Latest News

হাড়ের বাঁশি (প্রথম পর্ব)

সায়ন্তন ঠাকুর

গহিন অরণ্যের মাঝে লজ্জাবতী দেহাতি কিশোরীর মতো চলে গেছে সুঁড়িপথ-দুপাশে সারি সারি শালাই আর সাজি গাছ। শালাইয়ের বর্ণ ধূসর আর সাজি ঘন কৃষ্ণবর্ণ- কে যেন পরম যত্নে একটি সাজি গাছের পাশে একখানি শালাই গাছ সাজিয়ে রেখেছে, পুনরায় একখানি সাজি তারপর আবার শালাই, ধূসর-কালো-ধূসর-কালো, সমস্ত অরণ্যে কোথাও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে নাই। আশ্চর্য এক বর্ণ-উৎসব, দেখে মনে হয় দুই সখী পরস্পরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দূরে দূরে খয়ের কি তেণ্ডু গাছও চোখে পড়ে, চঞ্চলা মনোবৃত্তির মতো উঁচু নীচু পাহাড়ি পথ-চড়াই উৎরাই আবার চড়াই, বৃক্ষরাজির মাথা জংলা লতাপাতায় আচ্ছন্ন। চৈত্র মাসের দ্বিপ্রহর কিন্তু নিঃসীম এই অরণ্যে রৌদ্র খরচক্ষু নয়, স্নেহময়ীর মতো শিমশিম দখিনা বাতাস বইছে, অরণ্যের একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে কলকলনাদিনী শংকর-সুতা নর্মদা। সে চিরকুমারী। কখনও তাকে দেখা যাচ্ছে আবার কখনও লীলাচঞ্চলা বালিকার মতো গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। তবে এই শ্বাপদসংকুল পথে সর্বদা তার পায়ের রিনিঝিনি নূপুরধ্বনি শোনা যায়। সুঁড়িপথ অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছেন দুজন অল্পবয়সী পুরুষ, একজনের পরনে গেরুয়া বসন, কাঁধে একখানি সাপি, মুণ্ডিতমস্তক, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, হাতে দণ্ডী। অপরজন শুধুমাত্র কাষ্ঠকৌপীন পরিহিত, দীর্ঘ পিঙ্গলবর্ণ জটাভার নেমে এসেছে পিঠের উপর, রুক্ষ ধুলামলিন দেহ শ্বেতভস্মে আবৃত। উভয়েই মাঝে মাঝে আনন্দময় কণ্ঠে জয়ধ্বনি দিয়ে বলে উঠছেন, রেবা জয় জগদানন্দী-জয় নর্মদাশঙ্কর-হর হর মহাদেও। প্রস্তর ও কণ্টকাকীর্ণ পথে কয়েক দণ্ড চলার পর গেরুয়াবসনধারী সন্ন্যাসী পুরুষ নীরবতা ভঙ্গ করে অপরজনকে বললেন, ‘এই মুণ্ড মহারণ্য শ্বাপদসংকুল, সন্ধ্যার পূর্বেই আমাদিগকে রাত্রিবাসের নিরাপদ স্থান খুঁজিয়া লইতে হইবে।’

–হাঁ, অমরকণ্টকে মৎস্যেন্দ্রনাথজীর মন্দিরে বিশ্বনাথজী প্রথম রাত্রিবাসের জন্য কোন স্থানের কথা যেন কহিয়াছিলেন ?

–কবীর চবুতরা, অতিপ্রাচীন কবীর-বটবৃক্ষের নিকট একটি নিরাপদ গিরিগুহা রহিয়াছে, বিশ্বনাথজী কহিয়াছিলেন ওই স্থানেই রাত্রিবাস নিরাপদ।

কয়েক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করলেন কৌপীনধারী সন্ন্যাসী, তারপর ধীর গলায় বললেন, ‘বহুদিন পূর্বে পরিক্রমাবাসী এক মহাত্মার মুখে শুনিয়াছিলাম কবীর চবুতরা হইতে কয়েক ক্রোশ দূরে কপিলাশ্রম, ওইস্থানে কালভৈরবের মূর্তি রহিয়াছে, তাঁহাকে একবার দর্শন করিতে পারিলে’

–কপিলাশ্রম ? অর্থাৎ মহর্ষি কপিলমুনির প্রতিষ্ঠিত আশ্রম ?

