Latest News

প্রাংশুপুরাণ

প্রতিভা সরকার

‘‘আঃ মাহা, বড় কষ্ট!’’

শয্যায় পাশ ফিরতে গিয়ে অর্ধস্ফুট স্বরে কাতরোক্তি করে ওঠে নবীন শ্রাবক ন্যায়াপুত্ত। তার শরীরের রক্তমুখী স্ফোটকগুলি বেদনায় বিষিয়ে ওঠে। অবচেতনে বোধহয় তার মনে ফিরে আসে তার স্নেহস্বরূপা মাতামহীর কথা, যার কাছে জীবনের চতুর্দশ বৎসর সে আনন্দবেদনা হাসিখেলায় অতিবাহিত করেছে। যাকে সে ‘মাহা’ বলে ডেকে এসেছে জন্মাবধি। মাতার অপভ্রংশ কি এই মাহা? কে জানে! উত্তরে সে নিজে সম্ভাষিত হয়েছে আদরের ‘মহা’ নামে। মহা অর্থ বড়, প্রকাণ্ড, প্রচুর, উৎকৃষ্ট। ক্ষত্রিয় মাতামহী, স্বহস্তে অসিচালনা, অশ্বচালনায় পারদর্শী মাতামহী তার জন্য কী স্বপ্নসম্ভব ভবিষ্যৎ জীবনরেখা অঙ্কিত করেছিলেন তা মূর্খেও বোঝে।

মাতামহীর কথা মনে এলে দূরে থাকে না বাল্য ও কৈশোরের সেই মধুর দিনগুলির কথা। মাতা ত্রিশলার সেই মধুর মুখমণ্ডল। মাহার বিপরীতে মায়ের সেই কোমল নারীসুলভ ব্যবহার। মহা অশ্বপৃষ্ঠ থেকে পড়ে যেতেই তার সেই ‘বাছা, খুব কি লেগেছে’ বলে অকুণ্ঠ রোদন, যতক্ষণ না পৃথুলা মাতামহী সদর্পে ঘোড়াটির লাগাম আকর্ষণ করে সজোরে হাঁক পাড়েন,
‘‘কোথায় লুকালি মহা? এই বেগবান অশ্বকে বশে আনতে না পারলে আমি তোর মস্তকে এই ধুলা নিক্ষেপ করব।’’
বলতে বলতে সত্যিই তিনি বটবৃক্ষের মূল থেকে একমুঠো ধুলো কুড়িয়ে নেন। এবং পুনরায় মাহাকে ভূপতিত হতে দেখে উৎকট উচ্চহাস্যে ভেঙে পড়েন।

শাস্ত্রে তাকেই শ্রাবক বা শ্রমণ বলা হয়েছে যার মনে কারও প্রতি কোনও দ্বেষ কিংবা ভালবাসা নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, নরলোকে, দেবলোকে, পিশাচ বা জিনলোকে কারও প্রতি দ্বেষ নেই তার। তাই সে ন্যায়াপুত্ত নামে খ্যাত। কিন্তু মনের কোনও চোরাকুঠুরিতে মাতা এবং মাতামহীর প্রতি এক মধুর চোরাটান আজও রয়ে গেছে, এ কথা ভাবতেই এই অসুস্থ অবস্থাতেও ন্যায়াপুত্তের কর্ণমূল উষ্ণ হয়ে ওঠে। সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর পক্ষে এ অতি গুরুতর স্খলন!

শয্যা বলতে তো গৃহীর সযত্নলালিত শয্যা নয়, সম্মেতশিখর পর্বতের ওপর মহাপুরুষদের সমাধিগুলিকে অর্ধগোলাকৃতি বেষ্টন করে আছে যে আধো অন্ধকার গুহামালা, তারই একটিতে বিরাট পাথরের সমতলবৎ চট্টানে কুশের উপর শায়িত মহার নগ্ন শরীর। সুন্দর, যৌবনের পেশি-উচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ, কিন্তু রোগক্লিষ্ট।

বিশুদ্ধ বায়ু, সুপেয় জল ও পর্জন্যদেবের কল্যাণে সসাগরা বসুন্ধরা ছায়াময়, বিশাল মহীরুহের প্রাবল্যে শীতল ও স্নেহশালিনী। ব্যাধির প্রকোপ স্বাভাবিক কারণেই কম ছিল। কিন্তু হঠাৎই মারীর পূতিগন্ধে গ্রাম জনপদ পূর্ণ হয়ে গেছে। এমন অবস্থা, শবদেহ দাহ করার মানুষ নেই। জঙ্গল পরিকীর্ণ ভূমিতে অর্ধভক্ষিত মৃতদেহের পাশে দিবালোকেও বন্যজন্তুর অবাধ পদচারণা।

