Latest News

দুর্গমাসুরকে বধ করেছিলেন বলে দেবী পার্বতীর উগ্ররূপের নাম ‘দুর্গা’

দেবকুলের সব দেবত্ব বিনাশ করে অসুরকুলের প্রভুত্ব কায়েম করার জন্য বেদের দখল নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভয়ঙ্কর অসুর দুর্গ।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

অসুররাজ হিরণাক্ষের বংশধর ছিলেন রুরু। তাঁর পুত্র ছিলেন দুর্গ। সমুদ্রমন্থনের সময় অসুরদের সঙ্গে দেবতাদের প্রতারণা এবং দেবী পার্বতীর হাতে পিতা রুরুর অপমৃত্যুর কারণে জন্ম থেকেই দেবতাদের ওপর ছিল দুর্গের সীমাহীন ক্রোধ। দেবকুলের সব দেবত্ব বিনাশ করে অসুরকুলের প্রভুত্ব কায়েম করার জন্য বেদের দখল নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভয়ঙ্কর অসুর দুর্গ। তিনি জানতেন ব্রহ্মা দ্বারা সৃষ্ট ও ব্রহ্মার আশীর্বাদধন্য ঋষিদের লেখা বেদের অসীম ক্ষমতার কথা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বেদ যাঁর, ত্রিলোক তাঁর।

কারণ বেদেই আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জ্ঞান। তাই বেদের দখল নিলে খর্ব হবে দেবতাদের দৈবীশক্তি, ত্রিলোকের শাসনক্ষমতার একছত্র অধিকারী হবে অসুরকুল। এছাড়া প্রায় সব অসুরের মতো দুর্গেরও স্বপ্ন ছিল স্বর্গ দখল করার। কিন্তু তার জন্য চাই অমরত্ব।

দুর্গ অসুরের তপস্যা

দুর্গ গিয়েছিলেন অসুরদের গুরু শুক্রাচার্যের কাছে। সব কথা শুনে শুক্রাচার্য দুর্গকে বলেছিলেন ব্রহ্মার তপস্যা করতে। তবে তপস্যায় সফল হলে বর চাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন অসুরদের কুলগুরু। কারণ দেবতারা অসুরদের বর দেওয়ার সময় আবহমান কাল ধরেই বরের সঙ্গে সামান্য দুর্বলতা মিশিয়ে দেন। শুক্রাচার্যকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে দুর্গ চলে গিয়েছিলেন হিমালয়ে।

কঠোর তপস্যা শুরু করেছিলেন পদ্মযোনি ব্রহ্মাকে তুষ্ট করার জন্য। এক হাজার বছর ধরে চলেছিল দুর্গের সেই কঠোর তপস্যা। তপস্যার ফলে দুর্গের শরীর থেকে নির্গত হতে শুরু করেছিল অসীম তেজরাশি। সেই তেজরাশির হলকা অনুভব করেছিলেন দেবতারাও। দুর্গের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে নেমে আসেন ব্রহ্মা। বর দিতে চান।শুক্রাচার্যের কথা মতো প্রজাপতি ব্রহ্মাকে ফাঁদে ফেলে দিয়েছিলেন অসুর দুর্গ।

ব্রহ্মাকে বলেছিলেন, হয় অমরত্ব নতুবা চারটি বেদের সম্পূর্ণ অধিকার দিতে হবে। ব্রহ্মা পড়েছিলেন মহা ফাঁপরে। অমরত্বের বর দেওয়া সম্ভব নয়, অন্যদিকে বেদের পূর্ণ অধিকার দুর্গকে দিলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জ্ঞান অসুরকুলের করায়ত্ত হবে, অশুভশক্তির বিজয়পতাকা উড়বে ত্রিলোকে। কিন্তু তাঁর উপায় ছিল না, কারণ একটি বর দেওয়ার অঙ্গীকার করে ফেলেছিলেন তিনি। তাই অমরত্বের বদলে তিনি দুর্গকে দিয়েছিলেন চতুর্বেদের অধিকার। বলেছিলেন দুর্গ অসুর ছাড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আর কেউ চতুর্বেদ ব্যবহার করতে পারবে না।

