Latest News

বারাণসী : একটি শহরের কথকতা

কথা ও ছবির অনবদ্য মিশ্রণে গড়ে উঠেছে এক অত্যাধুনিক দৃশ্য-পাঠ সমৃদ্ধ বই বেনারস। সঠিকভাবে বললে বলতে হবে Banaras of Gods, Humans and Stories. দেশের অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় প্রকাশক নিয়োগী বুকস্ বইটি প্রকাশ করে প্রাচীন এবং সজীব শহর বারাণসীর সঙ্গে পাঠকের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

অমিতাভ রায়

জল ছাড়া জীবন অচল। সেইজন্যই জলকে ঘিরে গড়ে ওঠে জনপদ। সমাজসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে এমনটাই রীতি। জলের যোগান ফুরিয়ে এলে বুড়িয়ে যায় জনপদ। তা সে গ্রাম-নগর-বন্দর যাই হোক না কেন। পৃথিবীর সব প্রান্তেই জল ও জীবনের এই অঙ্গাঙ্গী সম্পৰ্ক ঐতিহাসিকভাবে পরীক্ষিত সত্য। জলের ধারে গড়ে ওঠা এমন এক প্রাচীন জনপদের সঙ্গে কথায় ছবিতে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন নিলোশ্রী বিশ্বাস ও ইরফান নবী।

কথা দিয়ে ছবি এঁকেছেন নিলোশ্রী। আর ছবি দিয়ে গল্প বলেছেন ইরফান। কথা ও ছবির অনবদ্য মিশ্রণে গড়ে উঠেছে এক অত্যাধুনিক দৃশ্য-পাঠ সমৃদ্ধ বই বেনারস। সঠিকভাবে বললে বলতে হবে Banaras of Gods, Humans and Stories. দেশের অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় প্রকাশক নিয়োগী বুকস্ বইটি প্রকাশ করে প্রাচীন এবং সজীব শহর বারাণসীর সঙ্গে পাঠকের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

বারাণসী প্রাচীন শহর। গঙ্গা নদীর তীরে বারাণসীর অবস্থান। কোনও এক সুদূর অতীতে গড়ে উঠেছিল এই জনপদ। বিভিন্ন নথি-পুথি থেকে তথ্য আহরণ করে সেই কাহিনি পুনরুদ্ধার করে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন নিলোশ্রী বিশ্বাস। সময়ের ধারাবাহিকতায় বারাণসীর কীভাবে শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে সেই গল্পও বলা হয়েছে। কথার পর কথা সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে বারাণসীর উত্তরণ। বাদ পড়েনি শহর বারাণসী ও নদী গঙ্গার ভৌগোলিক সম্পর্ক। যে শহরের পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের নানান অধ্যায় তা-ও নিলোশ্রী বিশ্বাসের নিখুঁত পর্যবেক্ষণে বিবৃত হয়েছে। অবশ্যই যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে ইরফান নবীর ছবি।

মন্দিরের প্রাচুর্য বারাণসীর অন্যতম আকর্ষণ। এবং বেশিরভাগ মন্দিরেই শিবের আরাধনা হয়। কাজেই যুগ যুগ ধরেই পুণ্যের সন্ধানে নদীতীরের এই শহরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ধার্মিক মানুষ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ধর্মীয় পর্যটনের এক আকর্ষণ কেন্দ্র বারাণসী। বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এই মন্দিরনগরী ভারতের এক অবশ্য দ্রষ্টব্য স্থান। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী থেকেই এই শহরে ইয়োরোপীয়দের পদার্পণ ঘটেছে। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় এত মন্দিরের সমাহার দেখে তাঁরা মুগ্ধ।

অসংখ্য মন্দির এবং গঙ্গার ঘাট বারাণসীর প্রধান সম্পদ। তীর্থদর্শন তথা পুণ্য অর্জনের জন্য সারা বছরই বারাণসীতে ঘটে বহু লক্ষ মানুষের আগমন। প্রয়োজনের তাগিদে গড়ে উঠেছে পান্থনিবাস, ধর্মশালা, হোটেল ইত্যাদি। সাবেক আমল থেকেই দেশের বিত্তশালীরা বারাণসীতে স্থাপন করেছেন নিজেদের সাময়িক আস্তানা। ফলে এই শহরের স্থাপত্যে প্রতিফলিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্থাপত্যশৈলী। বৈচিত্র্যের মধ্যে বারাণসীতে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য ঐক্য। এই ঐক্যই তো ভারতের চিরায়ত আদর্শ।