এ রোগের লক্ষণ অতি সামান্য। মস্তকঘূর্ণন ও প্রবল স্বেদধারা শরীরকে ধৌত করার পর বাসরকক্ষে নববধূর নিঃশব্দ, লজ্জাতুর আগমনের মতো শরীরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে, কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো চূড়ান্ত যন্ত্রণা ও অস্থিরতা রক্তমাংস বিদীর্ণ করে বাইরে আসতে চায়। জ্বর কমে না, শয্যাতেই রোগীর মৃত্যু হয়। সময় নেয় বড়জোর একদিন। তার মধ্যেই শরীর ছেয়ে যায় রক্তমুখী স্ফোটকে। আয়ুর্বেদাচার্যরা গম্ভীরমুখে মাথা নাড়েন, পরিচিত বসন্তরোগ এ নয়। প্রকৃতিদেবীর নতুন কোনও মারণলীলা শুরু হয়েছে। নিম ও চন্দনচূর্ণ লেপন এবং তুলসী ও মধু একত্রে পান ছাড়া যন্ত্রণা প্রশমনের অন্য কোনও নিদান তাদেরও অজানা।

বাইরে ঝড়ের দাপটে চারিদিক ছত্রখান হয়ে পড়ছে তা গুহাভ্যন্তর থেকেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। শাখায় শাখায় ঠোকাঠুকির আধিভৌতিক শব্দ, বজ্রের বধির করে দেওয়া আওয়াজ, হাওয়ার প্রবল শব্দ, বিদ্যুতের চিকন আলো গুহাদ্বার দিয়ে অহরহ ভেতরে প্রবেশ করছে। ন্যায়াপুত্তের শয্যা যে প্রস্তরের ওপর প্রলম্বিত, তার থেকে প্রায় সাত হাত নীচে গুহামৃত্তিকায় আর একটি কুশখণ্ড মেলে শায়িত আছে প্রিয় সাথি ইন্দ্রভূতি গৌতম। এই দিগ্বিদিক চূর্ণ করে দেওয়া ঝড়ও তার ক্লান্ত, অতিক্লান্ত নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। বরং হাওয়ার বেগ কিছুটা কমে এলেই ন্যায়াপুত্ত অত উঁচু থেকেও গৌতমের নাসিকাধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। জলহাওয়া শীতল হওয়াই বোধহয় এই গভীর নিদ্রার কারণ।

“আঃ!’’

আবার অস্ফুট কাতর শব্দ করে ওঠে ন্যায়াপুত্ত। জলপানের ইচ্ছায় সে বাঁদিকে শরীর ঘোরায়। কুশাগ্রে কয়েকটি স্ফোটক ফেটে যায়, ভেতরের রস ন্যায়াপুত্তের নিজের অঙ্গেই লিপ্ত হয়। হাতখানেক দূরেই মৃত্তিকাপাত্রে জল রক্ষিত। বিশালাকায় বৃক্ষপত্র চাপা দেওয়া। যদিও বাতাসের তোড়ে তা কাত হয়ে পড়েছে। কিন্তু জরা তার সমস্ত দেহকে প্রস্তরবৎ করে ফেলেছে, অসহনীয় ভারী, যেন নিজেও সে একটি পাথরের চট্টান। অতিকষ্টে আঙুলগুলি প্রসারিত করে সে, তবু জলপাত্র আর ওষ্ঠের দূরত্ব মনে হয় কয়েক যোজন।
হঠাৎ এইসময় ঝড়ের গতি অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বাতাসের গর্জনে কান পাতা দায়। যেন মহাপ্রলয়ের মুখোমুখি পৃথিবী। সাদা জলকণা সমুদ্রোত্থিত ফেনারাশির মতো হুহু ছুটে আসে। গুহার দেওয়ালে বাধা পেয়ে শ্রমণের শরীরকে ভেজায়। যে কোনও বৈদ্যের কল্পনারও অতীত, প্রকৃতির নিজহস্তের এই মমতাময় উপশম। শীতল জলকণায় প্লাবিত ন্যায়াপুত্তের চোখ আরামে বুজে আসে। মনে হয়, নীচ থেকে উঠে আসবে গৌতম, বলবে,

‘‘প্রভু কি তৃষ্ণার্ত?’’