–হাঁ, অতিজাগ্রত তীর্থক্ষেত্র

–তাহা হইলে ওই স্থলেই রাত্রিবাস উপযুক্ত হইবে, অবশ্য একটি সমস্যা রহিয়াছে।

–কী সমস্যা ?

–এইরূপ গহিন জনমানবশূন্য মুণ্ড অরণ্যে কপিলাশ্রম কী প্রকারে খুঁজিয়া পাইব ?

গেরুয়াবসন সন্ন্যাসীর কথা শুনে জটাধারীর মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল, কৌতুকের গলায় তিনি বললেন, ‘সমগ্র পরিক্রমা পথটিই আমাদিগের অপরিচিত শ্যামানন্দ, দক্ষিণ তট ধরিয়া রেবা-সঙ্গম অবধি যে আমরা যাইব তাহার কোন স্থানটি তোমার পরিচিত কহিতে পারো ? পুনরায় অমরকণ্টকে ফিরিয়া উত্তরতট ধরিয়া রেবা-সঙ্গম এবং অমরকণ্টকে পুনরাগমন, প্রায় চারহাজার মাইল দীর্ঘ এই যাত্রাপথে শরণাগতি এবং নর্মদা মায়ের কৃপাই আমাদিগের একমাত্র সম্বল। তিনি তাঁহার শরণাগত সন্তানকে সকল বিপদের হাত হইতে রক্ষা করিয়া থাকেন। দুশ্চিন্তা ত্যাগ করিয়া তাঁহাকে সর্বদা স্মরণ করিতে থাকো। দেখিবে তাঁহার ইচ্ছা হইলে আজ রাত্রে তিনিই পথ দেখাইয়া কপিলাশ্রমে লইয়া যাইবেন। তুম রেবা ভব মেটন্তী-হরি ওঁ জয় জগদানন্দী।’

কথা শেষ হতেই গেরুয়াবসন সন্ন্যাসী উদাত্তকণ্ঠে সুর করে গেয়ে উঠলেন, ‘রেবা নিশিদিন আনন্দ গাবত, গঙ্গা শংকর সেবত, রেবা শংকর তুম ভব মেটন্তী হো মাঈয়া’

–জয় জগদানন্দী হো মাঈয়া, জয় জগদানন্দী হো রেবা, জয় জগদানন্দী!

 

