Latest News

লকডাউন: কেমন আছে সুন্দরবনের দ্বীপ মৌসুনি

মৌসুনির দক্ষিণ প্রান্তের বালিয়াড়ার অনেক পরিবার থেকেই মানুষ আরব আমিরশাহি, কাতার, ওমান প্রভৃতি দেশে কাজের সন্ধানে গেছেন। তাঁদের মধ্যেও কিছু মানুষ দ্বীপে ফিরেছেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী

গত কয়েক বছরে অনেকেই দু-চার দিনের ছুটি পেলেই ছুটে গেছেন সুন্দরবনের এই প্রান্তিক দ্বীপে এবং ফিরে এসে নানা জায়গায় প্রকৃতির অনাবিল সান্নিধ্যের কথা বন্ধুদের শুনিয়েছেন, ছবিও দেখিয়েছেন। আজ এই বিশ্বব্যাপী করোনা লকডাউনের দিনে কেমন আছে মৌসুনি?
সুন্দরবনের অনেক দ্বীপের মতোই মৌসুনির বহু মানুষ আয়লার পর থেকেই দেশ এবং বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজের জন্য ঘর ছেড়েছেন। করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় নেমে আসার আভাস পেয়েই এঁরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফিরতে শুরু করেছেন গ্রামে। মৌসুনি দ্বীপের অনেকগুলি পরিবার থেকে মেয়েরা বেঙ্গালুরুতে নার্সিংয়ের ট্রেনিং নিতে যান, তাঁরাও ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেছেন আমেদাবাদ, সুরাট, মুম্বই, পোর্ট ব্লেয়ার এবং ভারতের অন্যান্য প্রান্তে কর্মরত মানুষেরা। মৌসুনির দক্ষিণ প্রান্তের বালিয়াড়ার অনেক পরিবার থেকেই মানুষ আরব আমিরশাহি, কাতার, ওমান প্রভৃতি দেশে কাজের সন্ধানে গেছেন। তাঁদের মধ্যেও কিছু মানুষ দ্বীপে ফিরেছেন।

সম্প্রতি রেডিও, টেলিভিশন এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এঁদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন দ্বীপবাসী। সেই দুশ্চিন্তা তাঁরা গোপন রাখেননি। প্রশাসনিক স্তরে বাইরে থেকে আসা মানুষদের কথা জানানো হয়েছে। ‘আশা’ কর্মীরা প্রায় প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে সন্ধান করেছেন বাইরে থেকে ফিরে আসা মানুষদের। যাঁরা স্বেচ্ছায় হাসপাতালে যেতে রাজি হননি তাঁদের প্রায় জোর করে স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। কাকদ্বীপের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে এঁদের দেওয়া হয়েছে একটি করে কাগজ যাতে কর্মরত চিকিৎসকের স্বাক্ষর-সহ লেখা আছে নাম, বয়স, উচ্চতা, ওজন এবং ১৪ দিন বাধ্যতামূলক ঘরে থাকার নির্দেশ। সেই নির্দেশ পালিত হচ্ছে কিনা তা নজর রাখছেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। কোনওরকম বিচ্যুতির সংবাদ মুহূর্তে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে বিডিও বা সিএমওএইচ পর্যন্ত। ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গেই।

