Latest News

ভানু থেকে সুচিত্রা, উত্তম সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন সুব্রত

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সুব্রত মুখোপাধ্যায়, যিনি তাঁর রাজনীতির রং দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে মানুষকে বিচার করতেন। রাজনৈতিক জগতে যাই মতভেদ থাক, ব্যক্তিগত স্তরে তাঁর সঙ্গে সব মহলের মানুষের ছিল নিত্য ওঠাবসা। তিনি সবার প্রিয় সুব্রত, সুব্রতদা। একদম পঁচিশের কোঠাতেই সুব্রত মুখোপাধ্যায় হয়ে ওঠেন উজ্জ্বল রাজনৈতিক মুখ ও সকলের ভরসার জায়গা। রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সংস্কৃতির অঙ্গন, ফিল্ম জগতও বাদ ছিলনা। তৎকালীন মেগাস্টারদের ভরসার হাত ছিলেন সুব্রত। উত্তম কুমার থেকে সুচিত্রা সেন কিংবা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় সবার প্রিয়পাত্র সুব্রত। যাত্রা যে একটা প্রাচীন শিল্প তা ভুলতে বসেছিল মানুষ। যাত্রাকে গ্রাম থেকে শহরমুখী করেন একমাত্র সুব্রত মুখোপাধ্যায়। গ্রাম থেকে যাত্রাকে শহরের মূলধারায় তুলে আনলেন তিনি। কলকাতার লোকেদের দেখাতে শুরু করলেন এক মাস ব্যাপী যাত্রা-উৎসব। টিকিট কেটে নামী দামি যাত্রাস্টারের যাত্রা দেখার সুযোগ কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্রে। রবীন্দ্রকানন পার্কে শুরু করলেন বিরাট যাত্রা উৎসব। পরের বার হল রবীন্দ্রসদনের উল্টোদিকের বিশাল ময়দান চত্বরে। সব শো হাউসফুল। যাত্রার জন্য তাঁর মতো কাজ আজ অবধি কেউ করেনি।

মহানায়ককে নকশালদের হাত থেকে রক্ষাকর্তা সুব্রত
সুব্রত মুখোপাধ্যায়-প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি ছিলেন আইকনিক মানিকজোড় জুটি। শুধু রাজনৈতিক জগতেই নয় সাংস্কৃতিক জগতেও ছিলেন ওঁরা মধ্যমণি। সে প্রসঙ্গেই বলতে হয় হাজরার ‘বসুশ্রী’ সিনেমাহল তখন সকল স্টারদের আড্ডাস্থল। উত্তমকুমার, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনিল চট্ট্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র সবার আড্ডাচক্র বসত বসুশ্রীতে। কত লেজেন্ডারি ছায়াছবির পরিকল্পনা থেকে আইকনিক গানের খসড়া তৈরি হয়েছে এই ‘বসুশ্রী’তে বসেই। বসুশ্রীর মন্টু বসু ছিলেন প্রিয়রঞ্জন আর সুব্রতর কাছের মানুষ। বসুশ্রীর সমস্ত জলসার পরিকল্পনা করতেন তাঁরাই।

