Latest News

বাংলা দেখেছে অনেক দুঃসাহসী পর্বতারোহী ও ট্রেকার, তবুও ভোলা যাবে না এই মানুষটিকে

মানবজাতির স্বার্থে হিমালয়কে পরিণত করেছিলেন প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরিতে। হিমালয়ের বুকে চালিয়েছিলেন প্রথম বৈজ্ঞানিক অভিযান।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৫২ সালে পালি ভাষায় মাস্টার্স করার পর, বন্ধু গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অসীম মুখোপাধ্যায় প্রথম গিয়েছিলেন হিমালয়ে। রুদ্রপ্রয়াগ পর্যন্ত বাসে করে গিয়ে, সেখান থেকে হেঁটে বদ্রীনাথ গিয়েছিলেন। অবাক হয়ে দেখেছিলেন তুষারমৌলী হিমালয়ের অনির্বচনীয় রূপমাধুরী। পৃথিবী এত সুন্দর হতে পারে, তা হিমালয়ে না এলে বুঝি জানতেও পারতেন না। এরপর বারে বারে গিয়েছেন হিমালয়ে। সারাক্ষণ ডুবে থাকতেন হিমালয় সংক্রান্ত বই ও পত্রপত্রিকায়। তবুও যেন মন ভরছিল না। আরও কাছে যেতে হবে। ছুঁতে হবে সাদা পাহাড়ের হিমশীতল দেহ। ছুঁতেই হবে।

পিণ্ডারী গ্লেসিয়ারে অসীম মুখোপাধ্যায়।

শুরু হয়েছিল হিমালয় অভিযান

স্বপ্ন দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছিল সাত বছর। ১৯৫৯ সালে, সুকুমার রায় ও শৈলেশ চক্রবর্তীর সঙ্গে ভারতের প্রথম অসামরিক ট্রেকিং দল ‘বেঙ্গল হাইকার ক্লাব’ গঠন করে পাড়ি দিয়েছিলেন হিমালয়ে। প্রথম অভিযানই ছিল কালিন্দী পাস (৫৯৫০ মি) বা কালিন্দী খাল। আজও যে ট্রেক কোনও পর্বতাভিযানের চেয়ে কম দূরুহ নয়। অত্যন্ত কঠিন এই ট্রেক সফলভাবে সম্পূর্ণ করেছিলেন, নুন্যতম রসদ ও সরঞ্জাম নিয়ে। কিন্তু অভিযান সফল হওয়ার পরও স্বীকৃতি মেলেনি ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে।

সামান্য হতাশ হলেও ভেঙে পড়েননি অসীম মুখোপাধ্যায় ও তাঁর সহ অভিযাত্রীরা। মনের কোণে উঁকি মারতে শুরু করেছিল নন্দাঘুঁটি (6309 মিটার) শৃঙ্গ। ১৯৪১ সালে নন্দাঘুঁটির পূর্ব গিরিশিরা ধরে সুইজারল্যান্ডের আন্দ্রে রচের টিম শৃঙ্গ আরোহণ করলেও। তখনও পর্যন্ত কোনও ভারতীয় টিম নন্দাঘুঁটি আরোহণ করতে পারেনি।

নন্দাঘুঁটির দরবারে

তাই হিমালয়ান ইন্সটিটিউট (পরবর্তীকালে নাম পালটে হয়েছিল হিমালিয়ান অ্যাসোশিয়েশন) পরিকল্পনা নিয়েছিল নন্দাঘুঁটিই হবে তার পাখির চোখ। অভিযানের খরচ ছিল প্রায় ৪৫,০০০ টাকা। অত টাকা তখন তাঁদের কাছে কোথায়। অসীম মুখোপাধ্যায় তখন ক্যালকাটা করপোরেশনের প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। মাস গেলে হাতে আসে খুব বেশি হলে তিনশো টাকা। অর্থের জন্য বিভিন্ন মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়েছিলেন তাঁরা। প্রায় সবাই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সবারই প্রশ্ন ছিল বাঙালি পাহাড় চড়ে কী করবে! এর জন্য টাকা দিতে পারবেন না!

