Latest News

ভক্ত রামপ্রসাদকে যে রূপে দেখা দিয়েছিলেন স্বয়ং মা কালী

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: অষ্টাদশ শতাব্দী, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবের আসনে আসীন ছিলেন সিরাজ-উদ-দৌল্লা। শৌখিন নবাবের নানা শখের মধ্যে ছিল দুষ্প্রাপ্য রত্ন সংগ্রহের শখও। নবাবের সেই শখ পূরণ করতেন উত্তর কলকাতার ধনাঢ্য রত্ন ব্যবসায়ী দুর্গাচরণ মিত্র। বাগবাজারে ছিল তাঁর সেরেস্তা। একদিন সেরেস্তা থেকে হন্তদন্ত হয়ে দুর্গাচরণবাবুর কাছে ছুটে এসেছিলেন তাঁর খাজাঞ্চি। হাতে হিসাবের খাতা। খাজাঞ্চি বলেছিলেন, কর্তা সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। যে ছোকরার ওপর হিসেব রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সে হিসেবের খাতায় হিসেব না কষে কীসব লিখে রেখেছে দেখুন! পুরো হিসেব গুলিয়ে দিয়েছে। এই লোককে পত্রপাঠ বিদেয় না করলে আরও বড় ক্ষতি হয়ে যাবে কর্তা।
রাগে দুর্গাচরণ মিত্রের মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছিল। কর্মচারীটিকে শাস্তি দেওয়ার আগে স্বচক্ষে দেখে নেওয়ার জন্য জাবেদা খাতাটা খুলেছিলেন দুর্গাচরণবাবু। উলটে গিয়েছিলেন পাতার পর পাতা। বদলে গিয়েছিল দুর্গাচরণবাবুর অভিব্যক্তি। জাবেদা খাতার পাতার পর পাতায় হিসেবের বদলে লেখা কালীকীর্তন। একটি পাতায় আটকে গিয়েছিল কালীভক্ত দুর্গাচরণ মিত্রের চোখ। সেই পাতায় খাগের কলম দিয়ে কর্মচারীটি লিখেছিল,

আমায় দেও মা তবিলদারি
আমি নিমকহারাম নই শংকরী।।
পদরত্নভাণ্ডার সবাই লুটে
ইহা আমি সইতে নারি।
ভাঁড়ার জিম্মা যার কাছে মা
সে যে ভোলা ত্রিপুরারি॥
শিব আশুতোষ স্বভাবদাতা
তবু জিম্মা রাখ তাঁরই,
অর্ধ অঙ্গ জায়গির,
তবু শিবের মাইনে ভারী॥
আমি বিনা মাইনার চাকর
কেবল চরণধুলার অধিকারী।
যদি আমার বাপের ধারা ধর,
তবে বটে আমি হারি॥
যদি আমার বাপের ধারা ধর
তবে তো মা পেতে পারি।
প্রসাদ বলে এমন পদের,
বালাই লয়ে আমি মরি।
ও পদের মতো পদ পাই তো,
সে পদ লয়ে বিপদ সারি॥

