Latest News

হাড়ের বাঁশি (পঞ্চত্রিংশ পর্ব )

‘শ্যামলদা, আজ আপনার কোনও ভাড়া আছে?’
ফোনে অনিন্দিতার গলা শুনে শ্যামল এক মুহূর্ত ভেবে জিজ্ঞাসা করল, ‘বেরোবেন নাকি?’
–হ্যাঁ, একটু চন্দননগর যেতাম।
–চন্নননগর? তা কখন যাবেন?
দেওয়াল ঘড়ির কাঁটার দিকে এক পলক তাকিয়ে অনিন্দিতা বলল, ‘এখন তো সাড়ে দশটা, এই ধরুন দুটোর দিকে বেরোব।’
–আপনের অফিসে গাড়ি নে আসব?
–না, না, বাড়িতে আসুন। আজ অফিস ছুটি নিয়েছি আমি।
পার্কস্ট্রিট মোড়ে লাল বাতির ইশারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে শ্যামলের সাদা অ্যামবাসাডার। বামহাতে চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট বন্ধ করে ইতস্তত স্বরে বলল, ‘আজ দুপুরের পর বলচে খুব ঝড় বিষ্টি হবে, আপনের অসুবিদা হবে না?’
ফোন কানে রেখেই নিঃশব্দে হাসল অনিন্দিতা, ‘নাহ! ঝড়-বৃষ্টিই তো ভালো! আপনি দুটোর মধ্যেই চলে আসবেন, আমি রেডি হয়ে থাকব।’

আলো সবুজ হতেই গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে ভাবল শ্যামল। আজ সন্ধের পর রানির সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল, ওকে ফোন করে বলতে হবে। এই ঝড়-বাদলার দিনে অন্য কেউ বললে সোজা কাটিয়ে দিত, কিন্তু রায় ম্যাডাম প্রায় সারা বছরই গাড়ি ভাড়া নেন আর পয়সাকড়ির বিষয়েও যা চায় তাতেই রাজি- এমন বাঁধা কাস্টমারকে মুখের উপর নিষেধ করা যায় না। আকাশের দিকে একবার তাকাল শ্যামল। অঘ্রাণ মাস, কিন্তু পীতকুসুমবসনা আলো আজ ছায়াচ্ছন্ন। উতলা বাতাসের ডানায় লেগে রয়েছে অভিমানিনীর কাজলের মতো মেঘ। গাড়ির এফ এমে বারবার করে বলছে, কী একটা ঝড় নাকি সাগর থেকে কলকাতার দিকে ছুটে আসছে। দুপুরের পর তারই লেজ আছড়ে পড়বে আর সেইসঙ্গে শুরু হবে ঝড়-বৃষ্টি! যাকগে, ওসব হাওয়া আপিসের কথা কত শুনেছে, যা বলে ঠিক তার উল্টো হয়! 

আজ রাস্তায় বড়ো ভিড়! প্রতি পদক্ষেপে লালবাতি দৈত্যের চোখ হয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাড়ি থামিয়ে শ্যামল ফোন করতেই ওপারে উচ্ছল ঝরনার মতো বেজে উঠল রানি, ‘মেঘ করচে খুব! তুমি সন্দ্যা লাগাবা না, তাড়তাড়ি চলে আসবা, বাড়িতে একা রইচি!’
এখনই রানির মুখ ভার
হবে, কিন্তু কী-ই বা করবে শ্যামল! টাকার সামনে সকলেই অসহায়। মন স্থির করে শ্যামল নীচু স্বরে বলল, ‘শোনো না, আজ ইদিকে ফেঁসে গেচি, কাল সন্দেয় ঠিক চলে যাব।’
দু-এক মুহূর্ত
চুপ করে থাকার পর রানির মলিন কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘জানতাম তুমি আসবা না। রাতে মাংস রাঁদব বলি সকালে মুরগি কিনে আনচিলাম, থাক গা।’
–আরে, অফিস থিকে ফোন করে একটু আগে বলচে, নাইট করতে হবে আজ। কী করব বল, বাঁধা অফিসে না বলা যায়? কাল পাক্কা আসব।
‘কাল আসবা
কী করি, ডেলিবাড়ি ফাঁকা থাকবে নাকি! ওই অপিস নিয়াই থাকো তুমি!’, কথাক’টি শেষ করেই ফোন কেটে দিল রানি। মোবাইল পকেটে রেখে সামান্য হাসল শ্যামল। কাল দেখা হলেই আবার রাগ পড়ে যাবে। পুজোর আকাশের মতো- এই রোদ, তো এই বিষ্টি! ইচ্ছে করেই ম্যাডামের কথা এড়িয়ে গেল, ইদানীং ওই রায়দিদির কথা শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে রানি। মেয়েদের মন ভারি বিচিত্র, কখন যে কাকে দেখতে পারে না বোঝা দায়!