দ্বিপ্রহর অপরাহ্ণের গর্ভে মিলিয়ে যেতেই চারপাশ অস্পষ্ট হয়ে উঠল। বাঙলাদেশের চৈত্রমাসের রূপ এখানে নাই, নিঝুম অরণ্যের ললাটে মহাদেবের শিরোভূষণ চন্দ্রকলার মতো বিবর্ণ আকাশ মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। অধিকাংশ সময়ই বৃক্ষরাজির উপরিভাগ আবৃত করে রেখেছে ঘন শৈবাল মালিকা- সেগুলি এত দীর্ঘ যে বৃক্ষচূড়া থেকে ভূমি অবধি দৃঢ় লৌহ শলাকার মতো নেমে এসেছে, একটি পাখির ডাকও এখানে শোনা যায় না। অদূরে কোথাও ভীত গলায় বারশিঙার ডাক শোনা গেল, একবার-দুবার, পরমুহূর্তেই ক্ষিপ্র শার্দূলের মতো নিস্তব্ধতা অতর্কিতে গ্রাস করল চরাচর। পথ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁটাঝোপে পরিপূর্ণ চারপাশ, তাদের দেহ বৈঁচির মতো কুশি কুশি লালরঙা ফলে যেন ধ্বকধ্বক করে জ্বলছে। তীক্ষ্ণ তিরের ফলার মতো অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ড বিছানো সারা পথে। সন্ন্যাসীদ্বয়ের নগ্ন পদযুগল রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে, তবুও তাঁদের মুখ বিন্দুমাত্র মলিন হয় নাই-কী এক অলৌকিক আনন্দে তাঁরা অনুমান এবং পরিক্রমাবাসীদের অস্পষ্ট পথরেখার উপর নির্ভর করে কবীর চবুতরার দিকে হেঁটে চলেছেন। সামনে চলেছেন গেরুয়াবসন সন্ন্যাসী আর তাঁর পেছনে শান্ত পায়ে চলেছেন জটাধারী কৌপীন পরিহিত সন্ন্যাসী হঠাৎ বামদিকের ঝোপের আড়াল থেকে একটি মৃদু হিসহিস শব্দ ভেসে এল, সন্ন্যাসী অবাক হয়ে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন মেটেরঙা এক প্রকাণ্ড গোখরো সাপ যমুনা নদীর উপর প্রসারিত বাসুকি-ফণা তুলে তাঁর দিকেই চেয়ে রয়েছে। মৃদু মলয় বাতাসের মতো কম্পন তার সারা শরীরে, মাঝে মাঝে চেরা জিভটি দেখা যাচ্ছে, প্রায় একহাত লম্বা ফণা, সন্ন্যাসীর থেকে দূরত্ব মাত্র কয়েক গজ, যেকোনও মুহূর্তে কালান্তক দংশন হয়ে নেমে আসতে পারে কিন্তু এমন সাক্ষাৎ মৃত্যুস্বরূপ নাগরাজকে দেখেও সন্ন্যাসীর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল, যেন শঙ্করের কণ্ঠহারখানি এই ধুলামলিন জগতে ফুটে উঠেছে। দেবী নর্মদা ও পশুপতিনাথকে স্মরণ করে বহুযুগ পূর্বে শেখা গাত্রবন্ধনের কৌশলটি প্রয়োগ করলেন সন্ন্যাসী। নিথর অরণ্যপথ,বাতাসের গতিও রুদ্ধ, অপরাহ্ণের মলিন আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর-কয়েক মুহূর্ত পর বিষধর সর্প তার ফণা নামিয়ে ধীরে ধীরে শালাই-সাজি গাছের গহিনে মিলিয়ে গেল, সেই যাত্রাপথের দিকে চেয়ে করজোরে প্রণাম জানিয়ে সন্ন্যাসী অস্ফূট স্বরে রেবা জগদানন্দীর নামে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠলেন।

