Latest News

হাড়ের বাঁশি (একত্রিংশ পর্ব )

টাকাপয়সা মিটিয়ে দত্ত ট্র্যাভেল এজেন্সির আপিসের বাইরে পা দিয়ে সাত্যকি আলগোছে মুখ তুলে একবার আকাশের পানে চাইল-রাধাচূড়া ফুলের মতো রৌদ্রের ডিঙা ভেসে চলেছে নীল আসমানি গাঙে, পথেঘাটে ভিড় সামান্য কম, উজ্জ্বল দোকান বাজারে ঝলমল করছে নানাবিধ শৌখিন পসরা, শীতকাল আসার পূর্বে এই প্রাচীন নগরী অষ্টাদশী তরুণীর মতোই চঞ্চলা হয়ে ওঠে, দেখে মনে হয়, ছেলেবেলার মাঠে যেন রঙিন সার্কাসের তাঁবু বসেছে! সাত্যকিকে আজ একবার জাতীয় মিউজিয়ামে যেতে হবে, ভদ্রলোক বেলা বারোটায় সময় দিয়েছেন, এখন পৌনে এগারোটা, নিজের মনে একবার হিসাব করল-এখান থেকে জাদুঘর পৌঁছাতে খুব বেশি হলে তিরিশ মিনিট লাগবে, গাড়ি সঙ্গেই রয়েছে, তবে গাড়ি সাত্যকির তেমন পছন্দ নয়, পায়ে হেঁটে পথ-চলাই তার প্রিয়, অনেক মানুষের ভিড়ে নিজেকে মিশিয়ে আত্মগোপন করে থাকা যায়, ঝিলিমিলি জনসমুদ্রে কেউ কাউকে বড়ো একটা খেয়াল করে না।

সহসা টুং-টাং শব্দে মণিবন্ধের ক্ষুদ্রাকার যন্ত্রটির দিকে তাকাল সাত্যকি, লাল আলোয় কতগুলি পিঁপড়ের মতো শব্দ ফুটে উঠেছে-বি কেয়ারফুল!সামওয়ান ইজ ওয়াচিং ইউ!

আলতো আঙুলে যন্ত্রটির আলো নিভিয়ে নির্বিকার মুখে চারদিক একবার আনমনে খেয়াল করল, কাউকে তেমন চোখে পড়ছে না, অবশ্য যে বা যারা অনুসরণ করছে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের আড়ালে রাখবে, তেমনই নিয়ম, তবে এই অনুসরণের কথায় তেমন বিচলিতও হল না সাত্যকি-দীর্ঘসময় ধরে এই অনিশ্চিত জীবনে সে অভ্যস্ত, জীবনপ্রবাহ টলোমলো কিন্তু তার মনোবৃত্তি স্রোত ছোট নদীর মতোই কোলাহলশূন্য, কী এক আশ্চর্য উপায়ে সে সর্বসময় স্থির থাকে, শত অগ্ন্যুৎপাত ও ঝঞ্ঝার পরেও মুখে গোধূলিবেলার স্মিত হাসি ভেসে ওঠে, কথায় বলে মন পদ্মপাতায় জলবিন্দুর মতোই স্বভাব-চঞ্চল অথচ সুদর্শন যুবাপুরুষ সাত্যকিকে দেখলে সে-কথা বোঝার কোনও উপায়ই থাকে না!

জামার পকেট থেকে ভাজা মৌরির কৌটো বের করে এক চিমটে মুখে দিয়ে রোদ-চশমার আড়ালে চোখদুটি রেখে সন্তর্পণে জামার উপর দিয়েই এক মুহূর্তের জন্য নিজের কোমর স্পর্শ করল-ধাতব ঠাণ্ডা অনুভূতি তাকে সবসময় আরও নিশ্চিন্ত করে, ওটি অত্যাধুনিক গ্লক-৪৩এক্স, নিঁখুত কনসিলমেন্টের ছিপছিপে হিঞ্জ হোলস্টারে রাখা যন্ত্রটি দশ রাউন্ড কার্তুজ পূর্ণ, আদতে গ্লক নয় মিলিমিটার ক্যালিবারের ছোট্ট পিস্তল, মাত্র সাড়ে তিন ইঞ্চির ব্যারেল, একটি কার্তুজ সর্বদা ব্যারেলে থাকে আর বাকি দশটি থাকে ম্যাগাজিনে, অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রের তুলনায় স্টপিং পাওয়ার অনেক বেশি, হাতের মুঠোয় পালকের মতো ভেসে থাকলেও মুহূর্তে যে-কাউকে ধরাশায়ী করার ক্ষমতা রাখে এই গ্লক, তার জন্য শুধু প্রয়োজন নিশানা, সাত্যকির হাতের নিশানা অবশ্য অভ্রান্ত, দশবারের মধ্যে দশবারই তার বুলেট বুল্‌স-আই হিট করে; লোকে অবশ্য জানে না চোখ বন্ধ করেও শুধুমাত্র শব্দ আর অনুমানের উপর নির্ভরশীল সাত্যকি লক্ষভেদে প্রায় তৃতীয় পাণ্ডবের সমকক্ষ!

