Latest News

হাড়ের বাঁশি ( চতুর্বিংশ পর্ব)

রাত্রি প্রায় সাড়ে দশটা, হাওড়া স্টেশনে জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসের বাতানুকূল প্রথম শ্রেণির কামরায় একটি দ্বি-শয্যার ক্যুপে বসে নির্মলানন্দকে ফোন করল বন্যা, ‘মহারাজ, ট্রেনে উঠে গেছি, দশটা পঞ্চাশে গাড়ি ছাড়বে।’
ওপার থেকে ধীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
‘সাবধানে যেও। আর বিলাসপুর নেমে যদি পেন্ড্রা রোডের রেলগাড়ি না পাও তাহলে অমরকণ্টক অবধি একটা গাড়ি ভাড়া করে নিও, ধকল কম হবে।’
–আচ্ছা! আমি বিলাসপুর পৌঁছে আপনাকে জানাব।
–কাল সকাল দশটা নাগাদ
পৌঁছাবে মনে হয়। অমরকণ্টকে নেমে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই তোমাকে মনোহারদাসজি’র অবধূত আশ্রমের পথ দেখিয়ে দেবে। সজ্জন মানুষ, তোমাকে যথাসম্ভব সাহায্য করবেন।

এক মুহূর্ত নীরব থেকে শান্ত স্বরে বন্যা বলল, ‘জানি না মহারাজ, আমাকে আদৌ কেউ সাহায্য করবেন কিনা। তবে আপনি না থাকলে এটুকুও হত না।’
সামান্য হতাশ শোনাল নির্মলানন্দের কণ্ঠ,
‘জানি মা, মুসলিম সম্প্রদায় নিয়ে আমাদের দেশে এখনও… তবে মনোহরদাসজি তেমন সন্ন্যাসী নন। অন্তত আমার সঙ্গে যখন পরিচয় হয়েছিল তখন তেমন ছিলেন না। তবে কী জানো, আজকাল এত পরিবর্তন দেখি যে কারোর সম্পর্কে বড়ো মুখ করে কিছু বলতে ভয় হয়।

ক্ষণিকের জন্য নিঃশব্দে হাসি ফুটে উঠল বন্যার মুখে। ‘চিন্তা করবেন না মহারাজ, নিশ্চয়ই সব ঠিক পথেই এগোবে। একবার নর্মদা তীরে না গেলে আমি শান্তি পেতাম না। আপনার জন্যই এত দ্রুত সব ব্যবস্থা হল। জানি না মুণ্ড অরণ্যে যেতে পারব কিনা, তবে আন্তরিক চেষ্টা করব।’
–মা নর্মদার কাছে প্রার্থনা জানাই
তিনি যেন তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। জয় শিবোশম্ভূ, জয় মা নর্মদা।
–আমার প্রণাম নেবেন মহারাজ।
ফিরে এসে আপনার সঙ্গে নিশ্চয়ই দেখা হবে।
–সাবধানে যেও মা। আনন্দে থেকো।
ফোন রেখে চোখ বন্ধ করে
বন্যা একবার ভাবল পৃথ্বীশকে ফোন করবে, পরমুহূর্তেই মনে হল এখনই সব কথা জানানোর প্রয়োজন নেই। তার পথ এখন পৃথ্বীশের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। আজ সকালে খড়গপুর হোস্টেলে ওয়ার্ড মাস্টারের মুখ থেকে শুনেছে পৃথ্বীশ দু’বার তার খোঁজ করতে এসেছিল অথচ ডিপার্টমেন্টে গিয়ে শুনল প্রজেক্টের কাজে সে চলে গেছে। অর্থাৎ এড়োয়ালি থেকে ফিরে পৃথ্বীশ নিশ্চয়ই ঈশ্বরের সঙ্গে প্রজেক্ট ওয়ার্কে যোগ দিয়েছে। কোথায় সে এখন? মুণ্ড মহারণ্যে নাকি অন্য কোথাও? 

