Latest News

আজ স্নানের দিন

 অদিতি বসুরায়

তৃতীয় পর্ব
খাবার টেবিলে গিয়ে দেখে, লুচি। আহা লুচি! সঙ্গে আলুর তরকারি। সাদা আলুর সঙ্গে কালো জিরে – কাঁচালঙ্কা দেওয়া তরকারি, তার খুব প্রিয়। মাও খাচ্ছে পাশে বসে। মা আবার লঙ্কা কামড়ে খায়। এতো ঝাল যে কি করে খায় মেয়েরা? মা টক খেতে পছন্দ করে।  তিথি টক-ঝাল দুটোই খেতে বড্ড ভালবাসতো
–     ও রণো, আর দুটো লুচি নিবি তো?
–     এখন এতো লুচি খেলে দুপুরে ভাত খেতে পারবো না, মা !
–      সে খাসনা, না হয়।কত ভাত খাও তুমি, আমার জানা আছে। এখন পেট ভরে খেয়ে নে তো! দুপুরের কথা দুপুরে ভাবা যাবে!
আদর বেশি দেওয়ার সময় মা, তাদের দু’ভাইকেই, তুই আর তুমি একসঙ্গে বলে।
–     তুমিও  তাহলে একেবারে খেয়ে নাও, নাকি?
–     আমি একটু ভাত খাব, বাবা । বড্ড অম্বল হয় আজকাল। এতো ভাজাভুজি সহ্য হয় না। আজ অনেকদিন পরে তোর জন্যে লুচি খাচ্ছি।
–       উফ, কেন খাচ্ছ? শরীর খারাপের ওপরে কিছু হয়না  । ভাত সকালে হয়েছিল তো! ভাত খেলে না কেন?
–       তোর সঙ্গে খাবো বলে খাচ্ছি। তুই একা খাবি টেবিলে? ওরা তো বেড়িয়েও গেছে।
এই হল, তার মা। কিছু বলার জায়গা ছাড়ে না। গোটা তিনেক লুচি খেয়ে উঠে পড়ল সে।  মাও আর কিছু বললো না।
মেঘ করে এসেছে আবার। মনে হচ্ছে, বাড়ির বাইরে যাওয়া  যাবে না। সে নিজের ঘরে চলে এল। সঙ্গে সঙ্গে, মা ঘরে ঢুকে এল আবার।
–       রণো, তুই আর কষ্ট পাস না, বাবাই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। জীবন দুঃখ-কষ্টের থেকে অনেক বড়। নানা দুঃখ পেরিয়ে পেরিয়েই যেতে হয় সবাইকেই। অতিক্রম করতে হয়, রণো। দুঃখ নিয়ে বসে থাকলে, দুঃখও তোকে নিয়ে বসে থাকবে, বাবা। যত অন্ধকারই থাকুক, রাত যেমন ভোর হয়, তেমনই  আমাদের কষ্টের পর আনন্দ আসে। আসেই। আমার জীবনটাই দেখ!
–       মা চলো, আমরা কোথাও ঘুরে আসি। বেড়িয়ে আসি। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয় নি আমাদের।
–       যাবি? দাঁড়া। তোর বাবাই ফিরুক। কথা বলছি। কোথায় যেতে চাস ?
–       পাহাড়ি গ্রামে চল। হোম স্টে-তে থাকব। কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালানো হবে – গান হবে – দেশী মুরগির রোস্ট হবে।
–       তাই হবে। তাই হবে- বাবাই আজ বাড়ি ফিরলে বেড়ানোর ব্যাপারটা পাকা করে নেবো।
–       মা, মুড়ির মোয়া বানাবে একদিন?
–       খাবি? বানাবো তো। তোর তো খাওয়া-দাওয়ার কথা মনেই থাকে না।
–       নিজের জন্যে তো কুলের আচার, তেঁতুলের আচার, আমতেল দিব্যি বানাও
–       তুই এসবও নজর  করিস বুঝি?
দুলে দুলে খুব হাসতে লাগল মা। মালতি ছুটে এল।
–       মায়ে-পোয়ে মিলে এতো হাসি? কি ব্যাপার?
সে এবার।  উঠে গেল টেবিল ছেড়ে। মাথা যন্ত্রণা বাড়ছে।

