Latest News

মাটির গন্ধ

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

হুস করে একটা সরু বাঁক ঘুরেই অফিসের রুপোলি ইনোভাটা গ্রামের রাস্তাটা ধরে ফেলল। মাঠের ধারের এবড়োখেবড়ো পথ। তার ওপর এখানে সেখানে জল আর কাদা জমে আছে। হবে নাই বা কেন? সকালে চড়া রোদ্দুর উঠলে সন্ধেরাতের দিকে রোজই তেড়ে বৃষ্টি। ভেজা রাস্তার ওপর দিয়ে মালপত্র বোঝাই বড় লরি গিয়ে গিয়ে জায়গায় জায়গায় পিচের চটা উঠে গিয়েছে। রাস্তার আর দোষ কী! এখন তো মরসুমের মর্জিই বোঝা ভার। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কারওরই নির্দিষ্ট কোনও সময় নেই। কে যে কখন আসে যায়, কিছুই টের পাওয়া যায় না।
জানালার কাচের ভেতর থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে তুহিনের মনটা এক্কেবারে শান্ত হয়ে গেল। এই জায়গাটাই এমন। ব্লটিং পেপারের মতো সমস্ত বিষণ্ণতা শুষে নিতে জানে। এতক্ষণ সবকিছুই কেমন যেন তেতো তেতো লাগছিল তুহিনের। আজও বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে ছুটি নেওয়া নিয়ে অহনার সঙ্গে একপ্রস্থ টকঝক হয়েছে। এই নিয়ে দ্বিতীয় বছর পুজোয় ওরা বাড়ি যাচ্ছে না। ক’দিন ধরেই অহনা গুম হয়ে রয়েছে। কথাবার্তা তেমন বলছে না। সন্ধ্যার দিকে চাউমিন কিংবা মোমো খাওয়ার বায়নাও আর করছে না।
মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে গাড়ির জানালা দিয়েই তুহিন দেখল এখন আকাশটা স্বচ্ছ নীল। একেবারে দাগছোপহীন আয়নার মতো। এমন আকাশ দেখলে মনে হয় নীল জলের একটা ধীর স্থির নদী। যেন রূপালি চাঁদের শ্বেতশুভ্র জোছনা নিঙড়ে তাতে আকাশের নীল মিশিয়ে নদীটা এঁকে দিয়েছে কেউ। নিজের মুখের প্রতিবিম্ব সেই নদীর জলে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে তুহিনের। যেমনটা ছোটবেলায় করত। শরৎকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রকৃতি এখানে রূপে টইটম্বুর ডালি সাজিয়ে বসে আছে। তুহিনের মনটাও এখন আকাশের মতোই পরিষ্কার। মনখারাপের মেঘ কেটে ঝলমলে রোদ্দুর উঠেছে। তুহিনের চোখের সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ আর সবুজ। এখানে এলেই ওর চোখের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষে দূর হয়ে যায়। রাত্রিবেলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাপটপের সামনে বসে থাকার পর যে হলদে-সবুজ লাল-নীল দোদুল্যমান আলোর ফুল্কিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সবুজ প্রকৃতির কাছে এলেই তারা বিলকুল ছু-মন্তর হয়ে যায়। আহা, এই সবুজের মায়া-থেরাপির কাছে কোথায় লাগে ভিয়েনা ফেরত আইস্পেশালিস্টের দেওয়া চোখের ড্রপ!
গাড়ির দরজাটা খুলে লাফিয়ে নেমে পড়ল তুহিন। ওর পায়ের ভারী সেফটি শু’টা নরম মাটির ভেতরে বেশ খানিকটা বসে গেল। সুপারভাইজার, মিস্ত্রি, লেবার মায় আশপাশের গেঁয়ো লোকগুলো পর্যন্ত তুহিনকে খুব সম্মান করে। প্রোজেক্টের হেড সুপারভাইজার ‘নমস্তে সাহেব’ বলে হাতজোড় করে দাঁড়াল। তুহিনও কুশল বিনিময় করে বলল ‘নমস্তে পাণ্ডেজি’। তুহিন কাউকেই শুধু নাম ধরে ডাকতে পারে না। আসলে সে জানে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গেলে তাদেরকে ভাইয়ের মতো আপন করে নিতে হয়। রোজগার কম, লেখাপড়া না জানা অশিক্ষিত, বোকার হদ্দ চাষাভুষো, এসব ভেবে তাচ্ছিল্যভরে দূরে সরিয়ে রাখলে তাদের হাত থেকে কিছুতেই মনের মতো কাজ আদায় করা