Latest News

যে গাছটি গল্প বলে

মৌসুমী ঘোষ

স্নান-খাওয়া-বাসনমাজা সেরে সুনেত্রা ফোনটায় নেট অন করতেই হোয়াটসঅ্যাপে কাকলি বউদির মেসেজ এল টং করে।
‘‘পাড়ায় কি কাণ্ড শুনেছ?”
“পরশু আমফানের দিন বিকেলে কারেন্ট গেছে, এই এল। ফোনে চার্জ ছিল না।”
রিপ্লাইটা ফরওয়ার্ড করার আগেই আবার টং, “তোমাদের গলির মুখে, রক্তারক্তি কাণ্ড” (একটা দু’গালে হাত দেওয়া ন্যাড়া মাথার ইমোজি)

প্রবাল খাটে শুয়ে টিভিতে খবরের চ্যানেলগুলো সার্ফিং করছিল। সুনেত্রা প্রবালকে ঠেলা দিয়ে বলল, “কী গো টিভির সাউন্ডটা কমাও না। মোড়ের মাথায় কী নাকি রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটেছে। বেরিয়ে দেখলে হয় না!”
“এই দেখো না, টিভিতে তো দেখাচ্ছে, আমফানের পর কেউ লকডাউন মানছে না। সকালে মোড়ের মাথায় মাছ নিতে গিয়ে দেখলাম তো। তাই পুলিশ আবার হয়তো লাঠি চালিয়েছে!”
সুনেত্রা কাকলি বউদিকে একটা রিং করল। বেজে বেজে থেমে গেল। প্রবালের উদ্দেশে বলল, “তখন কিছু শুনেছিলে!”
“তখন তো হা-কারেন্ট হা-জল হা-নেট করে গোটা পাড়া ভেঙে পড়েছিল মিষ্টির দোকানের সামনে। হাইটেনশান লাইনের ওপর যে গাছটা পড়ে গেছিল তার চারপাশে সবাই জটলা করছিল।”
প্রবালকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল, “কাকলি বউদি ডাকছিল।”
“মাস্ক-ছাড়া লোকজনের ভিড় থেকে করোনা আনতে যাবে! তোমার হলেও আসিম্পটোমেটিক হবে। আমি কো-মরবিডিটির পেশেন্ট। আমার প্রেশার, সুগার সবের ওষুধ চলে। আমাকে মারবে নাকি!”
বাধ্য হয়ে সুনেত্রা কাকলি বউদিকে লিখল, “নাইটি ছেড়ে আবার সালোয়ার-কামিজ পরতে হবে। তার চেয়ে তুমি বলো না কী হয়েছে। না হলে ছবি পাঠাও।”
খানিকক্ষণ কোনও রেসপন্স পেল না সুনেত্রা। ফোনটা বালিশের পাশে রেখে টিভির খবরে মন দিল।

“বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত বোটানিক্যাল গার্ডেন… শতাব্দী প্রাচীন বটগাছ…”
আবার টং, হোয়াটসঅ্যাপ অন করতেই স্ক্রিনে কাকলি বউদির মুখ, “ষষ্ঠী পাণ্ডের ছেলেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তোমাদের বাড়ি চড়াও হতে যাচ্ছে। তুমি ভিডিও করে পাঠিয়ো।” (একটা দাঁত বার করা ন্যাড়ার ইমোজি)।
সুনেত্রা ভাবছিল, ষষ্ঠী পাণ্ডে নামটা শোনা শোনা ঠেকছে। মনেও পড়ে গেল তৎক্ষণাৎ, লোকাল কাউন্সিলার তো! লিখল, “আমাদের বাড়ি কেন!”
কাকলি বউদি এবার ভয়েস রেকর্ড করে পাঠাল। সুনেত্রা প্লে করতেই, বউদির গলা, “তোমাদের বাড়িওয়ালার আধপাগলা ছেলেটাই তো কান-কাণ্ডটা বাঁধিয়েছে।” সুনেত্রার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে প্রবাল সাউন্ডটা মিউট করে ফেরত দিল। হিহি করে দাঁত খিচিয়ে হেসে বলল, “তিনদিন বাদে খবর শুনছি, জ্বালিয়ো না।” বাইরে ধুপধাপ আওয়াজ শুনে সুনেত্রা জানলার পর্দা সরিয়ে দেখল, একপাল ছেলে কেউ বাড়ির পাঁচিল টপকে, কেউ লোহার গেট খুলে হুড়মুড় করে ঢুকে সোজা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। বাড়িওয়ালি সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলছে, “ভুল করে ফেলেছে। হাবাগোবা ছেলে তো। তোরা তো জানিসই নন্দ অমন আধপাগলা জন্ম থেকেই। এবারের মতো ওকে ছেড়ে দে।”

