Latest News

কোনও একজন

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

কত বয়স হবে রাঙাপিসির? ষাট? নাকি পঁয়ষট্টি? দূর থেকে দেখা যাচ্ছে, রাঙাপিসি আসছে। তাকে এখনও দেখেনি। দেখলে চিনতে পারবে কিনা, সন্দেহ। সামনে একটা বাস এসে দাঁড়াল। ফাঁকা। হেমন্তর দুপুরে বাস বোধহয় ফাঁকাই যায়। যাক, এই বাসে সে উঠছে না।
রাঙাপিসি হনহন করে হেঁটে আসছে। সোজা তার দিকেই আসছে। মাঝেমাঝে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে বটে, কিন্তু হাঁটার সময় চোখ বেশিরভাগ সময় নিচের দিকেই থাকছে। কিন্তু ওই যে মাঝেমাঝে মুখ তুলছে, এতেই চেনা যায় মুখটা।
বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে যেন একটু ক্লান্ত হয়েই পড়েছিল পূর্ণিমা। এদিকে বাস এমনিতে আধঘণ্টা অন্তর। দুপুরের দিকে বাস আরও কমে যায়। একটু অপেক্ষা করতে হয় বটে, কিন্তু বাসটা ফাঁকা থাকে। গাদাগাদি ভিড় তার মোটেই ভাল লাগে না।
বসেই ছিল সে। কিন্তু যখন বুঝল, ওই দূর দিয়ে যে মানুষটা এলোমেলো শাড়িতে এলোমেলো হয়ে হেঁটে আসছে, সে রাঙাপিসিই; যখন চেনাটা স্পষ্ট হল— সে উঠে দাঁড়াল, বাসস্ট্যান্ডের ছায়া ছেড়ে নেমে দাঁড়াল রাস্তার ধারে। তাকিয়ে থাকল রাঙাপিসির এগিয়ে আসার দিকে। যেন দু’হাতে রোদ সরিয়ে হেঁটে আসছে পিসি।

বাসটা এল। দাঁড়াল, দাঁড়িয়েই থাকল। কনডাক্টর টুক করে নেমে পড়ল। দু-এক পা ঘোরাঘুরি করে বলল, ‘দিদি, যাবেন নাকি?’
‘পরের বাস ক’টায়?’
‘আধঘণ্টা পর…।’
‘আচ্ছা…।’
খানিক পর বাসটা ছেড়ে দিল। একটু একটু দূরের দিকে বাস মিলিয়ে যেতেই তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল রাঙাপিসি। যা চেহেরা হয়েছে, তার ভেতর থেকে চিনে নিয়ে আগের মানুষটিকে বের করে আনাই মুশকিল!
অথচ তাদের ছোটবেলায় রাঙাপিসি ছিল এলাকার নামকরা সুন্দরী। আর সাজের কী বাহার! একঢাল কোমর অবধি চুল ছিল তার। ডানহাতে ঘড়ি পরত। মুখে হালকা প্রসাধন, আলতো ছোঁয়ায় ঠোঁট রাঙাত। পিসি শহর থেকে গ্রামে এলে তারা পিসির সাজ দেখতে দলবেঁধে যেত।

উচ্চমাধ্যমিক অবধি রাঙাপিসি এখানেই থাকত, গ্রামের ইস্কুলে পড়শুনো করত। তারপর কলকাতার একটি ভাল কলেজে ভর্তি হল। ওর দাদারা ততদিনে কলকাতাতেই সেটেলড। সেখানে নানারকম ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। একটা বাড়িও কিনেছে। রাঙাপিসির সঙ্গে ওর বাকি পরিবার সেই বাড়িতেই উঠে গেল।
গ্রামে রাঙাপিসিদের তিনমহলা বাড়ি। সে বাড়িতে পাকাপাকিভাবে তালা পড়ল সেদিন। সেই মাটির বাড়ির যে বয়স কত, তার কোনও লেখাজোখা নেই। বাড়ির সামনে উঠোন, মড়াই, তেঁতুলগাছ— এখনও তেমনি আছে সব। বেশ কয়েক বছর আগে সেখানে গেছিল পূর্ণিমা। অবাক হয়ে দেখছিল সব। যেন মনে হয় সময় এখানে থমকে আছে আজও। কিন্তু না, সেদিন পিসির সঙ্গে তার দেখা হয়নি। ঘর খোলা, কুকুর-বিড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাখি ডাকছে, উঠোনে ঘুঘু চড়ছে।