যায় না। কাজের মধ্যেও যেন উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তের ফারাকটা চওড়া ফাটলের মতো প্রকট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কাউকে ভয় পাইয়ে নিজের নির্দেশ মানানোর চেয়ে ভালবেসে বুঝিয়েসুঝিয়ে কাজ করানোর মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে। তুহিন সকলের সুবিধে-অসুবিধের কথা শোনে। লাঞ্চের সময় সবার সঙ্গে বসেই খাবার খায়। বিকেলে একসঙ্গে চা-বিস্কুট খায়। নতুন ইঞ্জিনিয়ারবাবুকে তাই সবাই খুব খাতির করে। নিজেদের বড়ভাইয়ের মতো মান্যমান করে।

গম্ভীরপুর গ্রামে এই প্রথম সুপারফেসিলিটি হাসপাতাল হচ্ছে। সম্পূর্ণ সরকারি নয়, সরকারের অধিকৃত। এর আগে এই গ্রামে একজন বিহারি ডাক্তারের দাতব্য দাওয়াখানা ছিল। একটা মাটির বাড়িতে জনা চারেক হাতুড়ে কম্পাউন্ডার নিয়ে ডাক্তারবাবু হাসপাতাল চালাতেন। কিন্তু বেশ কিছু বছর হল সেই ডাক্তারও আর বসেন না। পুরনো সরকারি হাসপাতালটাও এখন ভগ্নপ্রায়। ওষুধপত্র আসে না, ডিপার্টমেন্টের উপরতলায় জোরজবরদস্তি করে সরকারি ডাক্তাররাও নিজেদের বদলি করিয়ে নিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালটা এখন আস্ত একটা ভূতের বাড়ি। সেটা অবশ্য এখান থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে। যানবাহন বলতে ভ্যান-রিকশা, ট্রেকার কিংবা টেম্পো। ফলে হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই অনেক সময় রোগীর মৃত্যু হয়। তবে গ্রামের লোকেদের মনে এখন অনেক আশা। বড় হাসপাতাল হচ্ছে। ভাল ওষুধ মিলবে। নামকরা শহুরে ডাক্তারবাবুরা আসবেন। এবার আর বিনা চিকিৎসায় গ্রামের কেউ মরবে না। সরল সোজা মানুষগুলো ডাক্তারবদ্যিকে আজও সাক্ষাৎ ঈশ্বর বলে মনে করে। তুহিন অবাক হয়।
প্রায় একবছর ধরে কাজ চলছে এখানে। আধা সরকারি প্রোজেক্ট। পাঁকজলে বাস করা বুড়ো কচ্ছপের পায়চারির মতো ঢিমে গতিতে কাজ এগোচ্ছে। শেষ হতে আরও বছরখানেক কী বছর দেড়েক সময় লাগবে। তুহিন-অহনার নতুন সংসার। একবছর হল বিয়ে হয়েছে। নতুন বউকে আলাদা রেখে আসতে তুহিনের মন চায়নি। শেকড়বাকড় সমেত সংসারের সমস্ত সরঞ্জাম উপড়ে নিয়েই ভিনরাজ্যে আসতে হয়েছে ওদের। সাইট থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে তুহিনকে একটা দু’কামরার কোয়ার্টার দিয়েছে কোম্পানি। তুহিন যেখানে থাকে সে জায়গাটা গম্ভীরপুর গ্রামের মতো অজপাড়াগাঁ নয়। আধা গ্রাম আধা শহর। পাড়ার দোকানগুলোতে কাজ চালানোর মতো টুকিটাকি জিনিসপত্র পাওয়া যায়। বাঁশের চ্যাঁচারি দিয়ে ঘেরা মাছ-মাংসের দোকানও আছে। একটু বেলায় খেতের তাজা সবজি নিয়ে গিয়ে রাস্তার ধারেই গেঁয়ো চাষিরা দোকান সাজিয়ে বসে। কুমড়ো, ঢ্যাঁড়স, ফুলকপি, আলু, পটল, ছোট ছোট বেগুন সবই পাওয়া যায়। হাইব্রিড নয়, দিশি। খেতে বসে ছেলেবেলার সেই হারিয়ে যাওয়া স্বাদটা তুহিনের জিভ আর আলটাগরা বেয়ে গোটা মুখের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। একটা দেহাতি বউ এসে অহনার হাতে হাতে ঘরের কাজ করে দেয়। প্রয়োজনে বাজারহাটও করে আনে। দুপুরের পরে সেই বউ চলে গেলে বাকি সময়টা অহনা একাই থাকে।

