Latest News

কেন লোকে দেখতে আসে! কী কাহিনি লুকিয়ে রেখেছে এই রহস্যময় মোটরসাইকেল!

অনেক ড্রাইভারই নাকি চালকহীন মোটরসাইকেলটিকে রাতের আঁধারে উন্মত্তগতিতে ছুটে যেতে দেখেছেন।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৮৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর। কড়া শীতের রাতে রাজস্থানের পালি জেলার বাঙদি থেকে নিজের গ্রাম চোটিলা ফিরছিলেন ২৩ বছরের যুবক ওম সিং রাঠোর। নানান কাজ মেটাতে গিয়ে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে বাবা মা স্ত্রী চিন্তা করছিলেন হয়ত। তাই যোধপুর-আমেদাবাদ ৬৫ নং জাতীয় সড়ক দিয়ে বাড়ির দিকে দুরন্তগতিতে ছুটছিল ওম সিং রাঠোরের রয়াল এনফিল্ড মোটরসাইকেল। সারাদিনের পরিশ্রমের ধকলে, বাইক চালাতে চালাতে হয়ত চোখের পাতা বুজে এসেছিল। নিজের গ্রাম চোটিলা থেকে মাত্র কয়েকশ ফুট দূরে, রাস্তার পাশে থাকা একটি ছোট গাছে প্রচণ্ড গতিতে ধাক্কা মেরেছিল ওম সিং রাঠোরের বুলেট। কুড়ি ফুট গভীর খাদে ছিটকে পড়েছিলেন ওম।

ভোরবেলা মাঠের কাজে যাওয়া গ্রামবাসীরা, রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখেছিলেন ওমের সর্বক্ষণের সঙ্গী মোটরসাইকেলটিকে। ছুটে গিয়েছিলেন। রাস্তার পাশের খাদে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ঠাকুর যোগ সিং রাঠোরের বড় ছেলে ওম সিং রাঠোরের মৃতদেহ। প্রথমে হাসপাতাল, তারপর মর্গ হয়ে দেহ পৌঁছেছিল চোটিলা গ্রামে। রাতের অন্ধকারে জ্বলে উঠেছিল গ্রামের সবচেয়ে শান্ত ও নম্র যুবক ওম সিং রাঠোরের চিতা।

স্ত্রীর সঙ্গে ওম সিং রাঠোর।

এরপর ঘটেছিল, বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা না মেলা কিছু ঘটনা

স্থানীয় মানুষেরা যা বলে থাকেন, তা বিশ্বাস করা বা না করা পুরোটাই আপনার ওপর। তবুও শুনুন। দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এগারো কিলোমিটার দূরের থানাতে মোটরসাইকেলটি নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। অদ্ভুত ব্যাপার হল, এত বড় দুর্ঘটনা সত্বেও মোটরসাইকেলটির কোনও ক্ষতি হয়নি। তাই এক পুলিশ অফিসার চালিয়েই থানাতে নিয়ে গিয়েছিলেন মোটরসাইকেলটিকে। রাখা হয়েছিল, থানার সামনে পড়ে থাকা দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়িগুলির সঙ্গে। কেটে গিয়েছিল সেই রাত, নিভে গিয়েছিল ওম সিং রাঠোরের চিতা।

পরের দিন সকালে থানার ডিউটি অফিসার থানার বাইরে এসে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। থানা থেকে উধাও ওম সিং রাঠোরের মোটরসাইকেলটি। অফিসার ভেবেছিলেন দামি মোটরসাইকেলটিকে, থানা থেকে কেউ নিয়ে পালিয়েছে। রাগে অগ্নিশর্মা অফিসারটির হুঙ্কারের পর, মোটরসাইকেল চোরদের ডেরার দিকে ছুটেছিল পুলিশের জিপ। কিন্তু কয়েকঘন্টা পরেই খবর এসেছিল, মোটরসাইকেলটিকে দেখা গিয়েছে দুর্ঘটনাস্থলে। যেখানে প্রাণ হারিয়েছিলেন ওম সিং রাঠোর।

