Latest News

হাড়ের বাঁশি (চতুর্ত্রিংশ পর্ব)

ঋষার অচৈতন্য শরীরখানি পূজাশেষের কুসুমের মতো অপারেশন টেবিলে নিথর শুয়ে রয়েছে। চারপাশে একদল চিকিৎসক পরস্পরের মুখের দিকে একবার চাইলেন। যুবতি শরীরের বাম পায়ের ফিমার অস্থিটি ভেঙে দু-টুকরো, ডান হাতের আঙুলগুলি একদলা গঙ্গামাটির মতো নরম হয়ে একে-অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। মাথার একপাশে রক্ত জমাট বেঁধে বন্ধ করেছে সকল সূক্ষ্ম নালিপথ। গম্ভীর গলায় ড. গোলাস বললেন, ‘লেটস স্টার্ট!’
জ্বলে উঠল উজ্জ্বল আলো। দক্ষ হাতে সিস্টারেরা এগিয়ে দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় অস্ত্র। জীবাণুনাশকের ভারি সুবাসে আচ্ছন্ন চারপাশ। আর ঋষা? সে কি সত্যিই অজ্ঞান? দেহি কি তবে ত্যাগ করেছেন এই জীর্ণ শরীর?
না, এত সহজে খেলা
ফুরোয় না হয়তো! এক আশ্চর্য জগতে সে ভেসে চলেছে, সেখানে আলো নেই, আবার অন্ধকারেও আচ্ছন্ন হয়নি চরাচর। ঊষা নয়, প্রদোষও আসেনি ধীর পায়ে। দুপাশে আলোফলের মতো নক্ষত্র ভেসে ভেসে কোথায় যেন চলেছে! এই কি সৃষ্টির আদিলগ্ন? একেই কি হিরণ্যগর্ভ বলা হয়?

ঋষা চলচ্চিত্রের মতো কতগুলি দৃশ্য দেখে চলেছে, ওষ্ঠাধরে অতি মৃদু নির্ভার হাসি।

কোন্‌ অদৃশ্য মানুষকে আপনমনে যেন ঋষা বলছে, ‘সেই বালিকার মুখ আজ বারবার মনে পড়ছে।’

পশ্চিম আকাশে ঘন মেঘ, ঠিক যেন ছেলেবেলার শেলেট, শুধু খড়ির বদলে তার উপর এখন সামনের বাড়ির নিমগাছের পাতাগুলো শিমশিম বাতাসে কাঁপছে। আজ বাজার দোকানপাট সব বন্ধ। জনশূন্য দ্বিপ্রহর স্নানান্তে যুবতির এলোচুলের মতো নিজেকে বিছিয়ে দিয়েছে চরাচরে। এমন রূপপানে চেয়ে বালিকার কথা ভাবছি।
তখন বোধহয় তার পাঁচ কি ছয় বছর বয়স। কাছেই একটি আশ্রমে প্রথম আলাপ। আধফোটা কুসুম মুখখানি ঘিরে রেখেছে ঝুমুরঝুমুর চুল। বড় বড় দুটি চোখ। আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি দিদিমণি?’
আমিও মুখে হাসি এঁকে বললাম, ‘না গো, আমি খেলব তোমাদের সঙ্গে!’
—য্যাহ!
—সত্যি!
—কী খেলবা?
—যা বলবে তোমরা!
—কুমীরড্যাঙা! খেলবা?
—খেলব তো, তারপর ধরো কিতকিত!
মুখে দুহাত
চাপা দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল জয়া, ‘এতবড় বিটি হয়ি কিতকিত খ্যালবা?’
কথা শেষ করতে না করতেই আবার হাসি। আশ্রমের দিঘির পৈঠায় বসে আছি আমরা। ওপারে ঠাকুরের মন্দির, দু দিকে সারি সারি গাছ। নাগকেশরের গাছে ঝিলমিল করছে বৈকালের রৌদ্র। কয়েকজন ব্রহ্মচারী মাঠে ফুটবল খেলছেন। জয়া হঠাৎ আমাকে শুধোলো, ‘তোমার ঘর কোতায় গো?’
বালিকাকে
কৌতুকের সুরে বললাম, ‘এই তো আমার ঘর। এখানেই তো থাকি!’
—য্যাহ!
—দ্যাখো কাণ্ড, বিশ্বাস করে না!
—একানে বিটিছেলাদের থাকতি দেয় না!