এবার সজ্ঞানে সচেতনভাবে মাহা বা জননীকে স্মরণ করা থেকে বিরত থাকে শ্রাবক। কিঞ্চিৎ জলপান করতে পারলেই শান্তি। তার বহিরঙ্গ শীতল হয়েছে, এবার অন্তরাত্মা তৃপ্ত হলেই হয়তো সে ঘুমিয়ে পড়তে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। বরং কর্ণপটহ ভেদ করে এক প্রকাণ্ড বজ্রপাত হয়। এক মুহূর্তের নীল আলো, তারপরেই নিকষ অন্ধকার! কিন্তু সেই প্রবল বিস্ফোরণ, যা দেব-দানবের অকল্পনীয় যুদ্ধ ব্যতীত আর কোথাও উৎপাদিত হওয়া সম্ভব বোধ হয় না, ন্যায়াপুত্তের মনে কী এক প্রত্যাশার সঞ্চার করে। যেন বহুদূরে কোথাও গর্ভিণী মেঘপুঞ্জ বিস্ফারিত হয়ে এইমাত্র জন্ম নিল এক অমিত শক্তিপুঞ্জ। হয়তো দূর দেবলোক থেকে তার প্রতি ধেয়ে আসছে কোনও অলৌকিক বার্তা। অসুস্থ ন্যায়াপুত্ত কোটরাগত চক্ষু টানটান করে অন্ধকারে কী দেখার চেষ্টা করে। পুঞ্জ পুঞ্জ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না।

হঠাৎ ন্যায়াপুত্তের কর্ণে কোথা থেকে এক সুমধুর বংশীধ্বনি প্রবেশ করে। দূর গ্রহান্তর থেকে ঝরে পড়া সেই সুর যেন ক্রমশ নিকটবর্তী হয়, স্পষ্ট হয় সঙ্গে মৃদঙ্গ করতালের আওয়াজ। সহসা স্নিগ্ধ এক মৃদু আলোয় গুহার ভিতর উদ্ভাসিত হয়। আর নাম না জানা কোনও বুনো ফুলের আচ্ছন্ন করা সৌরভে প্রাণমন ডুবে যায়। সে শুয়ে আছে যার ওপর সেই বিশাল পাথরের দৈর্ঘ্য ছাড়িয়ে ধীরে জাগে কার বস্ত্রবিরহিত অতিদীর্ঘ দেহ, বিশাল স্কন্ধ, তীক্ষ্ণ নাসা, আয়ত চক্ষু! কুঞ্চিত কেশ চুড়ো করে বাঁধা আর সেই উন্নত মস্তককে বেড় দিয়ে আছে সপ্ত ফণাযুক্ত এক মহাসর্প! অন্ধকারেও যেন তার চতুর্দশটি চক্ষু পরম মায়াভরে শ্রাবককে অবলোকন করতে থাকে।

আধো নিদ্রায়, আধো জাগরণে ন্যায়াপুত্তের একবার সন্দেহ জাগে সে কি সত্যি জাগ্রত না নিদ্রামগ্ন! তবুও অবশ শরীরের রোমরাজি বর্ষার জল পাওয়া কদম্বপুষ্পের মতো শিহরিত হতে থাকলে আপনা থেকে স্খলিত কণ্ঠে সে ডেকে ওঠে,

“প্রভু!’’

যদিও সে দেবমুখ গুহার অতি মৃদু অপার্থিব নীলাভ আলো এবং বিদ্যুতের আলোছায়ায় ভালমতো দর্শনীয় নয়, তবু ন্যায়াপুত্ত সপ্তফণার লাঞ্ছনচিহ্ন দেখেই বোঝে তাকে দেখা দিতে সম্মেতশিখরের সমাধি বিদীর্ণ করে আজ ঘোর নিশীথে উঠে এসেছেন স্বয়ং গুরু পার্শ্বনাথ। হয়তো কোনও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ আছে তার প্রতি। কী ভাগ্য! করজোড়ে প্রণাম জানাতে যায়, কিন্তু তার শিথিল বাহু শয্যাতেই এলিয়ে থাকে। কঠোর তপস্যার কারণে তার শরীর অতি দুর্বল হয়েছিল, এই মারী তাকে আরও দুর্বল করেছে।

শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা। আশ মিটিয়ে তাই তাকিয়েই থাকে ন্যায়াপুত্ত। কখন বিদ্যুতের প্রভায় সে ইষ্টমুখ স্পষ্ট দেখা যাবে!
সে সৌভাগ্য হবার আগেই তার ওষ্ঠে শীতল জলধারা ঢেলে দেয় কে! গুরু স্বয়ং? জানলেন কী করে তার সমস্ত সত্ত্বা উন্মুখ হয়ে আছে একটি গণ্ডুষ জলের জন্য! এই আলো-আঁধারে পরিষ্কার কিছু ঠাহর হয় না, কিন্তু প্রাণভরে পান করে ন্যায়াপুত্ত। যেন বহুযুগ ধরে তার কণ্ঠে মরুভূমির বালি ভরাট হয়ে ছিল। আজ এই মাহেন্দ্রক্ষণে যেন ঔষধির মতো এই জলধারা তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং সজল করে তুলবে।

জল শেষ হয়ে যায়, তবু বিচ্ছিন্ন ওষ্ঠাধর নিয়ে আচ্ছন্ন অবস্থায় শয্যাগত থাকে ন্যায়াপুত্ত। নীচে নিদ্রিত ইন্দ্রভূতি গৌতম এসবের কিছুই টের পায় না।

পরদিন অতি প্রত্যুষে ন্যায়াপুত্ত চোখ মেলে গুহার বাইরে চাকভাঙা মধুর মতো সোনালি তরল স্বচ্ছ আলোর রেখা দেখতে পায়। গুহার অন্ধকার দূরীভূত হচ্ছে। সূর্যদেব উদিত হচ্ছেন। পাখির গীতে আস্তে আস্তে বনভূমি পূর্ণ হয়ে উঠছে।

ন্যায়াপুত্তের শরীরে দুর্বলতা থাকলেও তেমন ক্লান্তি নাই। ভয়ঙ্কর মহামারী মুখব্যাদান করে তাকে প্রায় গিলে ফেলেছিল এইরকম অনুভূতির অভাবে সে নিজেই বড় আশ্চর্য। কিন্তু আবছা মনে আছে সর্পবেষ্টিত গুরুর অস্পষ্ট মুখমণ্ডলের কথা। চোখ দেখতে পায়নি অন্ধকারে, তাই কোন পথে তাঁর করুণাধারা ন্যায়াপুত্তের মস্তকে ঝরে পড়ছিল সে নিজেও ঠিক জানে না। শুধু অনুভব করছিল এক পরম শান্তি। সমস্ত জরার পরপারে, দ্বেষ হিংসা অশান্তি, আকর্ষণ, তথাকথিত ভালবাসার ঊর্ধ্বে উপনীত হলে বোধহয় জিনজ্ঞানীর মনোভাব এইরকমই হয়। না, পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নেয় ন্যায়াপুত্ত। এর থেকে শতগুণ, হাজারগুণ প্রগাঢ় হয়। সে মনোভাবের ধারেকাছে পৌঁছতে পেরেই সে এত বিহ্বল!

“গৌতম!’’

প্রিয় সাথিকে মৃদুস্বরে আহ্বান করে ন্যায়াপুত্ত। সমস্ত রাত্রির অলৌকিক গভীর ঘুমের পর ইন্দ্রভূতির সজাগ কর্ণে সেই ডাক একবারেই পৌঁছে যায়। সে কুশশয্যার ওপর ধড়মড়িয়ে উঠে বসে।

“ন্যায়াপুত্ত, তুমি উঠে বসতে পেরেছ! আমাকে ডাকোনি কেন? তুমি, তুমি ঠিক আছ তো?’’

সখার ব্যাকুলতা প্রশমনে ডানহাত উত্তোলন করে ন্যায়াপুত্ত। আজ কিন্তু সেই পাথরের মতো ভার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে অন্তর্হিত হয়েছে। মনে পড়ে যায় যতক্ষণ তার জিহ্বায় জলধারা ঝরে পড়ছিল ততক্ষণ নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকা বাসুকির চোদ্দজোড়া অগ্নিখণ্ডবৎ চক্ষু। কী আশ্চর্য, তাদের মধ্যে একটুও হিংসা ছিল না। অসূয়া ছিল না। মরকত মণির মতো দীপ্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, আর ন্যায়াপুত্তের শরীরে রোগের কামড় শিথিল হয়ে আসছিল।

“আমাকে বেরোতে হবে গৌতম।’’

‘বেরোতে হবে!’’