সেই বৃহৎ জায়গা-জমি-পুকুর সব পড়ে রইল। কিছু জ্ঞাতি আর ভাগচাষিরা চাষ করত।
রাঙাপিসি পাকাপাকিভাবে ফিরে আসার পর ফিরে এল চলে যাবার প্রায় তিনবছর পর। প্রথমে বাড়ির সকলে এলেও কেবল রয়ে গেল রাঙাপিসি ও তার মা। থাকতে থাকতেই পিসির বয়স বেড়ে গেল, মা বুড়ি থুড়থুড়ি হয়ে মারা গেল একদিন। মারা যাবার আগের দিন অবধি কোনও একজনের জন্য আক্ষেপ করে গেল। কিন্তু তার হাল-হকিকত কিছুই বের করা গেল না পিসির মুখ থেকে।
ক্রমে ক্রমে জানা গেল কলকাতাবাসী থেকে পুনরায় গ্রামীণ হবার কাহিনি।

কলকাতার কলেজে পড়তে পড়তেই এক সহপাঠীর সঙ্গে প্রেম হয় রাঙাপিসির। আস্তে আস্তে সে খবর বাড়িতে জানাজানি হয়। রাঙাপিসির বাড়ির লোক এই সম্পর্ক মেনে নেয় না। একদিন কথা বলার অছিলায় ছেলেটিকে বাড়িতে ডাকে, তারপর তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। রাঙাপিসির পড়াশুনো বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ির লোক কলকাতার পাট গুটিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। বন্ধ থাকা গ্রামের বাড়ির দরজা-জানালা খুলে ঝাড়পোছ হয়। মড়াই সারানো হয়। বুজিয়ে ফেলা হয় ইঁদুরের গর্ত, পোকা-মাকড়ের আবাস। শুরু হয় পুনরায় গ্রামীণ বসবাস।
সেই সময় রাঙাপিসির মায়ের যুক্তি ছিল এইপ্রকার: আমার বাকি দুই মেয়ের ভাল পরিবারে বিয়ে হয়েছে। তাদের বররা ভাল চাকরি করে। কোনও মেয়েরই টাকার অভাব নেই। ছোটমেয়ের বিয়ে আমি কিছুতেই এক হাভাতে ঘরের ছেলের সঙ্গে দেব না। আমার দুই ছেলেও ব্যবসা করে প্রচুর টাকা আয় করে। কলকাতায় বাড়ি কিনেছে। এসব দেখে হা-ঘরের ছেলেরা তো ঝাঁপিয়ে পড়বেই। তাছাড়া আমাদের দেশ-গাঁয় যা সম্পত্তি আছে, বসে খেলেও তিন পুরুষের আরামসে চলে যাবে।

গ্রামের বাড়িতে প্রথম বছরটা একপ্রকার গৃহবন্দি অবস্থায় ছিল রাঙাপিসি। তখন তো ফোন ছিল না। মোবাইল দূরের কথা, ল্যান্ডলাইনও ছিল না। রাঙাপিসি ওই বাড়িটুকু, উঠোন আর গাছদের গণ্ডি টপকাতে পারত না।
এমন নয় যে ছেলেটার বাড়ি কাছাকাছি কোথাও যে, সাইকেলে করে এসে চোরাগোপ্তা দেখা করে যাবে। এর যেমন কোনও সম্ভাবনা ছিল না, রাঙাপিসিও তা কখনও কল্পনাই করত না। তাছাড়া ছেলেটিকে যেরকম অশালীন ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছিল কলকাতার বাড়িতে তাকে ডেকে এনে, তাকে বসতে না দিয়ে যে রূঢ় ব্যবহার করা হয়েছিল, তাতে এটা মোটামুটি পরিষ্কার, এতটুকু আত্মসন্মানবোধ যার আছে— সে আর সে-বাড়িতে পা দেবে না। আর এটাই এদের পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল।
বাস্তবিক এরপর আর ছেলেটির সঙ্গে রাঙাপিসির আর কখনও দেখা হয়নি। সেই যে রাঙাপিসির কলেজ বন্ধ হয়ে গেল, আর পড়া হল না তার। পরবর্তীতে ছেলেটার সঙ্গে আর কেউ যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন আছে বলে কেউ মনে করেনি। তার কোনও ঠিকানা বাড়ির লোকের কাছে ছিল না। রাঙাপিসির কাছেও কেউ তা চায়নি। কেবল মাটির বাড়িতে বসে বসে, কোনওদিন তেঁতুলগাছের কাছে তার মা সেই আক্ষেপগুলো করে যেত। যদি সেই ছেলেটাকে সঠিক সময়ে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হত, তা হলে রাঙাপিসির আজ এই হাল হত না।