কিন্তু হিমালয়ান ইন্সটিটিউটের সদস্যরা ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। তাছাড়া, টিচারস ইউনিয়ন চালাবার অভিজ্ঞতা থাকায় অসীম মুখোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তাঁর ও হিমালয়ান ইন্সটিটিউটের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমে জোগাড় হয়েছিল অভিযানের অর্থ। এগিয়ে এসেছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক অশোক সরকার। ২২ অক্টোবর ১৯৬০, তৈরি হয়েছিল এক যুগান্তকারী ইতিহাস। উত্তর গিরিশিরা রুটে নন্দাঘুঁটির শৃঙ্গে আরোহণ করেছিলেন সুকুমার রায় ও নিমা তাসি।

নন্দাঘুঁটি শৃঙ্গ আরোহণকারী প্রথম ভারতীয় পর্বতারোহী দল।

শুশুনিয়ায় শুরু করেছিলেন রক ক্লাইম্বিং কোর্স

১৯৬০ সালের নন্দাঘুঁটি অভিযান, তুফান তুলেছিল বাংলার দামাল যুবক যুবতীদের মনে। হাতছানি দিয়ে ডাকছিল হিমালয়। তাঁরা ভাবছিলেন, কবে তাঁরা কক্ষচ্যুত নক্ষত্রের গতিতে ছুটে যাবেন হিমালয়ের দিকে। তুষার শৃঙ্গের ওপরে দাঁড়িয়ে আন্দোলিত করবেন ভারতীয় তেরঙ্গা। কিন্তু পর্বতাভিযানের জন্য দরকার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। অসীম মুখোপাধ্যায় ও সুকুমার রায় অবসরে আলোচনা করতেন, পর্বতারোহণের প্রতি যুবসমাজের উৎসাহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু প্রশিক্ষণের সুযোগ খুবই কম। এবং প্রশিক্ষণের প্রায় সবটাই নিয়ন্ত্রণ করে সেনাবাহিনী। কীভাবে বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা যায়, তা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনায় মগ্ন থাকতেন দুজন।

আলোচনা করতে করতে একদিন দুই জহুরীর নজর গিয়েছিল রাঢ় বাংলার রুক্ষ বুকের দিকে। ঘরের কাছেই তো আছে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম। তাহলে কেন প্রশিক্ষণের জন্য নির্ভর করতে হবে হিমালয়ের ওপর। পর্বতারোহণের হাতেখড়ি দেওয়ার আদর্শ জায়গা হতে পারে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূমের পাহাড়গুলি। যেখানে যেতে আসতে বেশি সময়ও লাগবেনা, আর খরচও হবে যৎসামান্য। পর্বতারোহণের প্রাথমিক পাঠ নেওয়ার পর, উৎসাহীরা উচ্চতর পাঠ নিতে যাবে হিমালয়ে।

মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত কিশোর কিশোরী, যুবক যুবতীদের পর্বতারোহণে আনার সংকল্প নিয়ে, অসীম মুখোপাধ্যায় ও সুকুমার রায় একদিন পৌঁছে গিয়েছিলেন পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়। সালটা ছিল ১৯৬১। কিন্তু অযোধ্যা পাহাড়কে তাঁদের পছন্দ হয়নি। ১৯৬২ সালে তাই তাঁরা গিয়েছিলেন পুর্বঘাট পর্বতমালার শুশুনিয়া পাহাড়ে। শুশুনিয়া পাহাড় তাঁদের ফেরায়নি। দিনের পর দিন ঘন্টা পর ঘন্টা শুশুনিয়া পাহাড়ে কাটিয়ে তাঁরা খুঁজে নিয়েছিলেন, তাঁদের পছন্দসই রক ক্লাইম্বিং শেখানোর জন্য আদর্শ কিছু ফেস। বাকিটা ইতিহাস। ১৯৬৩ সাল থেকে শুশুনিয়ায় শুরু হয়ে গিয়েছিল রক ক্লাইম্বিং কোর্স। আজও যা থামেনি।

৩৩ বছর বয়েসে গিয়েছিলেন পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নিতে 