স্নান শেষে বারান্দায় এসে দাঁড়াল অনিন্দিতা। নীচে কয়েকটি ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা গুমটি দোকানঘর আর নির্জন পিচ রাস্তা পার হলেই আদিগন্ত শূন্য প্রান্তর। মাঝে মাঝে দু-একটি বহুতল। কৃষ্ণবর্ণ ভ্রমরের মতো মেঘ আকাশে ফোটা কোনও অলীক কুসুমে এসে যেন বসেছে। উন্মনা কিশোরী বাতাস আজ চঞ্চলা, কান পাতলে তার মধুর নূপুরধ্বনি শোনা যাচ্ছে। পশ্চিম দিগন্তে সহসা কুহকিনীর কটাক্ষসম অপরূপ দুটি নয়ন মেলে ক্ষণিকের জন্য তাকালেন দামিনী, পরমুহূর্তেই কৃষ্ণগর্ভা মেঘে মিলিয়ে গেলেন। ন’তলার বারান্দা থেকে এমন রূপ দেখে অনিন্দিতার মনে হল, আজকের দিনটিই চন্দননগরে রানিঘাট পার হয়ে আরও নয় মাইল দূরে সেই নদীচরে যাওয়ার জন্য প্রশস্ত! নিঃসঙ্গ বালুচরের ছবি চোখে ভেসে উঠলে কত কথাই না মনে পড়ে! এক মগ্ন কিশোর তার পদ্মলতার মতো আঙুলগুলি বাতাসে তুলে পলাশপ্রিয়া কিশোরীকে কী যেন বলছে! মৃদু ইশারা দুটি চোখে, কোন্‌ গোপন কথা বলছে সে?

আয়তনে সুবিশাল এই গৃহটি ভারি যত্ন করে সাজানো। বড়ো ঘরখানির খোলা জানলা বেয়ে ভেসে আসা মেঘবতী বাতাসের দোলায় দরজায় ঝোলানো বাঁশের সুরযন্ত্রটি থিরিথিরি ছন্দে আপনমনে বেজে চলেছে। বিছানায় বসে সেই শব্দ শুনে অনিন্দিতার সহসা সাত্যকির কথা মনে পড়ল। কতদিন দেখা হয়নি! চারবছর! সমাজের চোখে স্বামী-স্ত্রী নয় তারা, কিন্তু দুটি বছর একসঙ্গে থাকার পর সাত্যকিকে সে স্বামী হিসাবেই ভাবে! চাকরি করেনি কখনও, অনিন্দিতাই করতে দেয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় নিজে দিবারাত্রি অসম্ভব পরিশ্রম করেছে। সুসজ্জিত এই গৃহটির দেনা এখনও প্রতি মাসে শোধ করতে হয়। সেই চৈত্র বাতাসের মতো কিশোর সারাদিন বাজনা নিয়েই থাকত। পাশের ঘরটি ছিল সাত্যকির সঙ্গী। আজও প্রিয় সেতার, তবলা, হারমোনিয়াম, কী-বোর্ড সবই সাজানো রয়েছে। অনিন্দিতা বারবার সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেছিল, কিন্তু পথভ্রষ্ট গন্ধর্বের মতো দিব্যোন্মাদ তরুণ রাজি হয়নি! সাত্যকি চলে যাওয়ার পর এই চার বছর একলাই থাকে অনিন্দিতা। বাবা-মা দুজনেই গত হয়েছেন। সেই অর্থে পিছুটান নাই কোনও। স্বাভাবিক নিয়মেই অনেক তরুণ তাকে বহুবার প্রেম নিবেদনও করেছে, কিন্তু কিছুতেই এই একাকী স্মৃতি-আখ্যান থেকে অনিন্দিতা সরে আসতে পারেনি। ইদানীং অসুবিধাও হয় না তেমন। নিঃসঙ্গ কর্মময় জীবনের মধুর সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে রেখেছে। অনেকদিন পর আজ মন ঈষৎ উতলা, জানলার কাছে এসে পর্দা সরিয়ে মেঘসজ্জায় আকুল হেমন্ত আকাশের উপর চোখ বন্ধ করে সাত্যকির দিকে চেয়ে নিঃশব্দে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমাকে তুমি ভুলে গেছ, তাই না?’