মোঘল দরবারেও বারাণসীর সম্মান অক্ষুন্ন ছিল। মোঘলদের মনসবদার রাজপুত রাণারাও যেমন বারাণসীর ঐতিহ্যরক্ষায় সচেতন ছিলেন একইরকম ভাবে মারাঠা পেশোয়ারাও বারাণসীর সম্মানহানির চেষ্টা করেননি। বরং গড়ে তুলেছেন নতুন নতুন মন্দির, অট্টালিকা, পথঘাট ইত্যাদি। মোঘল বাদশাহ্ হুমায়ুনের বারাণসীর প্রতি বোধ হয় কিঞ্চিৎ দুর্বলতা ছিল। জনশ্রুতি, তিনি এখানে অনেক দানখয়রাত করেছিলেন। হুমায়ুনপুত্র আকবরের দরবারে এমন অনেকেই ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে বেনারসের নিবিড় যোগ ছিল। সর্বধর্ম সমন্বয়ের চেতনা ছিল আকবরের। তিনি এই শহরের জন্য অর্থ খরচ এবং সময় খরচ করেছিলেন। বারাণসীর নিজস্ব শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আকবরের প্রতিনিধি হিসেবে টোডর মল, মান সিংহ বারাণসীর উন্নয়নের কাজে নজরদারির দায়িত্ব পালন করতেন। টোডর মল তো এখানে দিল্লি দরবারের একটি প্রশাসনিক শাখাও স্থাপন করেন। শহরের কেন্দ্রে নিজের জন্য একটি প্রাসাদও নির্মাণ করিয়েছিলেন। মান সিংহ কাশী বিশ্বনাথের মন্দির পুননির্মাণ করিয়েছিলেন। আর মান সিংহের বারাণসীর বাসস্থান তো প্রকৃত অর্থেই এক ঐতিহাসিক প্রাসাদ। ১৭৩৭-এ এই প্রাসাদে স্থাপিত হয় ভারতের প্রথম মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। অম্বরের রাজা দ্বিতীয় জয় সিংহ সারা দেশে পাঁচটি মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন যা যনতর-মনতর নামে পরিচিত। এটি ছিল প্রথম। মান সিংহের প্রাসাদে এই কেন্দ্রটি স্থাপিত হওয়ার জন্যই নাকি এর নাম মানমন্দির। মারাঠা মহারাণী অহল্যাবাই হোলকার অষ্টাদশ শতাব্দীতে বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণ করিয়েছিলেন। বলা যায়, কোনও সময়ই প্ৰশাসনের আনুকূল্য থেকে বারাণসী বঞ্চিত হয়নি, বরং দাক্ষিণ্য পেয়েছে।

প্রশাসন পৃষ্ঠপোষক হলে সেই জনপদে শিল্পী-কারিগর-স্থপতিদের কাজের সুযোগ সুবিধা বাড়ে। বারাণসীর ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। এসেছেন বহু পণ্ডিত ও শাস্ত্রজ্ঞ। ধীরে ধীরে তাঁরা সকলেই শহরের সঙ্গে কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে সময়ের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে শিক্ষা-শিল্প-স্থাপত্য-সঙ্গীত-সংস্কৃতির এক নিজস্ব ঘরানা, যা শহর বারাণসীর ঐতিহ্য ও একান্ত আপন, এবং এখনও যার জগৎজোড়া খ্যাতি।

নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের উদার মিশ্রণে জারিয়ে যাওয়া শহর বারাণসীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিচিত্র অর্থনীতি-সংস্কৃতি। তীর্থযাত্রীদের ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন করানো অনেকের পেশা। পর্যটকদের সহায়তা করে অনেকেই রোজগার করেন। গঙ্গাবক্ষে সফর করিয়ে নৌকোর মাঝিদের অন্নসংস্থান করতে হয়। শ্মশানকর্মীরা তো চব্বিশ ঘণ্টা চিতা জ্বালিয়ে দিন গুজরান করেন। নানাবিধ পণ্যের পশরা সাজিয়ে সারা শহর জুড়ে বাণিজ্য করছেন ছোট-বড়-মাঝারি ব্যবসায়ী। আর রয়েছেন কারিগর, শিল্পী প্রভৃতি। বারাণসীর প্রখ্যাত শাড়ি বয়নশিল্পের জগৎজোড়া খ্যাতি। এখানকার হস্তশিল্পের বাজার ছড়িয়ে আছে দুনিয়াজুড়ে। কাঠের তৈরি খেলনা থেকে শুরু করে ধাতুর উপর খোদাই করা মিনাকারি কাজের চাহিদা মেটাতে শিল্পীদের দিবারাত্র কাজ করতে হয়। সঙ্গীতচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় নানারকমের বাদ্যযন্ত্রের জন্যও বারাণসী প্রসিদ্ধ।

অনেকদিন আগে থেকেই বারাণসী সমৃদ্ধ শহর। মোঘল শাসনে শহরটি হস্তশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বেনারসি, জারদোসি, মসলিন, কাঠের কাজ, ধাতুর তৈরি শিল্প-সামগ্রী এবং আরও নানারকমের হস্তশিল্পজাত পণ্য কিছু বারাণসীতে তৈরি হত। গঙ্গার তীরে অবস্থান বলে এখানকার উৎপাদন সহজেই নৌ-পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্যত্র পাঠানো যেত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয়দের আগমনের পর বারাণসীর অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মাদি অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়। রাজস্থানের বণিক সম্প্রদায় সেই মান সিংহের সময় থেকেই বারাণসীর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সেই সম্পর্কে কখনও ছেদ পড়েনি। আরেকটি বিষয়ও রয়েছে। সাধারণ ধর্মীয় ভাবনা ছাড়াও বহু মানুষ নিজেকে বারাণসীর সঙ্গে জড়িয়ে রাখতে চান। এটা এই শহরের ব্যবসায়িক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