ইতিমধ্যেই শ্যামানন্দ বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে এসেছেন, হঠাৎ কী মনে হওয়ায় পেছন ফিরে চাইলেন, কেউ কোথাও নাই। জনশূন্য অস্পষ্ট পায়ে চলার পথখানি শুধু উদাসী পুরুষের মতো বয়ে গেছে। এখানে বৃক্ষরাজি আরও নিবিড়, অপরাহ্ণ আলোর তন্তুজাল অলীক কুয়াশামায়া একটি ভুবন যেন রচনা করেছে, কৌপীনধারী সন্ন্যাসীকে দেখতে না পেয়ে মনে মনে অবাকই হলেন শ্যামানন্দ। তবে পরিক্রমাবাসী প্রাচীন সাধুদের মুখে তিনি বহুবার শুনেছেন এই মুণ্ড মহারণ্যে দেবী নর্মদা সকলকে একাকী করে তোলেন, এ এক আশ্চর্য ঘটনা-পথ চলতে চলতে সঙ্গীরা পৃথক হয়ে যায়, কয়েকদিন পর হয়তো আবার তাঁদের দেখা হয়, শঙ্কর-সূতা নর্মদা মাঈয়ের লীলা সত্যই অতি বিচিত্র! মুহূর্তকাল অপেক্ষা করে শ্যামানন্দ সুঁড়িপথটি বেয়ে গহিন অচেনা ভুবনের দিকে এগিয়ে চললেন। যত অগ্রসর হচ্ছেন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের ক্ষীণ শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো আলো ক্রমশ নিভে আসছে, সেই বিরাট পুরুষের ধূম্রজটাজালে আচ্ছন্ন অরণ্য নৈঃশব্দ্যে পরিপূর্ণ, সায়াহ্ণকালের মৃদু পদধ্বনি শুধুমাত্র দূর দেশ হতে ভেসে আসা অস্ফূট বাক্যের মতো শোনা যাচ্ছে, নিরন্তর রেবামন্ত্র জপ করতে করতে এগিয়ে চলেছেন সন্ন্যাসী। পরনের গেরুয়া বসনখানি পথশ্রমে মলিন, মুখমণ্ডল স্বেদভারাক্রান্ত আরক্তিম, ক্ষুদ্র কণ্টকগুল্মে আবৃত বন্ধুর পথ। এ-পথধুলা একদিন পবিত্র হয়ে উঠেছিল আচার্য শঙ্করের পাদস্পর্শে, আহা! তাঁর কথা মনে পড়তেই শ্যামানন্দের মুখখানি প্রভাতরবির মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, সুমিষ্ট কণ্ঠে ধীর স্বরে বলে উঠলেন, মনো বুধ্য়হংকার চিত্তানি নাহং, ন চ শ্রোত্র জিহ্বা ন চ ঘ্রাণনেত্রম, ন চ ব্যোম-ভূমির-ন তেজো ন বায়ুঃ, চিদানন্দ রূপঃ শিবোহং শিবোহম! হঠাৎ একটি বিচিত্র ধ্বনি শুনে শ্যামানন্দ সচকিত হয়ে উঠলেন, অত্যন্ত ভারী কোনও প্রস্তরখণ্ড উচ্চস্থান থেকে কেউ যেন ভূমির উপর নিক্ষেপ করেছে- নিথর বনভূমি সেই শব্দে শিহরিত হয়ে উঠল, অদূরে কোনও বন্যপ্রাণীদলের ভীত পদশব্দ শোনা গেল। সামনে চোখ পড়তেই শ্যামানন্দ দেখতে পেলেন বৃক্ষরাজি হতে নেমে আসা অত্যুচ্চ শৈবাল বেষ্টনী ভেদ করে এক বিরাটদেহী পুরুষ তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। পুরুষটি ঘোর কৃষ্ণবর্ণ,মুণ্ডিত মস্তক, সম্পূর্ণ দিগম্বর এবং উচ্চতা প্রায় দুইজন সাধারণ মানুষের সমান, এমন দীর্ঘ মানুষ শ্যামানন্দ পূর্বে কখনও দেখেন নাই। সুগঠিত পেশীবহুল দেহকাণ্ড, মুখমণ্ডল মধ্যদিনের খর রৌদ্রের মতো উজ্জ্বল অথচ চক্ষুদুটি হিমকুণ্ডস্বরূপ শীতল, উন্নত খড়গ নাসা এবং অতি আশ্চর্যের বিষয় হল মধ্যললাটে চন্দ্রদেবের বিপরীত পৃষ্ঠদেশের মতো একখানি অতিকায় ক্ষত জ্বলজ্বল করছে। শ্যামানন্দ এই বিচিত্র আগন্তুকের দিকে বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইলেন, নগ্ন দীর্ঘকায় পুরুষ নিকটে এসে সুকঠিন বজ্রস্বরে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ত্বং কুতঃ আগতঃ অসি ?’

শ্যামানন্দের উত্তরের প্রত্যাশা না করেই পুনরায় বললেন, ‘কিঞ্চিৎ ঘৃতং দেহি মে!’

