Latest News

জীবনঠান্ডা

মৃত্তিকা মাইতি

মাটির দাওয়ায় বসে ঘরের প্র‌তিটা কোনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল গৌরী।

কড়ি-বরগাগুলো পোড়া কাঠের রং নিয়ে মাথার ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে। টালির চালে জায়গায় জায়গায় মাকড়শারা মশারি টাঙিয়ে ফেলেছে। কারও যত্নের হাত পৌঁছায়নি ওই অবধি। ঘাড় বেঁকিয়ে দেখতে দেখতে একসময় দৃষ্টি আটকে যায় গৌরীর। মনে হয়, ঘরটারই পুরনো দুটো চোখ বড় বড় করে তাকেই দেখছে! মনের মধ্যে কী চলছে, তাও জেনে নিচ্ছে যেন। শরীরের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গিয়ে হালকা লাগতে থাকে। সে যে প্র‌াণভরে দেখে নিচ্ছিল বাড়ির সবটুকু।

বাইরে গ্র‌ীষ্মের ঝাঁ-ঝাঁ রোদ ঝিলঝিল করছে। বউদি শাক আর মাছ কুটে পাছিয়ায় করে নিয়ে ধুতে গেছে পুকুরঘাটে। এখনও ফিরল না। ঘাটে কারও সঙ্গে গল্পে আটকে গেছে বোধহয়। ভাইপো-ভাইঝি দু’জন আজ স্কুলে যায়নি পিসি আসার আনন্দে। খরায় খরায় কোথায় খেলে বেড়াচ্ছে। সঙ্গে তার মেয়েটাকেও নিয়ে গেছে।

এবার অনেকদিন পরে বাপেরবাড়ি এসেছে গৌরী। বাবা যাওয়ার পর এই প্র‌থম। মা তো কবেই গেছে। ঠিক ঠিক মনেও পড়ে না। বাবা মারা যাওয়ার পর দাদাই দূরত্ব রেখে চলছিল।

সংসার সংসার করে গৌরীরও আসা হয়ে ওঠেনি। গোরু, হাঁস, মুরগি। শাশুড়ি আবার ছাগল এনেছে কতগুলো। তা ছাড়া চাষের সময় মাঠে যেতে হয় বরের সঙ্গে। এবার নিজে গিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে ডেকে এনেছে দাদা। সম্পত্তির কাগজে নামবদল হবে। গৌরীর সই চাই। এবারের আদরযত্নও তাই অন্যরকম। দাদা বলেছে, ‘ভাগনিটাকে নিয়ে কয়েকটা দিন থেকে যাস। দেখাই তো হয় না।’

আসার আগে বরের সঙ্গে আলোচনা করেছিল গৌরী। অমিত বলে দিয়েছে, ‘তোমার অধিকার, রাখবে, না দিয়ে দেবে, তোমার ব্যাপার। আমার কিচ্ছু বলার নেই।’ দাদা ফিশারিতে কাজ করে। দুপুরে খেতে আসবে। তখন কথা হবে। কথা আর কী। গৌরী তার অংশ দাদার নামে ছেড়ে দেবে কি না, এই তো। কাগজপত্রে সব পাকা হয়ে গেলেই হল।

পাঁচবছরের মেয়ে অণু দাদু-দিদা কারও আদর পেল না। দাদু যে তাকে কোলে নিয়েছিল কোনওদিন, তাই সে ভুলে যাবে বড় হতে হতে। তবু মামাবাড়ি আসাতেই তার আনন্দ। কিন্তু এসে থেকে গৌরীর মন বসছে না কিছুতেই। বাবা-মা যে নেই, তা যেন এখন আরও বেশি করে কষ্ট দিচ্ছে।

ওই যে বউদি ফিরল। বাঁশের কাঠিগুলোর ফাঁক দিয়ে পাছিয়ার নিচে থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। তাড়াতাড়ি রাঁধাশালের দিকে চলে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল, ‘ফিশারি থেকে সে এসে পড়লে আবার মুশকিল। টাইমে খাবার না পেলে বাড়ি মাথায় করে তুলবে।’