সেই প্রথম আলাপ, তারপর প্রতিদিন বিকেল হলেই দেখা হত আমাদের। জয়াদের একটি বাসে করে বাড়ি থেকে আশ্রমে নিয়ে আসা হত। তারপর দুধ বিস্কুট খেয়ে খেলা, সন্ধ্যায় পড়াশোনা, গান, ছবি আঁকা, নাচ আর যাওয়ার আগে রাত্রে খাবার ঘরে সারবেঁধে খেতে বসা। গরম গরম ভাত, ডাল, সয়াবিনের তরকারি, কোনওদিন ডিমের ঝোল। বড় তৃপ্তি করে খেত সবাই। একদিন খেতে বসেছে ওরা, আমি পরিবেশন করছি। হঠাৎ দেখি জয়া পুতুল পুতুল দুটি হাত জড়ো করে সেদ্ধ ডিমটি নিয়ে ফুঁ দিচ্ছে। সদ্য কড়াই থেকে নামানো হয়েছে কিনা! আমাকে দেখে বলল, ‘খুব গরম, ঠাণ্ডা করে দেবা!’
হাত ধুয়ে এসে ডিমটি ছোটো ছোটো টুকরোয় ভাঙতে যাব, ওমনি হাঁ হাঁ করে উঠল, ‘ভাঙবা না, ভাঙবা না!’
একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেন? ছোটো টুকরোগুলো ভাতের সঙ্গে মেখে নাও। তাহলে আর গরম লাগবে না।’
—না!
 ভাঙবা না! ভাঙলি তাড়াতাড়ি শ্যাষ হয়ি যাবে!করুণ চোখে আমার হাতে ধরা ডিমটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে জয়া। বাইরে অন্ধকার আশ্রম-প্রাঙ্গণে জোনাক পোকার দল উড়ছে। ওদিকে চাষের জমি। বড় মহারাজ নিজে তদারকি করেন। আলোর মতো ঝিঙেফুল ফুটেছে। জয়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় শুধোলাম, ‘আরেকটা ডিম খাবে তুমি?’
বুনো ফুলের মতো হাসিতে ছেয়ে গেল মুখখানি। আহা! একটি ডিম বৈ তো নয়! আমি রান্নাঘরে মহারাজের কাছে আবদার করলাম, ‘মহারাজ ওই যে মেয়েটা, জয়া, ওকে একটা বেশি ডিম দেব?’
—কেন রে? ওকে দেয়নি আজ
ডিম?
—না মহারাজ দিয়েছে, আসলে…
—কী? তাহলে দুটো দিবি কেন?
নিয়মভাঙা নীচু গলায় বললাম, ‘ওর খুব ইচ্ছা মহারাজ আরেকটা ডিম খাওয়ার! ‘

রান্নাঘরের যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি, তার উল্টোদিকেই মায়ের মন্দির। তিনি আজ লালপাড় বেনারসি পরেছেন। থলকমল আর গন্ধরাজ নিবেদন করা হয়েছে। কথা বলছি আর আড়চোখে তাঁর দিকে চাইছি। মনে মনে নিশ্চিত জানি একটা সেদ্ধ ডিম তিনি আজ দেবেন আমায়। দু’এক মুহূর্ত পর মহারাজ একটু হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘জয়ার ইচ্ছা হয়েছে, না তোর ইচ্ছা হয়েছে ওকে খাওয়ানোর?’
ও কথার কী উত্তর হয়! ধরা পড়ে যাওয়া বালিকার মতো মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছি।
—যা, বালতি থেকে নিয়ে যা। কিন্তু পাশের জন যদি চায় তখন কী করবি?
সত্যিই তো, তাহলে কী বলব! ইতস্তত করে বললাম, ‘তাহলে থাক মহারাজ!’
—আর তোর যে ইচ্ছে হল, তার কী হবে?
কয়েক মুহূর্ত প
র ফের বললেন, ‘যা যা, নিয়ে যা, মাকে মনে মনে একবার বলে নিয়ে যা!’

গোপন মোহরের মতো সেদিন নিয়ে গেছিলাম ডিমসেদ্ধ। পাঁচ বছরের বালিকা আমার হাতে ডিম দেখে বলেছিল, ‘এইটা ঘর নিয়ে যাতি দেবা?’
—ঘর নিয়ে গিয়ে কী করবে? এখানেই খেয়ে নাও।
মুখ নীচু করে বলেছিল, ‘মা খেত তাইলে!’

