Latest News

আড়ালে আততায়ী ১৫

সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

চা এসে গেল। ট্রেতে কাপ বসিয়ে হারু নিয়ে এসেছে চা। দীপকাকু একটা কাপ তুলে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, কমলবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম না কোন ট্রান্সপোর্টে জিনিস পাঠান। উনিই সতর্ক হয়ে যেতেন। ওঁদের শো-রুমে গিয়ে কমলবাবুর ছেলের থেকে জানলাম ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির নাম। আমার অনুমান সঠিক প্রমাণ হল, ওই কোম্পানিরই চাকরির অফার পেয়েছে নন্দ গড়াই।
–সেটা যে আমিই পাইয়ে দিয়েছি, তার কি কোনও প্রমাণ আছে? ঝাঁঝের গলায় জানতে চাইলেন কমলবাবু।
ঠান্ডাস্বরে দীপকাকু বললেন, এখনই এত অধৈর্য হচ্ছেন কেন? আমাকে আর একটু বলতে দিন। তখন দেখবেন, এ সব ছোটখাট বিষয়ের প্রমাণ দরকারই পড়ছে না।
কাপে শেষচুমুক মেরে সমরেশবাবু উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, আপনি বলে যান তো মশাই। থামবেন না।
শুরু করলেন দীপকাকু, এ বার গেলাম সেই ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে। কমলবাবুরা গত তিনমাসে কোথায় কোথায় যাওয়ার জন্য ওদের গাড়ি ব্যবহার করেছেন, তার লিস্ট নিলাম। সেখানে নৈহাটির নাম ছিল না। অথচ কমলবাবুর বাড়িতে একটা ফ্রেঞ্চ স্টাইল অ্যান্টিক ক্যাবিনেট দেখেছি, যেটা উনি আমাদের বলেছেন, দু’মাস আগে নৈহাটি থেকে আনিয়েছেন। এ দিকে লিস্টে চন্দননগরের একটা ঠিকানা পাচ্ছি বারবার। বাড়ির নাম ‘সাহেব কুঠি’। বুঝলাম, ওই বাড়ি থেকে কমলবাবু অনেক কিছু আনিয়েছেন। কিন্তু সেটা গোপন করতে চাইছেন কেন? চন্দননগরের ওই ঠিকানায় আমাকে একবার যেতে হবে, দেখতে হবে ব্যাপারটা কী? সেদিনই যেতাম না, যেতে হল অফিসার সাহার ফোন পেয়ে। ডা. রায়ের ফোনের কল-লিস্টে চারটে নামহীন নাম্বারের মধ্যে একটা নাম্বার এমন, যেটাতে ডাক্তারবাবুও কল করেছিলেন। ওঁর মৃত্যুর পর সেই নাম্বারকে ট্রেস করা যাচ্ছিল না। অফিসার সাহা ফোনে জানালেন, সেটা সক্রিয় হয়েছে। টাওয়ার লোকেশন পাওয়া যাচ্ছে চন্দননগরের জি টি রোডের কাছে। আমি দেখলাম, ‘সাহেব কুঠি’র ঠিকানা জি টি রোডের পাশেই, লালবাগানে। মনে হল, ওখানে গেলে অনেক রহস্যের কিনারা করতে পারব। তখনই রওনা দিলাম।

