Latest News

বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্বামীর প্রতিভার আড়ালে হারিয়ে যাননি, দুহাতে সামলেছেন ঘর আর বাইরের জগত

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: এ দেশের প্রথম নারী ডাক্তারের শিরোপা উঠতে পারত তাঁর মাথায়। নিজের মেধা, পাণ্ডিত্য আর ব্যক্তিত্বের ছটায় অনায়াসেই আলোড়ন তুলতে পারতেন দেশে বিদেশে। কিন্তু তার বদলে প্রায় স্বেচ্ছায় বেছে নিলেন সাদামাটা এক গৃহবধূর জীবন। বিশ্ববিখ্যাত স্বামীর অধ্যাপনা আর গবেষণাকে নিষ্কন্টক করতে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ- সংসারের যাবতীয় দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। দশভুজা হয়ে ঘিরে রাখলেন স্বামীর প্রতিভাকে। কিন্তু প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো স্বামীর পরিচিতি আর কাজকর্মের আড়ালে চাপা পড়ে যাননি এই মহীয়সী। ঘরসংসার সামলেও নিজেকে মেলে ধরেছেন, ছড়িয়ে দিয়েছেন শিক্ষা প্রসার থেকে সমাজ সচেতনতার নানা দিকে, নানা ভূমিকায়। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে কি রাখবে না তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না তাঁর। তিনি উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার প্রায় বিস্মৃত এক নাম, লেডি অবলা বসু। (Lady Abala Bose)

Image - বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্বামীর প্রতিভার আড়ালে হারিয়ে যাননি, দুহাতে সামলেছেন ঘর আর বাইরের জগত

অবলার জন্ম ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৮ অগাস্ট । আজকের বাংলাদেশের বরিশালে। ঢাকা বিক্রমপুরের তেলিরবাগে বাস ছিল তাঁদের দাস পরিবারের। পরে বরিশাল হয়ে কলকাতায় উঠে আসেন তাঁরা।
শিক্ষিত, মননশীল পরিবার, বাড়িতে লেখাপড়ার চল ছিল গোড়া থেকেই। অবলার বাবা দুর্গামোহন দাস ছিলেন ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম হোতা এবং সংস্কারক। গৃহবধূ হলেও অসম্ভব ব্যক্তিত্বময়ী ছিলেন মা ব্রহ্মময়ী দেবী। যদিও মাকে খুব বেশিদিন কাছে পাওয়া হয়নি অবলার। ১৮৭৫ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে মাকে হারান তিনি। তাঁর ভাইয়ের নাম সতীশ রঞ্জন দাস, দিদি সরলা রায়। ‘দেশবন্ধু’ চিত্তরঞ্জন দাশ ও ভারতের পঞ্চম প্রধান বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাস ছিলেন দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এককথায় কৃতী মানুষের ভিড় পরিবার জুড়েই। সমকালের থেকে চিন্তা চেতনায় এগিয়ে থাকার দামও দিতে হয়েছিল বৈ কি! অবলা বসুর যখন পাঁচ বছর বয়স তখনই বিধবা বিবাহের পক্ষে থাকার অপরাধে সামাজিকভাবে একঘরে হতে হয় তাঁদের পরিবারকে।

ছো্টবেলা থেকেই রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন অবলা। ডাক্তারি পড়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সে সময়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজে মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার কোনও সুযোগ ছিল না। এর বেশ কয়েকবছর পর পুরুষতন্ত্রের সেই অচলায়তন ভেঙেছিলেন কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। সেও আরেক লড়াইয়ের গল্প। তবে অবলা বসু (সেসময় দাস)র লড়াইটাও কম কঠিন ছিল না। সেই সময়ে একমাত্র মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজেই মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার সুযোগ ছিল। সে কথা জানতে পেরে অবলা জেদ ধরে বসেন তিনি মাদ্রাজেই যাবেন হাতেকলমে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ নিতে। এত দূরে মেয়েকে ডাক্তারি পড়ানোর ব্যাপারে খুব একটা রাজি ছিলেন না দুর্গামোহন। কিন্তু মেয়ের আগ্রহ আর পিতৃবন্ধু ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের সনির্বন্ধ অনুরোধের কাছে বাবা দুর্গামোহন হার মানলেন। শেষমেশ সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে মেয়েকে মাদ্রাজে পাঠাতে সম্মত হলেন তিনি। (Lady Abala Bose)

কিশোরী অবলা বসু

বেঙ্গল গভর্নমেন্টের সাম্মানিক বৃত্তি নিয়ে ১৮৮২ সালে অবলা পাড়ি দিলেন মাদ্রাজে। বস্তুতঃ বাঙালি মেয়েদের মধ্যে প্রথম ডাক্তারি ছাত্রী ছিলেন অবলা। কিন্তু মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে সে সময় মেয়েদের পড়াশোনার জন্য কোনো হস্টেল ছিল না। ফলত, মি. জেনসেন নামক এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে তিনি থাকতে শুরু করেন অবলা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে স্বপ্নের জন্য এতটা পথ পাড়ি দিলেন, সে পূরণ হল না। মাত্র দু’বছর পড়াশোনা করার পর শারীরিক অসুস্থতার জন্য ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ না করেই কলকাতায় ফিরতে বাধ্য হন অবলা।