প্রিয়রঞ্জন-সুব্রত জুটি

এদিকে সত্তরের দশকের শুরুতেই সেসময় নকশাল আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সন্ধের পর কলকাতার রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে যেত। কলকাতায় নকশাল আন্দোলনের সময় নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে উত্তম কুমারের নিজস্ব মেকআপ রুমে সশস্ত্র হানা দিয়েছিল কয়েকজন নকশাল যুবক। উত্তমকুমারের বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে প্রাণে মারার হুমকি দিয়েছিল তারা। উত্তম কুমার এতটাই সন্ত্রস্ত হয়েছিলেন যে সেই দিনই মাথার চুল ছোটো করে ছেঁটে বম্বে মেল চড়ে বম্বে পাড়ি দেন। যাতে ট্রেনে তাঁকে দেখে কেউ চিনতে না পারে তাই এই পথ নেন মহানায়ক। সেই ঘটনা উত্তমকুমারকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, কলকাতায় আর তাঁর ফেরা হবে না। সুপ্রিয়া দেবী বলেছিলেন, “সেদিন এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন উত্তম, যে ওঁর পুরো শরীর হলুদ হয়ে গিয়েছিল। যদিও তার আগেই উত্তম হার্ট অ্যাটাকের ঝাপটা সামলে উঠেছিলেন কোনওরকমভাবে। আর তারপরেই এই ঘটনা পুরো নাড়িয়ে দিয়েছিল ওঁকে।”সেসময় বম্বে গিয়ে প্রথমে বম্বের বাঙালি নায়ক অভি ভট্টাচার্যর বাড়ি ওঠেন উত্তম। তারপর বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও কিছুদিন ছিলেন। কিন্তু বাংলার ম্যাটিনি আইডল বাংলায় ফিরবেননা তাই কি হয়! মুশকিল আসান সেই প্রিয়রঞ্জন-সুব্রত জুটি। ‘বসুশ্রী’র মন্টু বসুর সঙ্গে আলোচনা করে তাঁরা ঠিক করলেন এমন এক লোককে মহানায়কের সিকিউরিটি করতে হবে, যে মহানায়ককে কলকাতায় ফেরাতে দেবে বরাভয়। তিনি আর কেউ নন, তখনকার কলকাতার ত্রাস ফাটাকেষ্ট। উত্তমকুমার কলকাতায় ফিরলে দরকারে তাঁর রক্ষাকবচ হিসেবে থাকবেন ফাটাকেষ্ট। ফাটাকেষ্টর কাছে নকশালরা ছিল চরম শত্রু। ফাটাকেষ্ট বড় গুণ্ডা, এই তকমা তাঁর গায়ে লাগলেও ফাটাকেষ্ট মহিলাদের অসম্মান করেছে এমন কখনও শোনা যায়নি। নকশাল আমলে মহিলারা সিনেমার নাইট শো দেখে বাড়ি ফিরলে ফাটাকেষ্টর চরেরা পাহারায় থাকত কোনও নকশাল যেন মহিলাদের অসম্মান করতে না পারে। এ হেন ফাটাকেষ্টর সঙ্গে উত্তমকুমারের হৃদ্যতা তৈরি করে দেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি এবং সুব্রত মুখোপাধ্যায়। এরপর ফাটাকেষ্ট হয়ে ওঠেন উত্তমের ডান হাত।

উত্তমকুমার ও ফাটাকেষ্ট

ফাটাকেষ্টর কালীপুজোর উদ্বোধনে উত্তমকুমার ছিলেন স্পেশাল গেস্ট। পরে অবশ্যি সেইসব নকশাল নেতারা উত্তমকুমারের টিকিটিও ছুঁতে পারেননি। শোনা যায়, টালিগঞ্জের বাসিন্দা সেই নকশালরা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল। ফাটাকেষ্ট-উত্তম ইতিহাসে প্রধান কাণ্ডারি হলেন প্রিয় আর সুব্রত।

উত্তম সুব্রত

সেসময় ১৯৭৩ সালে তৈরি হয় ‘বাংলা চলচ্চিত্র উন্নয়ন পর্ষদ’। ঐসময় সুব্রত ছিলেন তথ্য ও জনসংযোগ দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী।
সেই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সভা-অনুষ্ঠান থেকে একেবারে উত্তমকুমারের ঘরের ছেলে হয়ে ওঠেন সুব্রত। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের বিয়েতে, বৌভাতের অনুষ্ঠানেও হাজির ছিলেন মহানায়ক স্বয়ং।

