Latest News

শাড়ি না পরায় তাড়িয়ে দিয়েছিলেন কেতকী কুশারী ডাইসনকে, কে এই ‘বলাহক নন্দী’

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোনও কোনও মানুষের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বিতর্ক জিনিসটা কাঁটার মুকুটের মতো আমৃত্যু জড়িয়ে থাকে। তেমনই একজন মানুষ নীরদ সি চৌধুরী। কত গল্পই না এ দেশের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে আছে তাঁকে নিয়ে। তার কতকটা সত্যি, কিছু হয়তো অতিরঞ্জিতও। শোনা যায় শাড়ির পরিবর্তে সালোয়ার কামিজ পরে তাঁর অক্সফোর্ডের বাড়িতে এসেছিলেন বলে কেতকী কুশারী ডাইসনকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কাজটা যে ঠিক হয়নি সেটা বোঝানোর জন্য নবনীতা দেবসেন কেতকীকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে গেলে তিনি দুজনকেই ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন।সত্যজিৎ রায় তখন বেশ বিখ্যাত। দেশের প্রধানমন্ত্রীও তাঁকে সমীহ করে কথা বলেন। তিনি নীরদচন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে ফোন করে বলেছিলেন: “আমি সত্যজিৎ রায় বলছি।” উত্তরে নিস্পৃহ নীরদবাবু বলেছিলেন: “তাতে কী এলো গেল?… কী দরকার বলুন।” অপ্রত্যাশিত এই উত্তরের পর অপ্রস্তুত সত্যজিৎ বলেছিলেন: “আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই।” উত্তরে ততোধিক নির্বিকার নীরদচন্দ্রের জবাব ছিল: “চলে আসুন, প্রস্তুত থাকব।”
ছ ফুট সাড়ে চার ইঞ্চি উচ্চতার সত্যজিৎ রায় তাঁর অক্সফোর্ডের বাগানঘেরা বাড়িতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন, চার ফুট আট ইঞ্চির নীরদ সি চৌধুরী নির্ভেজাল বাঙালির মতো ধুতি পাঞ্জাবি আর বিদ্যাসাগরি চটি পরে তাঁর জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তাঁর আতিথেয়তা ছিল প্রবাদপ্রতিম। নিজের হাতে ট্রলি ঠেলে নিয়ে এসে উৎকৃষ্ট আহার্য ও পানীয় পরিবেশন করতেন মহার্ঘ ক্রকারিতে।নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারের সময় যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের প্রসঙ্গ উঠতেই ঠোঁটকাটা নীরদচন্দ্র বলে উঠলেন : ‘ওটা একটা ধাপ্পা। বুদ্ধদেব বসুর ধাপ্পা।’

একবার তসলিমা নাসরিন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে অক্সফোর্ডের এক সাহেব অধ্যাপক। নীরদচন্দ্র ওই সাহেবকে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন : ‘আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে। আপনি ভেতরে আসবেন না। একটা চেয়ার দিচ্ছি, বাগানে গিয়ে বসে থাকুন। তাছাড়া আমি একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলতে পছন্দ করি না।’
সেদিন তসলিমার সঙ্গে তিনি টানা আড়াই ঘণ্টা কথা বলেছিলেন। সেই আড়াই ঘণ্টা ওই সাহেব অধ্যাপক বাইরে গাড়ির মধ্যে বসেছিলেন।সেটা ১৯৩৭ সাল। ৪০ বছর বয়সী নীরদচন্দ্রের জীবনে এক বিপুল পরিবর্তন ঘটে সেবছর। তিনি সুভাষচন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসুর সচিব হিসেবে কাজ আরম্ভ করেন। সেই সময় সুভাষচন্দ্রকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় তাঁর। সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শীর্ণকায় নীরদচন্দ্র লিখেছেন: ‘সুভাষচন্দ্রের সুপুরুষ সুদর্শন চেহারা, চওড়া বুক আর অসামান্য ব্যক্তিত্ব দেখে আমি প্রবল ঈর্ষা বোধ করতাম। অন্তরের কোনও অনুভূতিকে তিনি গোপন করতে পারতেন না।’
নেতাজিকে নিয়ে বাঙালির শ্রদ্ধা সম্ভ্রমের বোধ নতুন কিছু নয়।কিন্তু সুপুরুষ সুভাষ যে সেসময় অনেক পুরুষের ঈর্ষার কারণও ছিলেন, নীরদচন্দ্রের জবানবন্দি সেই আশ্চর্য সাক্ষ্য বহন করে।এই মননশীল লেখক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদের জন্ম ২৩ নভেম্বর ১৮৯৭ এ বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলায়, মৃত্যু ১ আগস্ট ১৯৯৯ এ ১০১ বছরের বেশি বয়সে ইংল্যান্ডে।