খাতা নিয়ে দুর্গাচরণ মিত্র দৌড়েছিলেন সেরেস্তার দিকে। তাঁর থেকেও বড় কালীভক্তকে দেখার জন্য। যিনি শাস্তির খাঁড়া অগ্রাহ্য করে মা কালীর পদতলে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন তুরীয়ানন্দের সন্ধান পেয়ে। দুর্গাচরণবাবুকে সেরেস্তায় হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখে খুশি হয়েছিলেন সেরেস্তার কর্মচারীরা। এবার সেরেস্তা থেকে বিদায় হবে আপনভোলা ছোকরাটি। সেরেস্তায় ঢুকে দুর্গাচরণবাবু সটান চলে গিয়েছিলেন যুবক রামপ্রসাদ সেনের কাছে। রামপ্রসাদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,”হিসেবের খাতায় কেন কালীকীর্তন লিখলেন!” চাকরি হারানোর ভয়ে শঙ্কিত রামপ্রসাদ, ছলছল চোখে দুর্গাচরণবাবুকে বলেছিলেন তাঁর জীবনকাহিনি।হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত হালিশহর (কুমারহট্ট) গ্রামের এক বৈদ্যব্রাহ্মণ পরিবারে রামপ্রসাদের জন্ম। পিতা রামরাম সেন ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে তাঁর পেশা গ্রহণ করুক। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই রামপ্রসাদকে আকর্ষণ করত আধ্যাত্মিক জগৎ। পাছে ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে যায়, তাই বাইশ বছর বয়সি রামপ্রসাদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল বালিকা সর্বাণীর। পারিবারিক প্রথানুযায়ী বিবাহের পর কুলগুরু মাধবাচার্যের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন রামপ্রসাদ ও সর্বাণী।সেই দিন থেকেই রামপ্রসাদ মা কালীর পদতলে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গদেশে কালী পূজার প্রবর্তক, তান্ত্রিক যোগী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের শিষ্যত্ব। রামপ্রসাদকে তন্ত্রসাধনা ও কালীপূজা পদ্ধতির শিক্ষা দিয়েছিলেন মহাযোগী আগমবাগীশ। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সংসারে নেমে এসেছিল দারিদ্র্য। তাই বাধ্য হয়ে কালীসাধনা ত্যাগ করে দুর্গাচরণ মিত্রের সেরেস্তায় খাতা লেখার কাজ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই কাজ তাঁর জন্য নয়। কারণ মা কালী ছাড়া তাঁর মাথায় অন্য কোনও চিন্তা আসেনা। নেহাত সংসারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে তিনি সেরেস্তায় কাজ নিয়েছেন।রামপ্রসাদ সেনের অকপট স্বীকারোক্তি শুনে দুর্গাচরণের চোখ জলে ভরে উঠেছিল। ভাববিহ্বল হয়ে তিনি চেপে ধরেছিলেন রামপ্রসাদের হাতদুটো। বলেছিলেন, রামপ্রসাদকে আর সেরেস্তায় কাজ করতে হবে না। তিনি বাড়ি ফিরে গিয়ে কালী মায়ের সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করুন। তাঁর সংসার চালানোর ভার এখন থেকে দুর্গাচরণের। মাস মাইনের তিরিশ টাকা প্রতিমাসে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। স্তম্ভিত রামপ্রসাদ কালীনাম জপ করতে করতে বিদায় নিয়েছিলেন দুর্গাচরণ মিত্রের সেরেস্তা থেকে।

রামপ্রসাদ সেন হয়েছিলেন সাধক রামপ্রসাদ
গ্রামে ফিরে রামপ্রসাদ বেছে নিয়েছিলেন তন্ত্রমতে পবিত্র একটি স্থান। সেখানে স্থাপন করেছিলেন পঞ্চবটী এবং পঞ্চমুণ্ডীর আসন। জগৎসংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডুবে গিয়েছিলেন নিগূঢ় কালীসাধনায়। প্রথম দশবছর বীরাচার, তারপর দিব্যাচারী সাধনায় নিমগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন রামপ্রসাদ। সারাদিন পড়ে থাকতেন পঞ্চমুণ্ডীর আসনে। কাছেই এক চালাঘরে মায়ের প্রতিমা নিজে তৈরি করে নিত্যপূজা করতে শুরু করেছিলেন। সারাদিন কাটত তাঁর মায়ের ধ্যান, পূজা, হোম, যজ্ঞ নিয়ে। মায়ের নাম জপ করতেন অষ্টপ্রহর। এরই ফাঁকে মাকে শোনাতেন স্বরচিত শ্যামাসঙ্গীত। আবেগ বিহ্বল রামপ্রসাদের চোখ থেকে তখন ঝরে পড়ত অশ্রুধারা।আপামর বাঙালির কাছে রামপ্রসাদ সেন হয়ে গিয়েছিলেন সাধক রামপ্রসাদ।