হিমালয়ের তুখোড় ট্রেকার অসীম মুখোপাধ্যায়ের পর্বতারোহণের ওপর কোনও টেকনিক্যাল ট্রেনিং নেওয়া ছিল না। কিন্তু পর্বতারোহণের প্রতি ছিল অসীম আগ্রহ। অভিযাত্রী বন্ধুরা মজা করে বলতেন, পর্বতারোহণের ট্রেনিং নেবার বয়েস তাঁর পেরিয়ে গিয়েছে। অসীম মুখোপাধ্যায়ের ভারী চেহারাও ছিল পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়। প্রচুর ধুমপান করতেন বলে হাই-অল্টিচিউডে তিনি আদৌ সফল হবেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল শুভানুধ্যায়ীদের।

কিন্তু অসীম মুখোপাধ্যায় ছিলেন নাছোড়বান্দা। সুকুমার সেন, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিদগ্ধ পণ্ডিতদের প্রিয় ছাত্র অসীম মুখোপাধ্যায় কিন্তু সিদ্ধান্তটি নিয়েই ফেলেছিলেন। হ্যাঁ মাউন্টেনিয়ারিংয়ের টেকনিক্যাল দিকটা তিনি শিখবেনই। ১৯৬২ সালে, দার্জিলিংয়ের রয় ভিলায় সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রখ্যাত পর্বতারোহী নওয়াং গোম্বুকে। তাঁকে পর্বতারোহণের টেকনিক্যাল দিকটা শেখাতে হবে।

ভারী চেহারার, তাঁর চেয়ে সাত বছরের বড়, পালি ভাষার স্কলার অসীম মুখোপাধ্যায়ের মুখে প্রস্তাবটা শুনে আকাশ থেকে পড়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম পর্বতারোহী নওয়াং গোম্বু। আগে থেকেই অসীম মুখোপাধ্যাকে চিনতেন তেনজিং নোরগের ভাইপো  নওয়াং গোম্বু। প্রায় হেঁচকি তুলে বলেছিলেন, “বলেন কি স্যার! তেত্রিশ বছর বয়েসে পর্বতারোহণে আসবেন!” অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন নওয়াং গোম্বু। কিন্তু অসীম মুখোপাধ্যায়ও ছাড়বার পাত্র নয়। যুক্তিবাণে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা তাঁর কাছে কয়েক মিনিটের ব্যাপার। তিনি নওয়াংকে বুঝিয়েছিলেন, তিনি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছেন, দশ বারো কেজি ওজন কমিয়ে ফেলেছেন, প্রয়োজনে আরও ওজন কমিয়ে ফেলবেন। তবুও পর্বতারোহণের টেকনিক্যাল দিকটা শিখবেনই এবং নওয়াং গোম্বুকেই শেখাতে হবে। এরপর আর না করতে পারেননি নওয়াং গোম্বু।

নওয়াং গোম্বুর মতো বিশ্বমানের প্রশিক্ষকের কাছে হাতেকলমে শুরু হয়েছিল অসীম মুখোপাধ্যায়ের পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ। পাহাড়ে পা রেখে অসীম মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রশিক্ষককে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি মিথ্যা বলেননি। অফুরন্ত শক্তি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও নিজের শারীরিক ক্ষমতা বুঝে আরোহণ করা, এই তিনটি গুণই ছিল তাঁর মধ্যে। চেহারা দেখে নরম সরম ভদ্র বাঙালীবাবু মনে হলেও, অসীম মুখোপাধ্যায় আসলে ছিলেন একজন জন্ম পাহাড়ি। যাকে জীবন এতোদিন পাহাড় থেকে দূরে রেখেছিল মাত্র।

নওয়াং গোম্বু

পর্বতারোহণের ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসে, ‘হাইকার ক্লাব অফ বেঙ্গল-এর পক্ষ থেকে, ১৯৬৩ সালে পরিচালনা করেছিলেন রূপকুণ্ড অভিযান। সেই বছরেই প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন উল্টোডাঙ্গার ইউনাইটেড হাইস্কুলের শিক্ষক হয়ে। কয়েক বছর ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন টিচার্স ইউনিয়নের কাজে। ১৯৬৬ সালে, হিমালয়ান অ্যাসোসিয়েশনের ত্রিশুল (৭১২০ মি) শৃঙ্গ অভিযানেঅসীম মুখোপাধ্যায়কে পৃষ্টপোষক ও পরামর্শদাতা হিসেবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন চঞ্চল মিত্র।