থামলেন দীপকাকু। দম নিয়ে শুরু করলেন বলতে, সাহেব কুঠিতে গিয়ে আমি সক্রিয় হয়ে ওঠা সেই ফোনের মালিককে পেলাম, সায়ন রায়।
ঘর জুড়ে বিস্ময়ের শ্বাস বয়ে গেল। কে যেন বলে উঠল, সত্যি!
হারু এসে ফাঁকা কাপগুলো ট্রেতে উঠিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। দীপকাকু বলতে থাকলেন, সায়নের কাছে গিয়ে ছিনতাইয়ের রহস্য পরিষ্কার হল আমার কাছে। নিরুদ্দেশ হওয়ার পর সায়ন বছর-দুয়েক এদিক-ওদিক ঘুরে সাহেব কুঠিতে কেয়ারটেকারের কাজে ঢুকেছিল। আত্মগোপনের জন্য ওই ভাঙাবাড়ি আদর্শ জায়গা। ঘটনাচক্রে মাসকয়েক আগে ও বাড়ির পুরনো ফার্নিচার কিনতে গিয়ে কমলবাবু সায়নের দেখা পান। তখনই তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। সায়নকে দিয়ে তার বাবার কাছ থেকে তিনটে ওষুধের ফর্মুলা হাতিয়ে নেবেন। শ্বাসকষ্ট, হাঁটুর যন্ত্রণা, এপিলেপ্সি, এই তিনটে রোগের খুবই কার্যকরী ওষুধ দেন ডা. রায়। বিভিন্ন ওষুধ পরিমাণমত মিশিয়ে সেটা বানান। এই বিদ্যেটা তিনি পেয়েছিলেন, তাঁর গুরু ডা. জীবন দত্তর থেকে। ওষুধের পেটেন্ট নিতে পারেননি। কারণ, পেটেন্ট পেতে কোন ওষুধ কী কাজ করছে, লিখতে হয় প্রমাণ সহ। যা হোমিওপ্যাথি ওষুধের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। কমলবাবু যথেষ্ট সম্পন্ন মানুষ, আরও বড়লোক হওয়ার লোভে তিনি বহুদিন ধরেই বন্ধুর ওই তিনটে ওষুধের ফর্মুলা হাতাতে চাইছিলেন। ওষুধগুলো রেজিস্ট্রি ছাড়া টোটকার মত বাজারে আনতেন। বন্ধুকে পার্টনারশিপে ওই সব ওষুধের বিজনেসেরও অফার দিয়েছিলেন। এপিলেপ্সির ওষুধের জন্য রাজিও করে ফেলেছিলেন প্রায়। সেই কারণে নাম ঠিক করা চলছিল। শেষমেশ রাজি হননি ডা. রায়। তাঁর ইচ্ছে ছিল, ফর্মুলা দিয়ে যাবেন সায়নকে। তাই উনি আমাকে সায়নের সঙ্গে একবারটি দেখা করিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ছেলে যাতে ওই ফর্মুলার ওষুধ বেচে বাকি জীবনটা স্বচ্ছন্দে কাটাতে পারে।

কমলবাবুও টের পেয়েছিলেন, বন্ধুর সুপ্ত বাসনার কথা। সায়নের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ডা. রায়ের ইচ্ছেটা আরও জাগিয়ে তোলার জন্য কমলবাবু একটা ফন্দি আঁটেন, বন্ধুকে একবার মৃত্যুর মুখোমুখি করিয়ে দিলে ছেলেকে ফর্মুলাটা দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠবেন। ডা. রায় নিজের ওষুধ পুরিয়া করে রাখতেন, কমলবাবু হারুকে টাকার লোভ দেখিয়ে সেই পুরিয়াতে মেশালেন হোমিওপ্যাথি ওষুধ অ্যাকোনাইট। যে দিন দুই বন্ধু ক্লাসিকাল মিউজিকের প্রোগ্রাম দেখতে যাচ্ছিলেন, মেশানো হয়েছিল সেই দিন। অ্যাকোনাইট হারুকে এনে দিয়েছিলেন কমলবাবু। কারণ, ডা. রায়ের স্টক থেকে সেটা যোগাড় করা যাবে না। ওষুধের লেভেল খুলে উনি কোড নাম দিয়ে রাখেন। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কারণে হোমিওপ্যাথি ওষুধের ব্যাপারে সামান্য কিছু জানতেন কমলবাবু। নিজেও পড়াশোনা করেছেন। ওঁর স্টাডিরুমের র‍্যাকে আমি বেশ ক’টা হোমিও চিকিৎসার বই দেখেছি। অ্যাকোনাইটের কতটা ডোজ দিলে ডা. রায় মরবেন না, মৃত্যুর আগের কষ্টটা পাবেন, জানতেন কমলবাবু। সেই অনুপাতে পুরিয়াতে মেশানো হয়েছিল অ্যাকোনাইট।
থামলেন দীপকাকু। কমলবাবুর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, এই ঘটনার প্রমাণ চাইবেন না। কাল থানায় গিয়ে হারু জবানবন্দি দিয়ে এসেছে। আমিই এ বাড়িতে এসে হারুকে ফাঁকা ঘরে জেরা করার পর থানায় নিয়ে গিয়েছিলাম।
থমথমে মুখে নিরুত্তর রইলেন কমলবাবু। ফের দীপকাকু সবার উদ্দেশে বলতে থাকলেন, অ্যাকোনাইটের প্রভাবে ডা. রায় অসুস্থ হলেন। যার লক্ষণ অনেকটা হার্ট অ্যাটাকের মতন। ডাক্তারবাবু ভেবে উঠতে পারেননি, তাঁর ওষুধে অ্যাকোনাইট মেশানো হয়েছে। নার্সিংহোম থেকে ফিরে এলেন উনি। ঠিক এই সময়ে কমলবাবু সায়নকে বোঝালেন, তোমার বাবা তিনটে ওষুধের ফর্মুলা তোমাকে দিয়ে যেতে চান। তুমি তো সেই ফর্মুলা কোনওদিন কাজে লাগাতে পারবে না। ফর্মুলা থেকে ওষুধ তৈরি করে বিক্রি করতে গেলে পুলিশ তোমায় ধরে ফেলবে। এখনও তুমি তাদের খাতায় ফেরার আসামি। বাবার থেকে ফর্মুলা নিয়ে তুমি আমায় বেচে দাও। আমি তোমায় দশ লাখ টাকা দেব।