শ্যামাসংগীতে এসেছিল রামপ্রসাদী ধারা
কালীসাধনার পাশাপাশি রামপ্রসাদ অক্ষর দিয়ে বেঁধে রাখতেন মায়ের প্রতি তাঁর আবেগ ও অনুভূতিগুলোকে। তিনিই বাংলার প্রথম কবি, যিনি স্বরচিত শ্যামাসংগীতের মাধ্যমে তান্ত্রিকদের শ্মশানবাসিনী দেবী কালীকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাঙালির ঘরে ঘরে। রামপ্রসাদ রচিত শ্যামাসংগীতে মা কালী ভয়ংকর ও উগ্ররূপিণী দেবী নন। কখনও তিনি মা, কখনও মেয়ে, কখনও স্ত্রী।তাঁর গানের মুগ্ধ শ্রোতা ছিলেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। তিনি রামপ্রসাদকে সভাকবি হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যিনি মা কালীর শেকলে নিজেকে বেঁধেছেন, তিনি রাজার গোলামি করবেন কেন! তাই তিনি প্রস্তাবটি সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তার পরিবর্তে মহারাজকে উপহার দিয়েছিলেন বিদ্যাসুন্দর কাব্য। কাব্যটি  মহারাজা পড়তে দিয়েছিলেন মঙ্গলকাব্যের প্রবাদপ্রতিম কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরকে। কাব্যটি পাঠ করে মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন ভারতচন্দ্র। তাঁর প্রস্তাব অনুমোদন করে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদকে দিয়েছিলেন ‘কবিরঞ্জন’ উপাধি। ঊনবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও রামপ্রসাদী সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন। সর্বক্ষণ তাঁর সুমিষ্ট কণ্ঠে ধ্বনিত হত রামপ্রসাদের লেখা শ্যামাসংগীতের কলিগুলি।নিজেকে ‘কালীর বেটা’ বলতেন সাধক কবি রামপ্রসাদ। তাই তাঁর লেখায় ঝরে পড়ত মা কালীর প্রতি তাঁর যত ভালোবাসা, আবেগ, অভিমান, এমনকি রাগও। তবে প্রতিটি শব্দে মিশে থাকত ভক্তিরস। কখনও তিনি মা কালীকে নিজের মেয়ে ভেবে, চরম অভিমানে লিখেছেন,
“আর তোমায় ডাকব না কালী।
তুমি মেয়ে হয়ে অসি ধরে,
ল্যাংটা হইয়ে রণ করিলি॥
দিয়াছিলে একটা বৃত্তি,
তাও তো দিয়ে হরে নিলি।”
আবার তিনিই অনুভব করেছিলেন, জগজ্জননী মা কালীর পদতল বিনা গতি নেই। তাই লিখেছিলেন,
“মন রে কৃষিকাজ জানো না।
এমন মানব-জমিন রইলো পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।।
কালীনামে দেওরে বেড়া, ফসলে তছরূপ হবে না।
সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া, তার কাছেতে যম ঘেঁসে না।।”কখনও রামপ্রসাদ মাকে জানাচ্ছেন তাঁর দুঃখের বারমাস্যা। অধর্মে ডুবে যাওয়া দেশ ছাড়তে চাইছেন তিনি। কিন্তু পারছেন না, কারণ এ দেশের মাটি কালী মায়ের পদস্পর্শে ধন্য। তাই সাধক কবি লিখেছিলেন,
“আমি এত দোষী কিসে ।
ওই যে প্রতিদিন হয় দিন যাওয়া ভার,
সারাদিন মা কাঁদি বসে ॥
মনে করি গৃহ ছাড়ি, থাকব না আর এমন দেশ।।
…কিন্তু এমন কল করেছ কালী,
বেঁধে রাখে মায়াপাশে॥”

কখনও ছদ্ম-রাগ দেখিয়ে মাকে খেয়ে নেওয়ার কথা বলে লিখেছেন,
“এবার কালী তোমায় খাব।
(খাব খাব গো দীনদয়াময়ী)
তারা গণ্ডযোগে জন্ম আমার ॥
গণ্ডযোগে জন্ম হলে
সে হয় যে মা-খেকো ছেলে ।
এবার তুমি খাও কী আমি খাই মা,
দুটার একটা করে যাব ॥”
আসলে তিনি এই গানটির মাধ্যমে নিজের শরীরের প্রতিটি কোষে কোষে ভবতারিণী মায়ের উপস্থিতি চেয়েছেন। মায়ের প্রতি তাঁর রাগও যে সর্বোকৃষ্ট ভক্তিরস, যার তুলনা মেলা ভার।

