Latest News

মাদাম কুরির ডায়েরি, ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়াবে আরও দেড় হাজার বছর

Madam Curie's diary will Be radioactive for another 1,500 years

Madam Curie’s diary

 রূপাঞ্জন গোস্বামী

৪ জুলাই, ১৯৩৪
ফ্রান্সের সানসেলমজ স্বাস্থ্যনিবাসটির জানলার বাইরে, পড়ন্ত বিকেলের বিষণ্ণতা ও মৃত্যুর ধূসর ছায়া ক্রমশ ঘিরে ফেলেছিল ম্যাপল গাছগুলিকে। ঘরের ভিতর বিছানায় শুয়ে ছিলেন আধুনিক পদার্থবিদ্যার জননী মাদাম মেরি কুরি (Marie Curie)। প্রথম মহিলা হিসেবে যিনি দুটি ভিন্ন বিভাগে, ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। যাঁকে বিশ্ব চেনে মাদাম কুরি নামে।

মাদাম কুরি

মায়ের বিছানা থেকে একটু দূরে বসেছিলেন ছোট মেয়ে ইভ। বিছানার সঙ্গে মিশে যাওয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করছিলেন, “মা কেন চুপচাপ হয়ে গেল! আর কেন কাঁপছে না মায়ের হাত দু’টো।”

মাকে ছোঁয়ার অনুমতি ছিল না। মাদাম কুরির হাত দু’টি ক্রমশ শক্ত হতে শুরু করেছিল। হাতের চামড়ার জায়গায় জায়গায় পুড়ে যাওয়ার মত অসংখ্য কালো কুচকুচে দাগ দেখতে পাচ্ছিলেন ইভ। সেগুলি তেজস্ক্রিয়তার চুম্বনের চিনহ। ক্রমশ  দ্রুত হতে শুরু করেছিল ঘরের ভিতরে চিকিৎসক ও নার্সদের চলাফেরা।

একসময়  মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন চিকিৎসক। যাওয়ার আগে ইভকে বলে গিয়েছিলেন,” মাদাম আর নেই।” সূর্য্যের শেষ রশ্মি গায়ে মেখে পৃথিবী ছেড়েছিলেন মাদাম কুরি। মৃত্যুর কারণ ‘অ্যাপ্লাস্টিক পার্নিসিয়াস অ্যানিমিয়া’। ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তার ফলে কার্যক্ষমতা হারিয়েছিল মাদাম কুরির হাড়ের ভেতরে থাকা মজ্জা। মাদাম কুরির শরীরে রক্তকণিকা তৈরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল চিরতরে।

এই স্বাস্থ্যনিবাসেই প্রয়াত হয়েছিলেন মাদাম কুরি

রহস্যময় পিচব্লেন্ড

ফরাসি বিজ্ঞানী আঁতোয়া অঁরি বেকরেল, ১৮৮৬ সালে এক্স-রে নিয়ে গবেষণা করার সময় দেখতে পান ইউরেনিয়াম ধাতুর পরমাণু থেকে অস্বাভাবিক ক্ষমতাসম্পন্ন রশ্মি নির্গত হচ্ছে। যে রশ্মি প্রায় সবকিছুকেই ভেদ করতে সক্ষম। ঘটনাটি বিজ্ঞান জগতে তুলেছিল আলোড়ন।

বিজ্ঞানী বেকরেলের গবেষণাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মাদাম কুরি। ইউরেনিনাইট বা পিচব্লেন্ড থেকে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম নিষ্কাশন করতেন। একদিন মাদাম কুরি আবিষ্কার করেছিলেন, পিচব্লেন্ডের ভেতর ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম ছাড়াও লুকিয়ে আছে আরও একটি ভয়ঙ্কর তেজস্ক্রিয় মৌল। যার শক্তি, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের সম্মিলিত শক্তির চেয়েও কয়েক লক্ষগুণ বেশি।

ইউরেনিনাইট বা পিচব্লেন্ড

দিনরাত এক করে মাদাম কুরি শুরু করেছিলেন গবেষণা। ১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে বিশ্বের বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়ে মাদাম কুরি আবিষ্কার করেছিলেন অমিত শক্তিধর মৌল পোলোনিয়াম (polonium)। নিজের দেশ পোল্যান্ডের নামে তেজস্ক্রিয় মৌলটির নাম রেখেছিলেন মাদাম কুরি। এর পাঁচ মাস পরে পিচব্লেন্ড থেকে আলাদাভাবে রেডিয়াম নিষ্কাশন করেছিলেন কুরি দম্পতি।

বোহেমিয়া থেকে যখন পিচব্লেন্ডের টিন আসত মাদাম কুরির ল্যাবরেটরিতে, উত্তেজনার বশে অনেক সময় তিনি ইলেক্ট্রোমিটার নিয়ে পিচব্লেন্ডের ভেতরে সরাসরি হাত ডুবিয়ে দিতেন। কোনওরকম সুরক্ষা না নিয়েই। পিচব্লেন্ডের গোপন রহস্য জানার জন্য মাদাম কুরি এত উদগ্রীব হয়ে পড়তেন, যে নিজের সুরক্ষা নেওয়ার সময়টুকু নষ্ট করতে চাইতেন না। অথচ তিনি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের তেজস্ক্রিয় মৌলের টেস্ট টিউব ধরতে বলতেন চিমটা দিয়ে। তাঁদের সুরক্ষিত করতেন সিসার আস্তরণ দেওয়া দস্তানা পরিয়ে। কিন্তু এক অসীম অবহেলায় নিজের ল্যাবরেটরি ড্রেসের পকেটে রাখতেন তেজস্ক্রিয় পদার্থ ভর্তি টেস্টটিউব।