সমস্ত পরিকল্পনায় সঙ্গে জড়িয়ে থেকেও অসীমবাবু অভিযানে যেতে পারেননি। কিন্তু অভিযাত্রীদল ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সেতু হয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই বাংলা জেনেছিল, ত্রিশুল শৃঙ্গ আরোহণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন নিরাপদ মল্লিক ও শ্যামল চক্রবর্তী। বিশ্বজুড়ে প্রশংসা শুরু হয়েছিল বাঙালী পর্বতারোহীদের নিয়ে।

আবার হিমালয়ে, তবে অন্য রহস্যের সন্ধানে

অসীম মুখোপাধ্যায় সাধারণ পর্বতারোহী ছিলেন না। একজন গবেষক হিসেবে তিনি সবসময় অনুভব করতেন, গবেষকদের কাছে হিমালয় হয়ে উঠতে পারে হিরের সেই খনি। যে হিমালয়কে মানুষ চেনে না, যে হিমালয়ে প্রচারের আলো পড়ে না, সেখানেই লুকিয়ে আছে হিরের খনি। যা তখনও ছিল অনাবিষ্কৃত। তাই, ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে অসীম মুখোপাধ্যায় কলকাতায় একটি সেমিনার করেছিলেন। সেই সেমিনারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের, যাঁরা বটানি, জুলজি,অ্যানথ্রোপলজি ,জিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশুনা করছিলেন। সেই সেমিনারে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রায় সমস্ত প্রখ্যাত বাঙালি পর্বতারোহীদের।

সেমিনারে ঠিক হয়েছিল, একটি সংস্থা তৈরি করা হবে। যেটি হিমালয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক অভিযান চালাবে। কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতার ক্রিক রো’তে ভুমিষ্ঠ হয়েছিল অসীম মুখোপাধ্যায়ের সেই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘কাউন্সিল অফ হিমালয়ান এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড রিসার্চ’। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে একে একে জড়িয়ে গিয়েছিলেন কালীদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, নিতাই রায়, প্রদীপ দাসগুপ্ত, অরুণ মুখোপাধ্যায়, শৈলেশ চক্রবর্তী, হিমাংশু বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রসময় দত্ত, নরেন্দ্রমোহন দত্ত, ত্রিদিব বসু, কমল বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবাল দে, গৌরগোপাল মাইতি, মুকুল হাজরারা। এঁদের কেউ ছিলেন প্রখ্যাত অধ্যাপক, কেউ গবেষক, কেউ পর্বতারোহী, কেউবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী।

পর্বতারোহণের ডানায় ভর দিয়ে, সেই প্রথম হিমালয়ে শুরু হয়েছিল বৈজ্ঞানিক অভিযান

অভিযানের অর্থ সংগ্রহ করতে প্রচুর সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। পরিকল্পনা জানিয়ে অর্থ সাহায্য চাওয়া হয়েছিল ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনের কাছ থেকে। প্রত্যাখ্যান করেছিল ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশন। জানিয়েছিল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্য তাঁরা কোনও অর্থ সাহায্য করতে পারবে না। প্রত্যাখ্যান করেছিল ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ট কমিশনও। এরপরে অভিযানটিকে অসীম মুখোপাধ্যায় বিভক্ত করে ফেলেছিলেন দুইভাগে। একটি হবে নিখাদ পর্বতাভিযান ও অপরটি বৈজ্ঞানিক অভিযান। তাহলে ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশন-এর কাছ থেকে অর্থ পাওয়া সম্ভব। এছাড়াও অসীম মুখোপাধ্যায় ও তার সঙ্গীরা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা দফতর, অমৃতবাজার পত্রিকা ও যুগান্তর পত্রিকা থেকে অভিযানের জন্য অর্থ জোগাড় করেছিলেন।

