Latest News

ফরিশতা ও মেয়েরা: সমকালের স্পর্ধিত আখ্যানমালা

বাংলায় লিখিত ভারতীয় গল্পগুলি তাঁর কলমের ও সৃজনের আসল শক্তি প্রকাশ করে।

কুশান গুপ্ত

আমিও সেই পাঠককুলের একজন― যে, ওয়েবজিনে ছড়িয়ে থাকা এক-একটি ছোটগল্প পড়ে, একদিন প্রতিভা সরকার― এই নামটিকে সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছিল। গল্পগুলির ভিন্নতর আখ্যানধর্মিতা ও লেখনীর আন্তরিক পর্যটন স্পর্শ করেছিল, সঙ্গত কারণেই। কেন না, সমকালীন হয়ে গল্পগুলি তখনও একত্রিত একটি মলাটের অভাবে ছিন্ন, তবুও, নিছক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার মতন অপ্রতিভ ইতস্তততায় আক্রান্ত নয়, বরং প্রতিস্পর্ধী হওয়ার দাবিদার।
লক্ষ্যণীয়, তাঁর লেখা, সময়ের ক্ষতদাগগুলি সনাক্ত করতে সতত উৎসুক, এবং, ট্র্যাডিশনে সমাসীন লোকজ ও দেশজ অধুনা-দৈনন্দিনকে একটি ঐকিক জীবন-দর্শনে ধরতে তৎপর। এ-সবই, দৃষ্টি এড়ায়নি।

এখন প্রতিভা-লিখিত তেরোটি একত্রিত গল্পের এই সুলভ মলাটযুক্ত সংকলন, এখানে আরও সংহতভাবে তাঁর মরমিয়া ও সহজিয়া লিখন উপর্যুপরি পড়বার সুযোগ ঘটে গেল। গুরুচণ্ডালি প্রকাশিত ‘ফরিশতা ও মেয়েরা’ এমন একটি সংকলিত গল্পগ্রন্থ, যেখানে সভ্যতার ক্ষতচিহ্নবাহী উপদ্রুত সমকাল এসে যেন, আপাতত আমার পড়ার টেবিলে, একা চ্যাপলিন সেজে বসেছে। লেখকের গল্পসমূহ পড়েই বুঝে নেওয়া যায়― তাঁর প্ৰথম পক্ষপাত, প্রান্তিকের প্রতি। প্রাসঙ্গিক কারণেই দ্বিতীয় ও বাড়তি ঝোঁক লিঙ্গবৈষম্যের প্রতি। সামগ্রিক লেখা এমন প্রতীতিও দেয়― কখনও কখনও ব্যতিক্রমীভাবে লেখক-সংবেদন, দ্বিতীয় বৈষম্যের প্রতি, কিছু বেশি সজাগ। তাই, ‘ফরিশতা ও মেয়েরা’ গ্রন্থের প্রতিটি মেয়েই, বাস্তবানুগ হয়েও, বিনির্মিত, একাকী, তথাপি, লোকজীবনের অসহ্য দেগে দেওয়া ক্ষতস্থলসমূহের ধারক ও বাহক।
এক-একটি গল্পের সতর্ক পাঠ সাক্ষ্য দেয়― আভূমি-শয়ান, এই বেঁচে থেকে মরার উপমহাদেশের বিবিধ নারীদের প্রাপ্য অমেয় একাকিত্ব ও অবুঝ, ব্যর্থ সংরাগের অবস্থান, অদ্যাবধি, একই তলে। এবং, তজ্জনিত সমূহ বিরোধ ও রক্তক্ষরণ এখনও অব্যাহত― এক মধ্যযুগীয়-সমাজ নির্ধারিত ট্যাবু ও টোটেমের বশীকরণ মন্ত্রে সমর্পিত, যা, বস্তুত পুরুষনির্মিত, ও, আদতে সামাজিক অনুমোদন-সাপেক্ষ। এস ওয়াজেদ আলি ভাগ্যিস বেঁচে নেই। না হলে এই গল্পগুলি পাঠ-মোতাবেক হয়তো লিখতেন, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।

