Latest News

উন্মত্ত জনতার খুনে আক্রমণ রুখে দিয়েছিলেন এই মানুষটি, মুম্বইয়ের রাস্তায় একা নেমে

সামনের রাস্তা দিয়ে তির বেগে ছুটে আসছিল একটা প্রাইভেট গাড়ি। কিন্তু রাস্তাটাকে ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলেছিল কয়েকশো লোক। প্রাইভেট গাড়িটির পিছনে তাড়া করে আসছিল উন্মত্ত জনতা। অনেকের হাতে ছিল ছুরি ও তরবারি।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ। মুম্বইয়ে ধারাবাহিক ভাবে ঘটানো হয়েছিল ১২টি শক্তিশালী বিস্ফোরণ। নিহত হয়েছিলেন ২৫৭ জন নিরীহ মানুষ। গোটা মুম্বই জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছিল ভয়াবহ দাঙ্গা। যে দাঙ্গা মুম্বাই শহরকে ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল।মুম্বইয়ের মাটিতে গড়ে উঠেছিল আলাদা আলাদা সম্প্রদায়ের আলাদা আলাদা বসতি।

বিস্ফোরণের কয়েকদিন পর

বান্দ্রা-ওরলি সি লিঙ্কের পাশে আছে এক হাউসিং কমপ্লেক্স। নাম ‘স্পোর্টস ফিল্ড’। ন’তলা বাড়িটিতে থাকেন বারো জন টেস্ট ক্রিকেটার। তাঁদের মধ্যে ছ’জন ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। ক্রিকেটারটারা ছাড়াও বহুতলটিতে থাকেন বিলিয়ার্ডসের বিশ্ব চাম্পিয়ন, ভারতীয় হকি দলের অধিনায়ক, আন্তর্জাতিক টেনিস ও ব্যাডমিন্টন প্লেয়ারেরা।

বছর ছয়েক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছিলেন আপাদমস্তক শৃঙ্খলালাপরায়ণ মানুষটি। তবুও বহু দশকের অভ্যেসে, কাছের মাঠে সকালে ঘাম ঝরাতে গিয়েছিলেন। সবে ঘরে ঢুকে লেবুর সরবতে চুমুক দিয়েছিলেন। সহসা কানে এসেছিল উন্মত্ত জনতার চিৎকার। ক্রিকেটের মাঠে উল্লাসধ্বনি প্রচুর শুনেছেন মানুষটি। কিন্তু এ উল্লাস অন্য ধরণের উল্লাস। রক্তের স্বাদ পাওয়া একগুচ্ছ হায়নার জান্তব চিৎকার যেন।

গাওস্করদের আবাসন ‘স্পোর্টস ফিল্ড’, সামনে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন ক্রিকেটার অজিত ওয়াদেকর ও বেঙ্গসরকার।

স্লাইডিং জানলার পাল্লা সরিয়েছিলেন গাওস্কর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে অভিষেক সিরিজে ৭৭৪ রান আর ৪টি সেঞ্চুরি করা গাওস্কর। ৩৪ টেস্ট সেঞ্চুরি আর ইনিংস প্রতি পঞ্চাশের বেশি রান করা গাওস্কর। টেস্টে প্রথম ১০০০০ রানের এভারেস্ট ওঠা গাওস্কর। টেকনিক, পারফেকশন, মানসিক দৃঢ়তায় বিশ্ব-ক্রিকেটের প্রবাদপুরুষ হয়ে ওঠা সুনীল মনোহর গাওস্কর।

জানলা দিয়ে গাওস্কর দেখেছিলেন, সামনের রাস্তা দিয়ে তির বেগে ছুটে আসছিল একটা প্রাইভেট গাড়ি। কিন্তু রাস্তাটাকে ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলেছিল কয়েকশো লোক। প্রাইভেট গাড়িটির পিছনে তাড়া করে আসছিল উন্মত্ত জনতা। অনেকের হাতে ছিল ছুরি ও তরবারি। গাড়িটিকে লক্ষ্য করে চলছিল ইঁট আর পাথর বৃষ্টি। গাড়িটিকে গাওস্করদের ফ্ল্যাটের সামনে থামতে বাধ্য করেছিল রক্তপিপাসু জনতা। আশেপাশের বহুতলগুলির জানলা দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল আসন্ন নারকীয় ঘটনাটির আশঙ্কায়।

সুনীল মনোহর গাওস্কর

ইন্টারকমে সচেতন করে দেওয়া হয়েছিল গাওস্করদের কমপ্লেক্সের বাসিন্দাদের। গাড়িটির ওপর চলছিল অবিরাম ইঁট বৃষ্টি। চুরমার হয়ে যাচ্ছিল জানলার কাঁচ থেকে উইন্ড স্ক্রীন। হঠাৎ গাওস্করের নজর পড়েছিল গাড়ির ভেতর। গাড়িতে ছিলেন এক তরুণ দম্পতি ও তাঁদের সন্তান। দম্পতি কাঁদতে কাঁদতে হাতজোড় করে দাঙ্গাবাজদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন। তাঁদের ছোট শিশুটিও আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছিল। কিন্তু দাঙ্গাবাজদের উল্লাসে তিনজনের কান্নার আওয়াজ চাপা পড়ে যাচ্ছিল। ভিড় ক্রমশ বাড়ছিল গাড়িটি ঘিরে। ফোন করে বিল্ডিংয়ে থাকা অনান্য ভারতীয় ক্রিকেটারদের সাহায্য চেয়েছিলেন বিচলিত গাওস্কর। উন্মত্ত জনতার মাথায় ঘুরছিল দুটি শব্দ, পেট্রল আর দেশলাই।

দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেছিলেন গাওস্কর

জীবনের মায়া না করে। কয়েকশো জনতা তখন পৈশাচিক ঘটনাটির অপেক্ষায় অধীর। ক্রুদ্ধ জনতার সামনে একা গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সদ্য মাঠ থেকে ফেরা গাওস্কর। তখনও বুঝি দেহের ঘাম শুকায়নি। সারা দেহের রক্ত উঠে এসেছিল তাঁর মুখে। তাঁর সারা শরীর কাঁপছিল থর থর করে। গাওস্করের সে রুদ্ররূপ বিশ্ব দেখেনি কোনওদিন। দাঙ্গাবাজরাও মারমুখী হয়ে উঠেছিল। নিশ্চিত শিকার হাত ছাড়া হতে দেবে না তারা।

প্রতীকী চিত্র

হায়নাদের চক্রব্যূহের ভেতরে থাকা গাড়িটির চারদিকে সিংহের মতোই ঘুরতে শুরু করেছিলেন সিংহহৃদয় মানুষটি। চিৎকার করে বলেছিলেন, “তোমরা যা করতে চাইছো। তা আমাকে দিয়ে শুরু করতে হবে। আমি জীবিত থাকতে তোমরা ওদের স্পর্শ করতে পারবে না। তোমরা কি মানুষ! হিম্মত থাকে তো আগে আমাকে মারো।” ক্রিকেটের মাঠে ভারতের বিজয় পতাকা ওড়ানো তারকার  রুদ্ররূপ দেখে, সেই প্রথম থমকে গেছিল রক্তের গন্ধ পাওয়া দাঙ্গাবাজেরা।

একা গাওস্করকে কয়েক হাজার মানুষের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে দেখে, কমপ্লেক্স থেকে, ক্রিকেট ব্যাট হাতে বেরিয়ে এসেছিলেন ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার, একনাথ সোলকার, যজুবেন্দ্র সিং। বেরিয়ে এসেছিলেন কমপ্লেক্সে থাকা অনান্য খেলোয়াড়রাও। কারও হাতে টেনিস র‍্যাকেট, কারও হাতে হকি স্টিক।

গাওস্করের জ্বলতে থাকা চোখে চোখ রাখতে না পেরে একসময় পিছু হঠেছিল জনতা। ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে গিয়েছিল ভিড়। গাওস্করের হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন দম্পতি। আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকা শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন গাওস্কর। বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করেছিলেন।

কবে প্রথম জেনেছিল পৃথিবী!

কমপ্লেক্স-এর বারান্দা থেকে ঘটনাটি দেখেছিলেন গাওস্করের পুত্র রোহন গাওস্কর। ২০১৬ সালে মুম্বাইয়ের স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোশিয়েসনের গোল্ডেন জুবিলি অনুষ্ঠানে, ঘটনাটি শ্রোতাদের সামনে বলেছিলেন রোহন গাওস্কর। ঘটনাটি বিশদভাবে দ্য উইক পত্রিকায় লিখেছিলেন জাতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার যজুবেন্দ্র সিং।

অনেকে বলেছিলেন, একা ক্রুদ্ধ জনতার মুখোমুখি হওয়াটা হঠকারিতা। কিন্তু মানুষের জন্য নিবেদিত হৃদয়ে বাঁধ কি কোনওদিন দেওয়া গেছে! যে হৃদয় মানুষের স্বার্থে সহসা তেজ ঝরাতেও জানে! ক্রিকেটারদের অধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন গাওস্কর। প্লেয়ার অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেছেন গাওস্কর। দুঃস্থ অবসর নেওয়া ক্রিকেটারদের পেনসনের ব্যবস্থা করেছেন গাওস্কর। বেনিফিট ম্যাচ খেলে টাকা তুলে দিয়েছেন গাওস্কর। মুম্বইয়ের প্রাক্তন টেস্ট ক্রিকেটারদের ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করেছেন গাওস্কর। কিন্তু তাঁর সেরা অবদানটি ছিল নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তিনটি প্রাণ বাঁচিয়ে দেওয়া। যা আমরা অনেকেই জানি না।

হেলমেট ছাড়া অ্যান্ডি রবার্টস, মাইকেল হোল্ডিং, জোয়েল গার্নার, ম্যালকম মার্শাল, ডেনিস লিলি, জেফ টমসনের খুনে বোলিং-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন যে অকুতোভয় মানুষটি, এই ঘটনাটির মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন প্রয়োজনে মাঠের বাইরেও খুনে মেজাজকে প্রতিহত করা যায়। দরকার শুধু অবিচল সংকল্প ও অটুট সাহস। আসলে সত্যিকারের চ্যাম্পিয়নরা জীবনের সব ময়দানেই চ্যাম্পিয়ন হন এবং ‘courage under fire’ কথাটা সম্ভবত তৈরি হয়েছিল গাওস্করদের মত বিরল মানুষদের জন্যেই।

You might also like