কুতি উপত্যকা

এভাবে বহু বাধা পেরিয়ে, ১৯৬৮ সালেই ‘কাউন্সিল অফ হিমালয়ান এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ টিমের সদস্যেরা হিমালয়ের কুতি উপত্যকায় চালিয়েছিলেন ভারতের প্রথম গবেষণামূলক অভিযান। একই সঙ্গে দলটি অভিযান চালিয়েছিল জাঁস্কর রেঞ্জে থাকা সবচেয়ে উঁচু পর্বতটিতে। যেটিকে স্থানীয়রা বলত স্যাংট্যাং (৬৬৩০ মিটার)। যে শৃঙ্গটি তখনও পর্যন্ত কোনও টিম আরোহণ করতে পারেনি। ১৯৬৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, বিকেল ২.৫৫ মিনিটে, ভারত ও তিব্বতের সীমানায় থাকা শৃঙ্গটি আরোহণ করেছিলেন দিলীপ ভট্টাচার্য্য, শেরপা পেম্বা থার্কে ও শেরপা ওয়াংচু। শ্রীরামকৃষ্ণের নামানুসারে শৃঙ্গটির নাম দেওয়া হয়েছিল রামকৃষ্ণ পরমহংস গিরিশৃঙ্গ।

কুতি উপত্যকার ৩৬৫৮ মিটার থেকে ৬৬৩০ মিটার উচ্চতায় হওয়া ভারতের প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানটি থেকে সংগৃহীত হয়েছিল হিমালয়ের উদ্ভিদ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও বিভিন্ন জনজাতি সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য, যা এতদিন বিশ্বের কাছে ছিল অজানা। অভিযানটিতে অংশ নেওয়া গবেষকেরা অক্লান্ত পরিশ্রমের পর বিশ্বের সামনে এনেছিলেন অমূল্য কিছু গবেষণাপত্র। যেগুলি আজ অবধি বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে সমাদৃত হয়ে আছে। এই অসামান্য ঘটনাটির কৃতিত্ব অনেকটাই ছিল অসীম মুখোপাধ্যায়ের।

১৯৭০ সালে অসীম মুখোপাধ্যায় পরিচালনা করেছিলেন আপার স্পিতি অভিযান। অভিযানটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পর্বতারোহী প্রদীপ দাসগুপ্ত। এটি ছিল ‘কাউন্সিল অফ হিমালয়ান এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড রিসার্চ’- এর দ্বিতীয় অভিযান। ১৯৭৪ সালে, কাউন্সিলের সদস্যরা অসীম মুখোপাধ্যায় পরিচালনায় হিমাচলের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মণিরং (৬৫৯৩মি) অভিযানে গিয়েছিলেন। নেতৃত্বে ছিলেন প্রদীপ দাসগুপ্ত। মণিরং শৃঙ্গ আরোহণের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণাও ছিল সেই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে গভীর পাণ্ডিত্য ছিল অসীম মুখোপাধ্যায়ের। বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে দলটি গিয়েছিলে মণিরং শৃঙ্গ আরোহণে।

কিন্তু মণিরং আরোহণের আগে একটি তুষারাচ্ছাদিত গিরিপথ পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলেন দলনেতা প্রদীপ দাসগুপ্ত। তাঁর পা ভেঙে গিয়েছিল। তবুও চলছিল পর্বতারোহণ। মাত্র কয়েকদিন পরেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলেন স্বয়ং অসীম মুখোপাধ্যায়। একটি দুর্গম রক ফেস পার হতে গিয়ে প্রায় ফ্রি-ফল হয়েছিল তাঁর। রক ফেসের ওপর দিয়ে গড়াতে গড়াতে প্রায় ২০০ ফুট নীচে পড়ে গিয়েছিলেন। আরেকটু হলেই স্পিতি নদীতে পড়ে যেতেন। নদীর স্রোতে কোথায় ভেসে যেতেন কে জানে। অসামান্য উপস্থিত বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে একটি পাথরকে আঁকড়ে ধরে কোনও মতে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর হাঁটুতে লেগেছিল ভয়াবহ চোট। ছাড়তে হয়েছিল পর্বতারোহণ। মাউন্ট মণিরং’ই ছিল তাঁর শেষ পর্বতাভিযান।