বহুবিধ পঠনপাঠনের অধিকারী নীরদ সি চৌধুরীর অসামান্য ইংরেজি ও বাংলা গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে:
The Autobiography of an Unknown Indian,
A Passage to England,
The Continent of Circe,
The Intellectuals of India,
To Live or Not to Live,
The Scholar Extraordinary – The Life of F. Max Muller,
Clive of India,
Culture in the Vanity,
Hinduism,
Thy hand, Great Anarch (আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্ত গ্রন্থ),
The Horseman of the New Apocalypse,
The East is East and West is West,
From the Archives of a Centenarian,
Why I Mourn For England,
বাঙালি জীবনে রমণী (বাংলায় লিখিত প্রথম বই/ ১৯৬৮)
আত্মঘাতী বাঙালি
আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ
আমার দেবোত্তর সম্পত্তি
নির্বাচিত প্রবন্ধ
নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বাংলা প্রবন্ধ
আজি হতে শতবর্ষ আগে বাংলা (আত্মজীবনী),
আমার দেশ আমার শতক।

তাঁর প্রত্যেকটি বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকমহলে বিপুল বিতর্কের ঝড় উঠেছে, এ কথা আর নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না। কিন্তু সেসবে দমে যাওয়ার মানুষ নীরদচন্দ্র নন। একশ বছর বয়সেও তাঁর ক্ষুরধার কলম সচল ছিল। সেইসময় কিছুটা কটাক্ষ করে তিনি বলেছিলেন: ‘আমার সেই ক্রিটিকরা এখন কোথায়? তারা সব মরে ভূত হয়ে গেছে। আমি তো এখনও লিখছি।’
তাঁর সম্পর্কে চিন্ময় গুহ এক জায়গায় লিখেছেন: “নীরদচন্দ্র চৌধুরী সর্বদিক থেকে একক ও স্বতন্ত্র। তিনি সেই বিরলতম সাহিত্যবোদ্ধা ইতিহাসপাঠক, যাঁর আগ্রহ অকল্পনীয় রকম সর্বত্রগামী।”প্রখ্যাত ইতিহাস গবেষক ডেভিড লেলিভেল্ড লিখেছেন:
‘নীরদ মূলত একজন আগাগোড়া উদ্ধত, ভয়ানক, দ্বন্দ্বমুখর ব্যক্তিত্ব, যিনি একইসাথে সাম্রাজ্যবাদী সাহিত্যের ঝাণ্ডাধারী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার পর সামরিক বাহিনীর অ্যাকাউন্টস বিভাগে ক্লার্ক পদে যোগ দেন। বাকিটা জীবন তিনি কাটিয়েছেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করে। ইংরেজদের তিনি তাদেরই তৈরি করা খেলায় হারিয়েছেন- নীরদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এখানেই।’

ভি এস নাইপল তাঁর আত্মজীবনীকে অত্যন্ত প্রশংসা করে লিখেছেন: ‘ইন্দো-ইংলিশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে উঠে আসা সর্বোৎকৃষ্ট সাহিত্য হল নীরদের আত্মজীবনী। ভারতীয় উপমহাদেশে পশ্চিমা সংস্কৃতির আধিপত্যের প্রতি এমন বলিষ্ঠ জবাব মেলা ভার।’খ্যাতি এবং সমালোচনা আজীবন বেষ্টন করে ছিল তাঁকে। তাঁর সম্মানপ্রাপ্তির তালিকায় রয়েছে, ১৯৬৬ সালে দ্য কন্টিনেন্ট অব সার্স (১৯৬৫) রচনার জন্য ডাফ কুপার মেমোরিয়াল পুরস্কার। ১৯৭৫ সালে পেয়েছেন একাধারে আনন্দ পুরস্কার ও ভারত সরকার প্রদত্ত সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ১৯৯০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দিয়েছে সাম্মানিক ডি.লিট বা ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি। ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডের রানি ২য় এলিজাবেথ কর্তৃক সিবিই বা কমান্ডার অব অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার উপাধি পান তিনি, যা দেশের অন্যতম সম্মানজনক উপাধি। এছাড়া ১৯৯৬ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ডিগ্রি দেশিকোত্তম প্রদান করেন নীরদচন্দ্রকে।

