Latest News

মরুকন্যা ঋদ্ধি বাঈ আজ দেবী কর্ণী, যাঁর মন্দির পাহারা দেয় পঁচিশ হাজার ইঁদুর

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ভারতের অন্যতম সুন্দর রাজ্য রাজস্থান। রাজ্যটির উত্তর পশ্চিমে আছে মরু শহর বিকানীর। দেশবিদেশের পর্যটকেরা ভিড় করেন থর মরুভূমি লাগোয়া এই শহরে। দল বেঁধে তাঁরা দেখেন রাও বিকাজী দুর্গ, জুনাগড় দুর্গ, লক্ষ্মী নিবাস প্যালেস, মুকাম বিষ্ণোই মন্দির ও ভাণ্ডাসর জৈন মন্দির। শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার পশ্চিমে থাকা গজনের অভয়ারণ্যে গিয়ে দেখেন অ্যান্টিলোপ, নীলগাই, চিঙ্কারা, ব্ল্যাক বাক বা কৃষ্ণসার হরিণের দল। এত কিছু থাকা সত্ত্বেও পর্যটকদের আকর্ষণ করেন এক নারী। যিনি রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে এলেও, আজ তিনি রাজস্থানের সব থেকে প্রভাবশালী দেবী। বিকানীর শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত যাঁর মন্দির (Karni Mata) ঘিরে রাখে পঁচিশ হাজার ইঁদুর।

Image - মরুকন্যা ঋদ্ধি বাঈ আজ দেবী কর্ণী, যাঁর মন্দির পাহারা দেয় পঁচিশ হাজার ইঁদুর
এই সেই মন্দির

কে এই নারী!

থর মরুভূমির সুয়াপ গ্রামের চারণ সম্প্রদায়ে, ১৩৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নিয়েছিল এক শিশু কন্যা ‘ঋদ্ধি বৈষ্য‘। ঋদ্ধি ছিল বাবা মেহাজি কিনিয়া ও মা দেবল দেবীর ষষ্ঠ কন্যা। পর পর কন্যা সন্তান হওয়ায় ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলেন ঋদ্ধির কাকিমা। কোলে নিতে চাননি ছোট্ট ঋদ্ধিকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মহিলাটির দুই হাতের পাতা জুড়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও হাত দুটিকে আলাদা করতে পারেননি তিনি। এরপর হঠাৎই কাকিমার গায়ে লেগেছিল ঋদ্ধির পা। বিস্ময়করভাবে কাকিমার জুড়ে থাকা হাত দু”টি আলাদা হয়ে গিয়েছিল। উপস্থিত সবাই বুঝেছিলেন, এই মেয়ের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা অন্য কারও মধ্যে নেই।

প্রতীকী ছবি

ছোটবেলা থেকেই ঋদ্ধি ছিল মা দুর্গা, মা কালী ও দেবী চামুন্ডার ভক্ত। পূজাপাঠ নিয়ে কাটাত দিনের অনেকটা সময়। বাড়িতে ছিল প্রচুর উট, গরু ও ভেড়া। ঘাস ও পানীয় জলের খোঁজে পশুগুলিকে নিয়ে কিশোরী ঋদ্ধি ঘুরে বেড়াত তপ্ত মরুভূমির আনাচে কানাচে। ঋদ্ধি যখন যুবতী, তখন ঘটেছিল এক অলৌকিক ঘটনা। গ্রাম থেকে হারিয়ে গিয়েছিল একটি শিশু। সারাদিন খুঁজেও, গ্রামবাসীরা পাননি শিশুটির সন্ধান। বিকেল নাগাদ মরুভূমির বালি ঠেলে হাওয়ার গতিতে ছুটে চলেছিল, ঋদ্ধি বাঈয়ের পঞ্চাশটি উট। একটির পিঠে স্বয়ং ঋদ্ধি বাঈ।