ইরাবতী মিত্র 

কতদিন পরে বেড়াতে যাওয়ার কথা হচ্ছে। কেবল আমরা চারজন। সোয়েটার, টুপি, চাদর প্যাক করতে হবে – ভেবেই খুব আনন্দ হচ্ছিল। রণোর সঙ্গে শমীও হইচই করে নানা প্ল্যান করতে থাকল। আমি এতোটা খুলতে পারিনা নিজেকে। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হল – অনেকদিন পরে রণো নিজে থেকে একটা পরিকল্পনা করতে চেয়েছে! কোন একটা ইচ্ছের কথা জানিয়েছে। পাহাড়ের কথা উঠলে আগে রণো আঁতকে উঠতো! তিথির ব্যাপারটা ঘটার পর থেকেই কোনও কথায় পাহাড়ের সামান্য উল্লেখও সহ্য করতে পারতো না ছেলেটা! আর আজ নিজে থেকেই যেতে চাইছে! আবার কি সব আগের মতো হবে তাহলে?আমি কখনও চাই নি আমার সন্তান, আমার মতো হোক। ওরা অন্যরকম হলে, বেশ ইন্টারেস্টিং হতো ব্যাপারটা। কিন্তু ওরা আমার মতোও যেমন, অন্য ধাতেরও তেমন। এই ব্যাপারটা আগে বুঝতাম না। সন্তান তো কেবল মায়ের একার নয়। বাবা ও মা– দুজনের। আমার বরাবর মনে হয়, বাবা-মা সন্তানের জন্মের কারণ কিন্তু তাদের নিয়ন্তা নয়। বড়জন রণো। সে খুব চাপা। অমিশুক। একা থাকতে ভালবাসে। রণো আর আমি একসঙ্গে অনেক ঢেউ কাটিয়েছি। ও বড্ড একরোখা। ও একটা আলাদা জগতের স্বপ্ন দেখে। এক ধর্মহীন জগতের স্বপ্ন। তাই কখনো সম্ভব? ধর্মের হাত থেকে কে, কবে পরিত্রাণ পেয়েছে? ধর্মের চাকার ওপরেই তো পৃথিবী ঘুরছে।