দাদা যখন ছোট ছিল, তখন কি মা দাদাকে খাইয়ে দিত নিজের হাতে? গৌরী মনে করতে পারে না, মা তাকে কোনওদিন খাইয়ে দিয়েছে কি না। তবে আরও পরের কথা মনে আছে তার। খেতে বসে শেষ গরসটা বাবার পাত থেকে না খেলে পেটই ভরত না।

এক-একসময় খুব রেগে যেত বাবা। ‘তোর খারি লাগবে বো, আমি কাঁচা নুন খাই।’

তাও খাবে গৌরী। রাগ দেখাতেও ছাড়বে না। ‘অত নুন খাও কেন? জানো না আমি খাব?’

‘বাঃ, ভাল আবদার তো! তুই কোথায় একটা গরস খাবি তার জন্য আমি আমার পাতে নুন খেতে পারব না!’

কোথায় একটা ঘণ্টার আওয়াজে আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল গৌরীর। তা না হলে হয়তো বাবার সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ ঝগড়া চলত। যে ঝগড়া আসলে কবেই মিটে গিয়েছে!

কোথায় বাজছে ঘণ্টা? পুজো হচ্ছে কোথাও? না, তা তো নয়। শব্দটা এখনও শোনা যাচ্ছে। চেনা চেনা লাগছে যেন। কবেকার একটা সুর। কিন্তু তা কি হতে পারে!

দাওয়া থেকে উঠোনে নেমে এসে অবাক হয়ে যায় গৌরী। আরে! হ্যাঁ, এ তো জীবনঠান্ডা! ঘণ্টা বাজিয়ে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে।

কতগুলো বাচ্চা ছুটছে পিছনে পিছনে। হাতে-পায়ে ধুলোমাখা। খালি গা, চুলে তেল নেই, উসকোখুসকো। ছোট্ট মাটির পুতুলে দড়ি লাগিয়ে নাচালে যেমন লাগে, সেরকম লাগছে ওদের। কোনও কোনও ছেলের ঢিলে হয়ে যাওয়া হাফপ্যান্ট ঘুনসির নিচে সড়কে যাচ্ছে বার বার। তারা সেটা এক হাতে টেনে তুলে আবারও দৌড়চ্ছে! সঙ্গে গৌরীর মেয়ে, ভাইপো-ভাইঝিরাও আছে।

ডাক দিয়ে লোকটাকে দাঁড় করাল গৌরী। দেখার পরেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না তার। কাছে গিয়ে বলল, ‘এখনও এ জিনিস আছে কাকা? পাওয়া যায়!’

ঘামে ভেজা মুখে হাসল লোকটা। ‘এই গরমের সময়টায় যা একটু বিক্রি হয় দিদি। এখন তো গ্র‌ামেও কাপ আইসক্রিম বেরিয়ে গেছে। তার স্বাদও ভাল। তাই খায় সবাই। তার কাছে এ কী! এর কদর আর নেই। বাক্সটা খরচ করে কিনেছিলাম। গরম পড়লে আমি তাই মানুষের জীবন ঠান্ডা করতে বেরিয়ে পড়ি। নইলে সারাবছর তো আমাকে অন্য কাজ করতে হয়। এই দিয়ে আর চলে না।’ কথা শেষ করে লোকটা জোর করেই যেন আর একটু হাসি আনল। সাদা খোঁচা খোঁচা দাড়ি ঠেলে উঠল আরও।

গৌরী তাকিয়ে ছিল তার মুখের দিকে। এই কি সেই লোকটা, যে তার ছোটবেলায় এই সাহাপুরে আসত? বুড়ো হতে হতেও এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে জীবনঠান্ডা নিয়ে? তাদের দু’জনের কেউই কাউকে চিনে উঠতে পারবে না আর।

বাচ্চাগুলো সমানে হুরি-চকার করছে। গৌরী বলল, ‘একটা করে দাও তো সবাইকে। আমার শ্বশুরবাড়ির গ্র‌ামে তো এ জিনিস পাওয়াই যায় না।’