সুতরাং, এই সব গল্পে কোথাও তেমন একটা দেখা মিলবে না ফ্লাইওভার আর শপিং মলের চিরাচরিত আলোকিত, ফুল্লকুসুমিত বর্ণনার খামোকা আয়োজন ও ততোধিক নিটোল অযথা অনুষঙ্গ। যদি দিল্লি শহরের দেখা-ও বা মেলে, মিলবে এক পরিত্যক্ত কবরখানার ছায়ার তলে অপেক্ষারত এক প্রান্তিক ভিস্তিওয়ালার, যে আসলে ছদ্মবেশী ফরিশতা। অন্যথায়, এই গ্রন্থের মধ্যবিত্ত-অনুষঙ্গের কতিপয় গল্পেও তাই মধ্যবিত্ত নাগরিকতাও পুরুষতন্ত্রের রুক্ষ ও নির্দয় উপস্থিতি, অবধারিত, দেখাবেই দেখাবে। যা পড়ে পর্যায়ক্রমে ছ্যাঁত করে উঠতে পারে বুক।
প্রিয় পাঠক, যদ্যপি প্রতিভা-লিখিত ‘ক্ষত’ গল্পে মধ্যবিত্ত জীবন আসেও, তা হলে কেউ কেউ মিলিয়ে দেখতে পারেন, তাঁর জীবনের এই ধরনের গোপন কোনও গ্লানিময় বেদনাক্ষত আছে কি না, যা, শৈশব বা কৈশোর সম্পর্কিত, একান্ত লজ্জার।
কোথাও পড়েছিলাম, বেশ কিছু ক্ষেত্রে, মেয়েদের যৌন নিপীড়নের প্রথম তিক্ত ও রুঢ় অভিজ্ঞতাগুলি আসে নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকেই। যৌনতার অনুষঙ্গের প্রায় বর্ণনাহীন এই গল্প এমন এক নিষ্ঠুর, অথচ, সত্যি কথা অকপটে লিখতে পারল! এই সাবলীল লিখন, স্বভাবে আলাদা, মর্মস্পর্শী, এবং, নির্দ্বিধায় প্রতিস্পর্ধী।

এই ‘মেয়েদের গল্পে’ কখনও কখনও এসে পড়ে এক-আধজন পুরুষ ফরিশতা। কোনও এক লেখক বলেছিলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ধার্মিক নই, কিন্তু ধর্মীয় কল্পনার মুখাপেক্ষী।’ প্রতিভার লিখন-ভাবনার মূলদর্শনও হয়তো তাই। তাই শতাধিক কবরে যে নিয়মিত শুশ্রূষার জল ঢালে, সেই ভিস্তিওয়ালার মধ্যে ফরিশতার ঐশ্বরিক শুভরূপ ভর করে ডান কাঁধে, অশুভ বাম কাঁধ হেরে যেতে চায়। আসলে, প্রতিভার এই স্কন্ধময় ফরিশতা, লোকদেবতার গাথার অনুষঙ্গ হলেও তা নিছক-ই অনুষঙ্গ, এই ফরিশতা আদতে মানবিক করুণা নিয়ে আজও দৃশ্যমান― প্ৰকৃত মানুষের মত বিরল কতিপয় মানুষের অস্তিত্বশরীরে, যে-সব মানুষ প্রান্তিক, যারা পরম আস্তিক্যের বারিশুশ্রূষায় শতাব্দীকাল আগলে রেখেছে এই রুগ্ন, খরাপীড়িত দেশ আর গ্রামের নগ্ন কঙ্কাল।