টলে গিয়েছিল সৃষ্টির ভারসাম্য

দুর্গ অসুর অবিশ্বাস্যভাবে চতুর্বেদের অধিকার লাভ করার পর পৃথিবীর বুকে দেখা দিয়েছিল চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা। ধর্মের উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল অধর্ম। পৃথিবীর মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল হিতাহিত জ্ঞান ও মূল্যবোধ। বেদজ্ঞ ঋষিরাও কল্পনাতীতভাবে ভুলে গিয়েছিলেন বেদজ্ঞান। বেদ ছাড়া তাঁর সৃষ্টিযজ্ঞ সম্পূর্ণ করতে পারছিলেন না স্বয়ং ব্রহ্মাও। প্রায় অবলুপ্ত হতে শুরু করেছিল দেবতাদের নিত্যপূজা, যাগযজ্ঞ, জপ-তপ।

দুর্গ অসুর চতুর্বেদ হস্তগত করায় এবং মানুষ ও ঋষিদের কাছ থেকে পূজা ও উৎসর্গ না পেয়ে দেবতারা দৈবশক্তি হারিয়ে ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করেছিলেন। সুযোগ বুঝে ঠিক এই সময় স্বর্গ আক্রমণ করেছিলেন অসুররাজ দুর্গ। মর্যাদাভ্ৰষ্ট ও হৃতশক্তি দেবতারা দুর্গ অসুরের সঙ্গে যুদ্ধে এঁটে উঠতে না পেরে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন সুমেরু পর্বতে। সেই দিন থেকে দুর্গ অসুরের নাম হয়ে গিয়েছিল দুর্গমাসুর। যাঁকে আঘাত হানা তো দূরের কথা, যাঁর কাছে পৌঁছানোই অসম্ভব।

দেবতারা ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় ও স্বর্গ বেদখল হয়ে যাওয়ায় পৃথিবীর অবস্থাও হয়েছিল অত্যন্ত শোচনীয়। জলের দেবতা সহস্রলোচন বরুণদেব তাঁর দৈবশক্তি হারানোয় পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছিল প্রবল খরা। শুকিয়ে গিয়েছিল খাল, বিল, নদী-নালা, সাগর এমনকি মহাসাগরও। জলাভাবে পৃথিবীর বুক থেকে উধাও হয়েছিল সবুজ। পৃথিবী হয়ে উঠেছিল বিবর্ণ। একশো বছর ধরে চলেছিল এই খরা। মৃত্যুর করাল গ্রাসে প্রবেশ করেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গের দল। ভাগাড় হয়ে উঠেছিল গোটা পৃথিবী। মৃতদেহ দাহ করার লোক পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল না।

আবির্ভূতা হয়েছিলেন দেবী শতাক্ষী ও দেবী শাকম্ভরী

দেবতা ও জীবকুলের দুর্দশা বসে বসে দেখা ছাড়া ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের কাছে আর কোনও উপায় ছিল না। দুর্গমাসুরের পিতা রুরুর তপোবলের প্রভাবে দুর্গমাসুরকে ঘিরে ছিল ব্রহ্মার সুরক্ষাবলয়। দেবতারা জানতেন একমাত্র নারীশক্তি ছাড়া কেউ দুর্গমাসুরকে বধ করতে পারবেন না। অতঃপর সুমেরু ও মানক পর্বতের গুহায় ও অগম্য গিরিপথে লুকিয়ে থাকা দেবগণ শুরু করেছিলেন মহাশক্তিরূপিণী মহাদেবীর আরাধনা। একই সঙ্গে তপস্যা শুরু করেছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী ঋষিরাও। মহাদেবীকে ডাকতে ডাকতেই তাঁরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিলেন হিমালয়ের আনাচে কানাচে। কাঠের মতো শুকিয়ে যাওয়া ঋষিদের প্রাণহীন দেহগুলি থেকে ভেসে আসছিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে রক্ষা করার আকুল আর্তি।