ভিটের বেড়া বেঁধেছিলেন মা কালী
ভারতের বেশিরভাগ উচ্চকোটির সাধক সাধিকার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা অলৌকিক কাহিনি। যা বিজ্ঞাননির্ভর সভ্যতার কাছে অবাস্তব মনে হলেও, সেসব কাহিনি বিশ্বাস করেন ভক্তিরসে আপ্লুত ভক্তকুল। সেরকমই কিছু কাহিনি জড়িয়ে আছে সাধক রামপ্রসাদের জীবনের সঙ্গে। কাহিনিগুলির বেশিরভাগই লোকমুখে প্রচারিত।
একবার প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য রামপ্রসাদের ভিটের বেড়া ভেঙে গিয়েছিল। কন্যা জগদীশ্বরীকে সঙ্গে নিয়ে রামপ্রসাদ গিয়েছিলেন বেড়া বাঁধতে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গিয়েছিল বেড়া বাঁধতে বাঁধতে। রামপ্রসাদ আহার করে বেড়া বাঁধতে এলেও, জগদীশ্বরীর দুপুরের খাওয়াদাওয়া হয়নি। তাই সে রামপ্রসাদকে না জানিয়েই চলে গিয়েছিল আহার করতে। শ্যামাসংগীতে ডুবে বেড়া বাঁধতে থাকা রামপ্রসাদ টের পাননি যে জগদীশ্বরী বেড়ার ওপাশে নেই। কারণ বেড়ার অপরদিক থেকে বেড়া বাঁধার দড়িটি ফিরে আসছিল।ফিরে এসে জগদীশ্বরী দেখেছিল বেড়া বাঁধার কাজ প্রায় শেষ। বিস্মিত জগদীশ্বরী রামপ্রসাদকে জিজ্ঞেস করে, রামপ্রসাদ কীভাবে একা এতখানি বেড়া দিয়ে ফেললেন। জগদীশ্বরী তো অনেকক্ষণ ছিলেন না, ঘরে খেতে গিয়েছিলেন। তখন রামপ্রসাদ মাটিতে লুটিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “এত কাছে এলি, তবুও দেখা দিলি না মা!” এই ঘটনাটির পরে রামপ্রসাদ লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত শ্যামাসংগীত,
“মন কেন মায়ের চরণ ছাড়া।
ও মন ভাবো শক্তি, পাবে মুক্তি, বাঁধ দিয়ে ভক্তি-দড়া,
সময় থাকিতে না দেখলে মন, ছি ছি রে তোর কপাল পোড়া।
মা ভক্তে ছলিতে তনয়া রূপেতে, বাঁধেন আসি ঘরের বেড়া।”এতকাছে এসেও দেখা দিলেন না আরাধ্যা কালী মা। এই আক্ষেপে আহার নিদ্রা ত্যাগ করেছিলেন রামপ্রসাদ। সারাদিন পড়ে থাকতেন পঞ্চমুণ্ডীর আসনে। এক অমাবস্যার রাতে, কালীর বেটা রামপ্রসাদ প্রতিদিনের মতোই আকুল হয়ে তাঁর মাকে ডেকে চলেছিলেন। চোখ থেকে অবিরাম ঝরে পড়ছিল অশ্রুধারা। মধ্যরাতে আলোকিত হয়ে উঠেছিল পঞ্চবটী। দিব্যজোতির মাঝে আবির্ভূতা হয়েছিলেন মা এলোকেশী। ভাববিহ্বল রামপ্রসাদ ‘মা’ ‘মা’ বলে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন পঞ্চমুণ্ডীর আসনে।

গাব গাছে ধরেছিল পদ্মফুল
নিষ্ঠাভরে তান্ত্রিক মতে কালীমায়ের নিত্যপুজো করতেন রামপ্রসাদ। একদিন রাত্রে মায়ের পুজো করার সময় মায়ের অর্ঘ্যে পদ্মফুল রাখার ইচ্ছে হয়েছিল তাঁর। ফুলের ডালিতে অন্যান্য ফুল থাকলেও পদ্মফুল ছিল না। আকুল রামপ্রসাদ কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলেছিলেন, “মা তোর ইশারাতেই জগৎ চলে, আমার বাসনা পূর্ণ কর মা।” সেই মুহূর্তে তাঁর কানে কেউ ফিসফিস করে বলেছিল, “বাড়ির কোণে যে গাব গাছটি আছে, সেখানে যা, পদ্মফুল পাবি।” বিস্মিত রামপ্রসাদ দৌড়ে গিয়েছিলেন গাবগাছটির কাছে। স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিলেন, মায়ের অপার লীলায় গাবগাছের ডালগুলিতে ফুটে উঠেছে অগণিত পদ্মফুল। আত্মহারা রামপ্রসাদ পদ্মফুল এনে নিবেদন করেছিলেন মায়ের চরণে।

রামপ্রসাদের গানে মুগ্ধ হয়েছিলেন সিরাজ-উদ-দৌল্লা
একবার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, নিজের বজরাতে করে রামপ্রসাদকে নিয়ে গিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদে। নবাবের দফতরে কিছু বৈষয়িক কাজ ছিল তাঁর। মহারাজার আবদারে তাঁকে প্রতিসন্ধ্যায় শ্যামাসংগীত শোনাতেন রামপ্রসাদ। কোনও একদিন নবাবি বজরা করে সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছিলেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বজরার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল নবাবের বজরা। সংগীতের অনুরাগী নবাবের কানে ভেসে এসেছিল সুধামাখা কালীকীর্তন। নবাব জিজ্ঞেস করেছিলেন, কে গাইছে এমন মধুর কণ্ঠে? বজরার মাঝিরা জানিয়েছিল কণ্ঠটি রামপ্রসাদের।থেমে গিয়েছিল নবাবের বজরা। রামপ্রসাদকে তাঁর বজরায় এসে গান শোনাবার অনুরোধ করেছিলেন নবাব। নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লাকে খুশি করার জন্য ফার্সিতে গজল গেয়েছিলেন রামপ্রসাদ। কিন্তু গানটি থামার পর নবাব বলেছিলেন, তুমি যে গানে আমাকে টেনেছ, আমি তোমার কণ্ঠে সেই শ্যামাসংগীত শুনতে চাই। এরপর রামপ্রসাদ একের পর এক শ্যামাসংগীত গেয়ে গিয়েছিলেন। বিধর্মী নবাবও ডুবে গিয়েছিলেন রামপ্রসাদী শ্যামাসংগীতের ভাবসাগরে।