এই দেশের প্রান্তিক জীবনের, লোকজীবনের শিকড় নদীর দুই তীরে প্রোথিত, নিবিড় অরণ্যের সন্নিকটে। প্রতিভার কলম আমাদের নিয়ে যেতে চায় পুরুলিয়ায় প্রবাহিত কাঁসাইয়ের চরের কানু মাহতোর পড়ালিখা করা আশ্চর্য নতুন বউয়ের পাশাপাশি ডুয়ার্সের অচেনা নদী মুজনাইয়ের জঙ্গল-অধ্যুষিত গ্রামের ভীষণ একাকী সেই সদ্যবিবাহিত মেয়েটির কাছে, যার অসহ কষ্টের দিনলিপি লিখে যায় প্রতিভার দুখজাগানিয়া, সহমরমিয়া কলম। রাবিনা নামের সেই মেয়েটি ফজরের নামাজ হলেই দেখতে পায়― ‘অনেক উঁচু, প্রায় আন্ধার আকাশে ঘুমভাঙা পাখির মতো সারিসারি ওড়েন দেবদূতেরা, তাঁদের পথ বরাবর ফুটে থাকে একটি জ্বলজ্বলে শুকতারা। যেন আল্লাহতালার আরসের একটি উজ্জ্বল মণি। ভারী ভালো লাগে তার।’ কিন্তু এরই পাশে জনৈক মৌলবাদী হুজুরের মাইকের চোঙায় ফোঁকা উচ্চকিত বিধান চোখে পড়বে পাঠকের। যে লোকায়ত ধর্মের কাছে নিরক্ষর ও প্রান্তিক মানুষ হাঁটু মুড়ে মানবিকতা ও নৈতিকতা শিখেছে, তা, প্ৰকৃত প্রস্তাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও সহিষ্ণু। এই সহিষ্ণুতার ফেরেশতা হয়েই গল্পে এসে পড়বে ভিস্তিওয়ালা, তার কাছে এসে পৌঁছবে এক আনাড়ি শিখ কিশোর, রেখে যাবে তার প্রেমের স্মারক, যা সে তুলে দিতে চায় এক প্রার্থিত মুসলিম বালিকার জন্য। ভীষণ অসম্ভবের এক ধর্মনির্ধারিত বিভাজন-পাঁচিল চিরকালই এদেশে ছিল, আজ যার দেওয়ালের ওপরে কাঁটাতার উঠছে এই দু’হাজার কুড়ির সেকুলার ভারতে, সেখানে আজকে আর প্রতিভার গল্পগুলি প্রাসঙ্গিক থাকছে না শুধু, তা প্ৰকৃত পাঠকের জন্য অবশ্য ও নিবিড়পাঠ্য হয়ে উঠুক, এমন আকাঙ্ক্ষা থেকেই যাচ্ছে।

মনস্ক পাঠক, পড়তে পড়তে লক্ষ্য করুন, কখনও কাঁসাইয়ের চর থেকে প্রতিভার পর্যটন ধাবমান হচ্ছে সুদূর দিল্লি থেকে হরিয়ানায়, কখনও বা কর্ণাটকের প্রাচীন ইয়েলাম্মার মন্দিরে। যেভাবে ক্রান্তদর্শী মহাশ্বেতার কলম বাংলার প্রান্তিক দোপদী মেঝেনের পাশাপাশি রাজস্থানের রোরুদ্যমান নারীর গল্প বলে প্রান্তিক ও দলিতের ভারতবর্ষের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐকিক শ্রেণি-অবস্থান চিহ্নিত করেছিল, সেই পথেই এগিয়ে যান প্রতিভা। ফলত, আশ্চর্য বুননে নির্মিত হচ্ছে যে গল্প, তার নাম―দেবদাসী। হ্যাঁ, এই পাঁচতারা হোটেল, মসৃণ রানওয়েতে এরোপ্লেনের উড়ে যাওয়ার পাশে, সুশোভিত ব্যুরোক্র্যাট ও তথ্যপ্রযুক্তি ঠাসা আপাতউজ্জ্বল ভারতবর্ষের আড়ালে লুকিয়ে আছে আর একটা অন্ধকার প্রান্তিকের ভারত, যেখানে যতেক মধ্যযুগীয় প্রথার আড়ম্বর, যেখানে নারী, সমাজ-অনুমোদিত, বৈধ ক্রীতদাসীর অধিক কিছু নয়। এ-সবই অলীক দৃশ্য বলে মনে হওয়াই হয়তো সমীচীন হত, কিন্তু, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে আর কোনও কিছুই অসম্ভব লাগে না।
লক্ষ্যণীয়, প্রতিভার এই বাংলায় লিখিত ভারতীয় গল্পগুলি তাঁর কলমের ও সৃজনের আসল শক্তি প্রকাশ করে। এই লেখা লিখতে গেলে ইতিহাসের দার্শনিক প্রত্যয় ও সজাগ স্নায়বিক পক্ষপাত লাগে, সেই সঙ্গে স্থানিক সাংস্কৃতিক ভিন্নতা তুলে ধরতে ন্যারেশনের ভঙ্গির যথাযথ মুন্সিয়ানা প্রয়োজন। এই পাঠকের ব্যক্তিগত মতে, লেখক-প্রতিভা এই সৃষ্টিকাজে উত্তীর্ণ।