তুহিনের বাড়ির পাশে চওড়া পিচের রাস্তা নেই। সন্ধ্যায় নিয়নের আলো জ্বলে না। লোকজনের যাতায়াত, ভিড়ভাট্টাও তেমন নেই। দুটো বাচ্চা ছেলে ঠেলাগাড়ি করে ফুচকা আর আলুর মশলা টিকিয়া বিক্রি করে। সে মশলায় মিশে থাকে হাতেকোটা টাটকা হলুদের গন্ধ। টিকিয়াগুলো দেখতে দারুণ হলেও স্বাদে ফিকে। অহনা আদ্যোপান্ত শহরের মেয়ে। মফস্বলের পরিবেশের সঙ্গে সে মানাতে পারে না। লোডশেডিং হলে বিরক্ত হয়। শনি-রবির সন্ধ্যাগুলোয় ফাস্টফুডের জন্য তার মন উতলা হয়ে ওঠে। কিন্তু এই যে কিছুটা অভাব, বাড়ি থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে সব সুবিধে না পাওয়া তুহিনকে একটা অদ্ভুত ভাল লাগায় ভরিয়ে রাখে।
ছুটির দিনে পাড়ার মিষ্টির দোকান থেকে পাউরুটির পকোড়া আর চিনির গন্ধওয়ালা জিলিপি কিনে এনে ব্রেকফাস্ট সারে তুহিন। অন্ধকার রাতে দূর থেকে ভেসে আসা রাতচরা পাখির ডাক আর জোনাকির আলোয় খুশি হয়ে তুহিন বুঝতে পারে একটু একটু করেই এই জায়গাটার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে ও। এই প্রোজেক্টটা শেষ হলে আবার ওকে কলকাতা ফিরে যেতে হবে। তুহিন জানে, অহনা সেই দিনটার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু ফেরার কথা ভাবলেই তুহিনের মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে যায়। ওদের মতো ইঞ্জিনিয়াররাই তো ব্যস্ত শহরের বুকে ইটপাথরের ঝুলন্ত বাক্সবাড়িগুলো বানাচ্ছে। মডার্ন ডিজাইন, ঝাঁ-চকচকে মডেল, সুইমিং পুল, শপিং কমপ্লেক্স, একচিলতে পার্ক, উপরে-নীচে ওঠানামার জন্য লিফট দুর্দান্ত সব সুবিধেওয়ালা আবাসন; কিন্তু ওই কৃত্রিম পরিবেশে বসবাসের কথা ভাবলেই তুহিনের দমবন্ধ হয়ে আসে। মানুষজন যে কী করে ওইটুকু ঘরে বন্দি হয়ে থাকে কে জানে! মাটির কাছাকাছি বসত গড়তে কি আধুনিক মানুষের ভাল লাগে না? সবুজ ঘাসের বদলে কৃত্রিম কার্পেটে পা রেখেই কি আজ মানুষ অধিক আনন্দ পায়? ঘুরিয়েফিরিয়ে তুহিন নিজেকেই প্রশ্ন করে।
সাইটের জমিটা নিয়ে বহুদিন ধরে মামলা চলেছিল। আসলে সরকারি জমির পাঁচিলের আওতার মধ্যে গ্রামেরই একজন চাষির কিছুটা চাষজমি ঢুকে ছিল। সরকার বলেছিল পুষিয়ে দেবে কিন্তু অভিমানী চাষা মানেনি। অসম লড়াই লড়তে উদ্যোগী ছিল সে। এই জমি নিয়ে পঞ্চায়েত, শুনানি কম হয়নি। অবশেষে হাসপাতাল হবে শুনে সেই চাষি নিজেই নিজের দাবি ফিরিয়ে নেয়। এদিকে এসব জলভাত। জমি নিয়ে প্রায় দিনই মারামারি কাটাকাটি হয়! গোলাগুলিও চলে। আর একটু এদিকওদিক হলেই কাজ আটকে যায়। বিঘেকে বিঘে জমি তখন ডিসপ্যুটেড হয়ে পড়ে থাকে। সিমেন্টের পিলার পুঁতে পুঁতে খুঁতওয়ালা জমির চারধারে কাঁটাতার বেঁধে দেওয়া হয়। সাইনবোর্ড লেগে যায়। ‘মামলা চলছে। এ জমি এখন কারও নয়।’ বেওয়ারিশ আর বঞ্জর হয়ে পড়ে থাকে দো-ফসলি, তিন-ফসলি মাটি। হাসপাতালের জমিটা নিয়ে যে চাষির সঙ্গে মামলা চলেছিল সেই ভগবানদীনের সঙ্গে তুহিনের বেশ খাতির। ভগবানদীন রোগা রোগা শুখা চেহারার লম্বা এক বৃদ্ধ। তার মাথায় কাঁচাপাকা চুল। চোখদুটো কোটরে ঢোকা। অতিক্রান্ত দুপুরের শান্ত বেলাভূমির মতো চওড়া কপাল। লোকটা স্বভাবে তুমুল আড্ডাবাজ। একবার গল্প ফাঁদলে আর থামার নামটি করে না। শুধু মধ্যে মধ্যে ঠোঁটের ফাঁকে মশলা পুরে নেওয়ার জন্য ক’টা মিনিটের বিরতি নেয়। যেন ওই মশলাই তার সব এনার্জির উৎস। দুপুরের একটু পরে ভাঙা সাইকেল চালিয়ে ভগবানদীন খেতে আসে। লোকটার বাড়ি গম্ভীরপুরের পাশে কাপলি গ্রামে। এই চত্বরে এখনও তার বিঘে দুয়েক মতো জমি আছে। তুহিনকে দেখলেই সে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে, ‘কী ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, হাসপাতালটা খুলবে কবে?’