কিছু দূর যাওয়ার পর, উটগুলিকে অজানা ভাষায় কিছু বলেছিলেন ঋদ্ধি বাঈ। বিভিন্ন দিকে ছুটে গিয়েছিল পঞ্চাশটি উট। থর মরুভূমির ধূসর সন্ধ্যা একসময় ঘিরে ফেলছিল সুয়াপ গ্রামকে। হঠাৎ দূর থেকে শোনা গিয়েছিল অজস্র উটের পদধ্বনি। মশাল নিয়ে গ্রামবাসীরা এগিয়ে গিয়েছিলেন মরুভূমির দিকে। হতবাক হয়ে তাঁরা দেখেছিলেন, গ্রামের দিকে ঝড়ের গতিতে ছুটে আসছে ঋদ্ধি বাঈয়ের উট। হাওয়ায় উড়ছে তাঁর লম্বা চুল। কোলে হারিয়ে যাওয়া শিশুটি।

Image - মরুকন্যা ঋদ্ধি বাঈ আজ দেবী কর্ণী, যাঁর মন্দির পাহারা দেয় পঁচিশ হাজার ইঁদুর

সংসার তাঁর জন্য নয়

সেই যুগে মেয়েদের অনেক কম বয়সে বিয়ে হয়ে যেত। কিন্তু পাঁচটি বোনের বিয়ে হয়ে গেলেও, বিয়েতে রাজি করানো যায়নি ঋদ্ধি বাঈকে। গ্রামে একঘরে করে দেওয়া হয়েছিল রিদ্ধি বাঈদের। পরিবারকে বাঁচাতে, ১৪১৬ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন সাতাশ বছরের রিদ্ধি বাঈ। বিয়ে হয়েছিল সাথিকা গ্রামের দেপাজী রোহাদিয়ার সঙ্গে। বিয়ের রাতেই স্বামী দেপাজীকে রিদ্ধি বাঈ বলেছিলেন, বিয়ে করলেও স্বামীর সঙ্গে থাকবে না কোনও শারীরীক সম্পর্ক। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন দেপাজী।

স্বামীকে আশ্বস্ত করেছিলেন রিদ্ধি বাঈ। অবিবাহিতা ছোট বোন গুলাব বাঈয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন স্বামীর। নিজে বেছে নিয়েছিলেন সন্ন্যাসিনীর জীবন। জপতপ ও যৌতুক হিসেবে বাবার দেওয়া উট, ভেড়া, গরুদের পরিচর্যা করে সারা দিন কেটে যেত ঋদ্ধি বাঈয়ের। কিন্তু সেটা নিয়েও শ্বশুরবাড়ির গ্রামে দেখা দিয়েছিল অসন্তোষ। জল সংকটের আশঙ্কায় ঋদ্ধি বাঈয়ের পশুগুলিকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল গ্রামবাসীরা। একদিন জনসমক্ষে অপমানও করা হয়েছিল ঋদ্ধিবাঈকে। পরদিন ভোরেই প্রিয় পশুগুলিকে নিয়ে সাথিকা গ্রাম ছেড়েছিলেন ঋদ্ধি বাঈ।

শুরু হয়েছিল যাযাবর জীবন

পশুগুলিকে নিয়ে ঋদ্ধি বাঈ যাযাবরের মত ঘুরে বেড়াতেন থর মরুভূমির বন্ধ্যা বুকে। গ্রামে গ্রামে প্রচার করে বেড়াতেন শক্তিদেবীদের মাহাত্ম্য। ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছিল তাঁর ভক্তের সংখ্যা। তবে কোনও গ্রামই তাঁকে স্থায়ীভাবে থাকতে দিত না। তাই ঋদ্ধি বাঈ ও তাঁর প্রিয় পশুগুলির রাত কাটত খোলা আকাশের নীচে।