ভক্তগণের কাতর আর্তনাদ বিচলিত করেছিল দেবী পার্বতীকে। তাঁর সর্বাঙ্গ জুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল একশত চক্ষু। দেবী পার্বতী পরিণত হয়েছিলেন দেবী শতাক্ষীতে। দেবী শতাক্ষীর সর্বাঙ্গ থেকে ঠিকরে পড়ছিল শত সূর্যের জ্যোতি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল যন্ত্রণা অনুভব করায় দেবী শতাক্ষীর বর্ণ হয়ে গিয়েছিল ঘন নীল। দেবীর নীলপদ্মের মতো একশত চক্ষু থেকে অবিশ্রান্তভাবে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল অশ্রু। দেবী শতাক্ষীর অশ্রুজলে সজল হয়ে উঠেছিল বসুন্ধরা। জলে টইটম্বুর হয়ে উঠেছিল নদী নালা খাল বিল সাগর মহাসাগর। ধরণীর বুকে ফিরে এসেছিল প্রাণ। সুমেরু ও মানক পর্বতে লুকিয়ে থাকা দেবতারা দেবী শতাক্ষীর জয়গান করতে শুরু করেছিলেন।

এর পর দেবী শতাক্ষী তাঁর আট হাতে ধারণ করেছিলেন খাদ্যশস্য, শাকসবজি, ফল ও ঔষধি বৃক্ষ। পৃথিবী আবার শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সকল দেবতা ও জীবকুলকে খাদ্যবস্তু ও ঔষধি বৃক্ষ প্রদান করেছিলেন দেবী। দেবী শতাক্ষীর অপার করুণায় একসময় আবার গাছগাছালিতে ভরে গিয়েছিল পৃথিবী। সরস জমিতে ফলেছিল সোনালি ধান ও শাকসবজি। সবুজ হয়ে উঠেছিল বসুন্ধরা। শস্যদাত্রী দেবী শতাক্ষীর নাম হয়েছিল দেবী শাকম্ভরী।

দেবী শতাক্ষী বা শাকম্ভরী।

বেদ পুনরুদ্ধারের সংকল্প নিয়েছিলেন দেবী পার্বতী

পৃথিবীকে সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা করার পর, বেদ পুনরুদ্ধারের জন্য দেবী দূত পাঠিয়েছিলেন দুর্গমাসুরের কাছে। দেবীর বার্তাবহনকারিণী হিসেবে দুর্গমাসু্রের কাছে গিয়েছিলেন নবদুর্গার অন্যতমা দেবী কালরাত্রি। দেবী কালরাত্রি দুর্গমাসুরকে বলেছিলেন ব্রহ্মার হাতে চতুর্বেদ এবং ইন্দ্রের হাতে স্বর্গের অধিকার সত্বর তুলে দিতে। দেবী পার্বতীর প্রস্তাবে যথারীতি রাজি হননি দুর্গমাসুর। কটুভাষায় দেবী পার্বতীকে ভৎসনা করে দেবীর বার্তাবহনকারিণী দেবী কালরাত্রিকে চলে যেতে বলেছিলেন। ক্রোধান্বিতা দেবী কালরাত্রি ভীষণ কলেবর ধারণ করে, দুর্গমাসুরকে দেবীর হাতে মৃত্যুবরণ করার জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলেন।

দেবী পার্বতীর কাছে বার্তা এসেছিল, যুদ্ধের সম্পূর্ণ প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে দুর্গমাসুর। এক সহস্র অক্ষৌহিণী সেনার এক বিশাল বাহিনীকে প্রস্তুত করেছে সে (এক অক্ষৌহিণী সেনা বাহিনীতে থাকে ২১৮৭০ টি রথ , ৬৫৬১০ টি হাতি এবং ১০৯৩৫০ জন পদাতিক সেনা)। সুবিশাল সেই বাহিনী নিয়ে রণক্ষেত্রের দিকে উন্মত্তগতিতে এগিয়ে চলেছিলেন বলদর্পী দুর্গমাসুর।