আজ অনেকদিন পর কী মনে হওয়ায় মোবাইল থেকে খুঁজে সাত্যকির সেতারে স্পর্শ করা মেঘ রাগটি চালাল। মুহূর্তে সুললিত সুরে বেজে উঠল ‘বোস’ স্পিকার। সাত্যকির জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল। দাম সাধ্যের বাইরে, কিন্তু কাউকে না জানিয়ে ক্রেডিট কার্ডে কিনেছিল। ছোট্ট যন্ত্রটি সত্যিই ভারি মিঠে। অশরীরী কণ্ঠের মতো বেজে চলেছে সুরনদীর ছলাৎছল শব্দ। ওই যে বজ্রধ্বনি, তারপর সহস্র ধারায় অস্ফুট অভিমানের মতো নেমে আসছে জলরেণু। চঞ্চলা প্রজাপতির দল পাখা মেলল। কিশোরী আষাঢ় এই ভরা হেমন্তে নূপুরে সুর তুলে নাচছে। উপলসজ্জা বেয়ে কোন্‌ সুদূরে সোহাগি আহ্লাদে চোখ মেলে চাইল একাকিনী পাহাড়ি ঝোরা। দুপাশে অজস্র জলকুসুম, নির্জন কুয়াশাবৃত পাকদণ্ডী স্মৃতিপটচিত্রের মতো জেগে রয়েছে… এই ঘরে বসেই আকুল অশ্রু টলোমলো শ্রাবণ সন্ধ্যায় সাত্যকি শুনিয়েছিল অপরূপ মেঘ রাগ। সেদিনও সন্ধ্যাদেবীর কণ্ঠে বিদ্যুৎহার আর অঙ্গে বৃষ্টির মেখলা। সবক’টি আলো নিভিয়ে একটিমাত্র মোমবাতি জ্বেলে দিয়েছিল অনিন্দিতা। ওই যে শ্বেতপাথরের মেঝের উপর জাজিম বিছিয়ে বসেছে সাত্যকি। শুভ্র বসন, উর্দ্ধাঙ্গ অনাবৃত, যুঁই ফুলের মতো এলোমেলো চুলে স্বয়ং বর্ষাঋতু যেন নিজের ডানহাতটি রেখেছে। ধ্যানস্থ ভাবগম্ভীর দীর্ঘকায় সেই সুপুরুষকে দেখে ক্ষণিকের জন্য অজানা কোন্‌ শঙ্কায় শিহরিত হয়েছিল অনিন্দিতা! এই সুরগন্ধর্বকে নারী, সংসার কেউ কখনও বেঁধে রাখতে পারে না। সাশ্রুনয়নে মুগ্ধা নারী শুধু চেয়েছিল তার চিরকালের পুরুষটির পানে… আজও তেমনই মেঘ। যদিও সন্ধ্যা আসেনি। বিছানার উপর প্রস্তর মূর্তিবৎ বসে রইল অনিন্দিতা। সিক্ত আলুলায়িত দীর্ঘ কেশরাজি তীরভাঙা নদী হয়ে পিঠের উপর বয়ে গেছে। প্রসাধনহীন নির্ভার কোমল মুখমণ্ডল যেন সাত্যকির সুবাসে বিভোর। কোথাও যায়নি সে, এখানেই রয়েছে। এই তো মেঘ রাগ সাত্যকির সেতারে নেমে এসেছে… হঠাৎ গান থামিয়ে মোবাইলটি তীক্ষ্ণস্বরে বেজে উঠল। স্পিকারে সেই শব্দ চতুর্গুণ তীব্র আকার ধারণ করে তীব্র পরিহাসের স্বরে যেন বলছে, নাই, নাই, তোমার সাত্যকি বহুকাল পূর্বে হারিয়ে গেছে!