সুব্রতর বৌভাতে উত্তম কুমার

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিনে তাঁর বাড়ি হাজির সুব্রত
আবার ‘বসুশ্রী’র আড্ডাচক্রে শুরুর দিন থেকে যিনি ছিলেন তিনি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় ভানুদার প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন সুব্রত। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় ছেলে গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় আজ সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকাহত। সুব্রত মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে গৌতমবাবু জানালেন “আমি আর সুব্রত মুখোপাধ্যায় প্রায় সমবয়সী। সুব্রত আমার থেকে তিন চার মাসের বড়। বাবার সঙ্গে ওঁর আলাপ ‘বসুশ্রী’র আড্ডার দৌলতেই।
৭১-৭২ সাল থেকে আশির দশকের শুরু অবধি সুব্রত মুখোপাধ্যায় প্রায় রোজ আসতেন বসুশ্রীর আড্ডায়। ধরাবাঁধা ব্যাপার হয়ে গেছিল ওঁর। বাবাকে পয়লা বৈশাখে বসুশ্রীতে নেমতন্ন করতেন সুব্রত। তখন প্রিয়দা একটা পত্রিকার এডিটর ছিলেন। সেই পত্রিকা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই পত্রিকার ফাংশানেও বাবাকে আমন্ত্রণ জানান ওঁরা। প্রিয়রঞ্জনদা আর সুব্রত মুখোপাধ্যায় এমন রাজনৈতিক মুখ ছিলেন যারা সবার সঙ্গেই মিশতেন। কোন শিল্পী কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক সেটা ভেবে ওঁরা শিল্পীর বিচার করতেননা। এই গুণটা সুভাষ চক্রবর্তীরও ছিল। তখন রাজনৈতিক ভেদাভেদ এত প্রকটও ছিলনা। ও কমিউনিস্ট, ও কংগ্রেস, ওর সঙ্গে মিশবনা এই ব্যাপারগুলো ওঁদের মধ্যে ছিলনা।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ের বিয়েতে সুব্রত মুখোপাধ্যায়। চিত্রঋণ গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

আরও একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা আজ মনে পড়ছে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম নায়ক কমিউনিস্ট অনন্ত সিংহকে যখন জেলে দেখতে বাবা গেলেন, তখন সুব্রতবাবুও গেছিলেন। তখন সুব্রত মুখোপাধ্যায় হোম মিনিস্টার। অনন্ত সিংহ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ ছবির প্রযোজকও ছিলেন।
আমার বোন বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটকের বিয়েতেও এসেছিলেন সুব্রতবাবু। প্রিয়দা আসেননি বোনের বিয়েতে, তখন বোধহয় উনি দিল্লিতে ছিলেন তাই। সুব্রত আমাদের বাড়িতেও বাবার জন্মদিনে এসেছেন। সেবার বাবার জন্মদিনে অনুপ কুমার, রবি ঘোষ, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ও এসেছিলেন। তখন আবার সিপিএম জমানা কিন্তু সুব্রত মুখোপাধ্যায় সবার সঙ্গেই মিশতেনন। বিখ্যাত শ্রীমানি পরিবারের মেয়ে সুব্রতর স্ত্রী ছন্দবাণী মুখোপাধ্যায়।

সস্ত্রীক সুব্রত

বাবা গেছিলেন সুব্রতর বিয়ের রিসেপশানে। শ্যামল মিত্র,উত্তমকুমারও গেছিলেন। একসময় বিখ্যাত পরিচালক সুশীল মজুমদারকে দুটো তথ্যচিত্র বানাতে সাহায্য করেন সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং সেটা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধেই করেন সুব্রত। বাংলার সবথেকে বড় যাত্রাউৎসব করেন সুব্রত। রবীন্দ্রকাননে আমরা যাত্রাসম্রাট স্বপনকুমারের যাত্রা দেখতে গেছিলাম। সেদিন উত্তম কুমার, সুপ্রিয়া দেবী, সুপ্রিয়া দেবীর বোনেরাও সব যাত্রা দেখতে এসছিলেন। অনেক কাজ করেছেন সুব্রত মুখোপাধ্যায় তথ্যসংস্কৃতি মন্ত্রী পদে থেকে বা কলকাতার মেয়র হয়েও। সুব্রতর মতো কাজের লোক পশ্চিমবঙ্গে খুব কম আছেন।”