প্রস্তাবে রাজি হয় সায়ন। টাকার তার খুব দরকার। পাঁচবছর ধরে বড় কষ্টে দিন গুজরান করছে সে। টাকার জন্য কমলবাবু সমস্ত নির্দেশ পালন করতে থাকে সায়ন। ‘রিলাইফ’ হসপিটালে একদিনই যায় কমলবাবুর কথামত। ডা. রায় ওকে এতবছর পর দেখে উতলা হয়ে পড়েন। ক’দিন আগেই মৃত্যুকে দেখেছেন শিয়রে। যে করে হোক ছেলের হাতে ওষুধের ফর্মুলাটা দিয়ে ফেলতে চান। সেই কারণেই সায়নকে খুঁজে দিতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই ব্যাপারটা কমলবাবুর কাছে গোপন থেকে যায়। সায়ন কমলবাবুর প্ল্যান অনুযায়ী ডা. রায়কে ফোন করে বলে, তোমাকে হসপিটালে দেখে, কাছে যেতে ইচ্ছে করলেও যেতে পারিনি। পাছে তুমি আমায় পুলিশে ধরিয়ে দাও। আমি একদম ভাল নেই বাবা। ভীষণ অভাবের মধ্যে আছি।
ডাক্তারবাবু সায়নকে বলেছিলেন, তুই একবার খানিকক্ষণের জন্য হলেও আমার সঙ্গে দেখা কর। তোকে এমন কিছু দেব, তোর খাওয়া-পরার অভাব হবে না।
আমি যেহেতু ডা. রায়কে বলে রেখেছিলাম, সায়নের দেখা করিয়ে দেওয়ার পর ওর হদিশ পুলিশকে দেব নৈতিক কারণে, তাই উনি ফোনের এই কথোপকথন আমাকে জানাননি।
এর পর সায়নের নাম্বারে দু’বার ফোন করেন ডা. রায়। দ্বিতীয় কলটা ধরে সায়ন। কমলবাবুর শেখানো কথাই বলে, তুমি সাতাশ তারিখ কাঁকুলিয়া লেভেল ক্রসিংয়ের ওপারে চলে এসো, বিকেল চারটে দশ থেকে পনেরোর মধ্যে। লেভেল ক্রসিংয়ের যে গেটটার পাশে জলট্যাংকি আছে, তার ওপারে। ওই পাঁচমিনিটে আমাকে যা দেওয়ার দিয়ে দিয়ো। তার চেয়ে বেশি সময় আমি থাকতে পারব না। পুলিশের ভয় আছে।
সঠিক সময়ে যথাস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু। লেভেল ক্রসিংয়ের গেট তখন বন্ধ। ওই সময়ে দুটো ডিভিশনে চারটে লাইনে লোকাল ট্রেন চলাচল করবে। সায়ন অবশ্য এ সব জানে না। সে কমলবাবুর নির্দেশমত লেভেল ক্রসিংয়ের ওপারে না থেকে, এপারেই ছিল। আবার কমলবাবুর শেখানো কথাই ফোন করে বলে বাবাকে, আমাকে ধরার জন্য পুলিশ তোমাকে ফলো করছে। আমার জন্য যা এনেছ, ড্যাশবোর্ডে রেখে হেঁটে লাইন পেরিয়ে যাও। তার পর সিচুয়েশন কী দাঁড়ায় দেখে, আবার ফোন করব।
ফোন যে এসেছিল, তার সাক্ষী নন্দ এবং ডাক্তারবাবুর কল-লিস্টেও পাওয়া যাবে। ডাক্তারবাবু গাড়ি থেকে নেমে যেতেই নকল দাড়ি এবং হাতে খেলনা বন্দুক নিয়ে সায়ন ফাইলটা ছিনতাই করে। দাড়ি, বন্দুক সাপ্লাই দিয়েছিলেন কমলবাবু। সায়নকে বুঝিয়েছিলেন, তোমার আসল চেহারা ড্রাইভার যদি দেখে নেয়, পুলিশ ওর বর্ণনা শুনে স্কেচ আঁকাবে। বুঝে যাবে, তুমি সেই ফেরার আসামি। তোমাকে খোঁজার জন্য আবার উঠেপড়ে লাগবে পুলিশ। আবার, তুমি যদি বাবার হাত থেকে জিনিসটা নিতে যাও, অলকেশ তোমায় জোর করতে পারে পুলিশে স্যারেন্ডার করার জন্য। তাই ও সব ঝুঁকি নিয়ে কাজ নেই। ফর্মুলা যখন হাতের কাছে, সেটা ছিনিয়ে নাও।
নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে সায়ন অকুস্থল ছেড়ে পালায়। কমলবাবু ততক্ষণে রেলগেটের ওপারে যে কেবিন আছে, তার সিঁড়িতে উঠে দেখছেন কোন ট্রেনের মুখে পড়েন ডা. রায়। ডাউন লক্ষ্মীকান্তপুর এসে পড়েছিল, জাল নাম্বারটা থেকে ফোন করেন ডা. রায়কে। ডাক্তারবাবু ভেবেছিলেন হয়তো সায়নের ফোন, সেট বার করতে যান। অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটে যায়।

