Latest News

এ বছরেই কি পৃথিবীর আলো দেখবে, হাতি আর ম্যামথের সংকর ‘ম্যামোফ্যান্ট’

বর্তমান পৃথিবীতে কীভাবে বাঁচবে লোমশ ম্যামথের মতো দেখতে প্রাণিটি!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

২০১৭ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী জর্জ চার্চ চমকে দিয়েছিলেন পৃথিবীকে। তিনি বলেছিলেন, দুই বছরের মধ্যে পরিবর্তিত জিনযুক্ত হাতির ভ্রূণ তৈরি করতে সফল হবেন। জন্ম নেওয়া প্রাণীটি দেখতে একেবারে লোমযুক্ত হাতি বা লোমশ ম্যামথের মতো হবে। তুষারযুগের বিখ্যাত দৈত্য লোমশ ম্যামথকে আবার ফিরিয়ে আনবেন পৃথিবীতে।

বিজ্ঞানী জর্জ ফিরিয়ে আনবেন সেই ম্যামথকে, যে ম্যামথেরা আজ থেকে লক্ষ লক্ষ বছর আগে দাপিয়ে বেড়াত এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা ও উত্তর রাশিয়া জুড়ে। যে তৃণভোজী দৈত্যদের কঙ্কাল, দাঁত ও দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল আলাস্কা ও সাইবেরিয়ার বরফের গভীরে। যারা পৃথিবীর মূল ভূখণ্ডগুলি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল আজ থেকে ১১,৭০০ বছর আগে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, খাদ্যাভাব এবং তাদের দাঁত, হাড়, চামড়া, মাংসের প্রতি মানুষের লোভের কারণে।

লোমশ ম্যামথ।

সেই ম্যামথকে ফেরাবে বিজ্ঞান!

তেমনই দাবি করে আসছেন জীববিজ্ঞানী জর্জ চার্চ। কিন্তু পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়া কোনও প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব? বিজ্ঞানী চার্চ বলেছেন সম্ভব। ২০০৩ সালে স্পেন ও ফ্রান্সের গবেষকরা সর্বপ্রথম বুকার্ডো বা পাইরেনিয়ান আইবেক্স ( Capra pyrenaica pyrenaica ) নামে অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক বুনো ছাগল প্রজাতির ক্লোন তৈরি করেছিলেন। যে প্রজাতিটি ২০০০ সালে লুপ্ত বলে ঘোষণা করেছিল ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড (WWF)। যদিও ল্যাবরেটরিতে জন্ম নেওয়া ছাগলটি বেশিদিন বাঁচেনি।

কৃত্রিম উপায়ে সর্বপ্রথম তৈরি হয়েছিল এই বুকার্ডো ছাগলটি। যার প্রজাতি অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছিল জর্জ চার্চের দাবিকে ঘিরে। বিজ্ঞানী চার্চ তখন খোলসা করেছিলেন বিষয়টি। তিনি বলেছিলেন, তাঁর তৈরি প্রাণীটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে লোমশ ম্যামথের মতো হবে না। কিন্তু দেখতে হবে একেবারে লোমশ ম্যামথের মতোই। কিন্তু এখানেও উঠেছিল প্রশ্ন, ক্লোনিং করে ম্যামথের মতো জীব তৈরি করতে গেলে, প্রয়োজন হবে ম্যামথের কোষের নিউক্লিয়াস। যার মধ্যে ম্যামথের জিনগুলি অক্ষত অবস্থায় থাকতে হবে। সেই নিউক্লিয়াসটি আবার ম্যামথের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রাণী বা হাতির ডিম্বাণুতে বসাতে হবে। তারপর কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ভ্রূণকে মহিলা হাতির জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরে জন্মগ্রহণ করবে ম্যামথ শাবক। কিন্তু বিষয়টি কি এতই সোজা!

এর আগেও তো, জাপানের কিনকি ইউনিভার্সিটির বায়োটেকনোলজিস্ট, আকিরা ইরিটানি ঘোষণা করেছিলেন, সাইবেরিয়ার স্থায়ী বরফের তলায় ম্যামথের ক্লোন করার মতো উপযুক্ত উপাদান বা নিউক্লিয়াস খুঁজে পেয়েছেন। ২০১১ সালে  বিজ্ঞানী ইরিটানি বলেছিলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি আবার পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া ম্যামথকে ফিরিয়ে আনবেন। সেই সময় সংবাদমাধ্যমে প্রচুর প্রচার পেয়ে গিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ইরিটানি। ২০১৬ সাল কেটে গেছে কবেই। বিজ্ঞানী ইরিটানি তাঁর কথা রাখেননি। সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও, বিজ্ঞানী ইরিটানির ক্লোন করা ম্যামথ পৃথিবীর আলো দেখেনি।

জীববিজ্ঞানী জর্জ চার্চ।

তাহলে কীসের জোরে দাবি করছেন বিজ্ঞানী জর্জ চার্চ!