সুচিত্রা সেনকে দেখতে মার খেয়েছিলেন সুব্রত
সুচিত্রা সেন মানেই ভীষণ প্রাইভেট পার্সন। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় মুনমুন সেনের মাধ্যমে। মুনমুনের কাছের বন্ধু ছিলেন সুব্রত। মুনমুনের বিয়েতেও সুচিত্রা সেনের বাড়ির অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত ছিলেন সুব্রত। একসময় ব্যক্তিগত স্তরে মুনমুনের অনেক সমস্যা থেকে তাঁকে উদ্ধার করেন সুব্রতই।আশির দশকে ‘চৌধুরী ফার্মাসিটিকালস’ ধারাবাহিকে রোম্যান্টিক জুটি হয়ে অভিনয়ও করেন মুনমুন ও সুব্রত। সেই সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের প্রথম ও শেষ অভিনয়। মুনমুনই সাহসী দৃশ্যে কাটিয়ে দিয়েছিলেন বন্ধু সুব্রতর জড়তা। মুনমুন সেনের অনুরোধেই ছোটপর্দায় হাতেখড়ি হয়েছিল প্রয়াত রাজনীতিবিদের। রাজীব গান্ধী দিয়েছিলেন সুব্রতকে অভিনয় করার অনুমতি। টলি ক্লাবের সুইমিং পুলে সুব্রত এবং মুনমুনের জলকেলি দৃশ্য শ্যুট করা হয়েছিল। সেই দৃশ্য আলোড়ন তোলে বঙ্গজীবনে। সুব্রত-মুনমুনকে নিয়ে নানা সিনেপত্রিকার গসিপ-গুঞ্জন কখনও ভাঙন ধরায়নি দুই পরিবারে। বরং সুব্রত আরও কাছের হয়ে উঠেছেন সেন পরিবারে।একবার সুচিত্রা সেন সুব্রতকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সুব্রত কী খাবেন? তার উত্তরে সুব্রত মুখার্জি বলেছিলেন ম্যাডামকে, ‘আপনার জন্য অনেক মার খেয়েছি, আরও খেতে রাজি আছি।’ কারণ ছোটবেলায় বজবজের বাড়িতে সিনেমা দেখার অনুমতি ছিল না। কিন্তু ‘সাত পাকে বাঁধা’ মুক্তি পাওয়ার পর নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি সুব্রত মুখোপাধ্যায়। খালি পায়ে সিনেমাহলে চলে গিয়েছিলেন সিনেমা দেখতে।

মুনমুনের বিয়েতে সুচিত্রা

একবার বার্মা থেকে মুনমুনের জন্য শুঁটকি মাছের ডাস্ট নিয়ে এসেছিলেন। সুব্রতর যাতায়াত বেশি ছিল মুনমুন-ভরত দেববর্মণের ফ্ল্যাটেই। কিন্তু সুচিত্রা সেনকেও অনেক ঝামেলা থেকে উদ্ধার করেছেন নানা সময়ে সুব্রত। মুনমুনের পাশে চিরকাল ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সুব্রত। মহানায়িকা চলে যাবার পর তাঁর মরদেহ বেআব্রু হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। কারণ সারা বাংলা ভেঙে পড়েছিল বেলভিউ হাসপাতাল ও বেদান্ত আবাসনের সামনে অন্তরালপ্রিয়া সুচিত্রা সেনকে একবার শেষ দেখা দেখতে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মহানায়িকার মরদেহ কফিনবন্দি করে শেষযাত্রায় বের করা হয়। মুনমুনের গায়ে আঁচটুকু লাগতে দেননি বন্ধু সুব্রত। এবার দুর্গাপুজোয় সুব্রতর ক্লাব একডালিয়া এভারগ্রিনে শেষ দেখা হয়েছিল দুজনের। রবীন্দ্রসদনে ‘প্রিয় বন্ধু’-কে শেষ শ্রদ্ধা জানান শ্বেতশুভ্র শাড়ি পরিহিতা মুনমুন সেন।

You might also like