দুই

রাঙাপিসি বললে, ‘তোদের বাড়িটা— ওই দিকেই না…?’
বলে আঙুল নির্দেশ করল পিসি। পূর্ণিমা ঘাড় নাড়ল। বলল, ‘যাও না তো একদিনও…।’
‘যাব রে। আসলে হয়েছে কী বল তো, সময় পাই না একদম, বুঝলি—।’
পূর্ণিমা চুপ করে রইল। রাঙাপিসির কাজ বলতে চৌপ্রহর এপাড়া, ওপাড়া; এই গ্রাম, সেই গ্রাম ঘোরা। রাঙাপিসির বাবা-মা রাঙাপিসির নামে বেশ কিছুটা জমি লিখে দিয়ে গেছে। তা দেখভাল করে স্থানীয় ডোমপাড়ার একটি পরিবার। সেসব জমি তারাই চাষ করে, ফসল ফলায়; জানে এইসব জমি একদিন তাদেরই হবে— কেবল যা করতে হয়, যতদিন রাঙাপিসি বেঁচে আছে, তাকে দু’বেলা দু’মুঠো খেতে দেওয়া।
তারা তাদের কর্তব্যে গাফিলতি করে না। যখন সেই মাটির ঘরে-দোরে একাই ঘুরে বেড়ায় রাঙাপিসি, বা তেঁতুলতলায় বসে বিড়বিড় করে বকে, হাসে, আবার সেখানেই শুয়ে পড়ে— ওরা রান্নাভাত দিয়ে আসতেই পারে। কিংবা এপাড়া ওপাড়া থেকে কেউ খবর করল, রাঙাপিসি অমুকের বাড়িতে আছে, সেখানে বসে বসে মাথার উকুন বাছছে— তখন তাকে ডেকে এনে ভাত দেওয়া। এছাড়া নিত্য স্নান করানো, জামাকাপড় পালটে দেওয়া, গা পরিষ্কার করানো— সব তারাই করে। জমির মধ্যে এইসব করার হিসেব ধরা আছে।
কিন্তু এই যে এখন রাঙাপিসি গ্রাম উজিয়ে চারিদিক অনেকটা ঘুরে-বেড়িয়ে এসে এই হাইরোডের ধার দিয়ে ফিরছে; পূর্ণিমা নিশ্চিত আজ কোথাও খাওয়া জোটেনি তার। ডোমের ছেলেরা ওকে কোথায় খুঁজবে যে থালা সাজিয়ে দেবে?
রাঙাপিসিকে ওই যে গ্রামের বাড়িতে অন্তরিন করে রাখা হল, তারপর থেকেই একটু একটু করে পিসি বদলাতে শুরু করে। বাড়ির লোক প্রথমে বুঝতে পারেনি, গুরুত্ব দেয়নি। ছেলেটির নাম বিড়বিড় করত, নানা ঘটনার কথা বলত— এমনভাবে কথাগুলো বলত, যেন মনে হত— সেই ছেলেটি সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির লোক ভেবেছে, এটা ঢং মাত্র। এই খ্যাপামো ক’দিন পরেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তা তো হলই না বরং দিনে দিনে তা বেড়ে চলল। পিসি গালাগাল দিতে থাকল, ভাঙচুর করতে থাকল। পিসিকে এরপর ঘরে বন্ধ করে রাখতে হল।