তুহিনও পাল্টা হাসে, ‘আরে চাচা, এই তো সবে শুরু। আগে তো বিল্ডিংটা বানাই।’
বৃদ্ধ ভগবানদীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘‘হোক হোক, দাওয়াখানাটা এবার হোক। গ্রামে ডাক্তার ছিল না বলে আমার মেয়েটা বাচ্চা হতে গিয়ে মরেই গেল। সেই রাতে ছেলেরা সব বিয়েবাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিল। বাড়িতে ছিলাম শুধু আমি আর আমার ঘরওয়ালি। তুমুল তুফান মাথায় নিয়ে পনেরো কিলোমিটার পায়ে হেঁটে আমি ডাক্তারনির বাড়ি গিয়েছিলাম জানো। কিন্তু ডাক্তারনি কোনও কথাই শুনল না। হাঃ হাঃ করে হেসে বলল, ‘তোদের ঘরের মেয়েদের আবার ডাক্তার লাগে নাকি? তারা তো বছরবিয়ানি। নিজেই ঠিক সামলে নেবে।’ ব্যথায় আমার মেয়েটা কাটা ছাগলের মতো কাতরাচ্ছিল সেদিন।’’
বুড়োর কথা শুনে তুহিনের মাথা নীচু হয়ে যায়। সন্তান হারানোর কাহিনি শোনাতে শোনাতে চোখ ভরতি জল নিয়েও একসময় ভগবানদীন হেসে ওঠে। ‘আমার নাতিটা খুব সুন্দর হয়েছে জানো! ফর্সা টুকটুকে! পড়াশোনাতেও খুব মাথা। আমার সেই মেয়েটার ছেলে, এখন এই এই এত্তোটা বড় হয়েছে। আমার কাছেই থাকে।’
হাত দিয়ে বাচ্চা ছেলেটির উচ্চতা আন্দাজ করে দেখায় ভগবান। তুহিনও গ্রামের ছেলে। গ্রামের একটা স্কুলেই বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে ও। কৃষক ভগবানদীনের কথা শুনে নিজের গ্রামের কথা মনে পড়ে যায় ওর। একসময় বাবা-কাকার সঙ্গে তুহিনও নিজেদের জমি পাহারা দিতে যেত। কত রাত জেগে জেগে যে ওরা পাকা ধান পাহারা দিয়েছে তার কোনও হিসেব নেই। আলের ধারে খাটিয়া পেতে শুয়ে থাকত তুহিনের বাবা আর ছোটকা। বসন্তের দিনগুলোতে রাত্রিবেলা মাঠে যাওয়ার জন্য তুহিন মুখিয়ে থাকত। মাঠের মাঝে তখন খরগোশের বাচ্চা, রাতচরা পাখি আরও যে কত কী দেখা যেত! রাতের অন্ধকারে দলে দলে খরগোশ আসত খাবারের খোঁজে। লম্বা লম্বা ঘাসের মাঝখান থেকে তাদের চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করত। একটুখানি পায়ের শব্দ হলেই কান খাড়া করে তারা দৌড়ে পালাত। তুহিনের খুব ইচ্ছে ছিল একটা ছাইরঙা বুনো খরগোশের বাচ্চা পুষবে। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও ধরতে পারেনি। চোখ বুজলে সেসব দিন তুহিনের মনের পটে তুলি দিয়ে আঁকা ছবির মতো আজও ভেসে ওঠে। তখন নতুন ধান ঘরে তোলার দিনটা ছিল উৎসবের মতো। সারা বাড়িতে সাজো সাজো রব। বড় বড় আমের পাতা আর হলদে গাঁদা ফুল দিয়ে দরজার তোরণ বানানো হত। দরজায় দরজায় টিপিফল দিয়ে সিঁদুরের মাঙ্গলিক ফোঁটা এঁকে দিতেন ঠাকুমা। আর চালবাটা গুলে গোটা উঠোন জুড়ে সুদৃশ্য আল্পনা দিত মা। বিউলির ডালের গয়না বড়ি শুকিয়ে থাকত টালির চালে। ঠাকুমা যে কতরকমের পিঠে বানাতেন; সবক’টার নাম এখন তুহিনের ঠিক মনে পড়ে না। নতুন চাল আর নতুন গুড়ের গন্ধে ওদের সারা বাড়িটা ভরে থাকত। স্মৃতিমন্থনের সময় তুহিন আজও সেই ঘ্রাণ পায়।
তবে বাংলার নরম মাটিতে চাষের কাজ অনেক সহজ। বর্ষা সেখানে মায়ের মতো নরম স্বভাবের। গরম কাটতে না কাটতেই বর্ষা তার ঝিরঝিরে জলের মায়া আঁচল পেতে মাঠের শস্য আগলাতে ছুটে আসে। কিন্তু বিহার পেরিয়ে এসে এইসব শুখা রাজ্যে চাষবাস করা খুব একটা সোজা কাজ নয়। মে-জুনে এখানকার ফসলি জমি ফেটে চৌচির যায়। রোদের তেজ গা পুড়িয়ে চাষিদের কয়লার মতো কালো করে দেয়। তাদের দেখলে মনে হয় যেন একদল অন্ধকারের মানুষ। ক’ফোঁটা বৃষ্টির জন্য ওই মানুষগুলো চাতকের মতো চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। দুঃখ যেন তারা নিজেদের কপালে লিখিয়ে এনেছে। বাড়ি ফিরে তুহিন এসব গল্প করলে অহনা মুখঝামটা দেয়। জমি মাটি জল আর প্রকৃতির ঘরকন্নার কথা মেয়েটা বোঝে না। কলকাতার ঝাঁ-চকচকে শপিংমলের জন্য থেকে থেকেই তার মন কেমন করে। সপ্তাহান্তে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে হইহুল্লোড়, মাঝরাতের শো-তে বড় স্ক্রিনের সামনে বসে চোখে থ্রি ডি চশমা পরে দুরন্ত সব সিনেমা দেখা, কাচের দেওয়ালওয়ালা ফুডকোর্টে গিয়ে খাবার খাওয়ার দিনগুলো অহনার মনে পড়ে। সে অধৈর্য্য হয়ে ওঠে। তুহিনের চাকরি নিয়ে অহনা অনেক অভিযোগ করে। কিন্তু তুহিন এড়িয়ে যায়। অন্নদাতা কাজটাকে যে সে বড় ভালবাসে!

