Latest News

পৃথিবীর দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট, যাঁর নিরাপত্তারক্ষী পা হারানো এক কুকুর 

Jose Mujica, The world's poorest president.

Jose Mujica  

রূপাঞ্জন গোস্বামী

প্রতি বছরই বিশ্বের কোনও না কোনও দেশে রাষ্ট্রপতি বদল হয়। কখনও কার্যকাল শেষ হওয়ার পর, কখনও সামরিক অভ্যুত্থান বা দুর্নীতির কারণে পদ থেকে সরে যান রাষ্ট্রপতি। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়তে থাকে পেনশনভোগী প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিদের সংখ্যা। দেশের সর্বোচ্চ পদে একদা আসীন মানুষটি  সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সপরিবারে কাটান বিলাসবহুল অবসরকালীন জীবন। দেশ তাঁকে দেয় প্রাসাদোপম বাসভবন, মোটা অঙ্কের পেনশন, ত্রি-স্তরীয় নিরাপত্তা, আপ্তসহায়ক, ব্যক্তিগত পরিচারক পরিচারিকা ও আরও কত সুযোগ সুবিধা।

বেশিরভাগ প্রাক্তন প্রেসিডেন্টই সময় কাটান বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজ, পারিবারিক ব্যবসা বাণিজ্য, লেখালিখি ও বিভিন্ন দেশে শুভেচ্ছা সফর করে।  কিন্তু এই পৃথিবীতে এমন একজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আছেন, যিনি হেলায় ত্যাগ করেছেন অবসরকালীন সব রাজকীয় সুযোগ সুবিধা। বেছে নিয়েছেন কৃষকের পেশা। তাই দেশ তাঁকে বলে ‘মানুষের প্রেসিডেন্ট’।

উরুগুয়ের ‘পেপে’

উরুগুয়ের রাজধানী মন্টিভিডিও  থেকে বেরিয়ে আসা ঝাঁ চকচকে হাইওয়ে ধরে আধ ঘণ্টা যাওয়ার পর, দেখা মিলবে ভাঙাচোরা ও কর্দমাক্ত এক রাস্তার। হাইওয়ে ছেড়ে, সেই রাস্তা ধরে গাড়ি করে যাওয়ার সময়, উত্তাল ঢেউয়ের ওপর ভাসা নৌকার মতো দুলতে থাকবে গাড়িটি। এইভাবে প্রায় চার কিলোমিটার যাওয়ার পর,  ঝোপঝাড় ঘেরা নির্জন পরিবেশে দেখা দেবে একটি ভাঙাচোরা ফার্ম হাউস।

ফার্ম হাউসের সামনে গেলে, এক বৃদ্ধ মানুষের দেখা মিলবে। মলিন পোশাক পরে থাকা, অবিন্যস্ত কাঁচাপাকা চুলের মোটাসোটা মানুষটিকে দেখে গ্রাম্য চাষি ছাড়া অন্য কিছু মনে হবে না। মানুষটির নাম হোসে অ্যালবার্টো “পেপে” মুহিকা কর্ডানো। তিনি ছিলেন উরুগুয়ের চল্লিশতম রাষ্ট্রপতি। দেশ তাঁকে চেনে সব থেকে সফল ও  দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে। আদর করে জনগণ তাঁকে ডাকে ‘পেপে’ বলে।

Jose Mujica
হোসে অ্যালবার্টো “পেপে” মুহিকা কর্ডানো

গেরিলা নেতা মুহিকা

মন্টিভিডিওর এক কৃষক পরিবারে, ১৯৩৫ সালের ২০ মে, জন্ম নিয়েছিলেন হোসে অ্যালবার্টো মুহিকা। ডাক নাম পেপে।  বাবা দিমিত্রিও মুহিকা ছিলেন স্প্যানিশ ও মা লুসি কর্ডানোর ছিলেন ইতালীয় শরণার্থী। পেপে মুহিকার বয়স যখন মাত্র পাঁচ, কপর্দকশূন্য হয়ে প্রয়াত হয়েছিলেন বাবা দিমিত্রিও। প্রবল দারিদ্রের সম্মুখীন হয়েছিল পরিবারটি। শিশু শ্রমিক হিসেবে মুহিকা কাজ করেছিলেন আঙুর ক্ষেত ও পাউরুটির কারখানায়।