রাজারহাট থেকে শহরের সীমা পার হয়ে দিল্লি রোডে উঠতেই ভুবনডাঙা আঁধার হয়ে এল। দ্বিপ্রহরেই দিনমণি যেন অস্তাচলে গেছেন। অতিকায় কৃষ্ণসর্পের বাহুপাশে বন্দি আলো মৃত্যুপথযাত্রীর মতোই ক্ষীণকায়। কোন্‌ বিরহিনীর ইশারায় বাতাস অশান্ত সমুদ্র স্রোতের মাথায় ক্ষুদ্র ডিঙিনৌকো হয়ে নাচছে! বজ্রগম্ভীর মেঘ শূলপাণির ডম্বরুধ্বনি মনে করিয়ে দেয়। সাদা গাড়িটি নির্জন পথে কৃষ্ণচরাচরের মাঝে শ্বেতকায় অশ্বের মতোই ধাবমান। জানলার কাচ নামিয়ে মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকলেও অনিন্দিতার মনোজগত এখন অধিকার করে রেখেছে সুরধুনীর বুকে জেগে ওঠা সেই আশ্চর্য নদীচর। গম্ভীর মুখে স্টিয়ারিঙে হাত রেখে শ্যামল চিন্তিত স্বরে বলল, ‘দিদি, আজ না বেরলেই হত। খুব ঝড়-জল হবে মনে হচ্চে!’
সাদা শাড়িটি ভারি মানিয়েছে
আজ। চোখে শীর্ণ কাজলরেখা, আর সন্ধ্যা আলোর মতো ওষ্ঠরঞ্জনীর প্রসাধনে স্নিগ্ধ দীপের সুবাস বয়ে এনেছে। নিরাভরণ কণ্ঠ, শুধু কানে ঝিমঝিম হিরেফুল পরেছে। শ্যামলের কথা শুনে মৃদু হাসল অনিন্দিতা, ‘আপনি কি টেনশন করছেন নাকি? এমন কথা তো আপনার মুখে আগে কখনও শুনিনি!’

ক্রুদ্ধ বাতাসের তাড়নায় পথের দুধারে গাছপালা চঞ্চল হয়েছে উঠেছে। গম্ভীর আকাশের দিকে আড়চোখে চেয়ে শ্যামল বলল, ‘টেনসেন না, তবে ফেরার পতে রাতে বিষ্টি হলে হাইরোডে লরির ভিড়ে ছোটো গাড়ি চালানো খুব ঝামেলা।’ একমুহূর্ত কী যেন ভেবে জিজ্ঞাসা করল, ‘চন্নননগরে কোতা যাবেন? কারো বাড়ি?’
–আপনি রানিঘাট চেনেন?
–রানিঘাট? সে চিনি। তা ওকানেই যাবেন?
হাতঘড়িতে
একবার সময় দেখে অনিন্দিতা বলল, ‘না, ওখান থেকে নয় মাইল, মানে ধরুন প্রায় সাতাশ আটাশ কিলোমিটার দূরে গঙ্গার বুকে একটা বড়ো বালিচর আছে, ওখানেই যাব।’

লুকিং গ্লাসের মধ্য দিয়ে অনিন্দিতার মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত স্বরে শ্যামল জিজ্ঞাসা করল, ‘বালুর চর? এই মেঘ জল মাতায় নিয়া সেকেনে যাবেন? যাওনের পত চেনেন আপনে?’

প্রায় মাটির কাছে মেঘভারে নেমে আসা আকাশ পানে চেয়ে আনমনা স্বরে অনিন্দিতা উত্তর দিল, ‘যাইনি কখনও তবে একজনের মুখে এতবার গল্প শুনেছি যে মনে হয় রাস্তা চিনতে পারব!’

আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে যা হোক, রাণীর কাছে গেলেই ভালো হত! মানুষের পয়সা থাকলে কতরকমের ভূত যে মাথায় চাপে! দ্রুত হাতে গিয়ার বদলে গাড়ির গতি বাড়িয়ে শ্যামল বলল, ‘একন সাড়ে তিনটা, যেতে যেতেই আঁধার হয়ি যাবে। বালুর চরে এই বিষ্টি বাদলায় নৌকো করে যাওন ঠিক হবেনি দিদি। আজকার দিনটা ছাড়ে দিন, রোদ দেকা আপনেরে আবার একদিন নিয়া আসবনে।’  

চুড়ো করে বাঁধা খোঁপা থেকে হাড়ের কাঠি খুলে নিতেই কুয়াশাচ্ছন্ন জলপ্রপাতের মতো কেশরাজি পাহাড়ের শীর্ষদেশ হতে যেন সবেগে পিঠের সমতলে নেমে এল, আলতো স্পর্শে তাদের মুখের পাশে সরিয়ে দৃঢ় অচঞ্চল কণ্ঠে অনিন্দিতা বলল, ‘না, আমাকে আজই যেতে হবে শ্যামলদা।’

কথার মাঝেই রিণিঠিণি শব্দে শ্যামলের মোবাইল বেজে উঠল, ডানহাতে স্টিয়ারিঙ ধরে বামহাতে পকেট থেকে ফোন বের করে রাণীর নাম দেখে আবার পকেটেই রেখে দিল শ্যামল, এক মুহূর্ত পর আবার বেজে উঠল ফোন, এবারও পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে না পেয়ে রাণী তৃতীয়বার ফোন করল, নির্বিকার মুখে গাড়ি চালাচ্ছে শ্যামল, অনিন্দিতা সামান্য অবাক কন্ঠেই বলল, ‘রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফোনে কথা বলে নিন।’

–ও কিচু না দিদি!

–তা কেন হবে, বারবার ফোন আসছে, নিশ্চয় কোনও দরকার। আপনি গাড়ি দাঁড় করিয়ে আগে কথা বলে নিন।

ফোন না-ধরার কথা এলেই চারবছর আগের দিনটির কথা মনে পড়ে অনিন্দিতার, সেদিন সাত্যকি সাতবার ফোন করেছিল কিন্তু আপিসের মিটিঙয়ে থাকায় ধরতে পারেনি, যদি একবার কথা বলত…পথের ধারে কী একটা বুনো ফুলের ঝোপের কাছে গাড়ি দাঁড় করাল শ্যামল।

 

ইঞ্জিন বন্ধ করে ফোন ধরতেই ওপার থেকে রাণীর গলা ভেসে এল, ‘আমার ফোন তুলারও টেইম নাই তুমার!’

আড়চোখে লুকিং গ্লাসে অনিন্দিতার দিকে একবার চাইল শ্যামল, শান্ত স্বরে বলল, ‘গাড়ি চালাচ্চি, তাই তুলচিলাম না।’

–গাড়ি চালাচ্চিলা তো রাস্তার আওয়াজ নাই ক্যানে কুনও? কোতায় আচো বলো তো?

শ্যামলের সস্তার ফোনে ওদিকে বলা প্রতিটি কথাই প্রায় শোনা যায়, সম্ভবত স্পিকারে না বাজলে পুরাতন মোবাইলে কথা শোনা যায় না! অপরিচিতা বামাকণ্ঠের প্রতিটি শব্দ শুনেও নির্বিকার মুখে বুনো ফুলের ঝোপের দিকে চেয়ে রইল অনিন্দিতা, সে শুনেছে বুঝতে পারলে শ্যামল’দার ভারি অস্বস্তি হবে।

চাপা গলায় শ্যামল বলল, ‘আচি, কলকাতার বাইরে আচি, ফিরে সব বলচি তুমাকে।’

–তবে যে বললে আজ কুন অপিসে নাইট আচে! বউয়ের পারা আমাকেও মিত্যে কতা বলতে শুরু করচো, সেই মাগীটারে নিয়ে যেচ কোতাও?