এক একদিন ভগবানদীন বলে, ‘এখানে মাটির বুকে অসীম পিপাসা গো সাহেব। যতই বৃষ্টি হোক না কেন সামান্য রোদের ঝিলিকেই সব শুকিয়ে যায়। খেতের মাটি ফাঁক হয়ে ফেটে গেলে এইখানে বড্ড ব্যথা হয় গো। তখন আমরা বৃষ্টির জন্য পুজো করি। ঈশ্বরকে ডাকি।’
হাত দিয়ে বুকের বাঁ দিকটা দেখায় ভগবান। অহনা দেখলে হয়তো বলত ‘বেশি বেশি’। কিন্তু তুহিন ওই বুড়ো চাষার কষ্ট বোঝে। চাষির সঙ্গে তার জমির নিগুঢ় সম্পর্ক তুহিনের অচেনা নয়। ওর বাবা তো এখনও সামান্য ক’কাঠা জমি আগলে দেশে পড়ে আছেন। তুহিনদের জমিতে এখন আর চাষ হয় না। কেনা চাল আসে। কেনা আটা, কেনা আনাজ; সবই এখন কেনা জিনিস। অন্যের হাতে ফলানো। গোরুবাছুর কিছুই আর নেই তুহিনদের। তবুও একটুকরো জমির প্রতি এখনও কী অসীম টান ওর বাবার! কী তীব্র মোহ! বাবা-মাকে বহুবার নিজের কাছে আনতে চেয়েছে তুহিন। গ্রাম ছেড়ে আসতে তাঁরা নারাজ। দু-একবার বলে বুঝিয়েও তুহিন চুপ করে গেছে। বেশি জোর করতে সাহস পায় না ও। তুহিন বোঝে, শ্বশুর-শাশুড়ি আসে না বলে অহনা একদিক থেকে নিশ্চিন্তে আছে। যেমন খুশি পোশাক পরছে, যা খুশি রাঁধছে, খাচ্ছে। অহনার সংসারে মা এসে জুড়ে বসলে ঠাকুর পাতা, সন্ধ্যা দেওয়া এসব নিয়মের ফ্যাচাং বেড়ে যাবে। আবারও অশান্তি করবে অহনা। যদিও বাড়ির উঠোনে একটা ঘটের মতো তুলসী গাছ, সিমেন্ট বাঁধানো ছোট্ট একটা তুলসী মঞ্চ, একটা তেলের গাছ প্রদীপ, শাঁখের ফুঁ, প্রসাদী লাল বাতাসা তুহিনের মনটাকে টানে। বাড়ি ফেরার সময় তুহিন দেখে গোধূলি আকাশের গেরুয়া রঙের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখানকার কিশোরী বউরা মেটে সিঁদুরে সিঁথি রাঙিয়েছে। তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালছে তারা। কেউবা সযত্নে শাঁখে ফুঁ দিয়ে গৃহস্থের মঙ্গল কামনা করছে। অদ্ভুত একটা নস্টালজিয়া ঘিরে ধরে তুহিনকে। লালপেড়ে ছাপা কাপড়ে অহনাকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে হয় ওর।
একসময় এই গম্ভীরপুর গ্রামে সত্তরোর্ধ্ব ভগবানদীনের দশ বিঘেরও বেশি জমি ছিল। চাষি হিসেবে সে কিন্তু একেবারে ফেলনা ছিল না। বছর সাত-আটেক হল, হাঁপানির অসুখ লোকটাকে একেবারে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। মেয়ের বিয়ের সময় অনেকটা জমি বেচে দিয়েছিল ভগবানদীন। তারপর ঘরওয়ালির অসুখের সময়েও বেচেছে। এখন যা আছে সেটা তার হাতের ময়লা। তবুও দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে বুড়ো লোকটা প্রতিদিন আপন মাটির সঙ্গে মোলাকাত করতে আসে। বছরে একবার প্লটিং-এর গা-ঘেঁষেই বর্ষিনের চাষ দেয়। ছাগল মোষ চরাতে আসা যুবা রাখালদের নানা কৌশল শেখায়। কোন ঘাস খাওয়ালে গবাদিপশু বেশি দুধ দেবে সেসব নুস্কাও বলে দেয়। বুড়োর ছেলেরা এখন দাঁড়িয়ে গেছে। প্রত্যেকেই ভাল উপায় করে। বড়ছেলের ঘরের নাতি কলেজ পাশ। সে আবার পরীক্ষা-টরিক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরি পেয়েছে। চাষ না করলেও এখন ভগবানদীন খেতে পাবে। কিন্তু জমির মোহ ছাড়া তো সহজ কাজ নয়। তুহিন জানে, জমিকে চাষিরা মায়ের মতো ভালবাসে। আবার সময়বিশেষে প্রেয়সীর মতোও বাসে। দিনরাত্তির গায়েগতরে চাষি যে মাটির ছোঁয়া মাখছে তার সঙ্গে ভালবাসা হবে না, সেটা হতে পারে না। ফসল তো আসলে মাটি আর কৃষকের সন্তান। তাই এককণা জমিও