এ-কথা শুনে শ্যামানন্দ প্রথমে আগন্তুককে ভক্তিসহকারে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন, সম্ভবত এঁর সঙ্গে যে সাক্ষাৎ হবে এ-কথা তিনি অনুমান করেছিলেন। প্রণাম শেষে উঠে দাঁড়িয়ে সাপির ভেতর থেকে কলাপাতায় মোড়া ঘি বের করে নিবেদনের ভঙ্গিতে আগন্তুকের সামনে নিজের দুই করতল প্রসারিত করলেন।

 

সহসা মুছে গেল সমস্ত দৃশ্যপট, নিমেষে অস্ত গেল এই মায়াজগত, নিকষ কৃষ্ণগহ্বরের মতো অন্ধকারে আচ্ছন্ন হল সময় ও চেতনা আর আগন্তুকের মধ্যললাটে ওই উজ্জ্বল ক্ষতচিহ্নটি মুখব্যাদান করে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকল…

 

ভয় পেয়ে চোখ খুলতেই ঋষা বুঝতে পারল এতক্ষণ সে স্বপ্ন দেখছিল! শেষ কার্তিকেও সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে, গায়ের সুতির পাতলা কাঁথাখানি কখন যেন সরে গেছে, বুক এখনও হাপরের মতো উঠছে আর নামছে…উফ! কোন স্বপ্ন সে দেখল, এত স্পষ্ট এত জীবন্ত…সত্য বলে ভ্রম হয়। উঠে বসে বালিশের পাশে রাখা মোবাইল তুলে দেখল, প্রায় সাড়ে চারটে বাজে, সকাল হতে আর বেশি দেরি নাই। পুরাতন দিনের সিঁড়ি দেওয়া পালঙ্কের মাথার কাছে কাঁসার গেলাসে জল রাখা আছে, ঢাকা সরিয়ে একচুমুকে সবটুকু জল খেল ঋষা। আহ, এইবার যেন একটু স্বাভাবিক লাগছে। পর্দা ঢাকা খড়খড়ির জানলা বেয়ে এখনও ঊষালোক এসে পৌঁছায়নি, দীর্ঘ ঘরখানির একপাশে মেঝের উপর একটি টিমটিমে হ্যারিকেন জ্বলছে, অলীক রূপকথার মতো মৃদু আলোয় ভরে আছে চারপাশ। রাতপোশাকের উপর মিহি পশমের চাদর জড়িয়ে দরজা খুলে বাইরে এল ঋষা-দীঘল ভ্রূপল্লবের মতো টানা দোতলার বারান্দা, নীচু রেলিঙে জাফরির কাজ, বড়ো বড়ো থামগুলি মাথার উপরে কড়িবরগার ছাদে গিয়ে মিশেছে, শ্বেতপাথরের সাদা মেঝে কালস্পর্শে মলিন শুধু দাবাছকের মতো সাদা-কালো চৌকো খোপগুলি এখনও স্পষ্ট বোঝা যায়। এইটি বাড়ির পেছন দিক, বারান্দায় দাঁড়ালে নিচে প্রশস্ত উঠান তারপর সবুজ সমুদ্রের মতো অযত্নে লালিত বাগান চোখে পড়ে, বাগান পার হয়ে খিড়কির দরজা খুললেই দেবীদহের ঘাট-ঘাটের পাশেই ‘বড়ো-মা’র থান। কার্তিকের ঊষাকাল বড়ো অলস, এখনও ঝুঁঝকো আঁধারে ঢেকে রয়েছে চরাচর-ঋষা বারান্দার রেলিঙয়ে ভর দিয়ে অন্ধকার বাগানের দিকে চেয়ে রয়েছে, কত পুরাতন সব গাছ, ওই যে কাঠচাঁপা গাছটি দাদুর হাতে লাগানো, তাও কম করে পঞ্চাশ বছর তো হবেই। আর আঁধারে একাকী বৃদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে যে বেলগাছ, সেটি একশো বছরেরও বেশি সময় নাকি পার হয়ে এসেছে, ঠাকুমা নিভাননী দেবীর মুখে ঋষা শুনেছে গৃহদেবতা বাণেশ্বর লিঙ্গ ভোলানাথের নিত্য পূজার বেলপাতার জন্য গাছটি লাগিয়েছিলেন প্রপিতামহ শঙ্করনাথ ভট্টাচার্য। মুর্শিদাবাদের এরুল গ্রামের এই ভটচায পরিবারের ইতিহাস অতি প্রাচীন তবে শঙ্করনাথকে নিয়ে আজও গ্রামে আলোচনা হয়-তিনি বড়ো