তিন

পিসি বলল, ‘আমাদের বাড়ির তেঁতুলগাছটাকে মনে আছে তোর?’
‘ওমা! থাকবে না কেন? কী সুন্দর, কত বড় বড় তেঁতুল হত। পাকলে এই মিষ্টি। অমন মিষ্টি তেঁতুলের গাছ আর তো দেখলুম নে। ছোটবেলায় সে গাছের কচি পাতা তুলে নুন দিয়ে খেয়েছি কতবার। কী ঘন ছায়া ছিল তার। তা সে গাছটাকে কেটে ফেলেছ নাকি?’
‘নারে— কাটব কেন? মাঝেমাঝে পুন্নিমের দিনে সে গাছের নীচে আলো এসে জমা হয়— জানিস!’
‘এ তো খুব ভাল জিনিস।’
‘আমি ঘরে আর কতক্ষণ থাকি বল? সেখেনেই তো থাকি।’
‘সারারাত থাকো? ঠান্ডা লেগে যাবে যে এই সময়।’
পিসি উদাস হয়ে বলে যায়, ‘সেখানে খঞ্জনি বাজে, দোহার বাজে, শ্রীখোল বাজে— তখন বাঁশি বাজে।’
খটকা লাগে পূর্ণিমার। বলে, ‘বাঁশি? কে বাঁশি বাজায়?’
‘কে না বাঁশি বাজায় এ গোঠ গোকুলে—।’
‘মানে?’
‘কী নামে ডাকলে কে যেন আসত সেই যমুনাতীরে? পারবি বলতে? পারবি না। হুঁহুঁ বাবা! বল দেখি, কারা ফুলের রেণু মেখে বলত— ভালবাসি তোমায়?’
শ্বাস বন্ধ করে পূর্ণিমা বলল, ‘কারা বলে?’
‘বলত ওই— বাঁশি বাঁশি বাঁশি।’
পূর্ণিমা স্তব্ধ হয়ে রইল। বলল, ‘তারপর?’
পিসি তেমনি উদাস হয়ে বলে যায়, ‘তেঁতুলগাছের মাথার ভেতর তখন সেই চাঁদ বসবাস করে। পৌষ-ফাগুনের চাঁদ সে। আলোর যমুনায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। ভালবাসি ভালবাসি বলতে বলতে কারা যেন ধুলোর মাটিতে আলপনা দেয়।’
দম বন্ধ করে পূর্ণিমা বলে, ‘তারপর? কে আসে তখন?’
‘কেউ আসে না— ভালবাসে না— বাঁশি বাজে না— রোদ উঠে যায় তেঁতুলগাছের মাথায়। সূর্যের তাপে পুড়তে থাকে মাটি। কেন, তুই জানিস না, এমনি হয়?’
পিসি তার হাত ধরে পিছন দিকে টেনে নিল আর প্রায় ঘাড়ের উপর দিয়ে চলে যাওয়া লরির ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে কয়েকটি খিস্তি ছুড়ে দিল দুরন্ত গতিতে। চোখে-মুখে ধুলো হাত বুলিয়ে পরিষ্কার করে পূর্ণিমা বলল, ‘গেসলে কোথা, পিসি?’
‘ওই যে— বিধুশেখরের বাড়ি— চিনিস?’
‘না।’
‘ওর মেয়ের বিয়ে ছিল।’
‘সে তো রাতে। এখন গেছিলে কেন?’
‘বিয়ে তো কাল রাতে হয়েই গেছে। আমি সারারাত ওখানেই ছিলুম। বসে বসে বিয়ে দেখলুম। ওরা খুব যত্ন করে খাওয়ালেও। সকালে বর-কনেকে রওনা করিয়ে তবে ফিরছি। আমার একটা দায়িত্ব আছে না?’