পদার্থবিদ স্বামী পিয়ের কুরির সঙ্গে মাদাম কুরি

আবিষ্কারকের শরীরে ছোবল মেরেছিল আবিষ্কার

যে দুটি তেজস্ক্রিয় মৌল আবিষ্কারের জন্য তাঁর ভুবনজোড়া নাম, সেই দুটি  পদার্থ পোলোনিয়াম ও রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তাই হয়ে উঠেছিল মেরি কুরির মৃত্যুর একমাত্র কারণ। মেরি শেলী রচিত ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন: অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’ নামক বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাসটির দানবটির মতোই, রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম কামড় বসিয়েছিল আবিষ্কারকের শরীরেই।

তবে হিরোশিমা নাগাসাকির ভাগ্যাহত লক্ষ লক্ষ মানুষদের মত তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যে মারা যাননি মাদাম কুরি। দিনের পর দিন, এক পা এক পা করে এগিয়ে গিয়েছিলেন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। এবং তিনি জানতেন তাঁর মৃত্যুর কারণ। মৃত্যুর পর মাদাম কুরিকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত একটি বিখ্যাত সমাধিক্ষেত্রে। যেখানে শুয়ে ছিলেন দার্শনিক রুশো, ভলতেয়ার সহ ফ্রান্সের আরও অনেক বিখ্যাত মানুষ।

মৃত্যুর পরেও মাদাম কুরির শরীর ছড়িয়ে চলেছিল তেজস্ক্রিয়তা। তাই তাঁর দেহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশকে বাঁচাতে, মাদাম কুরির কফিনকে মুড়ে ফেলা হয়েছিল এক ইঞ্চি পুরু সিসার আস্তরণ দিয়ে।

Madam Curie
মাদাম কুরির সমাধি

আরও ১৫০০ বছর!

আজ থেকে ৮৮ বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মাদাম কুরি। তবুও তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, যেমন আসবাবপত্র, রান্না শেখার বই, ডায়েরি বা ল্যাবরেটরি নোটবুকগুলি এখনও ছড়িয়ে চলেছে তেজস্ক্রিয়তা । ছড়াতে থাকবে আগামী ১৫০০ বছর। কারণ এই সমস্ত জিনিসপত্রে লেগে আছে ভয়ঙ্কর তেজস্ক্রিয় মৌল রেডিয়াম-২২৬, যার তেজস্ক্রিয়তার আয়ু ১৫০০ বছর।

আরও পড়ুন: “সমাজের চোখে আমি নষ্ট নারী, ফাইন আর্টসের ছাত্রদের কাছে আমি আজও দেবী”

বিজ্ঞানীদের কাছে তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থের খনি হিসেবে পরিচিত মাদাম কুরির ডায়েরি বা ল্যাবরেটরি নোটবুক। যেটি এক সিসার বাক্সে ভরে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে রাখা আছে ফ্রান্সে লাইব্রেরিতে। সেই লাইব্রেরিতেই রাখা আছে মাদাম কুরির বিভিন্ন গবেষণার পাণ্ডুলিপি। আজও সেগুলি দেখতে দেওয়া হয় দেশ বিদেশের অতিথি ও গবেষকদের। তবে দেখার আগে সবাইকে সই করতে হয় একটি আইনি হলফনামায়। লিখিতভাবে ঘোষণা করতে হয়, মাদাম কুরির জিনিসপত্র দেখতে গিয়ে শারীরিক ক্ষতি বা মৃত্যু হলে কতৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।

মাদাম কুরির সেই তেজস্ক্রিয় ডায়েরি

খুনিদের চিনতে পেরেছিলেন মাদাম কুরি

মাদাম কুরি প্রায়ই ল্যাবরেটরিতে তাঁর ছাত্র ও সহ-বিজ্ঞানীদের বলতেন, “পোলোনিয়াম আর রেডিয়াম আমার ওপর রাগ পুষে রেখেছে।” কেন এ কথা বলতেন তিনি! তাঁর কথার অন্তর্নিহিত অর্থ তখন কেউ অনুধাবন করতে পারেননি। কিন্তু মাদাম কুরি জানতেন কী হতে চলেছে।

মাদাম কুরির মৃত্যুর জন্য দায়ী এই রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম

মাদাম কুরি তাঁর ভবিষ্যতের খুনিদের আগে থেকেই চিনে  ফেলেছিলেন। এবং বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন। তাই নিজের সুরক্ষার ব্যাপারে ছিল তাঁর চরম অবহেলা। নাকি, নিজের আবিষ্কারের হলাহল নিজে পান করে নীলকন্ঠ হতে চেয়েছিলেন মাদাম কুরি। হয়ত এভাবেই বিজ্ঞান ও ভবিষৎ প্রজন্মকে তেজস্ক্রিয়তা সম্বন্ধে সাবধান করে দিয়ে গিয়েছিলেন মাদাম কুরি, নিজেকেই নিজের ল্যাবরেটরির গিনিপিগ বানিয়ে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like