সুনেত্রারা এই বাড়িতে ভাড়া এসেছে মাত্র ছয়মাস। এরই মধ্যে বার তিনেক হয়ে গেল নন্দর জন্য ওর মায়ের পাড়ার ছেলেদের পায়ে পড়া। কোনওদিন পাড়ার দোকানের বয়াম ভেঙে আসে। কোনওদিন মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে আসে। ভাড়াটা এবাড়িতে কম তাই তো কাকলি বউদির কথায় বাড়ি ছেড়ে আলাদা হওয়া। না হলে এই আধপাগলাদের বাড়ি ইচ্ছে করে কেউ ভাড়া নেয় নাকি!
“ষষ্ঠীদার প্রতিটা রক্তবিন্দুর দাম নিয়ে তবে ছাড়ব পাগলাটাকে।”
“শুধু কি রক্ত! কান! ওর কানদুটোই আজ ছিঁড়ে নেব। এত বড় সাহস ষষ্ঠীদার কানে হাত দেওয়া!”
কয়েকটা ছেলে নন্দকে টেনেহিঁচড়ে নীচে নিয়ে এল। ঠিক তখনি আর একটা ছেলে চেঁচাল, “সাবধান, এখনও হাতে ব্লেড!”
যারা ওকে মারবে বলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে সরে গেল। নন্দ ওদের ভয় পেতে দেখে বেশ মজা পেল মনে হয়। গাঝাড়া দিয়ে উঠে ‘হ্যাহ্যা’ করে হাসতে হাসতে এর-ওর দিকে ব্লেড-ধরা হাতটা বাড়াল। ততক্ষণে নন্দর বাবা নেমে এসেছে।
“দে বাবা, ওটা আমায় দে। দাড়িটা কেটে নিই।”
কিন্তু নন্দ দেবে কেন। ও তো একটা খেলা পেয়ে গেছে। সবাইকে জনে জনে বলছে, “এবার তোর কান কাটব। আয় তোরটা কাটি। হ্যা হ্যা হ্যা…।”

সুনেত্রা জানলা দিয়ে নন্দর ব্লেড হাতে পাড়ার ছেলেদের ভয় দেখানোর ছবিটা তুলে কাকলি বউদিকে ফরওয়ার্ড করল। কাকলি বউদিও ওকে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ষষ্ঠী পাণ্ডের কানকাটা ছবিটা পাঠাল। বাইরে তখন কেউ কেউ বলছে, “চ, চ। ষষ্ঠীদাকে আবার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তাছাড়া গাছটাও তো অর্ধেক কাটা অবস্থায় পড়ে আছে।”
বাড়ি নিমেষে ফাঁকা হয়ে গেল। নন্দর বাবা নন্দর কান মুলে নিমেষে ব্লেডটা হাত থেকে নিয়ে নিল। ওর মা নন্দর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ওপরে নিয়ে যাচ্ছিল। নন্দ নিজের মনে বলে যাচ্ছিল, “আমি তো তাপসের দোকান থেকে জিলেটের ব্লেডটা কিনে ফিরে আসছিলাম। ষষ্ঠীরা বড় বড় ব্লেড দিয়ে ঝড়ে পড়ে যাওয়া মোড়ের গাছটা কাটছিল। গাছটা চিঁচিঁ করে চেঁচাচ্ছিল। আমি কতবার বললাম, ‘ষষ্ঠী, গাছটার লাগছে তোরা ওকে ছেড়ে দে। সব সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাছটার পায়ে ব্যথা হচ্ছিল, তাই একটু শুয়েছে।’ ষষ্ঠী কানেই দিল না কথাটা। তাই তো নতুন ব্লেডটা প্যাকেট ছিঁড়ে বার করে দিলাম ওর কানটা কেটে।”
কথাটা শুনে বাড়িওয়ালি, বাড়িওলাকে দাঁত খিঁচিয়ে বলল, “তুমি নিজে তো যেতে পারতে দাড়ি কামানোর জন্য ব্লেডটা কিনতে!”