বিচিত্র মানুষ ছিলেন, সংসার বিবাহ এমনকি একমাত্র পুত্র হরপ্রসাদের জন্মের পর কাউকে কিছু না জানিয়ে কৌশিকী অমাবস্যার গহিন রাত্রে গৃহত্যাগ করেন। কয়েকশো বিঘা ধানি জমি, একগণ্ডা মাছ-পুকুর, ভোলানাথের দেবোত্তর সম্পত্তি কয়েকঘর যজমান, এই চারশত বৎসরের প্রাচীন ভদ্রাসন, স্ত্রী, সদ্যোজাত পুত্র সব ত্যাগ করে একবস্ত্রে কোথায় যে তিনি চলে গেলেন তা আজও পরিবারের সকলের কাছে হেমন্ত কুয়াশার মতোই অস্পষ্ট। একটি পত্র অবধি লিখে যাননি, শুধু সমস্ত সম্পত্তি সদ্যজাত পুত্রের নামে লেখাপড়া করে কালো সিন্দুকে রেখে গেছিলেন, স্ত্রী চন্দ্রপ্রভা দেবীকে নাবালক পুত্রের অছি করেছিলেন। ঠাকুমার মুখে ঋষা শুনেছে মারা গেছেন না বেঁচে আছেন এই দ্বিধায় হরপ্রসাদ মৃত্যুর আগে পিতৃশ্রাদ্ধ অবধি করে যেতে পারেননি, পিতার উপর তাঁর ক্ষোভও ছিল আজীবন।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ ঋষার শঙ্করনাথের কথা মনে পড়ল, বৈঠকখানার দেয়ালে একটি অস্পষ্ট তৈলচিত্র ছাড়া আর কিছুই তার স্মৃতিতে নাই-কালো পাকানো গোঁফ, ঘাড় অবধি থাক থাক বাবড়ি চুল, পরনে বানিয়ান আর ধুতি, হাতে চকচকে একখানি লাঠি নিয়ে সামনের দিকে চেয়ে রয়েছেন, কার আঁকা কে জানে তবে অচেনা সেই শিল্পী চোখদুটি ভারি যত্ন করে এঁকেছিলেন। কী উদাস অথচ গম্ভীর মেঘের মতো দৃষ্টি, কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেই মনে হয় অন্তরমহল তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। কিছুক্ষণ আগে দেখা নিজের স্বপ্নদৃশ্যও তাকে উতলা করেছে আজ, কে ওই নগ্নদেহী বিরাট পুরুষ ? আর সন্ন্যাসী দুজনই বা কে ? নর্মদা পরিক্রমাকারী সাধক ? নগ্ন পুরুষটির কপালের ক্ষতচিহ্নটি যেন গিলে খেতে আসছিল ঋষাকে, এত স্পষ্ট স্বপ্ন সে বহুকাল দেখেনি। এরুলের এই পৈতৃক বাড়িতে অবশ্য নানা বিচিত্র ঘটনার কথা শুনেছে, গাঁয়ের লোক দিনমানেও সহজে দেবীদহে আসে না। ঠাকুমার মুখে ‘বড়ো-মা’র থান নিয়েও কম গল্প শোনেনি। তবে সেসব আখ্যনে তেমন বিশ্বাস নাই ঋষার। সে নিজে গণিতে মাস্টারস শেষ করে কলকাতার বরানগরে  ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স নিয়ে গবেষণার কাজ করছে, সবকিছু বিশ্লেষণ করে দেখাই তার সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু তীক্ষ্ণ মেধাবিনী ঋষাও আজ ভোররাত্রে দেখা স্বপ্নটিকে কিছুতেই বিশ্লেষণ করতে পারছে না। কী মানে ওই স্বপ্নের ? ইদানীংকালে ওরকম বিষয়ে কোনও বইপত্রও তো সে পড়েনি, তাহলে ? ভাবতে ভাবতেই স্থির করল এখনই পৃথ্বীশকে ফোন করবে।পাঁচটা প্রায় বাজতে চলল, এসময় সে তাদের খড়গপুর আইআইটি ক্যাম্পাসে জগিং করতে বেরোয়, খুবই ঠান্ডা মাথার ছেলে পৃথ্বীশ রায়, বয়সে ঋষার থেকে বছর তিনেকের বড়োই হবে, মেটালার্জি নিয়ে গবেষণা করছে আজ প্রায় দুই বছর, সে নিশ্চয় কিছু একটা ক্লু দিতে পারবে।