কলকাতার রাস্তায় এক করুণ আলো লেগে থাকে, চট করে বোঝা যায় না। অনেক দিন একা একা ঘুরে বেড়ালে তবে টের পাওয়া যায়। বহুবছর আগে এন্টালির কাছে আমি একবার হারিয়ে গেছিলাম। ওই যে সিনেমা হল ছিল না একটা, মোড় থেকে ডানদিকে ঢুকে, ওইখানে। তখন শহরে ছায়াচিত্র দেখার কত বাড়ি ছিল! ফুলেল বিকেলে গা ধুয়ে পন্ডস পাউডার ছড়িয়ে কাকিমা মাসিমণিরা সেইসব হলে ম্যাটিনি শো দেখতে যেতেন। সেই হারিয়ে যাওয়ার দিনে প্রথম বুঝতে পারি ওই করুণ আলোর কথা।
বৃষ্টি হচ্ছিল খুব
। বড় রাস্তায় জল জমে গেছে। সন্ধে পার হয়ে রাত শুরু হয়েছে অনেকক্ষণ। মল্লিকবাজারের দিক থেকে যে দু একটা বাস আসছে, তিল ধারণের জায়গাটুকু পর্যন্ত নেই। এন্টালি বাসস্টপ শুনশান। হু হু বাতাস উঠেছে। আমাকে ফিরতে হবে সেই শহরতলি, দমদম। তখনও দমদম একটা মফস্সল, কলতলায় লোকে সাবান মেখে স্নান করে। বাড়ির ভেতর ছোট্ট বাগানে দোলনচাঁপা আর দোপাটি ফোটে। যদি বাস না পাই, ফিরতে পারব না। কী করব তাহলে? উনিশ বছর বয়সে প্রথম বুঝতে পারলাম আমি হারিয়ে গেছি আসলে!

একটা সিড়িঙ্গে চেহারার লোক কোথা থেকে এসে জুটলো পাশে। মলিন ধুতি, তবে পাঞ্জাবিটা বেশ কাজ করা। কনুই থেকে হাতা অব্দি অসংখ্য ভাঁজ, গিলে করেছে! সিঁথি কেটে দুপাশে পাটি করে পাতা চুল। গলায় আবার উড়নি। হ্যাঁ, আপনি যা ভাবছেন এখন, আমার মনেও সে কথা এসেছিল! এই ঝড়জলের রাতে লোকটা শুকনো কেন! পুরো শুখা যদিও ছিল না, গা থেকে ভকভক করে মদের গন্ধ আসছে। আমার দিকে চেয়ে একটু হেসে জিগ্যেস করল, ‘তা যাবে কোতায়?’
পান আর খয়েরে লাল দাঁত, ঠোঁটে কালো কালো ছোপ।
পুরুষ মানুষ তাড়ানোর মতো গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনার কী প্রয়োজন?’
খিকখিক করে
হেসে লোকটি বলে, ‘আজ্ঞে ভুল হয়েচে বটে, ক্ষমাঘ্যান্না করে দিন! তা তুমি দত্তবাড়ির কাপ্তানের বাঁধা মাগি নাকি গো?’
—কী?
—হাটখোলার দত্তবাড়ির খপর রাকো না? তবে কি শীলদের ছোটো খোকা?
একটু থেমে
নিজের মনেই বিড়বিড় করে ফের বলে উঠল, ‘না তো, তিনি তো একন হাড়কাটার বুলবুলের ঘরে!’
—কী আবোল তাবোল বকছেন বলুন তো? কে আপনি?
‘আমি?’, হে হে করে
হেসে উঠল লোকটা আবার। একটু কাছে সরে এসে গলা নামিয়ে বলল, ‘তা যাবেন নাকি? ট্যাঁকে মালকড়ি আচে কিচু? খপর আচে আজ ছাতুবাবুর ওকেনে মোচ্চব, মেনি বেড়ালের বিয়ে বলে কতা! যাবেন?’