যদি কেউ ছিনিয়ে নিতে আসে এই মানুষগুলো পাগলা ষাঁড়ের মতো খেপে ওঠে। নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে বাঁচানোর মতো করেই প্রাণের মায়া ভুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা জমি আগলায়। অসৎ লোকেরা রাতের অন্ধকারে পিলার সরিয়ে নিজেদের আওতা বাড়িয়ে নেয়। জমি চুরির রেওয়াজটা এদিকে আজও আছে। ভগবান বলে, ‘জমি জমি করে হাঁপালে ছেলেরা এখন আমায় জোর কড়কে দেয় সাহেব। বলে, কী আছেটা কী তোমার ওই চিন্দি জমিতে? কারও মন হলে দখল নিক গে যাক। সেই ছেলেবেলা থেকে অনেক তো খেটেছ, এইবার ঘরে বসে খাও দেখি।’
দুই বছর হল ভগবানদীনের ঘরওয়ালি স্বর্গে গেছে। তার ছেলের বউরা কেউই চাষজমির দিকে আসে না। আশপাশের খেতগুলোতে চাষি বউরা কাজ করে। সেদিকে তাকিয়ে বুড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দুঃখ করে বলে, ‘আমার জমিতে আর লক্ষ্মীর পা পড়ে না। আমার কপালটাই খারাপ!’
তুহিন স্পষ্ট দেখতে পায় বলিরেখাময় চামড়ায় ঘেরা দুটো বৃদ্ধ চোখ আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের সঙ্গিনীকে খোঁজে। এক একদিন বুড়ো তুহিনের বাড়ির ব্যাপারেও নানা কথা জিজ্ঞেস করে। আবদার করে বলে, ‘একদিন জোড়ায় এসো না গো সাহেব। বহুকে দেখব। তোমার কপাল বলে দেয়, তোমার ঘরওয়ালি বড় পয়মন্ত। আমার এই জমিতেও তার পা পড়ুক। আমি ধন্য হই।’
লজ্জা পেয়ে তুহিন মুচকি হাসে। ইচ্ছে তো হয়; কিন্তু অহনা কি কোনওদিন আসবে? বিয়ের পর তুহিনদের গ্রামের বাড়িতেই যেতে চায়নি অহনা। এখানে এসে তার দামি হিলতোলা চটিতে কাদা লেগে গেলে সে যদি বিরক্ত হয়! মেয়েটার ওপর জোর করতে তুহিনের ইচ্ছে করে না। বুড়ো চাষির পাশে বসে আকাশের গায়ে তুলো তুলো মেঘের খেলা দেখে তুহিন। ভগবানদীন উদাস হয়ে চেয়ে থাকে জলের দিকে। ঘন শ্যাওলা রঙ দূরের বনবাদাড়ের দিকে। সূর্য ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হলুদ থেকে গাঢ় কমলা রঙের হতে থাকে। প্লটিং-এর থাবা দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে এদিকে। অনেক চাষিই নিজেদের জমিজমা বিক্রি করে নিশ্চিন্ত হয়েছে। তুহিন জানে, আর ক’টা বছর পেরোলে এখানেও ইটের প্রাসাদ উঠবে। সারাদিন সারারাত বড় বড় ডিজেল-খেকো গাড়ি যাতায়াত করবে এই রাস্তা দিয়ে। ভকভক করে কালো ধোঁয়া ছাড়বে তারা। নদীখালটাও হয়তোবা বুজিয়ে দেওয়া হবে। এই গ্রামের মুক্ত পশুপাখিরা তখন কোথায় যাবে কে জানে! মানুষ কত স্বার্থপর! কীভাবে অন্যের ঘর কেড়ে ক্রমাগত নিজেদের বংশ ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর কোণ থেকে কোণে। যেন আর কোনও প্রজাতিই এই পৃথিবীর বুকে বাস করার যোগ্য নয়! এই বিশ্বের সব সম্পদ শুষে নিয়ে একলা মানুষই রাজত্ব করতে চায়।
মরার আগে ভগবানদীন তার শেষ চিহ্নটুকু একটা সৎ মানুষকে বেচে যেতে চায়। বুড়ো চাষি জানে যে সে চোখ বুজলেই ছেলেরা যাকে পাবে তাকেই জমিটা গছিয়ে দেবে। মোটা টাকা আত্মসাৎ করাই তাদের মতলব। বেজুবান মাটির কদর ও ব্যাটার ছেলেরা বোঝে না। মাঝে মাঝে হাহুতাশ করে ভগবান বলে, ‘এই জমির জন্যই আমি মরতে পারছি না সাহেব। এই মাটিতেই আমার প্রাণ আটকে আছে। না হলে এখন আর কীসের টানে বেঁচে থাকব বলতে পারো? তোমার মতো একটা ভালমানুষ যদি পেতাম, জমিটা দিয়ে আমি শান্তিতে চোখ বুজতাম!’