২০১৫ সালে ‘সুইডিশ মিউজিয়াম অফ ন্যাচরাল হিস্ট্রি’-এর জীবাশ্মবিজ্ঞানী লাভ দালেনের নেতৃত্বে, এক দল বিজ্ঞানী ম্যামথের জিনের ম্যাপ বানিয়ে ফেলেছিলেন। সেই যুগান্তকারী গবেষণা দরজা খুলে দিয়েছিল বিজ্ঞানী চার্চের সামনে। বিজ্ঞানী দালেনের সাফল্যকে নিজের গবেষণার কাজে ব্যবহার করেছেন সুযোগসন্ধানী চার্চ। ২০১৫ সালেই চার্চ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, তিনি একটি এশিয়ার হাতির চামড়ার কোষকে স্টেম সেলে পরিণত করবেন, যে স্টেমসেলটি লোমশ ম্যামথের ভ্রূণ তৈরি করতে সক্ষম হবে। এই হাইব্রিড হাতির নাম তিনি দিয়েছিলেন ম্যামোফ্যান্ট (ম্যামথ+এলিফ্যান্ট)।

নকল ম্যামথ বা ম্যামোফ্যান্ট কীভাবে তৈরি করবেন সেটাও জানিয়েছিলেন বিজ্ঞানী চার্চ। তিনি বলেছিলেন, ল্যাবরেটারির ভেতর এশিয়ার হাতির জিনে এমন কিছু কারিকুরি করবেন, যে জন্য কৃত্রিম উপায়ে তৈরি হওয়া ম্যামোফ্যান্টের শারীরিক বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি ম্যামথের মতো হবে। ম্যামথের মতোই প্রচণ্ড ঠান্ডায় বাঁচতে পারবে ম্যামোফ্যান্ট। তাদের দাঁত ও লোম ম্যামথের মতো বড় বড় হবে। গায়ে চর্বির পরিমাণও হবে ম্যামথের মতোই।

এশিয়ার হাতির জিনকে ম্যামথের জিনে বদলে ফেলবার জন্য বিজ্ঞানী চার্চ ব্যবহার করেছেন ,CRISPR নামে একটি জেনেটিক এডিটিং টুল। ২০১৭ সালে চার্চ ঘোষণা করেছিলেন, তিনি এশিয়ার হাতির ৪৫ টি জিনের পরিবর্তন ঘটিয়ে ম্যামথের জিনের মতো করে দিয়েছেন। তাঁর আর মাত্র দু’বছর লাগবে লোমশ ম্যামথের মতো দেখতে ম্যামোফ্যান্ট তৈরি করতে। ২০১৯ সালে পৃথিবীর বুকে ভুমিষ্ঠ হবে বিজ্ঞানী জর্জ চার্চের ‘ম্যামোফ্যান্ট’।

এভাবেই তৈরি হবে চার্চের ম্যামোফ্যান্ট।

বর্তমান পৃথিবীতে বাঁচবে লোমশ ম্যামথ!

অনেক বিজ্ঞানী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ম্যামথদের বাসযোগ্য আবহাওয়া, পরিবেশ এবং খাদ্য পৃথিবীতে আজ আর নেই! নতুনভাবে সৃষ্টি করা লোমশ ম্যামথ, পৃথিবীর বুকে কঠিন জীবনসংগ্রামে টিকে থাকতে পারবে তো!  বিজ্ঞানী চার্চ সেদিকটাও ভেবে রেখেছেন। যোগাযোগ রেখে চলছেন রাশিয়ার বিজ্ঞানী সার্গেই ও নিকিতা জিমোভের সঙ্গে। এই পিতা-পুত্র জুটি সাইবেরিয়ায় অবস্থিত প্লিসটোসিন পার্ক রক্ষণাবেক্ষণ করছেন ,১৯৯৬ সাল থেকে ।

রাশিয়ার দুই বিজ্ঞানী, পৃথিবীর নানা এলাকা থেকে বড় বড় তৃণভোজী প্রাণিদের নিয়ে এসে ছেড়ে দিয়েছিলেন এই বরফ জমা সংরক্ষিত এলাকাটিতে। ১৪৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে, তুষার যুগের পরিবেশ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য নিয়ে। পার্কে ছেড়ে দেওয়া প্রাণিগুলি সাইবেরিয়াতে কস্মিনকালেও বাস করত না। যেমন তিব্বতি ‘ইয়াক’, পাকিস্তানের পার্বত্য এলাকার শক্তিশালী হরিণ ‘মারখোর’। অবাক করার মতো সাফল্য এসেছিল। সাইবেরিয়ার তুষারজমা পার্কের চুড়ান্ত হিমশীতল পরিবেশে বিস্ময়করভাবেই মানিয়ে নিয়েছিল প্রাণিগুলি। অপরিচিত পরিবেশে টিকে থেকে বংশবৃদ্ধিও করতে শুরু করেছিল স্বাভাবিক ভাবেই। তাই বিজ্ঞানী জর্জ চার্চের আশা, সার্গেই জিমোভের প্লিসটোসিন পার্কেই তাঁর তৈরি করা লোমশ ম্যামথ বা ম্যামোফ্যান্ট দিব্যি মানিয়ে নেবে।

প্লিসটোসিন পার্কে তিব্বতের ইয়াক।

কিন্তু জর্জ চার্চের দেওয়া সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে। ২০১৯ পেরিয়ে এসে গেছে ২০২০ সাল। আজও পৃথিবীর আলো দেখেনি বিজ্ঞানী চার্চের লোমশ ম্যামথ ওরফে ম্যামোফ্যান্ট। তবে ইউরোপের একটি অতিপরিচিত সংবাদ সংস্থা বলছে, এই বছরেই মিলবে উত্তর। মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন বিজ্ঞানী জর্জ চার্চ। কেন তিনি এই অবস্থান নিয়েছেন! চমকে দেওয়ার জন্যে অপেক্ষা করাচ্ছেন পৃথিবীকে! নাকি তিনিও হেরে গিয়েছেন বাস্তবের কাছে!

You might also like