–আমার একটা প্রশ্ন আছে। বলে উঠলেন বাবা। ঝিনুক আশ্চর্য হয়, এখন আবার বাবার কী প্রশ্ন! বাবা বললেন, ফর্মুলা যখন হাতানোই হয়ে গেল, তখন ডা. রায়কে কেন মারতে গেলেন কমলবাবু?
–ফর্মুলা লেখা কাগজটা হাতিয়েছেন, ডা. রায়ের মাথা থেকে তো ওষুধ বানানোর প্রক্রিয়াটা মুছতে পারেননি। কমলবাবু যখন ওষুধ বাজারে আনতেন, ডা. রায়ও ক্ষুব্ধ হয়ে আনতেন। কোনও কম্পিটিটর রাখতে না চাওয়ার জন্যই ডা. রায়কে মেরে দিলেন। বললেন দীপকাকু।
কমলবাবু বলে ওঠেন, আমি যে কেবিনের সিঁড়িতে উঠে ফোন করেছিলাম, তার কোনও প্রমাণ আছে?
–আছে। কেবিন থেকে খানিক দূরে রাস্তায় একটা ইলেকট্রিক্যাল গুডসের দোকান আছে, তার সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, আপনি সিঁড়িতে উঠছেন ওই সময়। এ ছাড়াও আপনি যখন ফোন করছিলেন, কেবিনম্যান সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে আপনাকে চার্জ করেন, কেন উঠেছেন সিঁড়িতে? আপনি বলেন, আপনার পেশেন্ট অ্যাম্বুলেন্সে ওপারে আটকে আছে। গেট যাতে তাড়াতাড়ি খোলা হয়, সেটা বলতে এসেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তখন ওপারে কোনও অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। কোর্টে কেবিনম্যান সাক্ষী দিতে আসবেন। তাকে আপনার ছবি আমি দেখিয়েছি। যে ছবি আপনার বইয়ের ব্লার্বে ছিল। তিনি আপনাকে চিনেছেন।
এতক্ষণে কাঁধ ঝুলে গেল কমল বিশ্বাসের। তবুও মরিয়া স্বরে দীপকাকুর উদ্দেশে বলে উঠলেন, আপনি যে এত কথা বললেন, কোর্টে এর কোনও দাম নেই। যার কথার দাম আছে, সে তো পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
–সায়ন পালিয়ে বেড়াচ্ছে না। সে আছে পুলিশের হেফাজতে। আমার নির্দেশে সে ফোনে আপনাকে বলেছে, পালিয়ে গেছে। ব্যবস্থাটা এই জন্য করেছি, যাতে আপনি না পালান।
দীপকাকুর দিকে বিপুল বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন কমল বিশ্বাস। দীপকাকু ফের বললেন, একটা ব্যাপারে সায়ন আপনাকে টেক্কা দিয়েছে। ছিনতাইয়ের দিনই ফাইল আপনার হাতে তুলে দেওয়ার আগে, ফর্মুলার ফটোকপি করে নিয়েছিল। টাকাটাও নিয়েছে আপনার থেকে। অর্থাৎ আপনি যে ভাবছিলেন, ফর্মুলা যেন কারুর কাছে না থাকে, মোনোপলি বিজনেস করবেন, তা আর হবে না।