নিদারুণ দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মুহিকা একসময় পৌঁছে গিয়েছিলেন যৌবনে। উরুগুয়ে তখন অশান্ত। ঘন ঘন বদলে যাচ্ছিল দেশটির প্রেসিডেন্ট। জনবিরোধী আইনের শাসনে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছিল জনজীবন। এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে জনসাধারণকে মুক্তি দেওয়ার জন্য গড়ে উঠেছিল বামপন্থী গেরিলা বাহিনী ‘টুপামারো’। পেরুর কিংবদন্তি গেরিলা নেতা ছিলেন টুপাক আমারু, তাঁর নামেই রাখা হয়েছিল সংগঠনের নাম। যদিও কিউবার স্বাধীনতায় অনুপ্রাণিত ‘টুপামারো’ গেরিলাবাহিনীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার বীরত্ব ও স্বপ্ন।

টুপামারো গেরিলা দলের কিছু সদস্য

তিরিশ বছরের মুজিকা, ১৯৬৫ সালে যোগ দিয়েছিলেন টুপামারো সংগঠনে। ক্ষুরধার বুদ্ধি ও শাণিত রণকৌশলের মাধ্যমে অল্পকালের মধ্যেই  মুজিকা হয়ে উঠেছিলেন দলটির অবিসংবাদী নেতা। দুর্নীতিগ্রস্থ সরকারকে পদে পদে হেনস্থা করাই ছিল গেরিলাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। ব্যাঙ্কের পর ব্যাঙ্ক লুঠ করে, লুঠের টাকা গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে শুরু করেছিল ‘টুপামারো’ গেরিলারা। শুরু হয়েছিল খাবার বোঝাই লরি লুঠ করে, সেই খাবার গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া। নাইট ক্লাবের গায়ে পোস্টার মারতে শুরু করেছিল গেরিলারা। পোস্টারে লেখা থাকতো, “হয় সবাই নাচবে, না হলে কেউ নাচবে না।”

জেলভাঙা কয়েদি মুহিকা

মুহিকার নেতৃত্বে টুপামারো গেরিলা বাহিনী, একটুও রক্তপাত না ঘটিয়ে ১৯৬৯ সালে দখল করে নিয়েছিল মন্টিভিডিওর নিকটবর্তী ‘পান্ডো’ শহর। গেরিলাদের নিকেশ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সরকার। নেকড়ের চেয়েও ধূর্ত মুহিকাকে জীবিত ধরা সম্ভব ছিল না, তাই জনগণের নয়নের মণি ‘রবিনহুড’ মুহিকাকে গুলি করে মারার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

১৯৭০ সাল, একরাতে এক নাইটক্লাবের দেওয়ালে পোস্টার লাগানোর সময়, মুহিকাকে দেখে ফেলেছিল পুলিশ। ছ-ছ’টা গুলি বিদ্ধ করেছিল মুহিকাকে। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ফেলে রাখা হয়েছিল স্ট্রেচারেই। শরীর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল রক্ত। সরকারের বিষনজরে পড়ার ভয়ে, সংজ্ঞাহীন মুহিকার দিকে কেউ এগিয়ে যাননি । শেষমুহূর্তে দেবদূত হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন এক চিকিৎসক।  অপারেশনের মাধ্যমে, প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন মুহিকাকে। জনশ্রুতি, সেই চিকিৎসকও নাকি ছিলেন ছদ্মবেশী টুপামারো গেরিলা।

পুলিশের ফাইলে থাকা গেরিলা মুহিকার ছবি

মুহিকাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘পুন্টা কারেটাস’ জেলে।  ১৯৭১ সালে,  কারাকক্ষের নীচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে প্রায় শতাধিক গেরিলাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন মুহিকা। কিন্তু ধরা পড়ে গিয়েছিলেন একমাসের মধ্যে। তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল একই জেলে।  ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে, আবার জেল থেকে পালিয়েছিলেন মুহিকা। এবার সুড়ঙ্গ কাটা হয়েছিল জেলের বাইরে থেকে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ধরা পড়ে গিয়েছিলেন মুহিকা।

১৯৭৩ সালে উরুগুয়েতে হয়েছিল সামরিক অভ্যুত্থান। প্রেসিডেন্ট হয়ে জুয়ান মারিয়া বোর্ডাবেরি দেশ জুড়ে শুরু করেছিলেন অমানুষিক অত্যাচার। মুহিকাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল শুকনো কুয়োর নীচে তৈরি করা এক কুঠরিতে। টানা দু’বছর অকথ্য অত্যাচার করা হয়েছিল তাঁর ওপর। মানসিক রোগের শিকার হয়ে গিয়েছিলেন মুহিকা। সর্বক্ষণ কানে অদ্ভুত সব আওয়াজ শুনতে পেতেন। পাগলের মতো চিৎকার করতেন। ১৯৮৫ সালে উরুগুয়েতে প্রতিষ্ঠা  হয়েছিল গণতন্ত্রের।  টুপামারো গেরিলাদের ক্ষমা করেছিল সরকার। টানা ১২ বছর জেলে কাটাবার পর এসেছিল বহুকাঙ্খিত মুক্তি।