নিচু গলায় পূর্ণিমা বলে, ‘আমার বাড়ি যাবে পিসি?’
অমনি পিসি দু’দিকে মাথা নাড়ে। বলে, ‘হবে নারে। কাজ আছে।’
‘কাজ!’ পূর্ণিমা দারুণ অবাক হল। ‘তোমার আবার কী কাজ?’
‘নবীনপুরের ভোলা ময়রাকে চিনিস?’
‘নবীনপুর? সেটা কোথায়?’
‘ওমা! জানিস না? সে অনেক দূর— আমি এই হেঁটেই চলে যাব বুঝলি— ঘণ্টা তিনেক মতন সময় লাগবে। তা লাগুক, পায়ের জোর আছে এখনও। ভোলা ময়রা নিজে বাড়ি বয়ে এসে নেমন্তন্ন করে গেল— না গিয়ে পারি কী?’
‘সে না হয় বুঝলুম। কিন্তু কীসের জন্য নেমন্তন্ন?’
‘বা রে, জানিস না বুঝি, ওর বড়মেয়ের বিয়ে? আমি না গেলে সে বিয়ে হবে? হবে নে।’
‘এই এলাকায় যখনই কোনও বিয়েবাড়ি হয়, সকলে আগে আমাকে নেমন্তন্ন করে যায়— আমাকে ছাড়া বিয়ে অসম্ভব!’
‘এমন কেন?’
‘আমি সেই সন্ধে থেকেই সব বিয়েবাড়িতে গিয়ে হাজির হয়ে যাই। সারাক্ষণ বসে বসে বিয়ে দেখি। আমি না থাকলে বিয়েবাড়ি জমবেই না। বিয়ে দিয়ে বর-কনেকে ঘরে তুলে তার পর প্যান্ডেলে বসে খাই— একা একাই— বুঝলি?’
‘তা সেই বিয়ে কবে?’
‘দেরি আছে— দিন দশেক।’
‘তা মাঝের এই ক’টা দিন তবে চলো আমার কাছে গিয়ে থাকবে।’
‘কত দূরে তোর বাড়ি?’
‘মনে নেই তোমার?’
‘মনে নেই জানিস— মনে পড়ে না আর! কতদিন হয়ে গেল তোদের বিয়ে হয়েছে— ভুলেই গেছি!’
‘আমার সঙ্গেই যাবে— এখন? আমার বাড়িতে? যাবে?’
‘কে কে আছে তোর বাড়িতে?’
‘কে আবার— আমি একাই।’
‘আর ছেলেপুলে?’
‘তারা শহরে থাকে। পড়ে। চাকরি পেলে শহরেই থাকতে হবে। আমাকে এখন থেকে একাই থাকতে হবে।’
‘আর তোর বর?’
‘তার থাকা, না থাকাই! পরে বলব তোমায় সব।’
‘তুই এখন যাচ্ছিস কোথা?’
‘যাচ্ছি কোথা— ফিরছি তো। মাকে দেখতে এসেছিলুম।’
‘ও। আর তোর বাবা?’
‘নেই— তিনবছর পার হয়ে গেল— তুমি এসেছিলে বাবার কাজের দিন– মনে করে দ্যাখো— সেই দেখা তোমার সঙ্গে— তারপর এই।’
‘হুম! মনে পড়েছে। আর তোর ভাই? সে থাকে না?’
‘সে বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে দিল্লিতে। আর ফিরবে না।’
‘ও! সবাই কেমন দূরে চলে যাচ্ছে… মারা যাচ্ছে— কী বল?’
পূর্ণিমা কী বলবে? সে চুপ করে রইল।
‘আমিই কেবল মরছি না!’
‘তোমার কি এখন সে বয়স হয়েছে?’
‘তোর মা মরবে না, দেখিস। তুইও মরবি না। আর আমিও মরব না। কেন বল দিকি? কারণ আমরা যে সকলেই একা। একা একাই তো আমরা দিব্বি বেঁচে আছি— তাই না? একা মানুষ কখনও এত তাড়াতাড়ি মরে না। তারা অনেক অনেকদিন বাঁচতে পারে। দেখিস না, একা গাছ কেমনি জল-ঝড় সয়ে অনেকদিন বাঁচে?’

চার

পূর্ণিমা এবার একটু নীচু গলায় বলে, ‘অনেকদিন আগের কোনও একজনের কথা তোমার মনে পড়ে, পিসি?’
পিসি রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কার কথা বলছিস?’
‘মনে করে দ্যাখো না— বহুদিন আগের একজন… কোনও একজন…।’
পিসি বিড়বিড় করে বলে, ‘এই দ্যাখ না, আমার বাবা-মা-বড়দাদা, বৌদি, এক জামাইবাবু— সব কেমন একে একে চলে গেল— কলকাতার বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। আচ্ছা, এই যে মানুষজন সব মারা যায়, কেন যায় বল তো? সকলেই কি সত্যি মারা যায়? নাকি অনেকে বাঁশি হয়ে যায়, যমুনা পুলিন হয়ে যায়? কেউ কেউ হয়তো মারা গিয়ে দ্যাখ গে যা— ফুলের রেণুও হয়ে গেল। মারা যাবার পর কে যে কখন কী হয়ে যায়— কে বলতে পারে! এর মধ্যে কোনও একজনের কথা মনে রাখা খুব শক্ত— জানিস।’
বলতে বলতে পিসি উদাস হয়ে মুখ উঁচু করে তাকায়। আর পূর্ণিমার তখনই চোখে পড়ে দূর আকাশটার দিকে। অস্পষ্ট, মলিন, শত ছিদ্রযুক্ত একটি ক্ষয়াটে চাঁদ দুপুরের এই আলোতেও তাদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

You might also like