 

কয়েকবার রিং হতেই ফোন ধরে বিস্মিত এবং অল্প কৌতুকের গলায় পৃথ্বীশ জিজ্ঞাসা করে, ‘হ্যাঁ রে, ভুল করে ফোন করিসনি তো?’

–চুপ করো তুমি, খালি বাজে কথা!

–না মানে এখন সবে কিনা পাঁচটা পাঁচ, গুড মর্নিং মেসেজ তো প্রতিদিন আসে বারোটা নাগাদ, তাই আর কী!

কথা শেষ না করেই উচ্ছল আলোর মতো হা হা হেসে ওঠে পৃথ্বীশ!

–মহা মিথ্যেবাদী তুমি জানো!

তারপর একটু মুখ ভেঙিয়ে বালিকার মতো গলায় ঋষা বলে ওঠে, ‘প্রতিদিন বারোটার সময় মেসেজ আসে! সব জেনে বসে আছে, কাপালিক কোথাকারে!’

–কাপালিক? এই নামটা আবার কোথা থেকে এলো? এতদিন তো ‘গঙ্গারাম’ বলেই জানতাম নিজেকে!

–আজ থেকে কাপালিক! দাড়ি না কেটে কেটে কী অবস্থা করেছ দেখেছ নিজের? সেইটা আবার ঘটা করে ফেসবুকে ডিপি বানানো হয়েছে! হুঁ, তাতে আবার সুছন্দা কমেন্ট করেছে, লুকস লাইক ইয়ং গিন্সবার্গ! ছাতার মাথা!তোর কী? কাকে গিন্সবার্গ না উত্তমকুমারের মতো লাগছে, প্রচণ্ড গায়ে পড়া একটা মেয়ে!

একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে ফোনের ওদিক থেকে, ‘ওহ! তাই এত সকালে ফোন?’

–মরণ নাই আমার! উনি মধ্যরাত্রে ডিপি বদলাবেন আর শত গোপিনী লাফিয়ে লাভ রিয়াক্ট দিয়ে যাবে আর আমি সেজন্য ঘুম নষ্ট করে সকালে উঠব! মরো তুমি ওদের নিয়ে!

বলতে বলতে নিজেই হেসে ফেলে ঋষা। হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে একটু উদ্বিগ্ন গলায় পৃথ্বীশ জিজ্ঞাসা করে, ‘না সিরিয়াসলি, সব ঠিক আছে তো রে? এই সিজন চেঞ্জে গ্রামে গিয়ে জ্বর বাঁধাসনি তো? যা ঠান্ডার ধাত তোর।’

 