জেল থেকে মুক্তির দিনে মুহিকা (ছবির বাম দিকে)

আরও পড়ুন: এক মর্মান্তিক জীবন কাটিয়েছিল বাস্তবের মোগলি, যাকে নিয়ে কিপলিং লিখেছিলেন ‘জাঙ্গল বুক’

গেরিলা নেতা থেকে রাষ্ট্রপতি

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, ১৯৮৯ সালের ৬ এপ্রিল, মুহিকা ও তাঁর সহ গেরিলারা তৈরি করেছিলেন বামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘মুভমেন্টো ডি পার্টিসিপেসিয়ন পপুলার’। এরপর মুহিকা  পিপলস ভিকট্রি পার্টি, দ্য ওরিয়েন্টাল রেভলিউশনারি পার্টি ও দ্য সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেছিলেন বামপন্থী জোট ‘ব্রড ফ্রন্ট কোয়ালিশন’। ১৯৯৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে জিতেছিলেন মুহিকা। ১৯৯৯ সালে আবার জিতে হয়েছিলেন সেনেটর।

হোসে মুহিকার আচার আচরণ তথাকথিত রাজনীতিবিদদের মতো ছিল না। গ্রাম্য ভাষায় উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ দিতেন। প্রতিটি ভাষণে মিশে থাকত রসালো চুটকি ও গ্রাম্য গালাগালি। কিন্তু তাঁর ক্যরিশমা ম্যাজিকের মতো কাজ করেছিল। জনগণ পাশে থাকায়  দ্রুত আকারে বৃদ্ধি পেয়েছিল মুহিকার  রাজনৈতিক দল। ২০০৫ সালে, প্রেসিডেন্ট তাবারে ভাস্কুয়েজ  তাঁর মন্ত্রিসভায় নিয়ে এসেছিলেন মুহিকাকে। ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল অবধি উরুগুয়ের কৃষি ও প্রাণি সম্পদ দফতরের মন্ত্রী ছিলেন মুহিকা। এরপর, ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে, ২০১০ সালের ১ মার্চ,  উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট হয়ে গিয়েছিলেন হোসে মুহিকা।

মুহিকার ভাষণ চুম্বকের মতো আটকে রাখতো শ্রোতাদের

সফল প্রেসিডেন্ট মুহিকা

প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় মুহিকা দেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন উন্নতির শিখরে। আইনসভা থেকে অনুমোদন করিয়ে নিয়েছিলেন সমকামী বিবাহ ও গর্ভপাতের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলিকেও। সেই সময় উরুগুয়ের অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতো  ড্রাগ মাফিয়ারা।  এই মাফিয়াদের সাম্রাজ্য ধ্বংস করার জন্য এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুহিকা। সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মারিজুয়ানা বিক্রির অধিকার। কারা কারা মারিজুয়ানা কেনে, তার তথ্য রাখা শুরু করেছিল মুহিকার সরকার। কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা সরকারের হাতে চলে যাওয়ায়, ভেঙে পড়েছিল ড্রাগ মাফিয়াদের সাম্রাজ্য।

প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকালীন মিতব্যয়ী মুহিকার জন্য দেশের খরচ হয়েছিল সবথেকে কম। মাসিক বেতন ছিল  ১২,০০০ ডলার, তার ৯০ শতাংশই মুহিকা দান করে দিতেন বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে। নিজে নিয়মিত গিয়ে দেখে আসতেন টাকাটা ঠিক জায়গায় পৌঁছচ্ছে কিনা।  রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিবেশনে তাঁর ভাষণ ছিল দেখবার মতো। মলিন পোশাকের মুহিকা, স্বভাবসিদ্ধ চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ করতেন উন্নত দেশগুলিকে। মোহাবিষ্ট হয়ে নিজেদের সমালোচনা শুনতেন দেশগুলির প্রেসিডেন্টেরা। আসন ছেড়ে ওঠার কথা ভাবতে পারতেন না, এতটাই  সম্মোহিনী শক্তি ছিল তাঁর ভাষণের। ২০১৫ সালের ১ মার্চ, দেশকে কাঁদিয়ে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে বিদায় নিয়ে ছিলেন হোসে মুহিকা।