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রথম শ্রেণির কামরা আরামদায়ক হলেও ভাড়া অত্যন্ত বেশি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অন্য কোথাও আসন না থাকায় বাধ্য হয়েই প্রথম শ্রেণির টিকিট কাটতে হয়েছে। ফোন চার্জে বসিয়ে রিডিং ল্যাম্প জ্বেলে ব্যাগ থেকে বইটি বের করল বন্যা। বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে কালিদাসের মেঘদূত, এই কাব্যেই অমরকণ্টকের অপরূপ বর্ণনা রয়েছে। সাতপুরা ও বিন্ধ্য পর্বতের মাঝে মেখল পাহাড় শীর্ষে পূতঃসলিলা নর্মদাতটস্থ এই সুপ্রাচীন তীর্থস্থান তার নয়নাভিরাম রূপের জন্যও প্রসিদ্ধ। বইটির প্রথম শ্লোকের বঙ্গানুবাদ পড়ে হঠাৎ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কতগুলি পংক্তি মনে পড়ল বন্যার- ‘পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভোতল, কই গো কই মেঘ উদয় হও,/ সন্ধ্যার তন্দ্রার মুরতি ধরি আজ মন্দ্র মন্থর বচন কওঃ!’ এই কথাগুলোই কতদিন আগে পৃথ্বীশকে শুনিয়েছিল। তখন ভরা আষাঢ়। খড়গপুর শহর ছাড়িয়ে স্বল্প দূরে কোথাও যাওয়া হয়েছিল। দুপাশে আদিগন্ত নির্জন শস্যখেতের উপর কাজলে সাজানো আঁখির মতো মেঘ অলস মনে ওষ্ঠটি নামিয়ে এনেছে, যেন সে চুম্বন প্রত্যাশী। চরাচর জনমানবশূন্য। আকুল উদাসী পথের পাশে শুধু তারা দুজন বালকের মুগ্ধ বিস্ময়ে রূপজগতের পানে চেয়ে রয়েছে। কুসুম রেণুর মতো রিনিঝিনি বৃষ্টি সর্বাঙ্গে। পৃথ্বীশের হাতটি ধরে মন্থর স্বরে বলেছিল, ‘বৃষ্টির চুম্বন বিথারি চলে যাও, অঙ্গে হর্ষের পড়ুক ধুম!’
সে-সব কোন্‌ দূর অতীতের মতো
মনে হয় আজকাল। স্মৃতিপটচিত্রে অমলিন, কিন্তু কাল-ধুলায় ধূসর, মলিন! নিজেকেই ইদানীং প্রশ্ন করে বন্যা, ‘সত্যি করে বল তো তুমি কি সত্যিই কাউকে ভালোবাসো?’

সহসা দরজায় শব্দ শুনে সংবিৎ ফেরে বন্যার। রেলগাড়ি ইতিমধ্যেই মন্থর পায়ে যাত্রা শুরু করেছে। দ্রুত হাতঘড়ির ডায়ালে চোখ রাখে, এগারোটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। উঠে দরজা খুলে দেখল অল্পবয়সী এক দীর্ঘকায় তরুণ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বেশভূষা পোশাক আজকের দিনের মতো নয়। পরনে ধুতি আর ফতুয়া, একমুখ দাড়ি-গোঁফ, আলুথালু দীর্ঘ চুল কণ্ঠ অবধি নেমে এসেছে। কাঁধে একখানি কাপড়ের ঝোলা। মানুষটির দৃষ্টি ভারি উজ্জ্বল। তাকে দেখে নমস্কার জানিয়ে বিনীত স্বরে বলল, ‘এইটি এ-তেইশ তো?’
দরজা থেকে সরে এসে বিস্মিত স্বরে বন্যা বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি?’
‘আজ্ঞে, আমি শ্যাম তালুকদার।’
হাতে ধরা টিকিট বন্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে হাসলেন, ‘আমার এই ক্যুপেই সিট পড়েছে।’
টিকিটে এক ঝলক
চোখ বুলিয়ে বন্যা ঈষৎ বিরক্তির সুরে বলল, ‘আচ্ছা, আসুন। আমি কিন্তু লোয়ার বার্থ নিয়েছি।’
–হ্যাঁ হ্যাঁ, কোনও অসুবিধা নাই, একটা সিট পেলেই হল।