রাস্তা পার হয়ে একটি প্রাচীন বকুলগাছের নিচে এসে দাঁড়াল সাত্যকি, এখান থেকে ট্র্যাভেল আপিসের কালো কাচে ঢাকা সদর দরজাটিও স্পষ্ট দেখা যায়, একজন বিহারি চাচা ঠেলাগাড়ির উপর লাল শালু মোড়া মাটির হাঁড়ি, স্টিলের গেলাস, বাটি সাজিয়ে নিয়ে ছাতুর শরবত বিক্রি করছে, দশটাকা গ্লাস, দু-একজন পথচলতি মানুষ তৃপ্তিভ’রে খাচ্ছে, অদূরে চা-দোকানেও ভিড় কম নয়, গরম লুচি, ঘুঘনি, ডিমভাজার গন্ধ ভাসছে বাতাসে, এসবই শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ক্ষুধার অন্ন! ছাতুওয়ালার মাথার উপর বকুল গাছের ডালপালা ঘেরা আকাশ আজ বড়ো নিঃসঙ্গ-হঠাৎ সাত্যকির এমন আশ্চর্য কথা মনে ভেসে উঠল, দু-একটি জীর্ণ পাতা অলস উত্তরগামী বাতাসের দোলায় আপনমনে কোথায় যেন বয়ে চলেছে, ছেলেবেলা কেটেছে মন্থর মফ্‌ফসলে, এমনই কার্তিক মাসের নিঝুম দুপুরে ভগ্নপ্রায় জীর্ণ ভদ্রাসনের দোতলার জানলা থেকে সাত্যকি সামনের নদীঘাটে ফেরি পারাপার দেখত, একটি নৌকো এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে আবার ওপার থেকে ফিরে আসছে যাত্রীবোঝাই নাও, শিমশিম বাতাসে বালুচরের উপর ম্রিয়মান রৌদ্রের ঝিকিমিকি, চখা-চখী, বালিহাস, ধবল বক-ভবহাটে রূপের যেন অন্ত নাই-তবে কিশোর সাত্যকির ভালো লাগত ওই নৌকো চলাচল, অল্পবয়সে ভাবত, কেমন পিছুটানহীন ভেসে যাওয়া, এই নদীর জলের সঙ্গে পীরিতে ঘাটে দোলা খাচ্ছে আবার পরমুহূর্তেই সবকিছু ফেলে রওনা দিয়েছে ওইপারে…সহসা ছাতুওয়ালার কণ্ঠস্বরে সংবিত ফিরে এল, ‘বাবুজ্বি, সাত্তুকা সরবত ইয়া লিট্টি-চোকা?’
মাঝবয়সী দোহারা চেহারার
মানুষটির মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি, পরনে সাদা মলিন ধুতি আর ফতুয়া, গলায় একখানি লাল গামছা। খুবই সাধারণ চেহারা অতি সহজেই জনসমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত। চোখদুটি ভাবলেশহীন। এমন মানুষের মুখ দেখে মনের হদিশ পাওয়া বড়ো কঠিন! সাত্যকি প্রশ্ন শুনে দু-পা এগিয়ে চু স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘ক্যেয়া আভি লিট্টি-চোকা মিলেগা?’