কথা চলার ফাঁকে কখন যে অফিসার সাহা উঠে গেছেন সদর দরজা খুলতে, খেয়াল করেনি ঝিনুক। উনি ফিরছেন, পিছনে প্রায় ন্যাড়ামাথার সায়ন রায়। তার দু’পাশে দু’জন কনস্টেবল। অফিসার সাহা কমল বিশ্বাসকে দেখিয়ে এক কনস্টেবলকে বললেন, একে অ্যারেস্ট করো।
দীপকাকু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দেখাদেখি ঝিনুক সহ বাকিরাও ছাড়লেন চেয়ার। দীপকাকু সমরেশবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনাকে একটা অনুরোধ। সায়নের নামে ইচ্ছাকৃত খুনের মামলাটা তুলে নিন। আপনিও জানেন, ও ইচ্ছে করে ভাইকে বাইকের ধাক্কা মারেনি। বেপরোয়া গাড়ি চালানোটা ছিল ওর দোষ। অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা হোক। অল্প ক’বছর জেল খেটে ফিরে আসবে। বেচারা এখন খুবই অনুতপ্ত, নিজের জীবনকে অভিশপ্ত মনে করছে। ওর কারণে ভাই মারা গেল এবং বাবাকেও চলে যেতে হল পৃথিবী ছেড়ে। সায়নের গুরুজন বলতে এখন আপনারাই।
–আপনার কথাই থাকবে। সদ্য দাদাকে হারিয়েছি। আমি চাইব, দাদার প্রতিনিধি হিসেবে ও বাড়ি ফিরে আসুক। অনিচ্ছাকৃত খুনের জন্য ক’বছরের জেল তো ওকে খাটতেই হবে। ওখানে আমার কিছু করার নেই। ওটা পুলিশের কেস। বললেন সমরেশবাবু। দীপকাকু ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে দরজার দিকে ঘুরতে যাচ্ছিলেন, ডা. রায়ের ছোটভাই কমলেশবাবু বললেন, একমিনিট।
দাঁড়িয়ে পড়লেন দীপকাকু। কমলেশবাবু পরের কথাটা বলেন, আপনি আমাদের পরিবারের জন্য এত করলেন, আপনাকে তো অবশ্যই এ বাড়ির পক্ষ থেকে সম্মান-দক্ষিণা দেওয়া উচিত।
মুখে হাসি হাসি ভাব নিয়ে দীপকাকু বললেন, এই কেসটা এত কঠিন ছিল, আমি যেন নিজের সঙ্গে নিজেই লড়ছিলাম। এখন সাফল্যটাই আমার ফিজ।
–না, আপনার ফিজ আমি দেব। বাবা আপনাকে অ্যাপয়েন্ট করেছিলেন, ছেলে হিসেবে সেই ফিজ মেটানো আমার কর্তব্য। বলল সায়ন।
দীপকাকু বললেন, ঠিক আছে, তাই হবে। আপাতত আমি গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে যাচ্ছি দাদা-ভাইঝির সঙ্গে। কেসটার জটিলতায় এতদিন একটা দমবন্ধ অবস্থায় কাটিয়েছি।
সদর লক্ষ্য করে এগিয়ে যাচ্ছেন দীপকাকু, উনি এমনিতে শর্ট হাইটের। ঝিনুকের আজ কেন জানি ওঁকে অনেকটাই লম্বা মনে হচ্ছে। অনেকের থেকেই হাইট বেশি।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                                                                          সমাপ্ত

রহস্য উপন্যাসের আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য নীচের শব্দে ক্লিক করুন

আড়ালে আততায়ী

You might also like