বেশি কথা না বাড়িয়ে বইটি খুলে অনুবাদে মন দিল বন্যা। কে আবার উটকো লোক এল! তবে কথাবার্তা শুনে ভদ্র-সভ্য বলেই মনে হয়। যাকগে, একটা রাত্রির তো বিষয়। ওঠার সময় শ্যাম তালুকদার নামটি লিস্টে দেখেছিল কিনা মনে করতে পারল না বন্যা।

কাঁধ থেকে ঝোলা নামিয়ে শ্যাম নীচের সিটে একপাশে বসে ধুতির খুঁট দিয়ে মুখটি মুছে বন্যার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি বিলাসপুর যাচ্ছেন?’
এই শুরু হল।
একা মেয়ে দেখলেই মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই! বই থেকে চোখ না তুলে গম্ভীর স্বরে বন্যা বলল, ‘হুঁ!’
–আমিও বিলাসপুর যাচ্ছি।
তারপর ওখান থেকে অমরকণ্টক যাব! নর্মদা দর্শন কতদিনের ইচ্ছে! শেষ অবধি মা স্বপ্ন পূর্ণ করলেন! আপনিও কি অমরকণ্টক যাবেন?
নাহ! একে কড়া ভাষায় না বললে থামবে না।
মুখ তুলে স্থির দৃষ্টি হেনে বন্যা হিমশীতল স্বরে বলল, ‘শ্যামবাবু, আমি অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না। তাছাড়া এই বইটি মন দিয়ে পড়ছি। আশা করি যাত্রাপথে আমরা পরস্পরকে অযথা বিরক্ত করব না।’
কথাটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে
তরুণ একমুখ হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বই পড়া খুব ভালো অভ্যাস, তা কী বই পড়ছেন?’
লোকটির সাহস দেখে
স্তম্ভিত হয়ে গেল বন্যা। আশ্চর্য! কোনও কথাই তো কানে তোলে না। কী বলবে বুঝতে না পেরে এক মুহূর্ত শ্যামের দিকে চেয়ে রইল বন্যা, তারপর কঠিন গলায় উত্তর দিল, ‘কেন? আপনি জেনে কী করবেন?’
–না, কী আর করব!
 প্রচ্ছদ দেখে মনে হচ্ছে কালিদাসের মেঘদূত পড়ছেন, তবে এই অনুবাদটি খাজা! মল্লিনাথ এই গ্রন্থের টীকাকার। মূল সংস্কৃতে পড়লে আনন্দ পেতেন! আপনি সংস্কৃত বুঝতে পারেন? মনে হয় জানেন না!

সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বন্যা। পরনে একখানি ঢোলা সুতির প্যান্ট আর টি-শার্ট, চুলগুলি একটি হাতখোঁপায় বাঁধা। স্থির চোখে শ্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শুনুন, আর একটিও অহেতুক কথা যদি বলেন আমি কিন্তু চেকারকে ডেকে অভিযোগ করতে বাধ্য হব! আশা করি আমার স্পষ্ট কথা নিশ্চয় আপনি বুঝতে পেরেছেন।’
বন্যার তেজোদীপ্ত চেহারা দেখে মৃদু হাসলেন শ্যাম।
দু-এক মুহূর্ত পর শান্ত স্বরে বললেন, সদৈব বাসনাত্যাগঃ শমোহয়মিতি শব্দিতঃ!’
সহসা বিদ্যুৎচমকের
 মতো নির্মলানন্দের আশ্রমে জাগ্রত তন্দ্রার কথা মনে পড়ল বন্যার। কণ্ঠে ভুজঙ্গ আর শিরোদেশে চন্দ্রকলা শোভিত সেই অপরূপ অলীক পুরুষ গহিন ছায়াচ্ছন্ন অরণ্যে তার হাত থেকে আকন্দ কুসুমের ভিক্ষা গ্রহণ করে এই কথাগুলিই তো বলেছিলেন! পূর্বে কতবার মনে করার চেষ্টা করেছে, নির্মলানন্দ বারবার জিজ্ঞাসা করেছেন, কিন্তু কিছুই বলতে পারেনি। আর আজ এই অপরিচিত আগন্তুকের মুখে শ্লোকটি শুনতেই কুয়াশা মুছে সমস্ত ঘটনা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট হয়ে উঠল, আশ্চর্য! কে এই শ্যাম তালুকদার? অল্পক্ষণ পূর্বের কর্কশ বাক্য সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে পুনরায় নিজের আসনে বসে নম্র স্বরে বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘কে আপনি?’

 

দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে রেলগাড়ি। দুপাশে নিদ্রিত নগর, ক্ষুদ্র পল্লী, আঁধারে ডুবে থাকা গাছপালা, দিঘি, নদীপথ, কার্তিকের কুয়াশাবৃতা প্রান্তরের শিরোদেশে নির্মেঘ সহস্র নক্ষত্রের অলঙ্কারে উজ্জ্বল আকাশ। পার হয়ে চলেছে কত অচেনা নিথর ইস্টিশান। মধ্যরাত্রে মানুষের অস্পষ্ট স্বপ্ন আর সংসার-রেলগাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষেরা বাইরের কাউকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। আবার বাইরের মানুষও এদের কাউকে চেনে না। অথচ প্রতিটি মানুষের একটি নিজস্ব আখ্যান রয়েছে, যেন অনেকগুলি জন্ম, সময় ফুরোলেই যে-যার নিজের ইস্টিশানে নেমে যাবে, ভুলে যাবে সহযাত্রীকে, হয়তো কোনও সহযাত্রীর মুখ স্মৃতিপটচিত্রে অমলিন হয়ে থাকবে, আবার কখনও অন্য কোনও জন্মের যাত্রাপথে দেখা হলে হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করবে, ‘কেমন আছেন? অনেকদিন পর দেখা হল!’
কেউ হয়তো বন্যার মতো ভুলে গিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে শুধোবে,
 ‘সত্যি করে বলুন তো আপনি কে?’

বন্যার প্রশ্ন শুনে ধীর স্বরে শ্যাম বললেন, ‘আমি আপনার সহযাত্রী।’
হাতে ধরা মেঘদূত বন্ধ করে কামরার তন্দ্রাচ্ছন্ন
আলোয় অন্যমনস্ক স্বরে বন্যা বলল, ‘কিন্তু যে শ্লোকটি আপনি বললেন, আমি এর আগে…’ কথার মাঝেই হাত তুলে বন্যাকে থামিয়ে শ্যাম বললেন, ‘কত কথা আমরা শুনি, কোনও কথা মনে হয় খুব চেনা,পূর্বে কোথাও শুনেছি! এ খুবই স্বাভাবিক, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই।’
দু-একটি নীরব মুহূর্ত চলে যাওয়ার পর শ্যাম পুনরায় বললেন,
‘আমার আচরণে আপনি সম্ভবত বিরক্ত হয়েছেন। যাইহোক, আর অধিক কথার প্রয়োজন নাই, আপনি বই পড়ুন।’
–তা নয়, আসলে ইদানীং
 অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না। আপনি অমরকণ্টক থেকে কোথায় যাবেন?