মণিরং শৃঙ্গ

পর্বতারোহণ আর সম্ভব না হলেও, হিমালয় ছাড়েননি

এর পরও পরিচালনা করেছিলেন একের পর এক অভিযান। কুতি উপত্যকাতে চালিয়েছিলেন দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক অভিযান। ১৯৭৬ সালের এই অভিযানে, দিলীপ দত্তের নেতৃত্বে ‘কাউন্সিল অফ হিমালয়ান এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড রিসার্চ’-এর অভিযাত্রীরা আবিষ্কার করেছিলেন, বেশ কিছু প্রজাতির বিষাক্ত সাপ, কীটপতঙ্গ ও পরজীবী প্রাণি। আবিষ্কার করেছিলেন, প্রায় ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ। যার মধ্যে অনেকগুলি ছিল ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ। এছাড়াও দলটি  চালিয়েছিল নৃতাত্বিক অভিযান। কুতি উপত্যকার সমাজ জীবন ও মানুষজনদের নিয়ে। কুতি উপত্যকায় দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক অভিযানে, পিথরাগড় থেকে কুতি উপত্যকা, এই এলাকার আবহাওয়ার নিয়ে একটি অসামান্য চার্ট বানিয়েছিলেন ডঃ ত্রিদিব বসু। যার প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান।

অসীম মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায়, ডঃ পুলক লাহিড়ীর নেতৃত্বে, ১৯৭৮ সালে ১২ সদস্যের একটি দল গিয়েছিল আর একটি বিশাল অভিযানে। স্পিতি উপত্যকা, পিন উপত্যকা, ইয়াং উপত্যকা, রোপা উপত্যকা, বাসপা উপত্যকা, মনিরং পাস ও মনিরং পিক নিয়ে চলেছিল কাউন্সিল অফ হিমালয়ান এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর গবেষণামূলক অভিযান। দলটিতে ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক ও পর্বতারোহীরা। হিমাচলের উচ্চভূমিতে প্রবাহিত নদীগুলিতে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে গবেষণা করেছিল দলটি। গবেষণা করেছিল পরজীবী প্রাণিদের নিয়েও।

অসীম মুখোপাধ্যায়

ভোলা যায়নি মানুষটিকে, যাবেও না

আজও ধ্যানমগ্ন হিমালয়ের সামনে দাঁড়ালে চোখে পড়ে উত্তুঙ্গ শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গগুলি। যে শৃঙ্গগুলি প্রথম সূর্য ও অস্তরবির রশ্মিপাতে ঝলমল করে ওঠে। নেশাচ্ছন্ন করে তোলে আপামর পর্বতপ্রেমীকে। কিন্তু শৃঙ্গগুলির আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সোনা দানা হিরে মানিকের দিকে চোখ পড়েনি কারও। আসলে সেসব দেখার চোখ খুব কম লোকেরই থাকে। অসীম মুখোপাধ্যায় সে রকমই একজোড়া চোখের অধিকারী ছিলেন। তাই তিনি প্রকৃতির স্বার্থে, মানবজাতির স্বার্থে হিমালয়কে পরিণত করেছিলেন প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরিতে। হিমালয়ের বুকে চালিয়েছিলেন প্রথম বৈজ্ঞানিক অভিযান। মানব ইতিহাসে যা এক অসামান্য অধ্যায় রুপে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

আমরা সবাই জানি, বাংলার পর্বতাভিযানের আকাশে ছিলেন, আছেন ও থাকবেন অনেক নামীদামি নক্ষত্র। তাঁদের তুলনায় হয়তো অসীম মুখোপাধ্যায়ের মুকুটে পালকের সংখ্যা নগন্য। কিন্তু তাতেও মানুষটির হিমালয়সম কৃতিত্ব খাটো হবে না। কারণ, অসীম মুখোপাধ্যায়কে সহস্তে মুকুট পরিয়ে দিয়েছেন দেবতাত্মা হিমালয়। যে মুকুট খুব কম পর্বতপ্রেমীর ভাগ্যেই জুটেছে। তাই বাংলার পর্বতাভিযানের আকাশে নক্ষত্র হতে না পারলেও, হিমালয়ের আকাশে সাতরঙা রামধনু হয়ে অনন্তকাল ধরে আবীর ছড়িয়ে যাবেন অসীম মুখোপাধ্যায়।

চিত্র কৃতজ্ঞতা: www.babusofindia.com, www.himalayanclub.org ,পর্বত অভিযাত্রী সংঘ

You might also like