জীবনের প্রথম পর্যায়ে ‘বলাহক নন্দী’ ছদ্মনামে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় তীব্র শ্লেষাত্মক রচনা লিখে বহু লেখকের বিরাগভাজন হয়েছিলেন নীরদচন্দ্র। বলাহক শব্দের অর্থ মেঘ। নীরদ শব্দের একটি প্রতিশব্দ এই ‘বলাহক’।
সজনীকান্ত দাস লিখেছিলেন: ‘নীরদচন্দ্র চৌধুরী বিচিত্র মানুষ। বেঁটেখাটো মানুষটি অথচ বিদ্যার জাহাজ। সাত সমুদ্র তেরো নদীর খবর তাঁহার নখাগ্রে ছিল, ফরাসি সাহিত্যের তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ভক্ত এবং সারা পৃথিবীর সামরিক বিদ্যার তিনি ছিলেন মনোয়ারি জাহাজ। তাঁহার ভালো-লাগা এবং মন্দ-লাগা গুরু মোহিতলালের মতই অতি স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট ছিল; একটু খামখেয়ালি প্রকৃতির ছিলেন। বিপুল সমারোহে কাজ আরম্ভ করিয়া শেষ করিতে জানিতেন না, গাছে উঠিয়া নিজেই মই ফেলিয়া দিতেন।‘১৩৩৪ বঙ্গাব্দ থেকে তিনি শনিবারের চিঠির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একবার নবীন কথাসাহিত্যিকদের বিভিন্ন রচনা থেকে অশ্লীল অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে নীরদ সি চৌধুরী লিখেছিলেন : ‘ইহাদের অশ্লীলতা করিবার আকাঙ্ক্ষা আছে, অথচ অশ্লীলতা করিবার সাহস ও বৈদগ্ধ্যের অভাব।’
তরুণ লেখকদের ভাষাগত ত্রুটির প্রতি কটাক্ষ করে তিনি লিখেছিলেন: ‘আমাদের সাহিত্যিকরা যদি অশ্লীলতার জাতি মারিতে চান, তবে মারুন। সহ্য না করিয়া কী করিব?… কিন্তু ছাপার অক্ষরে ভাষা ও ব্যাকরণ ভুল যে বড় বাজে!’

অক্সফোর্ডে তাঁর ঠিকানা ছিল : 20 Lathbury Road, Oxford, OX2 7AU. বহু বাঙালি এবং বিদেশি অতিথি অভ্যাগত উষ্ণ আতিথ্য পেয়েছেন এই সুরম্য বাগানঘেরা বাড়িটিতে। স্ত্রী অমিয়া চৌধুরানীর মৃত্যুর পর একাই থাকতেন এখানে। এক সিংহলী উদ্বাস্তু পদ্মনাভন তাঁর দেখাশোনা করতেন। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি জানিয়েছিলেন, রাত্রিতে একা একা এঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে তাঁর ভয় করত। সারা ঘরে একটা অদ্ভুত গা ছমছম করা পরিবেশ। এইসময় পদ্মনাভন শতবর্ষ অতিক্রমকারী এই মানুষটির সঙ্গে নাকি খুব অশোভন আচরণ করত। মৃত্যুর পর সে নীরদ সি চৌধুরীর চিতাভস্ম এবং অস্থির বিনিময়ে তাঁর ছেলেদের কাছ থেকে হাজার হাজার পাউন্ড দাবি করে। এভাবেই ভারতবর্ষ থেকে বহুদূরে এক নির্জন বাসভবনে নিঃসঙ্গ মানুষটির জীবনাবসান ঘটে। আনন্দ পাবলিশার্সের কর্ণধার বাদল বসু নীরদচন্দ্রকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন : ‘কিছু মানুষ থাকেন যাঁদের সান্নিধ্যে এলে এক মহৎ উপলব্ধি হয়। যে উপলব্ধি সারা জীবন মনের গভীরে এক আশ্চর্য আলো জ্বালিয়ে রাখে। সেই মানুষটি হয়তো জীবিত থাকেন না। কিন্তু আলোটা রয়ে যায়। আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ নীরদ সি চৌধুরী। ‘

You might also like