এই সেই গাছ। এখানেই ঘটেছিল দুর্ঘটনা

হাইওয়ে দিয়ে পুলিশের জিপ ছুটেছিল চোটিলা গ্রামের দিকে। গ্রামে পৌঁছে পুলিশ দেখেছিল শুনশান রাস্তায়, সেই ঘাতক গাছটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওম সিং রাঠোরের মোটরসাইকেলটি। গ্রামবাসী ও ওম সিং রাঠোরের বন্ধু্বান্ধবদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ নিঃসন্দেহ হয়েছিল, তাঁরা মোটরসাইকেলটি থানা থেকে নিয়ে আসেননি। সবার মনে একই সঙ্গে প্রশ্ন জেগেছিল, মোটরসাইকেলটিকে তাহলে দুর্ঘটনাস্থলে নিয়ে এলো কে?

আবার পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল মোটরসাইকেলটিকে। থানার গ্যারেজে চেন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ট্যাঙ্ক থেকে বের করে নেওয়া হয়েছিল সব পেট্রল। তা সত্বেও, পরের দিন ভোরে থানার গ্যারেজে মোটরসাইকেলটিকে পাওয়া যায়নি। পাওয়া গিয়েছিল দুর্ঘটনাস্থলে থাকা সেই গাছটির পাশে। এরপর সত্যিই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল পুলিশ। মোটরসাইকেলটি দিয়ে এসেছিল ওমের পরিবারের হাতে।

ওম সিং রাঠোরের সেই রয়াল এনফিল্ড মোটরসাইকেল।

অভিশপ্ত মোটরসাইকেলটিকে ঘরে ঢোকাতে চায়নি ওমের পরিবারও। সেদিনই বিক্রি করে দিয়েছিল এক ব্যবসায়ীকে। রাজস্থানের চোটিলা গ্রাম থেকে লরিতে চেপে ওম সিংয়ের রয়াল এনফিল্ড মোটরসাইকেলটি পাড়ি দিয়েছিল প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে থাকা গুজরাত। গুজরাত পাড়ি দেওয়ার দু’দিন পরেই, মোটরসাইকেলটিকে আবার দেখা গিয়েছিল চোটিলা গ্রামের ঘাতক গাছটির পাশে। খবর পেয়েও গুজরাতি মালিক আর মোটরসাইকেলটিকে নিতে আসেননি। মোটরসাইকেলের ফিরে আসার খবর দাবানলের মতো  ছড়িয়ে পড়েছিল আশেপাশের গ্রামে। হাজার হাজার গ্রামবাসী চলে এসেছিলেন দুর্ঘটনা স্থলে।

গ্রামের মুখিয়ারা বলেছিলেন, মোটরসাইকেলটির মধ্যে প্রবেশ করেছে ওম সিং রাঠোরের অশরীরী আত্মা। মোটরসাইকেলটি তাই বার বার ফিরে আসছে দুর্ঘটনাস্থলে। যাতে আর কেউ সেখানে দুর্ঘটনায় প্রাণ না হারায়। এরপর পল্লবিত হতে শুরু করেছিল নানান কাহিনি। গ্রামে গ্রামে রটে গিয়েছিল, যেকোনও পথ দুর্ঘটনা দৈব ক্ষমতাবলে আটকে দিতে পারে মোটরসাইকেলটি। কারণ সেটির ওপর অদৃশ্যভাবে বসে থাকেন স্বয়ং ওম সিং রাঠোরের আত্মা। বিভিন্ন গ্রামের মানুষজন একসঙ্গে বসে ঠিক করেছিলেন অভিশপ্ত গাছটির পাশেই বানানো হবে এক মন্দির। সেই মন্দিরে পাকাপাকিভাবে রাখা হবে ওম সিং রাঠোরের অলৌকিক ক্ষমতা যুক্ত বুলেট মোটর সাইকেলটি। যার নম্বর ‘আরএনজে-৭৭৭৩’।

বাবা ওম বান্না মন্দির

ওম সিং রাঠোর হয়ে গিয়েছিলেন ‘বাবা ওম বান্না’