ওবামার সঙ্গে মুহিকা

মুহিকা আজ কৃষক

রাষ্ট্রপতি পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর, দেশ মুহিকাকে দিতে দেয়েছিল প্রাসাদোপম অট্টালিকা ও অন্যান্য রাজকীয় সুযোগ সুবিধা। কিন্তু মুহিকা সবিনয়ে সেসব  প্রত্যাখ্যান করে চলে গিয়েছিলেন স্ত্রী লুসিয়া টপোলানস্কির ভাঙাচোরা ফার্ম হাউসে। অভিজাত পরিবারের সন্তান, স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করা স্ত্রী লুসিয়াও ছিলেন প্রাক্তন টুপামারো গেরিলা। জেলভাঙার মূল কারিগর। পরবর্তীকালে লুসিয়াও হয়েছিলেন উরুগুয়ের সেনেটর। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার পর, ২০০৫ সালে লুসিয়াকে বিয়ে করেছিলেন মুহিকা।

স্ত্রীর সঙ্গে মুহিকা

আজও দু’জন অবসর কাটান নির্জন পরিবেশে থাকা ফার্ম হাউসটিতে। যা কিনা একজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের পক্ষে অত্যন্ত বেমানান। জরাজীর্ণ একতলা  ফার্ম হাউসটিতে আছে তিনটি ঘর। প্রবল বৃষ্টিতে তাঁদের ফার্ম হাউসের ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে ঘরের ভেতরে।  অনেক রাত মুহিকাকে চেয়ারে বসে  কাটাতে হয়। ছাদ সারানোর মতো অর্থ নেই, তবুও কারও কাছ থেকে সাহায্য নেবেন না মুহিকা। ঘরে জল পড়লে পড়ুক। জমিটাতো জল পাবে। বিবর্ণ আসবাবপত্র ও বইয়ে ঠাসা ঘরগুলি অগোছালো থাকে বলে মুহিকা অতিথিদের বসান আগাছা ভর্তি লনে।

বাড়ির সামনে মুহিকা

বিবর্ণ ফার্ম হাউসটির একপাশে আছে টিনের একটি শেড। সেখানে কাপড় কাচেন মুহিকা। আছে আরও একটি শেড, যার ভেতরে রাখা আছে  ১৯৮৪ সালের ‘ফোক্স ওয়াগন বিটল’। এই গাড়িই চড়েন মুহিকা। ড্রাইভার রাখার অর্থ নেই। ৭৭৫ ডলার পেনসনের নব্বই শতাংশ দান করে দেন প্রতিমাসে। তাঁদের সংসার চলে ক্রিসেন্থিমাম ফুল চাষ করে। তাই নিজের গাড়ি নিজেই চালান মুহিকা।

স্মারক হিসেবে গাড়িটি কিনতে চেয়েছিলেন অনেকে। পুরোনো গাড়িটির বদলে দিতে চেয়েছিলেন নতুন বিলাসবহুল গাড়ি। দশ লক্ষ ডলার দাম হেঁকেছিলেন মুহিকা। বলেছিলেন টাকাটা পেলে গৃহহীনদের জন্য বাড়ি বানিয়ে দেবেন। পিছিয়ে গিয়েছিল ক্রেতার দল। তবুও মুহিকা আশাবাদী, একদিন তিনি নিশ্চয়ই পাবেন দরদী ক্রেতা। আরও দুটি বাহন আছে মুহিকার। মান্ধাতার আমলের একটি ট্রাক্টর ও একটি স্কুটার। স্কুটারটি তাঁর খুব প্রিয়। কারণ এই স্কুটারে চেপেই পার্লামেন্টে যেতেন মুহিকা।