Karni Mata

এভাবেই একদিন থর মরুভূমির গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল, ঘাগরা চোলি পরা এক সন্ন্যাসিনীর কথা। মাথার চুলে জটা। হাতে ত্রিশুল। এক রাতে নাকি সন্ন্যাসিনী পেরিয়ে যান চল্লিশ পঞ্চাশ ক্রোশ পথ। অলৌকিক ক্ষমতাবলে রুক্ষ মরুভূমিতে খুঁজে নেন জল ও ঘাস। দুধ ছাড়া অন্য কোনও খাবার গ্রহণ করেন না।

কয়েক বছর ধরে থর মরুভূমির বিভিন্ন গ্রামে ধর্ম প্রচার করার পর ঋদ্ধি বাঈ এসেছিলেন জাঙ্গলু নামক এক এলাকায়।মারওয়াড় তখন শাসন করছিলেন রাঠোর রাজা ‘রাও কানহা’। যিনি দাদা রাও রণমলকে প্রতারণা করে দখল করেছিলেন সিংহাসন। রিদ্ধি বাঈয়ের সঙ্গে ছিলেন কয়েকশো শিষ্য শিষ্যা। ছিল কয়েকশো উট, গরু ও ভেড়া। তৃষ্ণার্ত দলটিকে জাঙ্গলুর কোনও জলাশয় থেকে জল নিতে বারণ করেছিলেন অত্যাচারী রাজা ‘রাও কানহা’।

ক্রুদ্ধ রিদ্ধি বাঈ হাতের ত্রিশুল মাটিতে পুঁতে বলেছিলেন, “এই অন্যায় ধর্মে সইবে না। কয়েক বছরের মধ্যেই রাজা হবেন নির্বাসনে থাকা রাও রণমল।” এরপর দল নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন রিদ্ধি বাঈ। কয়েকদিন হাঁটার পর, পৌঁছেছিলেন এক নামহীন জায়গায়। অসংখ্য পুকুর ও সবুজ ঘাসে ঘেরা জায়গাটিতে, ১৪১৯ খ্রিষ্টাব্দে স্থায়ীভাবে ডেরা পেতেছিলেন ঋদ্ধি বাঈ। একটি পাথরের গুহাকে নিজের আস্তানা বানিয়ে শুরু করেছিলেন জপতপ। গুহাটিকে ঘিরে শিষ্য শিষ্যারা গড়ে তুলেছিলেন দেশনক গ্রাম।

কয়েক বছরের মধ্যেই ফলে গিয়েছিল ঋদ্ধি বাঈয়ের কথা। আকস্মিকভাবে মৃত্যু হয়েছিল রাও কানহার। রাজত্ব ফিরে পেয়েছিলেন রাও রণমল। হয়ে উঠেছিলেন রিদ্ধি বাঈয়ের অন্যতম প্রিয় শিষ্য। এই ঘটনার পর রিদ্ধি বাঈয়ের নাম হয়েছিল ‘কর্ণী’ মাতা (Karni Mata)। কারণ তিনি যা বলেন, তা তিনি করেন।

Image - মরুকন্যা ঋদ্ধি বাঈ আজ দেবী কর্ণী, যাঁর মন্দির পাহারা দেয় পঁচিশ হাজার ইঁদুর
শিল্পীর কল্পনায় কর্ণী মাতা

এগিয়ে চলেছিল সময়

মারওয়াড় রাজ রাও রণমলের ছেলে রাও যোধা, ১৪৩৯ খ্রিষ্টাব্দে বসেছিলেন সিংহাসনে। প্রচুর অর্থ খরচ করে গড়ে তুলেছিলেন যোধপুর শহর। রাও যোধাও ছিলেন কর্ণী মাতার শিষ্য। তাঁর আশীর্বাদ নিয়েই ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে একে একে আজমের, মের্তা ও মান্দোর জয় করেছিলেন রাও যোধা। ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি করতে শুরু করেছিলেন মেহেরগড় দুর্গ। যে দূর্গের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য দেশনক থেকে যোধপুর এসেছিলেন কর্ণী মাতা (Karni Mata)।