পাঠক, এই সংকলন গ্রন্থের এক-একটি গল্প পাঠ করুন, শিউরে আবিষ্কার করুন― জীবন্ত জান্তব রেসকিউয়ার বোটের পুরুষ-হাত অবলীলায় স্পর্শ করছে দুর্ঘটনায় মৃত নারীর স্তন, যা দেখে লজ্জায় নারীটিকে আঁকড়ে তলিয়ে যেতে চাইছে মৃত স্বামীপরিত্যক্তা অন্য এক নারী, জলঝাঁজি কাদামাখা শরীরে জড়িয়ে। অতঃপর পড়ুন, মালদার গ্রাম থেকে অনায়াসে পাচার হয়ে যাওয়া কিশোরী আন্নুর হরিয়ানায় এসে মনে পড়ে যাচ্ছে তার ফেলে আসা স্কুলের ভূগোল বইয়ের পড়া― ‘পপলার একটি পর্ণমোচী বৃক্ষের নাম।’ এবং, পড়ুন, প্রত্যন্ত ওড়িশার কিশোরী তেভাগু কীভাবে সোনাগাছির নারীতে রূপান্তরিত হওয়ার কালেও তার আত্মায় ধরে রাখে জগন্নাথদেবের আকুল ডাক, কীভাবে জলার বালিহাঁসের বাচ্চার মায়াডাক শুনতে পায় সে ঘুমের ভিতর, কীভাবে সে জানে― নিমগাছ পবিত্র, তাই তার বাকলে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ফুটে বেরয়। এই একই ধর্ম-অনপেক্ষ ‘নিম কা পেড়’ অপর গল্পে কবরের অভ্যন্তরে শুয়ে থাকা আমির, পীর ও সিপাহীদের মাথার ওপরে মিঠে হাওয়া এনে দেয়।

আমিও এখন মার্চের বিরল বৃষ্টিস্নাত রাতে পড়তে-পড়তে দেখি, দাঙ্গাবিধ্বস্ত দিল্লির কবরে যেন নেমে আসছে জ্যোৎস্না, মতি নামের ফেরেশতা যেখানে হাঁটু মুড়ে বসে দুই ভিন্নধর্মী কিশোর-কিশোরীর জন্য প্রার্থনারত― ‘হে সর্বশক্তিমান, অনুগ্রহ করে সরল পথ দেখাও।’

ফরিশতা ও মেয়েরা।। প্রতিভা সরকার
প্রকাশক: গুরুচণ্ডা৯
প্রচ্ছদচিত্র: বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী
প্রচ্ছদ: সায়ন কর ভৌমিক
মূল্য: ৯০ টাকা মাত্র

You might also like