ঝোলা থেকে একটি সাদা সুতির কাপড় বের করে গলায় ও মাথায় ভালো করে জড়িয়ে নিলেন শ্যাম। ছোটো সাদা কাচের শিশি থেকে কয়েকবিন্দু জল হাতে নিয়ে জিভে ও মাথায় দিয়ে মৃদুমন্দ মলয় বাতাসের মতো হাসলেন, ‘ঠিক নাই দিদিমণি। আমি ভবঘুরে মানুষ, হাটেবাটে ঘুরে বেড়াই। তাঁর ইচ্ছে হলে অমরকণ্টক থেকে পরিক্রমাবাসী হব, আর ভালো না লাগলে আবার পথে পথে। এই ভালো! কত মানুষ, দেবালয়, ধুলাপথ, গাছগাছালি, নদী, পাহাড়, আকাশ, বাতাস- দেখার জিনিসের তো অভাব নাই!’
তরুণের কথা শুনে ভারি অবাক হল বন্যা।
ভালো করে দেখে বুঝতে পারল, তরুণ যথেষ্ট অল্পবয়সী। হয়তো তার থেকে ছোটোই হবে। অতি সাধারণ চেহারা, শুধু চোখদুটি বিচিত্র! নানা ভাব সেখানে আপনমনে খেলা করছে। কখনও ঝিমঝিম রৌদ্রের মতো কৌতুক, পরমুহূর্তেই বর্ষামেঘের কৃষ্ণছায়া। কখনও আঁখিপটে বিবাগি চৈত্র বাতাসের মতো একতারা বাজছে মৃদুস্বরে। এমন এর আগে কখনও দেখেনি বন্যা। মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি নর্মদা পরিক্রমা করবেন?’
–যদি তাঁর ইচ্ছা হয় নিশ্চয় করব।
–শুনেছি পরিক্রমা নাকি ভীষণ কঠিন!
বন্যার দিকে তাকিয়ে দৃঢ়
 অথচ শান্ত স্বরে শ্যাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার কি পরিক্রমার ইচ্ছা রয়েছে?’

তরুণের তীক্ষ্ণ প্রশ্ন শুনে বন্যার মুখে আলতো হাসি ভেসে উঠল, ‘আমার সেই সামর্থ্য নেই। আমি শুধু নর্মদা দর্শনের জন্য যাচ্ছি।’
–সামর্থ্য নাই বুঝলেন কীভাবে?
আমাদের কতদূর ক্ষমতা তা কি আমরা সত্যিই জানি! অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জানি না।
তর্কের সন্ধানে
বন্যা সংস্কারাচ্ছন্ন বলে উঠল, ‘পূর্ণ পরিক্রমার অনুমতি সন্ন্যাসী ভিন্ন আর কারোর তো নেই। তাছাড়া আমি জাতিতে মুসলিম, অনধিকারী! এই সামর্থ্যের কথা অন্য কেউ না জানলেও আমি জানি!’
চোখ বন্ধ করে সুদূর কোন্‌
জগত থেকে ভেসে আসা গলায় শ্যাম বললেন, ‘আপনার এই জানা সত্য নয়। আমি তর্ক করব না। সময় উপস্থিত হলে সে-কথা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।’

 

এরপর আর কথা হয় না। মেঘদূত বের করে কয়েকটি শ্লোক পড়ার পরেও পাঠে মন না বসায় বই বন্ধ করে চুপ করে বসে রইল। হাওড়া স্টেশন থেকে রাত্রির খাবার সঙ্গে নিয়েই উঠেছে বন্যা। বেশ রাত্রিও হয়েছে। ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে সুপুরির পাতলা খোলা দিয়ে বানানো থালায় রুটি আর মাংস সাজিয়ে নিয়ে বসল। রাতের রেলগাড়ি চড়লেই ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। কলকাতা থেকে ডুয়ার্সে ফেরার সময় মা লুচি আর আলুরদম টিফিনবাক্সে নিয়ে উঠত, সঙ্গে মামারবাড়ি থেকে আনা বড়ো বড়ো সন্দেশ। কত কথা! জানলা দিয়ে রাত্রির আকাশ দেখা, ভোরবেলায় ফরাক্কার গঙ্গা, হু হু জলস্রোত- সেসব মধুর স্মৃতি কেমন বালক বয়সের মতোই মহাশূন্যে মিলিয়ে গেল!