আরও একবার লুকিং গ্লাসে অনিন্দিতাকে দেখল শ্যামল, ছি ছি ম্যাডাম শুনলে কী যে ভাববে, মাথা নিচু করে বলল, ‘শুনো আমি ফোন রাকচি, পরে বুঝায় বলব সব!’, কথাক’টি বলেই ফোন বন্ধ করে জামার পকেটে রেখে গাড়ি চালু করল শ্যামল।

 

অল্প সময় পরেই নিজের মায়া আঁচলে জগত আবৃত করে মন্থর পায়ে কোন্‌ সুদূর উর্দ্ধলোক হতে নেমে এলেন বৃষ্টি, কিশোরীর প্রিয় অলঙ্কার সম তাঁর রূপে মুহূর্তে বিভোর হল ভুবনডাঙা, আকাশ ও ভূমির বিচ্ছেদরেখা মুছে গেল নিমেষে, চারপাশ শ্বেতবসনা দূরবর্তিনী প্রেয়সীর মতোই অস্পষ্ট, বাতাস বড়ো অশান্ত এখন, যেন কোনও অন্ধ কারাগার হতে বহুযুগ পর সে মুক্তিলাভ করেছে-এই রূপমায়া অগ্রাহ্য করেই অনিন্দিতা শ্যামলের পানে চেয়ে শান্ত স্বরে বলল, ‘শ্যামলদা আমাকে নিয়ে যেতে আপনার অসুবিধা হলে চন্দননগরে নামিয়ে আপনি ফিরে যান।’

–না না দিদি, অসুবিদা ক্যানো হবে! আর আপনেরে মাজপথে নামায়ে গেচি কখনও!

কয়েক মুহূর্ত পর অনিন্দিতা ফোনে রাণীর কথা শুনেছে বুঝতে পেরে শ্যামল ক্ষমা প্রার্থনার সুরে বলল, ‘এর মাতা পুরাই নষ্ট, বোজলেন কিনা! মুকে আগল নাই-যা খুসি বলে, উর কতায় আপনে কিচু মনে করেন না দিদি।’

অনিন্দিতা কথার উত্তর না দিয়ে অবিরল জলধারায় আচ্ছন্ন জানলার কাচের ওপারে আবছা দৃশ্যমান পৃথিবীর পানে তাকিয়ে রইল, সামনে পথঘাট কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না, ওয়াইপার এবং ফগ লাইট চালু করে গাড়ির গতি কমিয়ে শ্যামল পুনরায় বলল, ‘দিদি, কিচু মনে করেন না, আমি উয়ার হয়ি ক্ষমা চায়ে নিচ্চি।’

কোনও কথা বলবে না স্থির করেও শ্যামলের আন্তরিক স্বর অনিন্দিতাকে চুপ করে থাকতে দিল না, এক মুহূর্ত পর ধীর স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইনি আপনার স্ত্রী তো নন?’

সামনে সোজা তাকিয়ে শ্যামল সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, ‘না।’

কয়েক মুহূর্ত পর শ্যামল পুনরায় বলল, ‘কখন কারে ভালোবাসা, সব কি হিসাব করি হয় দিদি! হয় না।’

মৃদু হাসি অনিন্দিতার মুখে ক্ষণিকের জন্য ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল, ‘স্ত্রী’কে ভালোবাসেন না?’

–সে অনেক কতা দিদি, সব তো আর কওন যায় না।

 

অশান্ত বাতাস আর বিদ্যুত চমকের মাঝে নির্জন জনশূন্য পথে গাড়িটি নিঃসঙ্গ মানুষের মতোই ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে, সমগ্র জগত জলে ভেজানো কোনও পটচিত্র-গাছপালার সবুজ আর কৃষ্ণবর্ণ মেঘ সোহাগে পরস্পরের শরীরে যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, সেই অলীক চিত্রের পানে চেয়ে অনিন্দিতার মনে হল, সত্যিই তো, মানুষ কেন ভালোবাসে তা কি বলা যায়! চারবছরে সাত্যকি কেন তার কাছে অধিক স্পষ্ট হয়ে উঠল-সে-কথাও তো কাউকে কখনও বোঝানো যাবে না! দারিদ্রহীন স্বচ্ছল জীবনে প্রেমসুধার মাঝে সাত্যকিরই বা সেদিন কী মনে হয়েছিল তাও অজানাই রয়ে গেল! সত্যি, সব কথা যুক্তি সাজানো বাক্যে প্রকাশ অসম্ভব।

 

হঠাৎ কী মনে হওয়ায় অনিন্দিতা শ্যামলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার ভালোবাসার মানুষের কী নাম?’