গঙ্গার তীরে অবস্থিত প্রাচীন শহর বারাণসীর ভূগোলের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিয়ে নীলোশ্রী বিশ্বাস গল্প বলিয়ের কেতায় একে একে শব্দ বুনে শহরের সমস্ত ক্রিয়াকর্মাদির কোলাজ সাজিয়ে দিয়েছেন। মূলত ধর্মচর্চার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জনপদ থেকে শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থান। তার সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কিছুই বাদ পড়েনি। মন্দিরের পূজা-অর্চনা থেকে গঙ্গায় নৌকাবিহার, গঙ্গার ঘাটে ঘাটে পুণ্যার্থীদের সমাবেশ, আবার একটু দূরে সেই নদীতীরেই অবস্থিত কুস্তির আখড়া, এককথায় বারাণসীর হাঁড়ি-হেঁশেলে ঢুঁ মেরে লেখক এবং চিত্রগ্রাহক পরিবেশন করেছেন শহরের প্রতিদিনের যাপন প্রক্রিয়া।

বারাণসীর মণিকর্ণিকা ঘাটে যখন পুণ্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় সমস্ত রকমের ধর্মীয় আচরণ পালন করে মহিলারা গঙ্গায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন জ্বলন্ত প্রদীপ ঠিক তখনই একটু দূরের শ্মশানে পুড়তে থাকে মানুষের মৃতদেহ। আবার ৫০ মিটার দূরের অন্য কোনও ঘাটে যখন কোনও শিশুর মুণ্ডন হচ্ছে ঠিক তখনই হয়তো কোনও নববিবাহিত দম্পতি গঙ্গার আশীর্বাদ নিতে সেখানে উপস্থিত। জীবন-মৃত্যু চক্রর এমন সহাবস্থানের ছবি কি অন্য কোনওখানে দেখা যায়? হয়তো এই কারণেই বারেবারেই গল্প-উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের পটভূমি হয়ে ওঠে বারাণসী। সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত বারাণসীর এই বিচিত্র বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করতে পারেননি। দু’দশকের ব্যবধানে নির্মাণ করেছেন ‘অপরাজিত’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’।

বইটির ছত্রে ছত্রে কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা থাকায় ধরা পড়েছে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বারাণসীর অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ। পূর্বনির্ধারিত কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্র সামনে রেখে (মাস্টার প্ল্যান) এই সম্প্রসারণ না হওয়ায় বারাণসী হয়ে গেছে বিভিন্ন সময়ের সমাহার। ফলে গলি-ঘুঁজি সমৃদ্ধ বারাণসীর পথ পরিক্রমা মোটেও সহজ নয়। তবে শহর সফরের যন্ত্রণা লাঘব করে প্রায় সব রাস্তার পাশের খাবারের দোকান। শুধুমাত্র দুধকে প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে কত রকমের খাবার-মিষ্টান্ন-পানীয় বানানো যায় তার স্বাদ গ্রহণ করতে হলে বারাণসী ভ্রমণ অবশ্যকর্তব্য। লেখক এবং চিত্রগ্রাহক সেই দুরূহ কাজটিও সাবলীল ছন্দে অনুপুঙ্খভাবে তুলে ধরায় পাঠকের রসনা প্ররোচিত হতে বাধ্য।

এত বিস্তারিত অনুসন্ধান-পর্যবেক্ষণ, তথ্য আহরণ, চিত্রগ্রহণের মধ্যে কীভাবে যেন হারিয়ে গেছে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি। শহরের দক্ষিণ প্রান্তে গঙ্গার তীরে প্রায় সাড়ে পাঁচ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কে সুখপাঠ্য ও সুদৃশ্য বইটিতে উল্লেখ করার দরকার ছিল।

সবমিলিয়ে নীলোশ্রী বিশ্বাস এবং ইরফান নবী বারাণসীর ওপর একটি অনবদ্য হ্যান্ডবুক নির্মাণ করেছেন। যত্ন নিয়ে সম্পাদনা করেছেন অরুণিমা ঘোষ। বইটির বিন্যাসশৈলীর দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন নবনীতা দাস। সুদৃশ্য প্রচ্ছদ রচনা করেছেন তৃষা দে নিয়োগী। সকলের সৃজনকে সম্মান জানিয়ে নিয়োগী বুকস্ যথাযথভাবে বইটি প্রকাশের দায়িত্ব পালন করে প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য আরও একবার অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

Banaras of Gods, Humans and Stories
Nilosree Biswas & Irfan Nabi
Niyogi Books, New Delhi, 2021
ISBN : 978-93-89136-77-7

You might also like