খাবার মুখে তোলার আগে শ্যাম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে সামান্য উঁচু গলায় বলল, ‘আপনাকে একটু খেতে দিই?’
চোখ খুলে বন্যার দিকে
চেয়ে হাসলেন শ্যাম, ‘কী খাবার?’
–এই যে মাংস আর রুটি।
তবে দোকান থেকে কেনা। যদি অসুবিধা না হয় তাহলে আসুন একসঙ্গে খাওয়া যাবে। ভালো লাগবে আমার।
–আমাকে একটুকরো মাংস শুধু দিন।
একটি আলাদা পাত্রে
মাংস তুলে বন্যা সহজ গলায় বলল, ‘শুধু মাংস কেন খাবেন? একটা রুটি অন্তত খান।’
–না না, শুধু মাংসই দিন, তাও ছোটো একটুকরো।

চোখ বন্ধ করে মাংসের পাত্রের উপর হাত রেখে নিঃশব্দে কী যেন বললেন শ্যাম! তারপর সামান্য অংশ মুখে দিয়ে বললেন, ‘বাহ! সুস্বাদু। আজ অনেক বছর পর মাংস মুখে দিলাম!’
কথা শুনে সামান্য অবাক হয়েই বন্যা শুধোল, ‘কেন? আপনি মাংস খান না?’
কুসুম বনের আলোর মতো হাসলেন শ্যাম,
‘আমি একাহারী, নিরামিষাশী! রাত্রে অন্ন গ্রহণ করি না।’
অপ্রস্তুত শোনাল বন্যার কণ্ঠস্বর,
‘সে কী! তাহলে খেলেন কেন! আমি কিন্তু না জেনেই আপনাকে অনুরোধ করেছিলাম।’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন শ্যাম।
তারপর মাংসের টুকরো শেষ করে বললেন, ‘আপনার মুখে মুসলিম শব্দটি আগে একবার শুনলাম। সম্ভবত এই দেশের কিছু হিন্দু জাতির মানুষের আচরণে আপনি কষ্ট পেয়েছেন। আমাকে আন্তরিক অনুরোধের পরেও যদি সামান্য কিছু মুখে না দিতাম তাহলে আপনার মনে জাতিদ্বেষের আগুন আরও তীব্র হত!’
মনে মনে শ্রদ্ধাবনত
হয়েও এই তরুণকে সামান্য উত্যক্ত করার লোভ সামলাতে পারল না বন্যা। হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করল, ‘এইটি যদি গো-মাংস হত?’
স্বচ্ছতোয়া পাহাড়ি
ঝোরার মতো শোনাল শ্যামের কণ্ঠস্বর, ‘তাহলেও কিছুই হত না! আমি ভোজ্য বা ভোক্তা কোনওটিই নই!’
–মার্জনা করবেন।
আমার জন্যই আপনার এতদিনের অভ্যাস ভঙ্গ হল!
–আপনার জন্য কেন হবে!
আমি কখনও কোনও অভ্যাসের দাস নই! আর সামান্য খাবার নিয়ে এত চিন্তা করবেন না। হাটে মাঠে ঘুরে বেড়াই, সুখাদ্য কপালে জোটে না। তা আপনার কল্যাণে একদিন ভালোমন্দ খাওয়া হল!

হাত ধুয়ে এসে নিজের ঝোলা থেকে একটি বোতল বের করে কয়েক চুমুক জল খেয়ে শ্যাম বললেন, ‘আপনার যদি তাড়াতাড়ি ঘুমোনোর অভ্যাস না থাকে তাহলে একটি গল্প বলতে পারি!’
গল্পের কথা শুনে
পা দুটি সিটের উপর তুলে কম্বলে ঢেকে একটি বালিশ কোলে নিয়ে গুছিয়ে বসে বন্যা সাগ্রহে বলল, ‘রাত্রে বহুক্ষণ জেগে থাকি, তাছাড়া ট্রেনে ভালো ঘুমও হয় না। আপনি স্বচ্ছন্দে বলুন!’