ধীরে ধীরে কুসুম আলোয় জেগে উঠছে চরাচর, আলতো হাতের স্পর্শে কেউ যেন শিশুর মতো এই জগতকে গতরাত্রির শয্যা থেকে তুলে মুখে পরম মমতায় চুমো খাচ্ছেন। বাগানের গাছপালা মাথা দুলিয়ে চেয়ে রয়েছে নির্মেঘ আকাশের দিকে, এখনও কুয়াশায় অস্পষ্ট তাদের শরীর, নরম দলঘাস শিশিরে টসটসে, উত্তরে দেবীদহের দিক থেকে ভেসে আসছে শিমশিম হেমন্ত বাতাস। পৃথ্বীশের গলা শুনে আনমনা হয়ে ঋষা বলে ওঠে, ‘না গো সেসব কিছু নয়, আসলে কাল রাত্রে এমন একটা স্বপ্ন’

–স্বপ্ন?

–হ্যাঁ, আশ্চর্য জীবন্ত একটি স্বপ্ন, আগে কখনও এমন হয়নি জানো…মনে হচ্ছিল যেন কোনও সিনেমা দেখছি!

বিস্মিত গলায় পৃথ্বীশ জিজ্ঞাসা করে, ‘কী স্বপ্ন বল তো?’

–সে অনেক বড়ো গো, সময় লাগবে

দু-এক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে পৃথ্বীশ তারপর ধীর গলায় বলে, ‘আচ্ছা শোন আমি তাহলে রাত্রে সব কাজ সেরে ফোন করছি, আমারও এদিকে জানিস একটা ঘটনা’

–কী? কাল সন্ধেয় যখন ফোন করেছিলে তখন বললে না তো কিছু!

–আরে, আমিই তো জানলাম তারপর, রাত্রি প্রায় দশটার সময় ডিসি স্যর ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

–অত রাত্রে? পৃথ্বী এনিথিং সিরিয়াস?

ফোনটা মুখের কাছে এনে চাপাস্বরে প্রায় ফিসফিস করে পৃথ্বীশ বলে, ‘ফোনে বলতে পারব না রে, তোর কাছে এরমধ্যেই এক-কি দুদিনের জন্য আসব…আমার মানে আমাদের টিমের সকলের ফোন আন্ডার সার্ভেলান্সে রয়েছে!’

পৃথ্বীশের কথা শুনে কিছুই বুঝতে না পেরে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন স্বরে ঋষা জিজ্ঞাসা করে,  ‘কী হয়েছে তোমার? টিম, আন্ডার সার্ভেল্যান্স…কিছুই তো বুঝতে পারছি না…প্লিজ আমায় বলো পৃথ্বী, প্লিজ বলো, কী হয়েছে?’

তেমনই চাপা স্বরে পৃথ্বীশ বলে, ‘আরে খারাপ কিছু নয়, বরং ভালোই…আমি এসে তোকে সব বলব, শুধু এইটুকু শোন আমাকে দিন পনেরোর মধ্যে ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্টের একটা টপ সিক্রেট প্রোজেক্টে বাইরে যেতে হবে। নির্দেশ এসেছে পিএমও থেকে, এএসআই হ্যান্ডেল করবে প্রজেক্ট।’

–টপ সিক্রেট, পিএমও, এএসআই মানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া…কোথায় যেতে হবে তোমাকে?

চারপাশ একবার ভালো করে দেখে নেয় পৃথ্বীশ, খড়গপুর ক্যাম্পাসের ঘুম ভাঙছে সবে, ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারপাশ, জনমানবশূন্য পথ শুধু দু-একজন ছাত্র অস্পষ্ট মেঘের মতো জগতে শরীরচর্চার জন্য দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতে শুরু করে পৃথ্বীশও,চাপা স্বরে ফোনটা প্রায় মুখের কাছে এনে বলে, ‘অনেকদূর…আমিও স্পষ্ট জানি না রে এখনও, তবে আন্দাজ করছি নর্মদা উপত্যকা, সম্ভবত মুণ্ড অরণ্যের ভেতরে কোথাও।’

       চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                                               পরের পর্ব  মাসের চতুর্থ শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

You might also like