একটি স্টিলের ঘটিতে কাঠের দণ্ড দিয়ে ছাতুর শরবত তৈরি করে গ্লাসে ঢেলে উপরে পেঁয়াজ-কাঁচালঙ্কা কুচি-বিট লবণ ছড়িয়ে সামনের খরিদ্দারের হাতে ধরিয়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলল, ‘মিলেগা বাবুজ্বি!বাস থোড়া ইন্তেজার করনা পড়েগা!’

–মেরা পাস ইতনা টাইম নেহি হ্যেঁ!

সাত্যকির কথা শুনে পলকের তরে ক্ষীণকায় হাসি ছাতু বিক্রেতার ঠোঁটে ভেসে উঠে মিলিয়ে যেতেই অদূরে একটি নির্জন গলিপথের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘তব আপ সিধা যাইয়ে, ঔঁহা আভি লিট্টি-চোকা মিল যায়েগা!’

‘সুক্রিয়া!’, সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে সাত্যকি গলিপথের দিকে চাইল।এগারোটা বেজে পাঁচ মিনিট, আরও মিনিট কুড়ি অপেক্ষা করা যেতে পারে কিন্তু তার মধ্যে ‘লিট্টি-চোকা’র দোকান খুঁজে না-পেলে সামান্য অসুবিধার সৃষ্টি হবে, দোকানের নাম্বারটি অন্তত জানা প্রয়োজন-নিজের চিন্তাস্রোতের পানে চেয়ে আপনমনে হাসল সাত্যকি, আসলে দোকান মানে একটি গাড়ি, মেয়েটি এখনও ট্র্যাভেল এজেন্সি থেকে বেরিয়ে আসেনি, গলিও শুনশান, কোনও গাড়ি তো চোখে পড়ছে না, তবে কি গাড়িটা আর আসবে না?
এমন সময় একটা
সিগারেট হলে ভালো হয়, কিন্তু বহুদিন হল ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করেছে। পকেট থেকে আবার সামান্য মৌরি বের করে মুখে দিল। মেয়েটিকে কোথাও যেন দেখেছে! কোথায়? অপরূপা না-হলেও আলগা শ্রী রয়েছে মুখে। প্রসাধনও ভারি মৃদু। আচ্ছা, এই যুবতি কি আগে কেশবতী ছিল? দৃশ্যটি অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো চোখে ভেসে উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছে কুয়াশায়। এমন তো কখনও হয় না! ‘পৃথ্বীশ, পৃথ্বীশ’, আপনমনেই নামটি দুবার উচ্চারণ করল সাত্যকি। এই তাহলে পৃথ্বীশ রায়ের প্রেমিকা! মন্দ নয়! প্রেমিকা, একটি আশ্চর্য শব্দ। কোনও নারীর কাছে মানুষ কি শুধু শরীরের আকর্ষণে যায়? নাকি সঙ্গ ও শরীর দুটিই প্রয়োজন জীবনে? প্রশ্নগুলি নিজের মনোতটে ভেসে এল দেখে সামান্য বিস্মিতই হল সাত্যকি। এই বত্রিশ বছরের জীবনে তার কখনও কোনও নারীসঙ্গের কথা মনে পড়েনি। শরীরের প্রয়োজনও হয়নি তেমন। ওসব বড়ো বিচিত্র ও জটিল বিষয়! তার মনোবৃত্তি সংখ্যানুসারী, মৌলিক সংখ্যা, দুরূহ প্যারাডক্সই সাত্যকির প্রকৃত নর্মসহচরী। ছায়াচ্ছন্ন গলির মুখে ছাতিম গাছের তলায় কে যেন বাসি ফুলরেণু বিছিয়ে রেখেছে… সেদিকে তাকিয়ে কোনও সুডৌল চিবুকের ছন্দ নয়, সাত্যকির মনে পড়ল P and NP সমস্যার কথা। P মানে যে-সব সমস্যার সমাধান কম্পিউটর পলিনোমিয়াল টাইমের মধ্যে বা বলা ভালো নির্দিষ্ট সময়ে খুঁজে বের করতে পারে, অর্থাৎ কিনা ট্র্যাক্টেবল আর NP হল সেইসব সমস্যা যাদের সমাধান জানা থাকলে কম্পিউটর পরীক্ষা করে বলতে পারে সেইটি সঠিক সমাধান কিনা কিন্তু নিজে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবিষ্কার করতে পারে না! এই যেমন গাড়িটি আসবে আজ, অর্থাৎ উত্তর জানা রয়েছে, এবার পরীক্ষা করে দেখা সহজ গাড়িটি সত্যই এল কিনা, মানে, এইটি NP প্রবলেম, নাকি P–সামান্য হাসির রেখা ফুটে উঠল সাত্যকির মুখে, নিজেকেই আলতো স্বরে শুধোল, ‘আসলে কি তুমি একটি কম্পিউটর? তাহলে NP=P প্রমাণ করতে পারবে? অথবা P ≠ NP?‘দত্ত এন্ড দত্ত’ ট্র্যাভেলসের কাচের দরজা খুলে রাস্তায় এসে ঋষা প্রথমে একটু অবাকই হল। অন্যদিনের তুলনায় পথঘাট কি আজ একটু কম ব্যস্ত? সোহাগি কণ্ঠস্বরের মতো রৌদ্র চরাচরে নিজেকে বিছিয়ে দিয়েছে। ঝিমঝিম বাতাসে জগত ভারি মধুর বলে মনে হয়। পরনের সালোয়ার-কামিজটিও যেন ঈষৎ চঞ্চল, হাতে-ধরা এজেন্সির নাম লেখা বড়ো সাদা খামের দিকে একবার তাকাল ঋষা। রায়পুরের এয়ার টিকিট, সেখান থেকে পেন্ড্রা রোড হয়ে অমরকণ্টক অব্দি গাড়ির ব্যবস্থাও করে দিয়েছে ট্রাভেল এজেন্সি। শুধু অমরকণ্টকে হোটেল বুকিং ইচ্ছা করেই নেয়নি ঋষা। ওখানে পৌঁছে দেখেশুনে কোনও আশ্রমে ওঠাই ভালো। রামকৃষ্ণ মিশনের অতিথিশালাও রয়েছে। সাতপাঁচ চিন্তার মাঝে হঠাৎ খেয়াল হল, এবার দ্রুত হোস্টেলে পৌঁছাতে হবে। আগামীকাল সকালেই ফ্লাইট। জামাকাপড় কিছুই গোছানো হয়নি। এদিক ওদিকে তাকিয়ে গাড়িটিকেও কোথাও দেখতে পেল না। সাদা রঙের মারুতি সুইফট, শেষের চারটি নাম্বার মনে আছে- টু নাইন ফোর টু, মহেশ্বরবাবুর গাড়ি। তিনিই ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়েছেন। হাতব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে ড্রাইভারকে ফোন করতে যাওয়ার আগেই মনে পড়ল, ড্রাইভার বলেছিল, সামনে গলির মধ্যে গাড়ি নিয়ে সে অপেক্ষা করবে। ওই তো গলিটি, ছায়া-আলোয় আনমনে যেন ঘুমিয়ে রয়েছে। কালো রোদচশমাটি চোখে পরে ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল ঋষা।সহসা একটি সাদা মারুতি সুইফট সামনে দেখতে পেয়েই চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল সাত্যকির, সামান্য বাম পাশে সরে পথ করে দিতেই নজরে পড়ল নাম্বার প্লেট-শেষ চারটি নাম্বার, টু নাইন ফোর টু, আহ!বিউটিফুল!সাম অব ফোর ডিজিটস-সেভেনটিন, আ পারফেক্ট প্রাইম! নিয়ম মেনে সমাধান সূত্র ঠিক সময়েই এসে উপস্থিত হয়েছে, মুখে মৃদু বাতাসের মতো হাসি টেনে সাত্যকি আপনমনে অস্ফুটে বলল, ‘স্টিল আই নিড টু কনফার্ম!’