রঘু ডাকাত ও রামপ্রসাদ
মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র তখন মৃত্যুশয্যায়। মৃত্যুর আগে রামপ্রসাদকে দেখতে চেয়েছিলেন মহারাজা। মহারাজের সঙ্গে দেখা করে, তাঁকে গান শুনিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন রামপ্রসাদ। ত্রিবেণির খেয়াঘাটে তাঁকে ঘিরে ফেরেছিল কালীভক্ত রঘু ডাকাতের দলবল। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে নরবলির প্রয়োজন। তাই পথিক রামপ্রসাদকে স্নান করিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কালী প্রতিমার সামনে স্থাপন করা হাড়িকাঠের সামনে।
রঘু ডাকাতকে রামপ্রসাদ বলেছিলেন মৃত্যুর আগে, তিনি একবার মায়ের পুজো করে নিতে চান। নিষ্ঠাভরে কালীপুজো সমাপ্ত করেছিলেন রামপ্রসাদ। তারপর শ্যামাসংগীত গাইতে গাইতে নির্ভীক রামপ্রসাদ হাড়িকাঠে গলিয়ে দিয়েছিলেন গলা। বলির খাঁড়া উঠে এসেছিল এক ডাকাতের হাতে। কোপ দেওয়ার আগের মুহূর্তে সভয়ে ডাকাত দল দেখেছিল, রামপ্রসাদের মুখের জায়গায় মা কালীর মুখ।হাত থেকে ছিটকে পড়েছিল খাঁড়া। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলি। রামপ্রসাদের পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল রঘু ডাকাত ও তার দলবল। পরদিন ভোরে নিজের নৌকায় রামপ্রসাদকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল রঘু ডাকাত। ঘটনাটি আমূল পরিবর্তন এনেছিল রঘু ডাকাতের জীবনে। ডাকাতি ও নরবলি ত্যাগ করে রঘু ডাকাত হয়ে উঠেছিল কালীসাধক।

গঙ্গাবক্ষে কালীর কোলে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন সাধক কবি
প্রতিবছরের মতো ১৭৮১ (মতান্তরে ১৭৭৫) সনেও দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজার আয়োজন করেছিলেন রামপ্রসাদ। বিপত্নীক রামপ্রসাদকে মাতৃ আরাধনায় সাহায্য করতেন পুত্র রামদুলাল ও পুত্রবধূ ভগবতী। সারারাত ধরে পূজা করার পর, ভোররাত্রে মাকে গান শুনিয়েছিলেন রামপ্রসাদ। পরদিন সন্ধ্যায় মায়ের ছোট্ট প্রতিমাটি মাথায় নিয়ে ভক্তবৃন্দের সঙ্গে চলেছিলেন গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়ার জন্য।প্রতিবছরের মতো সেবারও সজলচক্ষে গেয়ে চলেছিলেন একের পর এক শ্যামাসংগীত। গঙ্গার বুকজলে নেমে মাকে আরও কয়েকটি গান শুনিয়েছিলেন রামপ্রসাদ। তারপর মাকে মাথায় নিয়ে ডুব দিয়েছিলেন গঙ্গায়। মাকে ভাসিয়ে, দিয়েছিলেন আরও কয়েকটি ডুব। তারপর ঢলে পড়েছিলেন পতিতপাবনী গঙ্গাবক্ষেই। ভক্তবৃন্দ বলেছিলেন, বিদায়কালে মা তাঁর দুঃখী ছেলেকেও সঙ্গ নিয়ে গেলেন। কথাটি সঠিক, কালীর বেটা রামপ্রসাদ এভাবেই তো কালীর কোলে বিলীন হতে চেয়েছিলেন। তাই তো লিখে গিয়েছিলেন

ডুব দে রে মন কালী বলে!!
(হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে!)
রত্নাকর নয় শূন্য কখন,
দু-চার ডুবে ধন না পেলে!
তুমি দম-সামর্থ্যে এক-ডুবে যাও,
কুলকুণ্ডলিনীর কূলে!!

You might also like