রাজা যোধার পঞ্চম পুত্র ছিলেন রাও বিকা। ১৪৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বাবার প্রতি অভিমান করে, ৫০০ রাঠোর পদাতিক সেনা ও ১০০ অশ্বারোহী নিয়ে যোধপুর ছেড়েছিলেন রাও বিকা। সঙ্গে ছিলেন কাকা রাওয়াত কান্ধাল। রহস্যময়ী কর্ণীমাতার আশীর্বাদে জংলাদেশ নামক এক বন্ধ্যা এলাকায় গড়ে তুলেছিলেন নিজের রাজত্ব। ১৪৭২ খ্রিষ্টাব্দে রাতি ঘাঁটি নামের একটি দুর্গ তৈরি করেছিলেন রাও বিকা। যে দুর্গটিরও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ৮১ বছরের কর্ণী মাতা।

মানবী হয়েছিলেন পশ্চিম রাজস্থানের কূলদেবী

এলাকায় রাঠোর রাজা রাও বিকার উত্থান চিন্তায় ফেলেছিল ভাটি রাজপুত রাজাদের। রাঠোররা ভাটিদের জাতিশত্রু। শুরু হতে চলেছিল দুই রাজপুত সম্প্রদায়ের মধ্যে আর একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। উভয়পক্ষের মাঝে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কর্ণী মাতা। ১৪৭২ খ্রিষ্টাব্দেই রাঠোর রাও বিকার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন পুঙ্গালের ভাটি রাজপুত রাজা রাও শেখার কন্যা রঙ কুনওয়ারের। সেই দিনই সমাপ্তি ঘটেছিল রাঠোর ও ভাটি রাজপুতদের চিরাচরিত শত্রুতার। রাঠোর রাজপুত ও ভাটি রাজপুতদের কূলদেবী হয়ে গিয়েছিলেন কর্ণী মাতা। মরুকন্যা ঋদ্ধি বাঈ হয়ে গিয়েছিলেন যোধপুর ও বিকানীর রাজ পরিবার সহ সমগ্র পশ্চিম রাজস্থানের আরাধ্যা দেবী। পরবর্তীকালে এই কর্ণী মাতারই আশীর্বাদ নিয়ে রাও বিকা গড়ে তুলেছিলেন ঐতিহাসিক শহর ‘বিকানীর’।

এভাবেই মানবী থেকে লৌকিক দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন কর্ণী মাতা। ১৪৭২ খ্রিষ্টাব্দে, তাঁর জীবদ্দশাতেই মাথানিয়া গ্রামে দেবী কর্ণী মাতার মন্দির গড়ে তুলেছিলেন শিষ্য অমরজী বাপজী চারণ। মন্দিরের গর্ভগৃহে অমরজী স্থাপন করেছিলেন কর্ণী মাতার পাদুকা দু’টি। আজও আছে সেই মন্দির। আজও সেই মন্দিরে পূজিত হয় কর্ণী মাতার পাদুকা দুটি।

কর্ণী মাতার প্রথম মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নেই,, পূজা করা হয় মায়ের পাদুকা দুটিকে

হারিয়ে গিয়েছিলেন অতর্কিতেই

১৫৩৮ সালের ২১ মার্চ। জয়সলমীরের মহারাজার সঙ্গে দেখা করে দেশনকে ফিরছিলেন কর্ণী মাতা। সঙ্গে ছিলেন বোন গুলাব বাঈয়ের চারপুত্র ও কয়েকশো শিষ্য শিষ্যা। বিকানীরের কোলায়াত তহশিলের গাদিয়ালা ও গিরিরাজসরের মাঝামাঝি কোনও জায়গায় থেমেছিল কর্ণী মাতার উটের বহর। উট থেকে নেমে শিষ্য শিষ্যারা জল খেতে গিয়েছিলেন, কাছেই থাকা এক সরোবরে।