দুই
সুনেত্রা নিজের তোলা ছবিটা আর কাকলি বউদির পাঠানো ছবিটা ফেবু-তে পোস্ট করে লিখল, “লকডাউন আর আমফানের জেরে ডবল ধামাকা, পুবপাড়ার কাউন্সিলারের কান কাটল পাড়ার আধপাগলা বাসিন্দা নন্দকিশোর।” ট্যাগ করল কাকলি বউদিকে। প্রচুর হাসির ইমোজি পেল পোস্টটা। অনেকেই লিখল, “কাউন্সিলারগুলোর মাথায় আদৌ কান আছে! ওরা তো দু’কান কাটা।” কেউ লিখল, “প্রত্যেক পাড়াতেই এমন একটা করে আধপাগলার প্রয়োজন আছে।” (সঙ্গে এক চোখ মারা ন্যাড়ার ইমোজি)।
শ’য়ে শ’য়ে মজার মজার কমেন্ট এসে ভাইরাল হয়ে গেল সুনেত্রার ফেবু পোস্টটা। সুনেত্রা অনেক রাত অবধি বারে বারে দেখতে লাগল কমেন্টগুলো। গুনতে লাগল ক’টা কমেন্ট এল। লাইক, হাসির ইমোজি, জিফ দিয়ে নিজেও কমেন্ট সংখ্যা বাড়িয়ে চলল অনেক রাত অবধি। শেষে এক মাথা মজা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালে ঘুম ভেঙে চা-টা নিয়ে বসল বারান্দায়। ফোনটা অন করতেই সোমালির নাম ফুটে উঠল। সোমালি, সুনেত্রার কলেজ ফ্রেন্ড। থাকে নিউ জার্সিতে। ডবল ক্লিক করল কমেন্ট বক্সে। বেশ খানিকটা দপদপ করার পর খুলল কমেন্টটা। বিশাল মন্তব্য, কয়েক লাইনের পর লেখা, সি মোর। সুনেত্রা চশমাটা নিয়ে পড়তে শুরু করল, “নন্দর কী দোষ ছিল বল! ওর তো তখন ভালই লাগছিল না সেই গাছ কাটার মতো ব্যাপারটা দেখতে। এমনকি ও তো বুঝতেই পারছিল না কী করলে ও এই না ভাল লাগার হাত থেকে বাঁচবে! তাই ও শেষে ব্লেডটা দিয়ে লোকটার কানটা কেটে দিয়েছে। না হলে ও কী করত বল! ‘ফরেস্ট গাম্পের’ টম হ্যাঙ্কসের মতো দৌড়োত! নন্দর যা হয়েছিল সেটার ডাক্তারি পরিভাষায় নাম অটিস্টিক মেল্টডাউন। এটা হলে অটিস্টিক চাইল্ড পাঁচ মিনিটের মধ্যে বদলে যাবে আমূল। ওর স্বাভাবিক বোঝা-শোনার দরজাটা বন্ধ হয়ে যাবে ধড়াম করে!”
সুনেত্রা একবার থামল, মনে করার চেষ্টা করল। মেল্টডাউন কথাটা কোথায় শুনেছে। মনে পড়ল না। পাশে বসে চা খাচ্ছিল প্রবাল। ভয়ে ভয়ে প্রবালকে জিজ্ঞেস করল, “মেল্টডাউন কী গো?”
“ওই তো, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে যদি কোনও কারণে জ্বালানি রডকে ঠান্ডা রাখা না যায় তবে সেটি নিজেই গলতে শুরু করে ফলে পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। একে মেল্টডাউন বলে।”
সুনেত্রা আবার সোমালির লেখার বাকি অংশটা পড়তে যাচ্ছিল কিন্তু কী ভেবে বলল, ‘‘তুমি তো সফটওয়্যারে চাম্পিয়ান জানতাম। কেমিস্ট্রিটাতেও তো বেশ তুখোড় ছিলে দেখছি।’’
প্রবাল হোহো করে হেসে উঠল। বারান্দার গ্রিলের ফাঁক পেরিয়ে হাসির শব্দ গলির মোড় অবধি ছড়িয়ে পড়ল। তারপর সুনেত্রার দিকে ঝুঁকে বলল, “মাত্র দু’দিন আগেই মেল্টডাউন নামে একটা কম্পিউটার বাগ ছেয়ে ফেলেছে বিশ্বের সব কম্পিউটার। সেই থেকে আমরা মেল্টডাউন শব্দের ব্যুৎপত্তি গুলে খেয়ে ফেলেছি। কীভাবে ওই বাগটাকে বাগে আনা যায় তাই নিয়ে গোটা দুনিয়া উত্তাল।”