–অমরকণ্টক, শংকরসূতা নর্মদার উৎপত্তিস্থল নর্মদাকুণ্ডের উপরেই অবস্থিত দেবী নর্মদার মন্দির। অপরূপ প্রতিমা! কৃষ্ণপ্রস্তর নির্মিত দ্বিভুজা দেবী হস্তে কমণ্ডূল এবং বরাভয় শোভিতা। শুদ্ধচিত্তে এই প্রতিমা দর্শনে মন নিমেষে আনন্দে পরিপূর্ণ হয়। নর্মদাকুণ্ড থেকে গোমুখনালা বেয়ে পুণ্যতোয়া নর্মদা এসেছেন কোটিতীর্থ কুণ্ডে। এই জল স্পর্শ করেই পরিক্রমার জন্য সন্ন্যাসীরা সংকল্প করেন। অমরকণ্টক থেকে সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কপিলধারা। এই পথ এখনও নির্জন। সুনীল মেঘমুক্ত আকাশে শৈলরাজি স্রোতের মতোই বহমান। সুপ্রাচীন বৃক্ষরাজি পথটিকে নিবিড় ও ছায়াচ্ছন্ন করে তুলেছে। বামদিকে উপত্যকায় বয়ে চলেছেন নর্মদা। এখানে যেন তিনি চঞ্চলা কিশোরী, নূপুরে রিনিঝিনি হিল্লোল তুলে কয়েকশো ফুট নীচে ক্রীড়াচ্ছলে নেমে গেছেন। এটিই কপিলধারা, মহর্ষি কপিল এখানে বসেই তপস্য করেছিলেন। এইস্থল সত্যই অতীব পবিত্র। এরপর নর্মদা বয়ে গেছেন উপলশোভিত গহিন অরণ্যপথে। সন্ন্যাসীরা বলেন, ইঁহাকা হর কংকর মে শঙ্কর! এখান থেকেই শুরু হয় প্রকৃত পরিক্রমা। অদূরেই মুণ্ড মহারণ্য, শ্বাপদসংকুল পথে শুদ্ধাভক্তি এবং অসীম শরণাগতি ব্যতীত কেউ অগ্রসর হতে পারেন না।

একটানা কথা বলে কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ রইলেন শ্যাম। বোতলের জলে গলা ভিজিয়ে ধীর শান্ত কণ্ঠে পুনরায় শুরু করলেন আখ্যান। ‘আমাদের কাহিনি আরম্ভ হবে এই কপিলধারায়। আজ থেকে বহু বৎসর পূর্বে দুজন সন্ন্যাসী এইস্থান থেকেই পরিক্রমা সঙ্কলার্থে যাত্রারম্ভ করেছিলেন। একজন তরুণ এবং আরেকজন অপেক্ষাকৃত প্রবীণ। তরুণ সন্ন্যাসীর নাম শ্যামানন্দ আর প্রবীণ সন্ন্যাসী ভস্মীবাবা নামেই এই অঞ্চলে পরিচিত ছিলেন।’
সন্ন্যাসীদ্বয়ের নাম শুনে কথার
মাঝেই বন্যা বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘তরুণ সন্ন্যাসীর নাম কী বললেন? শ্যামানন্দ?’
সহাস্যে শ্যাম তালুকদার
শুধোলেন, ‘হ্যাঁ, কোথাও শুনেছেন তাঁর কথা?’
এক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করল
বন্যা। তারপর ঈষৎ অন্যমনস্ক স্বরে বলল, ‘খুব চেনা লাগছে, কোথায় যেন শুনেছি!’
রেলগাড়ির নিরন্তর দোলা
আর কামরার পীতবসনা আলোয় প্রাচীন গর্ভগৃহের মতো নির্জন কণ্ঠে শ্যাম বললেন, ‘আরেকটু শুনুন, হয়তো বুঝতে পারবেন।’
‘সুঁড়িপথ অনুসরণ করে
এগিয়ে চলেছেন দুজন অল্পবয়সী পুরুষ। শ্যামানন্দের পরনে গেরুয়া বসন, কাঁধে একখানি সাপি। মুণ্ডিতমস্তক, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, হাতে দণ্ডী। ভস্মীবাবা শুধুমাত্র কাষ্ঠকৌপীন পরিহিত। দীর্ঘ পিঙ্গলবর্ণ জটাভার নেমে এসেছে পিঠের উপর, রুক্ষ ধুলামলিন দেহ শ্বেতভস্মে আবৃত। মাঝে মাঝে আনন্দময় কণ্ঠে জয়ধ্বনি দিয়ে বলে উঠছেন, রেবা জয় জগদানন্দী-জয় নর্মদাশঙ্কর-হর হর মহাদেও। 