অদূরে গলির মাঝে গাড়িটি দাঁড়াতেই দ্রুত পায়ে হেঁটে পার হয়ে আবার ফিরে এল। এটুকু অভিনয়ের প্রয়োজন রয়েছে। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে বসে রয়েছে, দুপাশে কাচ নামানো। জানলার কাছে মুখ নামিয়ে সাত্যকি সহজ গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদা, এখান থেকে পার্কস্ট্রিট কীভাবে যাব?’
বামদিকে জানলায়
সাত্যকির দিকে এক-দুই মুহূর্ত চেয়ে রইল ড্রাইভার। বাচ্চা ছেলে, খুব বেশি হলে পঁচিশ কি ছাব্বিশ বছর বয়স। কেজো স্বরে বলল, ‘আপনি সোজা এগিয়ে যান, কলামন্দির পার হয়ে মোড়ের মাথায় ডানহাতে নাইটিঙ্গেল নার্সিংহোম রেখে একটু এগোলেই পার্কস্ট্রিটপেয়ে যাবেন!’
–ওই ইস্কুলের সামনে মোড়?
–না, না মেয়েদের ইস্কুল
তো বামহাতে। আপনি ডানদিকে যাবেন। নার্সিংহোম যে দিকে, ওইদিকে হাঁটবেন।
কিছুই না-বোঝার ভঙ্গিমায় দু-এক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে সাত্যকি আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘ডানহাতে?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডানহাতে! আপনি যাবেন কোথায়?’, অল্পবয়সী ড্রাইভার সামান্য যেন অধৈর্য্য হয়ে উঠেছে।
–ওই রায়-ত্রিবেদি
রক্তপরীক্ষার সেন্টার রয়েছে না, ওইখানে যাব। আসলে আমি তো এদিককার পথঘাট কিছুই চিনি না, নতুন এসেছি।
–তাহলে তো আরও কাছে।
আপনি সোজা যান। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই ডানহাতে প্রথম রাস্তা, উড স্ট্রিট। ওই রাস্তা ধরেই এগোলেই অ্যালেন পার্ক পড়বে। ওরই ডানদিকে একটু দূরে রায়-ত্রিবেদি, চিনতে না-পারলে কাউকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন।  