সন্ধ্যার আগে বুড়ো গা হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ঝরঝরে সাইকেলটা গুছিয়ে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। প্রকৃতি মায়ের কোলে বিঘেখানেক সবুজ ঘেরা জমি কিনে নিতে তুহিনেরও খুব ইচ্ছে হয়। চাষি বাড়ির ছেলে সে, জমির প্রতি তার টান তো জন্মগত। কিন্তু অহনা যে কলকাতার কোনও পশ এলাকায় একটা বড় ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখে! নিজের ইচ্ছের কথা তাকে বলতে পারে না তুহিন।

একদিন সাহস করে তুহিন অহনাকে বলে ফেলে, ‘তুমি তো এখানকার গ্রাম দেখোইনি। সাইটের দিকে গ্রামটায় একদিন বেড়াতে যাবে? জায়গাটা কিন্তু খুব সুন্দর।’
–‘কী যেন নাম?’
–‘গম্ভীরপুর।’
–‘গম্ভীরপুর! বাব্বা! ওখানকার সবাই বুঝি খুব গম্ভীর!’
গ্রামের নাম শুনেই অহনা উপহাস করে। অহনার সেই হাসি তুহিনের বুকে তিরের মতো বেঁধে। সত্যিই, শহরের মানুষের কাছে গ্রাম আর গ্রামের সরল মানুষেরা কেমন যেন খোরাকের উপাদান! তুহিন আহত হয়, কিন্তু মনে মনে ঠিক করে অহনাকে একদিন ওই সবুজ গ্রামের বাঁধনেই সে বাঁধবে। প্রকৃতির টান যে কী অমোঘ শহুরে মেয়েটাকে বুঝিয়ে ছাড়বে ও।

সকাল থেকেই টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বাংলার লোকে একে বলে ইলশেগুঁড়ি। এদিককার দেহাতি ভাষায় বলে বুন্দি বারিস। তুহিনের টমেটো লাল রঙের পোলো গাড়িটার কাচ জুড়ে জলের ফোঁটা আল্পনা আঁকছে। নীল রঙের শিফন শাড়িতে অহনাকে আজ ভারি স্নিগ্ধ লাগছে। আড়চোখে তাকিয়ে স্ত্রীকে দেখে নেয় তুহিন। মেয়েটা রাগি হলেও সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। অহনা জীবনে আসার পর তুহিনের অনেক উন্নতি হয়েছে। জীবনের কাছে তুহিনের আর কিছুই চাওয়ার নেই। অহনার রুক্ষ মেজাজটা শুধু একটু নরম হোক, তাহলেই হবে। খোলা মাঠের কাছে এসে গাড়ি থামায় তুহিন। পাতায় ছাওয়া চায়ের গুমটি থেকে দু-একজন গ্রামের লোক উঁকি মারে। ইঞ্জিনিয়ারবাবু আজ নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে ফিসফাস কথা শুরু হয়ে যায়। সাইটের দিক থেকে ছুটে আসে কিছু লোকজন। অল্প কথাতেই তুহিন তাদের বুঝিয়ে দেয় আজ সে ডিউটিতে আসেনি। এমনিই বেড়াতে এসেছে। তবুও ম্যাডামকে দেখার জন্য মহিলা শ্রমিকরা উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে। শহুরে মেমসাহেব, না জানি কত সুন্দরী! তার একঝলক দেখা পেলেও চাষাভুসো মেয়েছেলেদের জীবন ধন্য হবে।
সাইট ছেড়ে তুহিনরা এগিয়ে যায় পাশের খোলা জমির দিকে। উঁচুনীচু মেঠোপথ, ঘাসের কার্পেটে ঢাকা। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি নদীখাল। অবিকল ছেলেবেলার ড্রইং খাতায় আঁকা কোনও ছবি। শুধু খাতার পাতায় আঁকা সেই কুঁড়ে বাড়িটিই যা নেই, যার টালির চালের ওপর থেকে উঁকি দিত কচি কচি পাতায় ঢাকা কলাগাছ, যার উঠোনে পুরোনো আমগাছের গোড়ায় বাঁধা থাকত দুধসাদা মাদি ছাগল আর তার ছোট্ট বাচ্চাটা।
বৃষ্টিতে ভেজা এঁটেল মাটি এখন আঠার মতো চটচটে। হাঁটতে গেলে পা আটকে আটকে যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে অহনাকে সামলে নিল তুহিন। একটানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। আকাশের একদিকে সাদা আর একদিকে ছাইরঙা মেঘ। অদ্ভুত রঙের কন্ট্রাস্ট! ক’টা বাচ্চা ছেলেমেয়ে খালিপায়েই কাদাজলের মধ্যে নাচানাচি করছে। ওদের পরনে জীর্ণ জামা প্যান্ট। হাততালি দিয়ে দেহাতি ভাষায় বৃষ্টিদিনের গান জুড়েছে ওরা। হঠাৎই ছেঁড়া ঘুড়ি হাতে নিয়ে একটা বাচ্চা অহনার প্রায় গা-ঘেঁষে ছুটে গেল। আর একটু হলেই বাচ্চাটার সঙ্গে ধাক্কা লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেত অহনা। তুহিন ভয় পেয়ে থমকে দাঁড়াল। অহনা বুঝি যা-তা বলে উঠবে এখুনি! কিন্তু না, অহনার খেয়ালই নেই। শহুরে মেম এখন সবুজ প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার চোখের আয়নাতে শুধুই প্রকৃতিকন্যার স্নিগ্ধ রূপের ছায়াছবি।
–‘গ্রামটা এত সুন্দর! আমাকে তুমি আগে আনোনি কেন তুহিন?’