প্রস্তর ও কণ্টকাকীর্ণ পথে কয়েক দণ্ড চলার পর শ্যামানন্দ নীরবতা ভঙ্গ করে অপরজনকে বললেন, ‘এই মুণ্ড মহারণ্য শ্বাপদসংকুল, সন্ধ্যার পূর্বেই আমাদিগকে রাত্রিবাসের নিরাপদ স্থান খুঁজিয়া লইতে হইবে।’
-হ্যাঁ, অমরকণ্টকে
মৎসেন্দ্রনাথজীর মন্দিরে বিশ্বনাথজী প্রথম রাত্রিবাসের জন্য কোন স্থানের কথা যেন কহিয়াছিলেন?
–কবীর চবুতরা।
অতিপ্রাচীন কবীর-বটবৃক্ষের নিকট একটি নিরাপদ গিরিগুহা রহিয়াছে। বিশ্বনাথজী কহিয়াছিলেন ওই স্থানেই রাত্রিবাস নিরাপদ।
কয়েক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা
করলেন ভস্মীবাবা। তারপর ধীর গলায় বললেন, ‘বহুদিন পূর্বে পরিক্রমাবাসী এক মহাত্মার মুখে শুনিয়াছিলাম কবীর চবুতরা হইতে কয়েক ক্রোশ দূরে কপিলাশ্রম। ওইস্থানে কালভৈরবের মূর্তি রহিয়াছে, তাঁহাকে একবার দর্শন করিতে পারিলে…’
–কপিলাশ্রম?
অর্থাৎ মহর্ষি কপিলমুনির প্রতিষ্ঠিত আশ্রম?
–হ্যাঁ, অতিজাগ্রত তীর্থক্ষেত্র।
–তাহা হইলে ওই
স্থলেই রাত্রিবাস উপযুক্ত হইবে। অবশ্য একটি সমস্যা রহিয়াছে-
–কী সমস্যা?
–এইরূপ গহিন জনমানবশূন্য মুণ্ড অরণ্যে কপিলাশ্রম কী প্রকারে খুঁজিয়া পাইব?’

 

এই আখ্যান তার সুপরিচিত। পৃথ্বীশের মুখে শুনেছে। ঋষার স্বপ্ন… সহসা উঠে দাঁড়াল বন্যা। কবরীমুক্ত আলুলায়িত কেশরাজি যেন আষাঢ়ের ঘন কৃষ্ণবর্ণ মেঘমালা, ওষ্ঠাধর ঈষৎ কম্পমান, দুটি পদ্মাক্ষী কালনাগিনীর বিষবাস্পের মতোই তীক্ষ্ণ, দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘এই আখ্যান আপনি কোথা থেকে পেয়েছেন? আমাকে সত্যি কথা বলুন, কোথা থেকে পেয়েছেন এই অলীক কাহিনি?’

নির্বিকার-চিত্ত শ্যাম তালুকদারের মুখমণ্ডল কুসুমরেণুর মৃদু সুবাসের মতো প্রসন্ন হয়ে উঠল, স্বচ্ছ সুরধারায় কণ্ঠস্বর ভাসিয়ে বললেন, ‘জ্বলে আগুন বিরহন কি, মধূ কী স্বাদ পাপিয়া জানে, গান গায়ে তাপ জুড়ায়ন কি!’

 

 চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

https://three.pb.1wp.in/magazine/magazine-novel-harer-banshi-part-twenty-three-by-sayantan-thakur/

  

 

You might also like