মৌসুনির প্রাণকেন্দ্র বাগডাঙ্গা বাজার এখন জনশূন্য। যে প্রকাশের চায়ের দোকানে সারাদিন তাসের আড্ডা চলে সেই দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো ছেলে-ছোকরাকে ঘরে ঢোকাচ্ছে সিভিক পুলিশ। বাগডাঙ্গায় হাট বসে সোম আর শুক্রবারে। গত সোমবার শেষ হাট বসেছিল, এই শুক্রবার হাট বসেনি, কবে আবার বসবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
আজন্ম মৌসুনিবাসী সরল দাসের কাছে জানতে চাই, ‘হাট না বসলে খাবেন কী?’ সরল হাসির সঙ্গে একরাশ আত্মবিশ্বাস মিশিয়ে জবাব দিলেন, ‘আমাদের প্রত্যেকের ঘরে যা শাকসবজি হয় তাতেই চলে যাবে, আর পুকুরে জাল ফেললেই মাছ পাব’। বললাম, ‘বালিয়াড়ার গরীব মানুষদের কীভাবে চলবে দিন?’ মৌসুনি কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের কর্মী সরলবাবু জানালেন, তাদের কাছে সরকারি চাল পৌঁছে গেছে, আর পা বাড়ালেই নদী, খাওয়ার ব্যাপারে দিন কয়েকের চিন্তা আপাতত নেই।
চিন্তা হল, যাঁরা ফিরে এসেছেন তাঁরা কেউ কি এই মারণ ভাইরাস বহন করছেন শরীরে? দিন কয়েক আগে দুবাই থেকে জ্বর নিয়ে ফিরেছিলেন যে যুবক তাঁকে সরলবাবুরাই জোর করে স্থানীয় দ্বারিকনগরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারবাবু কোনও ঝুঁকি না নিয়ে সেই যুবককে পাঠিয়েছিলেন বেলেঘাটা আইডি-তে। বেলেঘাটা আইডি অবশ্য তাঁকে ফিট সার্টিফিকেট দিয়েছে, দিয়েছে বাধ্যতামূলক ঘরে থাকার পরামর্শও। আর আরব আমিরশাহিতে সদ্য বিয়ে করা বউকে নিয়ে গিয়েছিলেন যে যুবক তিনি ফিরে এসেছেন দিন কয়েক হল। সেই দম্পতিও আপাতত গৃহবন্দি কাকদ্বীপ হাসপাতালের নির্দেশে।

গত কয়েক বছরে মৌসুনির দক্ষিণ দিকে পর্যটনের বেশ রমরমা। শহরের বহু মানুষ আসেন দিন কয়েকের ছুটি কাটাতে। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ছাড়াই গড়ে ওঠা সেসব ‘হোম স্টে’-র ভাল-মন্দ নিয়ে কথা বলার সময় এখন নয়। তবে যেদিন রাজ্য সরকারের নির্দেশে স্কুলগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হল সেদিন আসা একদল পর্যটককে প্রায় তাড়িয়ে ছেড়েছেন বালিয়াড়ার মানুষ।
স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো হয়তো সুন্দরবনের এই প্রান্তিক দ্বীপে নেই কিন্তু এসব ঘটনা শুনে মাঝে মাঝে মনে হয়, ইউরোপের উন্নত দেশ ইতালির থেকেও বোধহয় আমাদের সুন্দরবনের এই প্রান্তিক মানুষেরা এগিয়ে আছেন সচেতনতায়। গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথোপকথনে যখন জানতে চাই— ‘খেয়া তো বন্ধ, হাট বসছে না, অসুবিধা হবে না আপনাদের?’ উত্তর আসে, ‘আমাদের যা অসুবিধা হবে তার চেয়ে বেশি অসুবিধা হবে শহরের মানুষের। আজ স্পেশাল খেয়ায় উচ্ছে আর ঝিঙে গেছে কলকাতায়, গত সপ্তাহে চাষিরা দাম পেয়েছেন উচ্ছের জন্য কেজিতে ছ-সাত টাকা, আজ তার দাম কেজিতে দশ-বারো টাকা। আমাদের খাবার কিছুদিনের অন্তত গ্রামেই মজুত আছে কিন্তু গ্রামের সবজি বা মাছ শহরের বাজারে না গেলে শহরের চলবে তো?’
এই প্রশ্ন ও উত্তর আমাদের এক বৃহত্তর সত্যের সম্মুখীন করে। আজও বাংলার এইসব ছোট ছোট গ্রাম স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারেন, ‘কিছু দিন চলে যাবে আমাদের, আপনাদের চলবে তো?’
শহুরে উচ্চবিত্তদের হাত ধরে গ্রামের দোড়গোড়ায় চলে আসা মৃত্যুর ছায়াঘেরা আজকের বিপন্ন পৃথিবীকে ভবিষ্যতের পথ দেখাবে কি এইসব ছোট ছোট স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামের আত্মবিশ্বাসী বেঁচে থাকা?

লেখক ‘শুধু সুন্দরবন চর্চা’ পত্রিকার সম্পাদক
আলোকচিত্র: অভিজিৎ চক্রবর্তী

You might also like