ক্লাসে পড়া-না-পারা বালকের মতো উদভ্রান্ত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল সাত্যকি, এমন অভিনয় তার কাছে খুবই স্বাভাবিক, মুখে দিনান্তের করুণ আলো ফুটে উঠেছে, ওইরকম মুখ দেখেই বোধহয় মায়া হল ড্রাইভার ছেলেটির, নরম গলায় বলল, ‘আমি ওদিকেই যাব কিন্তু ম্যাডাম রয়েছে, নাহলে আপনাকে নামিয়ে দিতাম, আপনি এই রাস্তা দিয়েই চলে যান, ঠিক পারবেন!’
–আমি তো কখনও আসিনি এদিকে, কিছুই চিনি না!
কথার মাঝেই
আড়চোখে সাত্যকি দেখল ছাতিম গাছতলার ছায়াচ্ছন্ন রৌদ্র আর মাথার উপর ঝিলিমিলি উজ্জ্বল আকাশ নিয়ে শ্বেতহংসীর মতো মন্থর পায়ে মেয়েটি এগিয়ে আসছে। ঋষা। এই নামটিই শুনেছে আজ সকালে। ঋষা মানে কী? মুহূর্তের মধ্যে ড্রাইভারের পকেটে মোবাইল বেজে উঠল। ফোন ধরতেই নিঃশব্দে সরে এল সাত্যকি। দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে মণিবন্ধের যন্ত্রটি আঙুলের স্পর্শে সচল করে মুখের কাছে এনে চাপা গলায় কাকে যেন বলল, ‘কনফার্মড!’
ওপ্রান্ত থেকে পূর্বের ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘নাম্বার?’
–ডাব্লু বি জিরো সিক্স এ-টু নাইন ফোর টু!

এই ঘটনার অল্পক্ষণ পরে বেলা একটা নাগাদ, মধুর হেমন্ত দ্বিপ্রহরে লালবাজার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল রুমে একটি ভয়াবহ অ্যাকসিডেন্টের কথা রিপোর্ট করা হল–মা উড়ালপুল থেকে নামার সময় একটি প্রাইভেট কারে ধাক্কা মারে নিয়ন্ত্রণহীন টেম্পো, শ্বেতকুসুমের মতো গাড়িটি বড়ো রাস্তার পাশেই উল্টে যায়, আরোহী ছিলেন একজন অল্পবয়সী তরুণী, ড্রাইভারের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি, টেম্পো-ড্রাইভারকে অবশ্য পুলিশ গ্রেফতার করেছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়িটি মারুতি সুফইট, নাম্বার, ডাব্লু বি জিরো সিক্স এ-টু নাইন ফোর টু।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

https://three.pb.1wp.in/magazine/magazine-novel-harer-banshi-part-thirty-by-sayantan-thakur/

You might also like