সেই শুরু আমার কলকাতা ভ্রমণ। রাত হলেই মেসবাড়ির নীচে চলে আসত লোকটা। ওর নাম ভাঁড়ু দত্ত। কত জায়গায় যে নিয়ে গেছে। একবার বলল, গঙ্গার পারে দক্ষিণেশ্বরে কে এক সাধু নাকি আছে, অনেক লোকে যায়-টায়। তা গেলাম একদিন ভাঁড়ুর সঙ্গে। ছেলে ছোকরাদের ভিড় শুধু। এক তেজি যুবক, টানা টানা দুটি চোখ, তাল দিয়ে দিয়ে গান গাইছে, অহংকারে মত্ত সদা অপার বাসনা!
সে গলা শুনলে মনে আফিমের নেশা ধরে যায়।

ছাতুবাবুও ভালো লোক, কতদিন ওখানে বিলিতি মদ খেয়েছি। দত্তবাবুর সঙ্গে শুলাম একদিন। খাসা রূপ। তবে বুদ্ধিসুদ্ধি তেমন নাই, দু চারটে কথা বলেই বিছানায় ঘষটাঘষটি করতে চায়। কাশেমের ছ্যাকরা গাড়ি ফিট করেছিল ভাঁড়ু। ওতে চড়েই ঘুরি আমরা। তবে একদিনও কোনও পয়সা চায়নি কেউ। আর আমার পয়সা নিয়ে করবেই বা কী, ও তো অচল কাগজের টুকরো শুধু!

আহ! কী দিন ছিল! সারাদিন মেসের ঘরে তক্তপোষে শুয়ে থাকতাম আর চেয়ে থাকতাম কখন রাত আসবে! তবে শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। চোখের তলায় কালির ছোপ। কিছু মনেও রাখতে পারতাম না ভালো। কেউ কিছু বললে কয়েক মিনিট পরেই ভুলে যেতাম।

শ্যামবাজারের পর এদিকে ঘন জঙ্গল। জনমানুষ নেই। বড় বড় উলুখাগড়া বেথুর ঝোপ। একা মানুষ পেলেই সর্বস্ব লুট করে পালাত মাধো ডাকাতের স্যাঙাতরা। তবে ভাঁড়ু সঙ্গে থাকলে নিশ্চিন্ত। কী সব মন্ত্র পড়তো বিড়বিড় করে, ওমনি সাপের মাথায় ধুলো পড়ার মতো নেতিয়ে যেত লোকজন!

আজ সকালে বাজার করতে গিয়ে দেখি, দুটি বালক বালিকা বসে বসে খেলা করছে পথের ধারে। বর্ষণক্ষান্ত বাজার। লকলকে পুঁইলতা বেগুন লাউ কত বাহার! তার মধ্যে এক যুবক কদমগাছের তলায় খেলনাবাটি পেতে বসেছে দুটি অবোধ বালক বালিকা। মেয়েটি পাতা কেটে লুচি বানিয়ে ইঁটের উনোনে ভাজছে। ধুলো রেখেছে একমুঠি শুকনো পাতায়! ময়লা ফ্রক, নাক দিয়ে শিকনি গড়াচ্ছে, রুক্ষ চুল। ছেলেটির পরনে ছেঁড়া হাফপ্যান্ট, পাঁজরের হাড়কটিও গোনা যায়! খিলখিল করে হাসছে দুজনে। বালকের হাতে একটি আস্ত কদম ফুল!
বালিকার চোখে স্পষ্ট দেখলাম সেই করুণ আলোর ছায়া। সেই দেখেছিলাম একবার এন্টালির মোড়ে, ঝড়জল তুফানের রাতে, আর আজ দেখলাম।

আপনার সঙ্গে এইবার আর কখনও দেখা হবে না।
আমার হাতে নিরামিষ রান্না খেতে চেয়েছিলেন! হল না। আজ নিরামিষ হয়নি আমার রসবতীর তীরে। হবে কখনও। সেদিন শালিখ আসবে, চড়াই, ফিঙে, দুটি কৃষ্ণকাক, কতগুলি গঙ্গাফড়িং, আর একটি বাস্তুসাপ। আমার পুরাতন ভিটায় সেই বাস্তুসাপের নাম রেখেছিলাম দুধরাজ। একটা নেউলও আসবে, তার নাম মহাকাল। তাদের সবাইকে খেতে দেব শাকান্ন। মৃৎপাত্রে রাখব তৃষ্ণার জল। তখন আকাশে ভাসবে মেঘগৃহ। আপনিও থাকবেন। জীর্ণ বস্ত্রের মতো শরীরটি তো আজ সন্ন্যাসী অগ্নি গ্রাস করেছে, যা থাকবে তা হল আপনার মনছায়া। তাকে আমি বলি মায়া।
ঘট ভেঙে গেলে কী থাকে
? ঘটাভাব। অভাব থেকেই জন্ম নেয় বিপরীত ধারণা। বেদনা কী? আনন্দের অভাব!