গৌতম জলপাত্রটি হাতে তুলে নিয়েছিল প্রস্রবণে পুনরায় ভরে নিয়ে আসবে বলে। উত্তেজনায় ঠক করে সেটিকে আবার পাথরের ওপরেই রেখে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,

“প্রভু পার্শ্বনাথের দোহাই, তুমি এমন পাগলের মতো কথা বলো না, মহা। কাল রাতে অবধি তোমার ধুম জ্বর ছিল। দ্যাখো দ্যাখো বিস্ফোটকের রসে তোমার গাত্রবর্ণের কী অবস্থা হয়েছে!’’

বারণ করা সত্ত্বেও উত্তেজনায় তাকে পূর্বাশ্রমের নামে ডেকে ফেলে ইন্দ্রভূতি গৌতম জিভ কাটে। ন্যায়াপুত্ত যেন তা খেয়ালই করেনি এইভাবে বলে,

‘‘ঝর্নায় একটিমাত্র অবগাহন। তা হলেই এই সবের থেকে মুক্তি পাব আমি। তারপর থাকবে শুধু পথ আর ন্যায়াপুত্ত। তুমি এইখানেই অবস্থান করো গৌতম। আমার ডাক এসেছে।’’

“মহা মহা, এমন কথা বলো না সখা।’’

সব ভুলে ইন্দ্রভূতি হাহাকার করে ওঠে। যে রাতে মাতা ত্রিশলাকে ঘুমন্ত রেখে চিরকুমার মহা গৃহত্যাগ করে সেই ক্ষণ থেকে নিশ্চুপে তাকে অনুসরণ করে সম্মেতশিখরের পাদদেশ অবধি এসেছে সে। ছায়ার মতো লেপ্টে থেকেছে বাল্যসখার গায়ে। তার প্রতিজ্ঞা আর ইচ্ছার জোর দেখে ন্যায়াপুত্ত আর জোর করেনি। অপ্রকাশ্য অনিচ্ছায় মেনে নিয়েছে তাকে আগলে রাখবার এই দুর্মর ইচ্ছা। বন্য জন্তু, দস্যু, ব্যাধি, মারী, সর্বত্র ন্যায়াপুত্তের পাশে ইন্দ্রভূতি গৌতম। আজ অসুস্থ সন্ন্যাসী তার শেষ পিছুটানকে নির্মমভাবে কর্তন করতে চাইছে!

“আমি আর অসুস্থ নই গৌতম। প্রভুর আদেশেই এই সাময়িক বিচ্ছেদ। যদি অচেনা প্রান্তরে, বিজন অরণ্যে, দস্যু তস্কর অথবা বন্য জন্তু দ্বারা হত না হই, এই সম্মেতশিখরেই আবার ফিরে আসব জিনলাভের পর। কথা দিচ্ছি, তুমিই হবে আমার প্রথম শিষ্য।’’

‘‘শিষ্য করো বা নাইই করো, আমার কিছু যায় আসে না, ন্যায়াপুত্ত। মারের* মতো প্রলোভন আমাকে তুমি দেখিয়ো না। সে সাধনায় আমার তোমার আগেই সিদ্ধিলাভ হয়েছে। তুমি যেখানেই যাবে, আমি তোমার ছায়ানুগামী হব। এই আমার শেষকথা।’’

জলপাত্র হাতে নিয়ে সবেগে ইন্দ্রভূতি গুহার বাইরে চলে যায়। ধীরে ধীরে চট্টান থেকে নেমে ন্যায়াপুত্ত তার অনুগামী হয়। দু’জনের অভিমুখ এক– পাহাড়ের গা ফুঁড়ে বেরনো প্রস্রবণ।

কিছুক্ষণ পরে সূর্যের আলোয় প্রস্রবণের জলকে যখন মনে হচ্ছে উচ্ছল গলিত স্বর্ণের ধারা, তখন ধীরে তার ভিতর থেকে উত্থিত হল এক অতি দীর্ঘ স্বর্ণকান্তি যুবাপুরুষ। এত দীর্ঘকায় সেই পুরুষ, পাখিরা ভুল করে তার মস্তকে উপবিষ্ট হচ্ছে, আবার পরক্ষণেই উড়ে পালাচ্ছে। বৃক্ষশাখায় বসে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে এই বিশালকায় অনিন্দ্যকান্তিকে।