গাড়ি চালিয়ে শহরে যাচ্ছেন মুহিকা

একতলা  ফার্ম হাউস থেকে পাঁচশো ফুট দূরে রোজ দাঁড়িয়ে থাকে একটি পুলিশ ভ্যান। তাতে বসে থাকেন দুজন সশস্ত্র পুলিশ অফিসার। যেখানে ভ্যানটি দাঁড়ায়, তার থেকে আর এক ফুটও এগোনোর অনুমতি নেই। নিরাপত্তাজনিত কারণে পুলিশ অফিসারেরা মুহিকার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেই খেঁকিয়ে ওঠেন মুহিকা, “তোমরা তোমাদের মতো থাকো না বাপু। আমার তোমাদের দরকার নেই। আমার নিরাপত্তার জন্য ম্যানুয়েলাই যথেষ্ট।”  নিঃসন্তান মুহিকার নয়নমণি হল ম্যানুয়েলা। এক পা হারানো এক স্ত্রী কুকুর। সে  মুহিকার সর্বক্ষণের নিরাপত্তারক্ষী।  অপরিচিত কাউকে ফার্মের মধ্যে দেখলে তিন পা নিয়েই তেড়ে যায়। অনেক কষ্টে তখন তাকে শান্ত করেন মুহিকা।

ম্যানুয়েলার সঙ্গে মুহিকা

কী ভাবে কাটে মুহিকার দিন!

রোজ সকালে পোষ্য কুকুর ও মুরগীদের খাবার দিয়ে, সামান্য প্রাতরাশ করে,  ট্রাক্টর নিয়ে ক্ষেতে চলে যান মুহিকা। জমি চষেন, পাইপের মাধ্যমে জল নিয়ে আসেন ক্ষেতে, চারাগাছ লাগান, ক্ষেত থেকে আগাছা সরান, কীটনাশক স্প্রে করেন। নিজের হাতে ক্ষেতের সব কাজ করেন কৃষক পরিবারের সন্তান মুহিকা।

দুপুরে বাড়ি যেতে না পারলে, ক্ষেতেই খাবার দিয়ে যান স্ত্রী লুসিয়া। সঙ্গে নিয়ে আসেন ম্যানুয়েলার খাবারও। কারণ মুহিকাকে ছেড়ে একচুলও নড়ে না ম্যানুয়েলা। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে ক্ষেতের পাশে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বই নিয়ে বসেন মুহিকা। কখনও গান শোনেন। দেশাত্মবোধক গান। কখনও  গল্প করেন স্ত্রীয়ের সঙ্গে। তারপর চলে পরের দিনের চাষের পরিকল্পনা। বারান্দায় ডাঁই করে রাখা যন্ত্রপাতির স্তুপ থেকে খুঁজে রাখেন পরের দিনের যন্ত্রপাতি।

ট্রাক্টর চালিয়ে ক্ষেতে যাচ্ছেন মুহিকা

কোনও কোনও দিন, ক্ষেতে হওয়া ক্রিসেনথিমাম ফুল বেচতে বা টুকিটাকি জিনিপত্র কিনতে মুহিকা বাজারে যান স্কুটার নিয়ে। যেতে আসতে এক ঘণ্টা লাগে। কিন্তু মুহিকা ফেরেন সাত আট ঘণ্টা পরে। কারণ তিনি মানুষের প্রেসিডেন্ট। যেখানে পেপে সেখানেই জমে যায় ভিড়। দেশের জনপ্রিয়তম জননেতাকে রাস্তায় দেখে দাঁড়িয়ে সম্মান জানান না, এমন মানুষ উরুগুয়েতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

অতিসাধারণ জীবনযাপনের জন্য মুহিকা পৃথিবী বিখ্যাত। তাঁকে বলা হয় পৃথিবীর দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট (The world’s poorest president)। কিন্তু নিজেকে দরিদ্র বলে মানতে চান না মুহিকা । তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমাকে বলা হয় পৃথিবীর দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট। ভুল কথা। আমি নিজেকে দরিদ্র ভাবি না। তারাই দরিদ্র যারা কেবলমাত্র বিলাসবহুল জীবনযাত্রার জন্য কাজ করে এবং সবসময় আরও চায়। আরও বেশি চায়।”

যেখানে মুহিকা সেখানে জনসমুদ্র

তারপর কাঁচাপাকা ভুরু কুঁচকে, তীব্র কটাক্ষ হেনে মুহিকা বলেন,”এটা হচ্ছে স্বাধীনতার প্রশ্ন। যদি তোমার বেশি সম্পত্তি  থাকে। তাহলে তোমাকে সারা জীবন সম্পত্তির ক্রীতদাস হয়ে সেগুলি ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। আমার সম্পত্তি নেই। ফলে আমি কারও দাস নই। নিজের ইচ্ছামতো সময় কাটাতে পারি। আমাকে দেখে হয়তো উদ্ভট বুড়ো বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এভাবে জীবন কাটানোই আমার পছন্দ। আমি নাইটহুডের থেকে ‘রবিনহুড’ শব্দটাকে বেশি পছন্দ করি।”

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like