উটের ওপর বসেছিলেন কর্ণী মাতা। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন পড়ন্ত বিকেলের নরম সূর্যের দিকে। কিছুক্ষণ পরে, তৃষ্ণা মিটিয়ে ফিরে এসেছিলেন শিষ্য শিষ্যারা। হতবাক হয়ে তাঁরা দেখেছিলেন, কর্ণী মাতার উট দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু উটের পিঠে কর্ণী মাতা নেই। আশেপাশের বালিতে নেই মাতাজীর পায়ের ছাপ। উদভ্রান্ত শিষ্য শিষ্যারা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিলেন গোটা এলাকা। পাওয়া যায়নি কর্ণী মাতাকে। অস্তরবির শেষ রশ্মিকে জড়িয়ে থর মরুভূমির বুকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন কর্ণী মাতা। ১৫১ বছর বয়সে।

Image - মরুকন্যা ঋদ্ধি বাঈ আজ দেবী কর্ণী, যাঁর মন্দির পাহারা দেয় পঁচিশ হাজার ইঁদুর

তৈরি হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত ‘ইঁদুর মন্দির

এরপর দেশনকের যে গুহায় মা কর্ণী তপস্যা করতেন, সেই গুহাটিকেই গভগৃহ করে মায়ের মন্দির বানাতে শুরু করেছিলেন শোকাহত ভক্তের দল। মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপন করেছিলেন, কর্ণী মাতার আড়াই ফুট উচ্চতার বিগ্রহ। মায়ের মাথায় মুকুট, গলায় রত্নহার। এক হাতে ত্রিশুল ও অন্য হাতে নরমুণ্ড। পরনে ঘাগরা ও ওড়না। পায়ের নিচে মহিষের মুণ্ড।

রাজপুত ও চারণ সম্প্রদায়ের মানুষেরা শক্তি ও বিজয়ের দেবী হিসেবে পুজো করতে শুরু করেছিলেন কর্ণীমাতাকে। স্থলে যাঁর বাহন সিংহ, আকাশে ঈগল। এভাবেই একদিন ঋদ্ধি বাঈ হয়ে গিয়েছিলেন হিংলাজ মাতা, দেবী দুর্গা, মা ভগবতী ও মা জগদম্বার সাক্ষাৎ অবতার। পরবর্তীকালে মন্দিরের গর্ভগৃহ বা গুহাটিকে কেন্দ্রে রেখে কর্ণী মাতার মার্বেলের মন্দিরটি গড়ে দিয়েছিলেন বিকানীর রাজ গঙ্গা সিং। যা আজ সারা বিশ্বে ইঁদুর মন্দির (Rat temple) নামে বিখ্যাত।

মন্দিরের গর্ভগৃহে মা কর্ণীর বিগ্রহ, ভোগের থালায় ইঁদুর

কারণ এই মন্দিরে কর্ণী মাতার পরেই, অন্যতম দ্রষ্টব্যটি হল হাজার হাজার ইঁদুর। হ্যাঁ, দেশনকের কর্ণী মাতার মন্দিরে বাস করে প্রায় পঁচিশ হাজার ইঁদুর। মনে প্রশ্ন জাগে কোথা থেকে এল এত ইঁদুর? প্রশ্নের উত্তর দেয় পশ্চিম রাজস্থানের লোকগাথা।

স্বামী দেপাজীর মৃত্যুর পর কর্ণী মাতার বোন গুলাব বাঈ, তাঁর চার নাবালক ছেলেকে নিয়ে চলে এসেছিলেন দিদির কাছে। দেশনকে মা কর্ণীর আশ্রমেই থাকতেন তাঁরা। একবার গুলাব বাঈয়ের বড় ছেলে লাখন গিয়েছিলেন কোলায়াতের কার্তিক মেলায়। পুজো দেওয়ার আগে স্নান করতে নেমেছিলেন কপিল সরোবরে। জলে নামার সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গিয়েছিলেন কিশোর লাখন।