আজ সারাদিন আপনার কথা মনে পড়ছে। দ্বিপ্রহরে কেমন আলো মুছে মেঘ এল, ঝিরঝির বাতাসে দূরে নিমগাছের পাতাগুলি কাঁপছে। সেই ভবনদীর আখ্যান কতবার যে আপনাকে বলেছি! ওই দেখুন আকাশের শরীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল সে, স্রোতে ভাসছে আপনার এই জন্মের তরীখানি। কোথায় চলেছে সে? কামনা-বাসনা ধ্বংস করতেই তো তিনি আসেন বারবার, অন্ধ বধির পিঙ্গলকেশী। তাঁকে ভয় করতে নেই। তিনি যে স্নেহময়ী মৃত্যুরূপা জননী।

শেষ জীবনে আপনার কতগুলি একা থাকা দিন, এক রাত্রে আমাকে বলেছিলেন, তোমার ঈশ্বর আছেন কিনা জানা নাই তবে ঈশ্বর না থাকলেও তাঁর প্রেম রয়েছে। আমি বলি, একটু ভুল হয়েছিল, তিনিই প্রেম, তিনি আর প্রেম যে ভিন্ন নয়।
আপনার সঙ্গে দেখা হবে। আমার বেদনা ও অশ্রুবিন্দু হব্যবাহর অলংকার, তাঁর রথে চড়েই শুরু হল নূতন যাত্রা। যেখানে শেষ করলেন ঠিক সেখান থেকেই আবার শুরু হবে।

অপরাহ্ণের
আলোয় নির্জন জনমানবশূন্য পথ নদীর মতো হয়ে উঠেছে। এক বালক খালি গায়ে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে সেই পথ দিয়ে কোথায় যেন চলেছে! তার পেছনে ঝমঝম করে বাজছে চৈত্র মাসের স্মৃতি।
ওই বালকের মতো নূতন বছর এসে আবার বয়ে চলেছে কাল স্রোতে। একটি ঝরা পাতা খসে পড়ল বৈশাখী বাতাসে। অনিত্য সদাচঞ্চল জীবন, আজ আছে আবার মুছে যাবে! তাই নিয়েই আমাদের ধুলাখেলার সংসার।

কত জন্ম
পার হয়ে, অপরাহ্ণ-আলোয় কত মলিন পথঘাট, ঘেঁটু আকন্দ ফুলের জোছনা, রুক্ষ চৈত্র বাতাস, সন্ধ্যাতারা আর চঞ্চলা প্রজাপতির ডানায় আঁকা কালস্রোত পার হয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা, তবুও কখনও ফিরে এলাম না আর। আমাদের পুনরায় দেখা হবে বলেও এলাম না ফিরে এই জগতে। তোমার মুখখানি বাসনার মতো কখনও টানেনি আমায়। আমার আলতো আঙুলের স্পর্শও কোনওদিন পথরোধ করেনি তোমার। তাই তো এত কটুবাক্য চারপাশে! জগত শুধু ফিরে আসা আর দেখা করার আখ্যানই বুঝতে পারে!
অথচ আমরা জানি, কখনও ফিরে আসব না বলেই তোমার মুখখানি আজও অপরূপ আমার কাছে। তুমিও আমার কথা ভুলে যাওনি এখনও।
দ্যাখো,
সামনে সহস্র কোটি সূর্য আমাদের পথ আলো করে রেখেছে। শত শত নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছে আবার পরমুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে অতিকায় কৃষ্ণগহ্বরে। বিশ্ব তৈজস প্রজ্ঞা সব অতিক্রম করে তুমি চলেছ। আমিও চলেছি। তখন তুমিও নাই আমিও নাই। তুমি আমি কি পৃথক ? 

শোনো, কতদূরে মায়াজগতের বুকে খর চৈত্র অপরাহ্ণে এক অপরিচিত ধুনুরি তার যন্ত্রে সুর তুলেছে, সেখানে তুঁহু তুঁহু রবে নিরন্তর বেজে চলেছে আমাদের অলীক প্রেমাখ্যান।

      চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (ত্রাত্রিংশ পর্ব)

You might also like