অহনার গলা থেকে অভিমান ঝরে পড়ল। তুহিন বুঝতে পারল, প্রথমদর্শনেই মেয়েটা প্রকৃতির প্রেমে পড়ে গিয়েছে। তার শুষ্ক মনটা আবেগে ভিজে উঠছে এখন। এই দিনটার জন্যই তুহিন অপেক্ষা করে ছিল। আজ ও খুব খুশি। আকাশে জলভরা মেঘ গুরুগম্ভীর গলায় ডাকাডাকি শুরু করেছে। একটু পরেই খুব জোর পশলা আসবে। খানিকটা দূরেই পেখম মেলে দিয়েছে তিন-চারটে ময়ূর। ছড়িয়েছিটিয়ে আছে কিছু যুবতী ময়ূরীও। এসব দৃশ্য কোনওদিন দেখেনি অহনা। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে ভালবাসার মানুষটাকে জাপটে ধরল।
–‘চলো না তুহিন এইখানেই একটুকরো জমি কিনে নিয়ে একটা বাড়ি করি আমরা। আমাদের স্বপ্নের বাড়ি। সকালে সন্ধ্যায় আকাশের দিকে চাইলেই আমার মনটা ভাল যাবে। আর আমার কান্না পাবে না।’
–‘কিন্তু অহনা, এ তো একটা গণ্ডগ্রাম। অর্ধেক সময় কারেন্ট থাকে না, মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যায় না, আরও নানা ঝামেলা! তুমি তো এখানে থাকতে পারবে না। মফস্বলেই হাঁপিয়ে উঠছ তুমি আর…’
তুহিনকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল অহনা, ‘থাকতে পারছি না, কারণ ওখানে প্রাণ নেই তুহিন। ওখানে কোনও মানুষ নেই। সারাদিন তুমি বাড়ি থাকো না, আমার যে কী করে কাটে, আমিই জানি। এখানে একটা বাড়ি করলে, আমি মামণি আর বাবাকেও আমাদের সঙ্গে থাকতে বলব।’
অহনার কথা শুনে তুহিন অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে পড়ল ছোটবেলায় এরকম বৃষ্টির দিনগুলোতে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকত। কখন ভারী বর্ষণের শেষে সূর্য উঁকি দেবে আর আকাশ জুড়ে ফুটে উঠবে সাতরঙা রামধনুর ছবি সেই অপেক্ষায় প্রতিটা মিনিট গুনত সে। আচমকাই ‘সাহেব’ ডাকে তুহিনের ঘোর কেটে গেল। দূর থেকে ওদের স্বামী-স্ত্রীকে দেখতে পেয়ে হাত নাড়ছে ভগবানদীন। তুহিনকে জোড়ায় দেখে সে খুব খুশি। তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসছে।
এরই মধ্যে কোথা থেকে একদল বুনো সারস উড়ে এসে বড় বড় ঘাসের ভেতরে ঝুপঝুপ করে নেমে পড়ল। তুহিনকে অবাক করে দিয়ে অহনা তাড়াতাড়ি নিজের পা থেকে দামি জুতো টান মেরে খুলে ফেলল। পরনের জর্জেট শাড়িটা উঁচু করে ধরে একটা আহ্লাদী বাচ্চার মতো আনন্দে নাচতে নাচতে ছুটে গেল সেই পাখিদের দিকে। তুহিন চেঁচিয়ে উঠল, ‘সামলে অহনা, পড়ে যেয়ো না যেন!’
বুড়ো চাষা ভগবানদীন ততক্ষণে তার ইঞ্জিনিয়ারবাবুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তুহিন আর সেই গ্রামের চাষা দু’জনেই অবাক হয়ে দেখছে যে জলে ভেজা আঠালো মাটির ওপর দিয়ে শহুরে অহনা দৌড়োচ্ছে। আজ কতদিন পর অপেক্ষমাণ অবহেলিত মাটির বুকের ওপর আঁকা হয়ে যাচ্ছে পয়মন্ত রাঙা পায়ের ছাপ। মিটে যাচ্ছে মাটির সব পিপাসা। দু’হাতের পাতায় চোখ মুছে বুকভরে আরও একবার মাটির সোঁদা গন্ধ শুষে নিল ভগবানদীন। হয়তো এবার শান্তিতে চোখ বুজতে পারবে সে।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

You might also like