দু-এক মুহূর্ত পর দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে শ্যামল উত্তর দিল, ‘রাণী!’ 

 

রাণীঘাটে পৌঁছানোর পূর্বেই বৃষ্টির বেগ স্তিমিত হয়ে এল, মিশিমাখা আকাশে এখন সন্ধ্যালগ্ন যদিও চিরাচরিত হেমন্তের বিধুর ম্লান সায়াহ্ন আজ কোন্‌ গোপন অন্তঃপুরে আত্মগোপন করেছে, ঘাট জনহীন, অশ্বারোহী বাতাসের দাপটে টলোমলো সুরধুনী যেন আশুতোষের ধূম্রবর্ণ জটাভার-দেখে মনে হয় ভগীরথের আহ্বানে তিনি সদ্য ধরাধামে অবতীর্ণা, তিরতির বৃষ্টির মাঝেই গাড়ির দরজা খুলে রাণীঘাটের পৈঠায় এসে দাঁড়াল অনিন্দিতা, সর্বাঙ্গে কুসুম রেণুর মতো জলকণা, এলোমেলো বাতাসে দীর্ঘ কেশরাজি উন্মনা, কোন্‌ সুদূর পানে চেয়ে রয়েছে অনিন্দিতা, পশ্চিমাকাশ মেঘ-শৈলশিরার শীর্ষে ক্ষণপ্রভার অপরূপ সৌন্দর্যে বিহ্বল, অনিন্দিতার সহসা মনে হল নয় মাইল দূরের বালুচরের দিকে সে মিথ্যাই চলেছে, সাত্যকি তাকে বহুবার বলেছিল সেই একাকী বালুচরের কথা, নদীগর্ভে ধূ ধূ বালির মাঝে বসে এমন মেঘমন্দ্রিত দিনে সেতারে মেঘ রাগের আহ্বান সার্থক হলেই নাকি ব্যাকুল চরাচরে সুদূর গান্ধর্বীর অশ্রু হয়ে সহস্র ধারায় নেমে আসবে বৃষ্টি…এ-কথা সাত্যকি বহুবার বলেছিল কিন্তু আজ সে সঙ্গে নাই, তাহলে ওই স্মৃতিচরে একাকিনী অনিন্দিতা কী ই বা করবে!

 

‘দিদি, সন্দে লাগচি, চরে যাবেন না?’, শ্যামলের কথায় অনিন্দিতার সংবিত ফিরে এল, বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যার মতো মলিন হেসে আলতো স্বরে বলল, ‘নাহ! আজ আর যেতে ইচ্ছে করছে না! চলুন ফিরেই যাই।’

বিস্মিত কণ্ঠে শ্যামল জিজ্ঞাসা করল, ‘এত দূর আসি যাবেন না?’

ঈষৎ সিক্ত চঞ্চলা কেশরাজি আলগোছে একটি খোঁপায় স্থির করে অনিন্দিতা মৃদু গলায় বলল, ‘পরে আসব একদিন! একটা চা-দোকানে বরং নিয়ে চলুন।’

 