লাখনের নিথর দেহ নিয়ে দেশনকে ফিরেছিল বন্ধুরা। মৃত সন্তানের দেহের ওপর আছড়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন গুলাব বাঈ। লাখনের দেহ কোলে তুলে, নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলেন কর্ণী মাতা। বন্ধ করে দিয়েছিলেন ঘরের দরজা। আট ঘণ্টা পর বাইরে এসেছিলেন, জীবিত লাখনকে সঙ্গে নিয়ে। লোকগাথা থেকে জানা যায়, স্বয়ং ধর্মরাজ ও কর্ণী মাতার মধ্যে চলেছিল তত্ত্বের লড়াই। কর্ণী মাতার যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন ধর্মরাজ। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন লাখনের প্রাণ।

ধর্মরাজ কর্ণী মাতাকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, সমগ্র রাজস্থানে শক্তির দেবী হিসেবে পূজিত হবেন কর্ণী মাতা। তাঁর বোনের চার ছেলে ও শিষ্য শিষ্যারা মৃত্যুর পর মুষিক বা ইঁদুর হয়ে পুনর্জন্ম লাভ করবে। পাহারা দেবে দেবী কর্ণী মাতার মন্দির। আজও তাই কর্ণী মাতার ভক্তেরা দেশনকের মন্দিরে থাকা পঁচিশ হাজার ইঁদুরকে পবিত্র আত্মা বলে মনে করেন। ইঁদুরদের খাওয়ান বিভিন্ন শস্য, দুধ, নারকেল ও মিষ্টি।

Image - মরুকন্যা ঋদ্ধি বাঈ আজ দেবী কর্ণী, যাঁর মন্দির পাহারা দেয় পঁচিশ হাজার ইঁদুর

পাঁচটি সাদা ইঁদুর

হাজার হাজার ইঁদুরের ভিড়ে তবুও ভক্তদের চোখ খুঁজে বেড়ায় পাঁচটি সাদা ইঁদুরকে। ভক্তরা মনে করেন, এই পাঁচটি সাদা ইঁদুর হল গুলাব বাঈয়ের চার ছেলে ও স্বয়ং কর্ণী মাতা। এই পাঁচটি ইঁদুরকে খুঁজে বের করে, এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেন ভক্তের দল। এর জন্য তাঁরা ব্যয় করেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কারণ তাঁরা মনে করেন এক পাত্রে এই পাঁচটি সাদা ইঁদুরকে দুধ খাওয়ালে সারা জীবনের পুন্য অর্জন করা যায়।

দুধ খাচ্ছে পবিত্র সাদা ইঁদুর

কর্ণী মাতার দেশনকের মন্দির আজ আক্ষরিক অর্থেই ইঁদুরদের অভয়ারণ্য। নির্ভয়ে পঁচিশ হাজার ইঁদুর ঘোরা ফেরা করে মন্দির প্রাঙ্গণে। ভক্তদের পায়ে চাপা পড়ে কোনও ইঁদুর মারা গেলে, ভক্তকে মৃত ইঁদুরের সম ওজনের সোনা বা রুপোর ইঁদুর উৎসর্গ করতে হয় মায়ের পায়ে। তাই অতি সন্তর্পণে মন্দিরের ভেতর হাঁটা চলা করেন ভক্তের দল। দেবী কর্ণী মাতার আরও একটি অলৌকিক লীলার সাক্ষী এই মন্দির। শত শত বছর ধরে ইঁদুরদের উচ্ছিষ্ট খাদ্যকে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করার পরেও, আজ অবধি একজন ভক্তও ইঁদুর বাহিত কোনও রোগে আক্রান্ত হননি।

আরও পড়ুন: আজও কেন দেবতার সম্মান পায়, গুরুভায়ুর মন্দিরের কৃষ্ণভক্ত হাতি ‘কেশবন’

You might also like