শুরু হয়েছিল মহাসংগ্রাম

দেবী পার্বতীর পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন দেবতা ও ঋষিরা। কিন্তু অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধে কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছিলেন না। অসুরদের হাত থেকে তাঁদের রক্ষা করার জন্য দেবী পার্বতীকে অনুরোধ করেছিলেন দিশেহারা দেবতারা। রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন দেবী শাকম্ভরীরূপী দেবী পার্বতী। এক উজ্জ্বল ও বৃত্তাকার গণ্ডি কেটে দিয়েছিলেন দেবী ভয়ভীত দেবতাদের চারিদিকে। তারপর নতুন এক অসুরবিনাশিনী রূপ ধারণ করে নিজে রইলেন বৃত্তের বাইরে।
নবরূপে ভয়ঙ্কর লাগছিল দেবী পার্বতীকে। শত্রু নিধনের জন্য বিভিন্ন মারণাস্ত্র হাতে নিয়ে দশভুজা দেবী বসে ছিলেন হিংস্র এক সিংহের উপরে। দূর থেকে দুর্গমাসুরকে দেখতে পেয়ে সিংহবাহিনী দেবী বজ্রকণ্ঠে রণহুঙ্কার দিয়ে উঠেছিলেন। সেই রণহুঙ্কারে কেঁপে উঠেছিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড।

রণক্ষেত্রে স্বয়ং দেবীর প্রবেশের পর, দেবতা ও ঋষিরাও নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। উভয়পক্ষের নিক্ষেপ করা তিরে ঢেকে গিয়েছিল সূর্য। পৃথিবীতে নেমে এসেছিল ঘন অন্ধকার। উভয়পক্ষের কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিরের সঙ্গে তিরের ঘর্ষণে জ্বলে উঠছিল আগুন। সেই আলোতেই আলোকিত হচ্ছিল রণক্ষেত্র। তির ও বর্শা উড়ে যাওয়ার সাঁইসাঁই শব্দ, তরবারির ঝনঝনানি, মৃত্যুযন্ত্রণা কাতর আর্তনাদ ছাড়া উভয়পক্ষের যোদ্ধাদের কানে অন্য কিছু প্রবেশ করছিল না।

রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন শক্তিদেবীরা

কিন্তু যুদ্ধে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিলেন দেবতারা। কয়েক মুহূর্তের জন্য যুদ্ধ থেকে বিরত হয়েছিলেন দেবী। বন্ধ করেছিলেন নীল পদ্মের মতো চোখ দুটি। দেবীর শরীর থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন সংহাররূপিণী ভয়াবহ সব দেবীরা। প্রথমে রণক্ষেত্রে অবতীর্ণা হয়েছিলেন দেবী পার্বতীর দশটি প্রধান উগ্ররূপ বা ‘দশমহাবিদ্যা’ অর্থাৎ দেবী কালিকা, তারিণী, ত্রিপুরাসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামুখী, মাতঙ্গী ও কমলাত্মিকা।

এরপর দেবীর অঙ্গ থেকে জন্ম নিয়ে সরাসরি রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নবদূর্গা, অর্থাৎ শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী। এর পর রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ‘দশ মাতৃকা’। অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন কৌমারী, বরাহী, মহেশ্বরী, নরসিংহী, বৈষ্ণবী, শিবদূতী, বিনায়কী, ইন্দ্রাণী, ব্রহ্মাণী ও চামুণ্ডা। এছাড়াও দেবীর অঙ্গ থেকে সৃষ্টিলাভ করে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন আরও চৌষট্টি হাজার দেবী।

রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেই ধ্বংসের প্রতিমূর্তি দেবীরা নির্মমভাবে অসুরদের সংহার করতে শুরু করেছিলেন। অসুরকুলের রক্ত সাগরের মতো ঢেউ তুলেছিল রণক্ষেত্রে। দশ দিন চলেছিল দেবাসুরের মহাসংগ্রাম, তুমুল যুদ্ধ। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল দুর্গমাসুরের এক সহস্র অক্ষৌহিণী সেনা। রণক্ষেত্র জুড়ে বাজতে শুরু করেছিল দেবতাদের বিজয়শঙ্খ ও মৃদঙ্গ।

যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন স্বয়ং দুর্গমাসুর

উপায়ান্তর না দেখে দেবাসুরের যুদ্ধের একাদশ দিনে দেবীর সঙ্গে সম্মুখ-যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন দুর্গমাসুর। সর্বাঙ্গে রক্ত-চন্দন মেখে, গলায় লাল মালা ও রক্তলাল পোশাক পরে, সোনার রথে চড়ে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন বলদর্পী দুর্গমাসুর। দুর্গমাসুরকে দেখে আবার কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করেছিলেন দেবী। নিজ হাতে অশুভের বিনাশ করবেন তিনি, তাই দেবীর শরীর থেকে সৃষ্টি হওয়া সংহাররূপিণী দেবীরা আবার বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন দেবীর শরীরে। শুরু হয়েছিল সিংহবাহিনী দেবীর সঙ্গে দুর্গমাসুরের ভয়ঙ্কর যুদ্ধ।

দানবদলনী দেবীর রণহুঙ্কারে কাঁপছিল স্বর্গ মর্ত্য পাতাল। ছ’ঘণ্টা যুদ্ধ চলার পর এসেছিল সেই শুভক্ষণ। দুর্গমাসুরের রথ লক্ষ্য করে একইসঙ্গে পনেরোটি তির নিক্ষেপ করেছিলেন দেবী। চারটি তির বিদ্ধ করেছিল রথের চারটি ঘোড়াকে। পঞ্চম তিরে বিদ্ধ হয়েছিলেন রথের সারথি। একটি তির ভুলুণ্ঠিত করেছিল রথের উপর উড়তে থাকা দুর্গমাসুরের পতাকাকে। দুটি তির গেঁথে গিয়েছিল দুর্গমাসুরের দুটি চোখে। দুটি গেঁথে গিয়েছিল দুর্গমাসুরের শক্তিশালী দুটি বাহুতে। অবশিষ্ট পাঁচটি তির বিদীর্ণ করেছিল দুর্গমাসুরের হৃৎপিণ্ড। চেতনা হারাবার আগে রক্তবমি করতে শুরু করেছিলেন দুর্গমাসুর। অসুরকুলের রক্তে ভিজে যাওয়া মাটির বুকে একসময় আছড়ে পড়েছিল দুর্গমাসুরের প্রাণহীন দেহ।

মৃত্যুর পর দুর্গমাসুরের নিথর দেহ থেকে নির্গত হয়েছিল সহস্র সূর্যের আলোয় ভরা বেদজ্ঞান। যা দুর্গমাসুর লাভ করেছিলেন চতুর্বেদ দখল করার পর। আলোকোজ্জ্বল বেদজ্ঞান প্রবেশ করেছিল দেবীর দেহে। শান্তি ফিরে এসেছিল ত্রিলোকে। দেবী দশভুজা ব্রহ্মার হাতে তুলে দিয়েছিলেন চতুর্বেদ ও ইন্দ্রের হাতে স্বর্গের অধিকার। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মহাদেবীর মহিমা প্রচার করার ও প্রত্যহ বেদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন দেবতা ও ঋষিদের। জীবকুলকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, অশুভশক্তিকে বিনাশ করতে তিনিই বিভিন্ন রূপ ধারণ করে ধরাধামে ফিরে আসবেন। সবশেষে দেবী পার্বতীর দেহে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন সেই দেবী, দুর্গমাসুরকে বধ করার জন্য যে দেবীর নাম দেবতারা দিয়েছিলেন দুর্গা।

সূত্র: স্কন্দ পুরাণ

আরও পড়ুন: মা দুর্গার ভয়ঙ্করতম অবতার ‘কালরাত্রি’, বধ করেছিলেন পার্বতীর পাণিপ্রার্থী অসুররাজ রুরুকে

You might also like