কৃষ্ণ নিশীথে ফেরার পথ মেঘাচ্ছন্ন, বৃষ্টি যদিও সংবরণ করেছে তার গতিপথ, মাঝে মাঝে সৌদামিনীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে জগত, খোলা জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে রয়েছে অনিন্দিতা-নদী স্রোতের মতো বাতাসে ভেসে আসছে জলের সুবাস, গাছপালা নিদ্রিত ক্ষুদ্র পল্লী প্রান্তর দীঘি বিল ছায়াচ্ছন্ন জনপদ পার হয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি, কোথাও অল্প কোলাহল পূর্ণ ছোট বাস গুমটি, চা-দোকান, ভাতের হোটেল তারপরেই আবার কৃষ্ণসমুদ্রের মতো জগত, বৃষ্টি শেষ হওয়ায় গাড়ির হেডলাইটের সামনে উড়ছে একদল বাদুলে পোকা, ঝোপঝাড়ের মাথায় জোনাক জ্বলা ঝিমঝিম আলো, দু-একটি ট্রাক দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে দূর কোন্‌ শহরের দিকে, আজ শুক্লপক্ষের দ্বাদশী তিথি, সেদিনও এমনই অঘ্রানের শুক্লা দ্বাদশী ছিল…বাতাসে ভাসমান জলকণার ইশারার মতো অনিন্দিতার মনে পড়ল, সাত্যকির মুখে শোনা রাণীঘাট থেকে সেই আশ্চর্য নয় মাইল পথের কথা, হেমন্তের শুক্লপক্ষে ওই পথ নাকি খই ফোটা আলো আর কুয়াশাবৃতা হেমন্তিকার অঞ্চলছায়ায় জেগে ওঠে-দিকবসনা জ্যোৎস্নাদেবীর মধুর হাস্যে সুরনদীর জলোচ্ছাসে ভেসে যায় চরাচর, পথের শেষে শুভ্র কুন্দকুসুমের মতো সেই বালুচর, দুপাশে সুরধুনী পরম যত্নে তাকে আগলে রেখেছে, সেখানে বসেই দিব্যোন্মাদ যুবক সাত্যকি বাজাতে চেয়েছিল তার প্রিয় মেঘ রাগ…সহসা অঝোর অশ্রু ধারায় ভেসে গেল অনিন্দিতার আঁখিপদ্ম, কেন তাহলে চলে গেল সাত্যকি? অনিন্দিতা তো তার দুটি হাত ধরেই নয় মাইল জ্যোৎস্না পার হয়ে বালুচরে যেতে চেয়েছিল, সাত্যকির কাছে সেই ইচ্ছার কি তবে কোনও মূল্যই ছিল না?

 

প্রশ্নগুলি অকাল বর্ষা বাতাসে ভেসে কোন্‌ দূর প্রান্তরে বয়ে গেল, নশ্বর মানুষের প্রশ্ন কবেই বা দেহশূন্য ভাবজগতে পৌঁছাতে পেরেছে?

 

মোবাইল ফোনটি ব্যাগ থেকে বের করে পুরাতন একটি ছবি দেখল অনিন্দিতা, সাদা কুর্তা-চুড়িদার পরা উজ্জ্বল সাত্যকি-কলামন্দিরে অনুষ্ঠানে ছবিটি অনিন্দিতাই তুলেছিল, হৃদয়হীন যন্ত্র ছবির নিচে লাল রঙে লিখে রেখেছে, টু ডে বার্থডে!

 

আজ ছাব্বিশে নভেম্বর, এগারোই অঘ্রান, ঠিক চার বছর আগে আজই রাজারহাট ফ্ল্যাটে ভর দুপুরে অনেকগুলি ঘুমের ওষুধ খেয়ে…অনিন্দিতা আপনমনে সাত্যকিকেই আজ যেন জিজ্ঞাসা করল, ‘সেদিন দুপুরে আমি ফোন ধরতে পারিনি কিন্তু সাত্যকি তুমি অন্তত জানতে, তোমার প্রিয় নতুন একটি সেতার নিয়ে বিকেলে তোমার কাছেই ফিরব! এত তাড়া ছিল তোমার? একবার বলে যেতে পারলে না?’

 

আঁচলে চোখ মুছে মৃদু হাসল অনিন্দিতা, ফোন সুইচ অফ করে মেঘাবৃত নিশীথে চঞ্চলা বাতাসের মাঝে জানলা দিয়ে রাত্রিদেবীর কৃষ্ণকেশাচ্ছন্ন আকাশ পানে চেয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, ‘ফিরে যাও, ওগো শাপভ্রষ্ট গন্ধর্ব তুমি তো কখনও আমার ছিলে না, তোমাদের মতো সুরদেবতাকে বেঁধে রাখব সে সাধ্যও আমার নাই, ফিরে যাও নিজগৃহে, আর যেন কখনও আমাদের মতো নশ্বর মানুষের কাছে ফিরে এসো না। আর কখনও তোমাকে স্মরণ করে কষ্ট দেব না, নয় মাইল অলীক জ্যোৎস্না শুধু তোমারই থাক, আজীবন।’

 

               চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

https://three.pb.1wp.in/magazine/magazine-novel-harer-banshi-part-thirty-four-by-sayantan-thakur/

 

You might also like