জাতীয় সড়কের পাশেই থাকা চোটিলা গ্রামের সেই ঘাতক গাছটির পাশে তৈরি হয়েছিল একটি অদ্ভুত মন্দির। খোলা আকাশের নীচে পাথরের বেদীর ওপর স্থাপন করা হয়েছিল ‘বাবা ওম বান্না’র অলৌকিক মোটরসাইকেল। দেবজ্ঞানে পূজা করা শুরু হয়েছিল মোটরসাইকেলটিকে। কিছুদিনের মধ্যেই সারা রাজস্থানে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল বুলেট বাবার মন্দির। কেউ বলেন ‘বাবা ওম বান্নার মন্দির’।

আপনি যদি ৬৫ নং জাতীয় সড়ক ধরে গাড়িতে যান, গাড়ি থামিয়ে যেকোনও গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেন ‘বুলেট বাবা’ ওম বান্নার কথা। আপনার কথার উত্তর দেওয়ার আগে সবাই কপালে হাত ঠেকাবেন। তাঁরা বলবেন, সবার অলক্ষ্যে বুলেট চেপে ৬৫ নং জাতীয় সড়কে ঘুরে বেড়ান বাবা ওম বান্না। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে বাঁচিয়ে দেন দুর্ঘটনার কবলে পড়া ড্রাইভার ও যাত্রীদের।

যোধপুর-আমেদাবাদ ৬৫ নং জাতীয় সড়ক।

হাইওয়ের বিভিন্ন জায়গায় বাবার অলৌকিক উপস্থিতির কথা বলে থাকেন বাবা ওম বান্নার ভক্তেরা। কেউ বলেন, দুর্ঘটনা ঘটতে যাওয়ার আগেই হাতের স্টিয়ারিংটা আপনা আপনি ঘুরে বিপদকে পাশ কাটায়। কেউ বলেন, দুর্ঘটনার আঁচ পাওয়া মাত্র, ড্রাইভারকে বিভিন্নভাবে সতর্ক করতে শুরু করেন বাবা ওম বান্না। বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে কারও গাড়ির চাকার হাওয়া খুলে দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য গাড়িকে অচল করে দেন। অনেক ড্রাইভারই নাকি চালকহীন মোটরসাইকেলটিকে রাতের আঁধারে উন্মত্তগতিতে ছুটে যেতে দেখেছেন।

৬৫ নং জাতীয় সড়কে গাড়ি চালানো ড্রাইভারদের কাছে, বাবা ওম বান্নার এরকম শত শত কাহিনি শুনতে পাবেন। আজও, প্রত্যেকদিন কয়েক হাজার স্থানীয় গ্রামবাসী, ড্রাইভার ও পর্যটক, পুজো দেন বাবা ওম বান্নার মন্দিরে। নিজেদের যাত্রা শুভ করার জন্য বুলেট বাবার আশীর্বাদ চান তাঁরা। ৬৫ নং জাতীয় সড়ক দিয়ে যাওয়া অন্য রাজ্যের বাস, লরি, ট্রাক ও প্রাইভেট গাড়ির ড্রাইভাররাও বুলেট বাবার মন্দিরে থামেন এবং পুজো দেন।

কাচের ঘেরাটোপে রাখা আছে বাবা ওম বান্নার মোটরসাইকেল।

বাস্তব না অবাস্তব, লৌকিক না অলৌকিক, সংস্কার না কুসংস্কার, সত্য না মিথ্যা, ধর্ম না অধর্ম, সেই বিচারে যাব না। তবে রাজস্থানের ৬৫ জাতীয় সড়কে,পালি থেকে ২০ কিমি ও যোধপুর থেকে ৫৩ কিমি দূরে, আজও আছে বুলেট বাবার মন্দিরটি। যার ভেতর কাচের ঘেরাটোপে রাখা আছে বাবা ওম বান্নার সেই রহস্যময় মোটরসাইকেল। যে মোটরসাইকেলটিকে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে আজও জীবন্ত। সেই লোকবিশ্বাস, গাড়ির সামনে বেড়াল রাস্তা পার হলে, যে লোকবিশ্বাস, গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে মিনিট খানেক দাঁড় করিয়ে রাখে অনেক শিক্ষিত মানুষকেও।

You might also like