সুনেত্রা আবার ডুবে গেল সোমালির কমেন্টে।
“নন্দকে আমি চিনি। অনেক দূরে থাকলেও চিনি। কোনওদিন না দেখলেও চিনি। তোরা চিনিস না। এই যে এতদিন লকডাউনে চারিদিকে অবসাদের আবহাওয়া, আমফানের পর গাছেদের চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়া। কারেন্ট না থাকা। বাইরে বেরোতে না পারা। এতে তোর-আমার মতো সক্রিয় ব্রেনের অধিকারীদেরই মেল্টডাউন হচ্ছে, সেখানে অটিস্টিক চাইল্ডরা তো কোন ছার।
“এই যে তুই এই পোস্ট দেবার পর তোর আগের থেকে অনেক ভাল লাগছে। এই অবস্থাটায় পৌঁছাতে চেয়েছিলিস বলেই তো তুই এইটা শেয়ার করেছিস তাই না! এই পোস্টটা না করা অবধি তুই কতটা অস্থির ছিলিস ভাব। এটা তোর মেল্টডাউন অবস্থা। তারপর লাইক পেয়ে তোরও কেমন ভাল লাগছে তাই না!
“পোস্ট দে। আরও এমন পোস্ট দে। (একটা বাঁ-চোখ দিয়ে একফোঁটা জল পড়ার ন্যাড়া মাথার ইমোজি) …পারলে নন্দর ছবি আঁকার, গান গাওয়ার, গল্প বলার পোস্ট দে।”( একটা লাল লাভ সাইন)।
কেঁদে ফেলেছে সুনেত্রা। চা জুড়িয়ে গেছে। শুনতে পাচ্ছে ওপরের বারান্দায় বসে নন্দ অনর্গল গল্প বলে যাচ্ছে। নন্দর মা সবাইকে এলেই বলে, ছেলেটা সবসময় বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলে চলে। যাকে পায় তাকেই বলে। সুনেত্রা ঠিক করল, রান্না সেরে ও আজ ওপরে গিয়ে নন্দর গল্প শুনে আসবে। কী গল্প বানিয়ে বলে নন্দ যা সোমালি সুদূর নিউ জার্সি থেকে শুনতে পায় অথচ এত কাছে থেকেও সুনেত্রা কোনওদিন শোনার চেষ্টাই করল না!
সুনেত্রা মন্তব্যে মন্তব্যে দীর্ঘ লাইকদীর্ণ পোস্টটা ডিলিট করে দিল। বিকেলে নন্দর গল্পের একটা ভিডিও পোস্ট করল। আর খুঁজে খুঁজে অটিস্টিক সেন্টার ও মনোবিকাশ কেন্দ্রগুলির প্রোফাইল খুলে তাদের টাইমলাইনে শেয়ার করল পোস্টটা। নন্দর গল্প শুনুক নন্দর অন্য বন্ধুরা। ‘নন্দর গল্প’ বলে এই সেকশনটা সুনেত্রার লকডাউনের সমস্ত না ভাললাগাগুলোকে মুছে দিল ধীরে ধীরে।
এখন সোমালি, সুনেত্রার ‘নন্দর গল্প— এক, নন্দর গল্প— দুই…’ বলে পোস্টগুলোয় মাঝে মাঝেই কমেন্টে লেখে, “রান, সুনেত্রা রান…”
চিত্রকর : মৃণাল শীল

You might also like