১৮৮৭ সালে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথে অবলার বিয়ে সম্পন্ন হয়। স্বামীর যোগ্য সহধর্মিনী হিসেবে তার সব ধরনের কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা ও সমর্থন করে গেছেন। এই আত্মভোলা বৈজ্ঞানিক মানুষটাকে সত্যিই বড় ভালোবাসতেন অবলা। সারা জীবন জগদীশ বসুর পাশে ছিলেন ছায়ার মতো। স্বামীর বিজ্ঞান সাধনায় যাতে কোনোরকম ব্যঘাত না ঘটে সেদিকে সবসময় সতর্ক দৃষ্টি ছিল তাঁর। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর অনুভবের অভাব ছিল না এই দম্পতির যৌথজীবনে। খুব অল্প বয়সে মারা যায় তাঁদের একমাত্র সন্তান। কিন্তু সেই দুঃখ ভুলে স্বামীর ছাত্রদের কাছে টেনে নিয়েছিলেন অবলা। সন্তানের মতো স্নেহ করতেন, আগলে রাখতেন তাঁদের। পাখি মায়ের মতো স্নেহের ডানায় ঢেকে রেখেছিলেন স্বামী-সংসারকে।

Image - বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্বামীর প্রতিভার আড়ালে হারিয়ে যাননি, দুহাতে সামলেছেন ঘর আর বাইরের জগত
জগদীশ চন্দ্র বোসের সঙ্গে অবলা বোস

জগদীশ চন্দ্র বসু বিখ্যাত বিজ্ঞানী হলেও কর্মজীবনের শুরুর দিকে আর্থিকভাবে তেমন একটা স্বচ্ছল ছিলেন না। তার উপর বাবার পুরোনো অনেক দেনা সন্তান জগদীশের ঘাড়ে এসে বর্তায়। সেসময় যথার্থ সহধর্মিনীর মতো পাশে থেকে সবটা সামলেছেন অবলা। স্বামীর সুখ-দুঃখে পাশে থেকে অক্লান্ত সেবা করে গেছেন। শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছেন। কলেজে পড়ানোর সময় জগদীশ চন্দ্র বসু তার সমমর্যাদার শিক্ষকের সমান বেতন দাবি করায় অনেক দিন তিনি কলেজ থেকে কোনও বেতন পাননি। ্সেসময় নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সংসারের খরচ কমাতে বাধ্য হন অবলা। সংসারের টালমাটাল অবস্থাতেও স্বামীর বিজ্ঞান সাধনায় ব্যাঘাত ঘটতে দেননি। নিজে বিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ায় জগদীশের অনেক ধরনের কাজেই অবলা সাহায্য সহযোগিতা করতেন। বিজ্ঞান সাধানার জন্য জগদীশ চন্দ্র বসুর বসুমন্দির প্রতিষ্ঠার কাজেও অবলা বসুরও অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে। প্রখ্যাত স্বামীর সাথে একাধিকবার বিদেশ সফর করলেও খুবই সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। নিজেদের একমাত্র সন্তান অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় স্বামীর ছাত্রদের অপত্য স্নেহে ভরিয়ে রেখেছিলেন। ১৯১৬ সালে নাইট উপাধি লাভ করলেন জগদীশচন্দ্র। অবলা বসুর নতুন পরিচয় হল লেডি অবলা বসু। (Lady Abala Bose)

জীবনভর অবলা কাজ করে গেছেন স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের জন্য। মেয়েদের জন্য শিক্ষার দ্বার খুলে দেওয়া এবং বাল্যবিবাহ রোধ করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল ব্রত। ১৯১০ সালে অবলা ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের সম্পাদিকা নিযুক্ত হন। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত এই পদে থেকে তিনি যোগ্যতার সাথে স্কুলটি পরিচালনা করেছিলেন। সমগ্র বিদ্যালয়টিই নতুন করে গড়ে তোলেন তিনি। এছাড়াও বাংলার মেয়েদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নারী শিক্ষা সমিতি’ নামক একটি অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থার মাধ্যমে গ্রাম-বাংলায় ৮৮টি প্রাথমিক ও ১৪টি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন অবলা বসু। এইসব স্কুলে শিক্ষয়িত্রীর অভাব পূরণের জন্য ১৯২৫ সালে গড়ে তুললেন ‘বাণীভবন ট্রেনিং স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকেই নারীদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে নিয়োগ করা হত।

গোখেল মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনেও দিদি সরলা রায়ের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অবলা। এছাড়া আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর মৃত্যুর পর তাঁর সঞ্চিত এক লক্ষ টাকা দিয়ে তিনি ‘সিস্টার নিবেদিতা উইমেন্স এডুকেশন ফান্ড’ প্রতিষ্ঠা করেন। লেখিকা হিসেবেও তিনি যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেন। ১৩০২ সাল থেকে ১৩৩২ সাল পর্যন্ত তখনকার জনপ্রিয় ‘মুকুল’ ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখে গেছেন। এসব প্রবন্ধে তার চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের স্ফুরণ ঘটতো। ইউরোপে তার প্রথম ভ্রমণের গল্প নিয়ে ১৩৩২ সালে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম ভ্রমণ কাহিনী ‘বাঙ্গালী মহিলার পৃথিবী ভ্রমণ’। এছাড়াও নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং নারী স্বাধীনতা নিয়ে তার একাধিক প্রবন্ধ তৎকালীন বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা ‘মর্ডান রিভিউ’-এ প্রকাশিত হয়।
১৯৫১ সালের ২৬ এপ্রিল ৮৭ বছর বয়সে এই মহিয়সী নারী প্রয়াত হন। তিনি আজীবন নারীশিক্ষা প্রসার নিয়ে সদর্থক ও সদর্পে কাজ করে গেছেন।

অবলা বসু বলতেন একটা সোজাসরল কথা। মেয়েরা শেষ পর্যন্ত কী করবে আর কী করবে না, সেটা আলাদা বিষয়, “কিন্তু ক্ষমতা থাকা দরকার, না হলে পুরুষরা মেয়েদের সম্মান করবে কী করে?”

You might also like