রণো বুঝবে না। ও মনে করে, ধর্ম ব্যাপারটাই অসাড়। ম্যান-মেড। সারা বিশ্বে মারামারি-কাটাকাটি সব এই জন্যে। ও নাকি ধর্মহীন দুনিয়া গড়বে! তাই কি হয়?  বাস্তবের সঙ্গে তাই তার ঘোর দ্বন্ধ। এ তো হওয়ারই কথা ছিল। ওকে রাজ অনেক বোঝায়। আমি কিছু বলতে পারি না। কারণ, আমার মনে হয়, ও যা ভাবছে একদম ঠিক ভাবছে। কী করে ওকে মিথ্যে বলি?  রণো আমার আনন্দের সন্তান। একুশ বছর বয়েসে, ওর জন্য আমার চতুর্থ স্বর্গে উত্তরণ। রণো, আমার ‘শ্যামরাই’,  শান্ত এবং রাগী। ওর রাগ তবু বোঝা যায়, ভালবাসা বোঝা দুষ্কর। আগেই বলেছি,  ও  ছেলে সহজে মিশতে পারে না কারো সঙ্গে। সারাক্ষণ ওর জন্য ভাবনা হয় আমার।  ও অনেকটাই ওর বাবার মতো। ফারহান, রণোর মতো দেখতে ছিল। যাহ্‌ ! উল্টো বললাম মনে হয়। মানে বলা উচিত,  রণোকে অনেকটাই ফারহানের মতো দেখতে। স্বভাবেও। কিন্তু আমাদের দুজনের বাইরে আরো কিছু আছে, ওর মধ্যে। তার নাগাল পাওয়া কঠিন। আন্দাজ পাওয়া সোজা। আর সেই আন্দাজ মেলেনা সচরাচর।  ছোট ছেলে, শমী। সে অনেক স্মার্ট। হুল্লোড়বাজ। শমী বাড়ি না থাকলে, বাড়িটা যেন ঝিমিয়ে থাকে। এ বাড়ির প্রাণভোমরা শমী।আমাদের পাড়ায় প্রচুর গাছপালা। প্রপার শহর থেকে একটু ভেতরে। শোরগোল তেমন নেই। বেশ চুপচাপ কাটে সারাদিন। আমার এমনই ভাল লাগে। একটু উদাস, আলসেমির পাড়া। অনেক দিন পর্যন্ত জীবনে,  বড় লম্বা দৌড় গেছে। গেছে কী করে বলি? চলছে তো এখনও। আমি যে এক রেসের ঘোড়া। দৌড় বন্ধ হলে, একেবারে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। মাঝে মাঝে পুরোনো পাড়ার গৌরদাস মণ্ডলের কথা মনে পড়ে, নিজের কথা ভাবতে বসলেই।
আমাদের সে পাড়ার মোড়ে, গৌরকে তার মা হাত ধরে এনে বসিয়ে দিয়ে যেত। খুব ছোটবেলায় পোলিও খাওয়াতে নিয়ে  যাওয়া হয়েছিল তাকে। কি সব গোলমাল ছিল তাতে। সেদিন রাতেই জ্বর আসে তার।  ধীরে ধীরে ডান পা শুকিয়ে যায়। হাঁটতে পারতো না  আর।  একটু বড় হতে,  তার মা হাত  ধরে বসিয়ে রেখে যেত, বড় রাস্তার ধারে। ভারি সুরেলা গলা ছিল ছেলেটার। গান গাইতো বসে। কারো কাছে কিছু চাইতো না। তবু অনেকেই সাহায্য করতো সুদর্শন, বিনয়ী গৌরকে। কারো প্রতি কোন অভিযোগ ছিল না তার। আমি যাতায়াতের পথে, গল্প করেছি কতবার ওর সঙ্গে। গান শুনেছি। কীর্তন গাইতো সে প্রাণ দিয়ে। ওই শান্ত মানুষটার কাছে শিখেছি, এই হিংসার জগতকে চাইলে তফাতে রাখা যায়। চাই শুধু  নিষ্টা আর বিশ্বাস। আমি কোথায় পাবো সে সব? বারবার জিজ্ঞেস করেছি তাই ওকেই।
–       এই যে ডাক্তারের ভুলে তোমার পা দুটো শেষ হয়ে গেল, তাই নিয়ে তোমার রাগ হয় না গৌর ?
–       না দিদি। কার ওপর রাগ করবো? পরমেশ্বর যা চান, তার বাইরে কি আমরা যেতে পারি, বলেন? নিয়তি।
–       তবু?
–       ওরকম ভাবে ভাবলে দিদি, রাগ আর বিদ্বেষে মন বিষ হয়ে যায়। সে বড় কষ্ট। ওসব আমি মনে লই না, গো।
–       পারো কি করে গৌর?
–       আমার ভার, তো আমার ওপর নেই দিদিভাই। সব তাঁর কাছে সঁপে দিয়েছি। তুমিও তাই দিও। দেখবে, তিনিও ভেবে নেবেন তোমার কথা।  তোমার-আমার আবার ভাবনা কি বলো? আমাদের কথা, তিনিই ভাববেন। সাধে কি আর তাঁকে জগদীশ্বর বলে ডাকি ?

আজ স্নানের দিন

You might also like