নিগগন্থ ন্যায়াপুত্তের দেহ থেকে পতিত জলধারায় পাথর সিক্ত হচ্ছে। তার দৃষ্টি সম্মুখে নিবদ্ধ। প্রস্রবণের তীরে খানিক গিয়ে ঘন অরণ্য। ব্যাধের কপালের ওপর পালকসজ্জিত বস্ত্রখণ্ডের মতো সে অরণ্য ভেদ করে চলে যাওয়া একফালি পথই তার গন্তব্য।
গতরাত্রে সে আধো জাগরণে প্রভু পার্শ্বনাথের কন্ঠস্বর শোনেনি। শুধু ছায়ার মতো তাকে ওষ্ঠে জল ঢেলে দিতে দেখেছে। অথচ কী অলৌকিক উপায়ে তার চেতনায় চারিয়ে গেছে গুরুর প্রত্যেকটি আদেশ, যেমন কর্দমাক্ত গ্রাম্যপথে গেঁথে যায় প্রস্তরখণ্ড।

তাকে এখন যেতে হবে নদী কংসাবতীর উৎসে। তার ধারা অনুসরণ করে অর্ধেক রাঢ়ভূমিতে হবে তার পদচারণা। বাকি অর্ধেক লোকের মুখে শুনে। সেখানে মানুষ হিংসার বশ, কিন্তু মহামারীর আক্রমণে আকুল। পতঙ্গের মতো মরছে রাঢ়বাসী। প্রভুর কৃপায় এই দুইয়ের শোধন তার আয়ত্তে। তাই ওই স্থানে তার উপস্থিতি অতি প্রয়োজনীয়।
দ্রুত পা চালায় ন্যায়াপুত্ত। দুর্গমকে জয়, অভিলাষের ওপর নিয়ন্ত্রণ, মানবের কল্যাণ তাকে ভবিষ্যতে জিন-জয়ের নিকটবর্তী করবে– গুরু পার্শ্বনাথের কথায় এই রকম সংকেত গুপ্ত ছিল।

কিন্তু এসব তো সে গৌতমকে খুলে বলতে পারে না। সর্বসুখে বীতস্পৃহ সন্ন্যাসী বাল্যবন্ধুকে সরোষে বলতে পারে না, ‘‘তোমাকে আমি চাই না। পার্থিব সুখের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নাই।’’

বাল্যবন্ধুর কথা মনে আসতেই ন্যায়াপুত্ত জোরে পা চালায়। দৃষ্টি সম্মুখে নিবদ্ধ, তাই দেখে না আর এক জলে-ভেজা শরীর নিঃশব্দে অতিকায় মৎস্যের মতো তাকে অনুসরণ করে সাঁতার কাটছে সমতলে উচ্ছল প্রস্রবণের গহন ধারায়। যেখানে এই ধারা বেঁকে যাবে, সেখানে সে আত্মগোপন করবে ঝোপঝাড়ের আড়ালে। তারপর বৃক্ষের পশ্চাতে।
বন্ধুপ্রাণ ইন্দ্রভূতি গৌতম। ন্যায়াপুত্তের ছায়াসঙ্গী।

(সিদ্ধিলাভের পর নিগগন্থ ন্যায়াপুত্ত পরবর্তীতে মহাবীর বর্ধমান নামে পরিচিত হন। রাঢ়দেশের এখন যেটুকু এই বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ পুরুলিয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরের কিয়দংশ, সেখানে কোথাও কোথাও তিনি ধর্মপ্রচারের উদ্দেশে এসেছিলেন। জনশ্রুতি, রাঢ়বাসী তাঁর পেছনে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল।

বাংলায় তীর্থংকর মহাবীরকে নিয়ে কোনও আখ্যান আমার জানা নেই। হয়তো আছে, তবে বিরল। কিন্তু কংসাবতীর ধারা বরাবর ও পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে জৈন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ একেবারেই বিরল নয়, বরং প্রচুর ও ক্রমবিলীয়মান। বেশিরভাগই ভৈরবের থান হিসেবে পরিচিত এবং তীর্থংকরদের মূর্তিগুলি ভৈরব মূর্তি হিসেবে পূজিত।

আচারঙ্গসূত্র অনুযায়ী, তীর্থংকর মহাবীরের দৈর্ঘ্য ছিল এখনকার মাপে সাড়ে দশ ফিট।
জৈন তীর্থংকরদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা লাঞ্ছনচিহ্ন ছিল। পার্শ্বনাথের বহু ফণাযুক্ত সর্প, মহাবীরের সিংহ ইত্যাদি।

ন্যায়াপুত্তের তপস্যার প্রথম ধাপ নিয়ে এই গল্প। ইতিহাস, কল্পনা এবং জনশ্রুতির মিশেলে। * মার শব্দের অর্থ প্রলোভনকারী অশুভশক্তি)

চিত্রকর: মৃণাল শীল

You might also like