বাঁশের সরু কাঠিতে অনেক বরফের কুচি একসঙ্গে মুঠো করে লাগানো। সাদা মিষ্টি বরফ। তাতে অল্প বিটনুন আর কয়েক ফোঁটা পাতিলেবুর রস ছড়িয়ে সকলের হাতে একটা করে ধরিয়ে দিল লোকটা। ছোটরা তাই পেয়ে একেবারে ঠান্ডা। গৌরীও একটা নিয়েছে।

ছোটবেলায় এই ঘণ্টার আওয়াজ কানে গেলেই সে একছুটে চলে যেত বাবার কাছে। ‘বাবা, একটা টাকা দাও তো, জীবনঠান্ডা এসছে।’

‘কাল যে খেলি একটা? রোজ রোজ ও খেতে হয় না। দাঁতে পোকা লেগে যাবে।’

‘না লাগবে না।’ হাঁফাতে হাঁফাতে হাঁ করে দাঁত দেখিয়ে দেয় গৌরী। ‘দাও না তাড়াতাড়ি। চলে যাবে যে।’

‘ও যাক। আমার কাছে আর পয়সা নেই।’

গৌরী বলল, ‘তোমায় দিতে হবে না, আমার টাকা থেকে দাও।’

‘তোর আবার কীসের টাকা!’

‘সেই যে, মেলার সময় দশ টাকা রাখতে দিয়েছিলাম।’

অমনি বাবা হো হো করে হেসে উঠল। ‘রোজ একটাকা করে খাচ্ছিস, এখনও সে টাকা আছে? একপয়সাও শোধ হয়নি?’

কথাটায় একটুও পরোয়া না করে গৌরী মুখ, হাত-পা বেঁকিয়ে বলল, ‘সে কি আমার টাকায় খেয়েছি নাকি, সে তো তোমার টাকা। আমারটা তো যেমন ছিল তেমনই আছে।’

যেন খুব রহস্যের মীমাংসা জানা গিয়েছে, এভাবে তাকিয়ে থাকত যোগেন। গোটা মুখে হাসি মেখে আছে। গৌরীর অন্যরকম লাগত, কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারত না। তখন ট্যাঁকে গোঁজা খুচরো পয়সা বের করে বাবা বলত, ‘এই নে, নিয়ে যাঃ।’

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে গৌরীর। সে জানে না, পরে আর এখানে আসা হবে কি না। এলে কেমন লাগবে, তাই বা কে জানে। জায়গাজমি, বাড়ি-ঘর কিছুই কি আর থাকে! সবই জলের মত। আঙুল গলে বেরিয়ে যায়। ভেবে নিয়েছে গৌরী, লিখেই দেবে সে।

অণু শাড়ি ধরে টান দিচ্ছে। ছোট্ট হাতে গৌরীকে বেড় দিয়ে মাথা তুলে মিটিমিটি হাসছে সে। সারামুখে মিষ্টিজলে মাখামাখি। ঠোঁটে লেগে থাকা লেবুর রস জিভে লাগলে চোখ পিটপিট করছে। গৌরী তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। সেও খাওয়া শেষে বাবাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরত। ভাল লাগাটা কীভাবে জানাবে, খুঁজে পেত না। বাবা হয়তো ঠিক বুঝে যেত। গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলত, ‘ভাল খেয়েছিস?’

সেই বড় গাছটার ছায়া গৌরীর সাতাশ পেরোনোর আগেই মাথার ওপর থেকে সরে গেছে। এখন হয়তো গৌরী নিজেই শক্ত গাছ হয়ে উঠছে। তাকে জড়িয়ে বেড়ে ওঠার চেষ্টা করছে একটা চারাগাছ।

কচি গলায় অণু বলল, ‘মা, তুমি খাচ্ছ না কেন?’

কাঠিটা হাতে ধরা। জীবনঠান্ডা মুখ অবধি পৌঁছচ্ছে না গৌরীর। অণুর চোখের ঘন কালো দুটো তারায় নিজেকে দেখছে সে। টুং টুং করে বাজতে বাজতে ঘণ্টার আওয়াজটা মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে। সময় যেন শীতল হয়ে ঝরে পড়ছে আঙুল গলে মেয়ের মাথায়।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

You might also like