Latest News

বইমেলা না আরও কিছু

গৌতমকুমার দে

এ মাসের মাসকাবারি বাজারটা অনেককে এ বার সেরে নিতে দেখা গেল কলকাতা বইমেলা থেকে! আমি নিশ্চিত, সাহিত্যিক শ্যামলকুমার গঙ্গোপাধ্যায় আজ বেঁচে থাকলে তাঁর বাজারসফরের একটা কিস্তি বরাদ্দ থাকত এই বার্ষিক বাজারের জন্যে।

ফর্দ মিলিয়ে অনেক কিছুই সওদার সুযোগ রয়েছে এখানে। সস, আচার, মায় নলেনগুড় পাওয়া যাচ্ছে খাদি গ্রামোদ্যোগে। গুঁড়ো মশলার জন্য রয়েছে এক বহুল পরিচিত কোম্পানির স্টল। ধূপকাঠি, ধুনো, সুগন্ধী, চন্দন প্রভৃতি দেব-ঘেঁষা জিনিসের বিপুল পসরা সাজিয়ে বসেছে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্টলগুলো। এদের মধ্যে অন্তত দুটো (যার একটা আবার অনাবাসী কলকাতা, এসেছে প্রতিবেশী রাজ্যের কটক থেকে) জায়গায় প্রসাদও দিতে দেখা গেল। সন্ধ্যার স্ন্যাক্সটা বাঁচাবার কথা ভেবে দেখতে পারেন স্বল্পাহারীরা। বাইরে বেরিয়ে এসবিআই অডিটোরিয়ামের পাশের যেতে পারেন। ওখানে রয়েছে চায়ের দোকান। যারা সন্ধেটা একটু অন্যভাবে কাটাবেন ভাবছেন, তাদের জন্যে ঠিক পাশেই রয়েছে কাশ্মীরি চায়ের দোকান।

বইমেলার পরিধি বরাবর আধো-আলো আধো-অন্ধকারের মধ্যে মহিলাদের সাজগোজের রকমারি আয়োজন। সেখানে রয়েছে চালের পাপড়, গয়না বড়ি! সরষের তেল চাইলে আসতে হবে এক বাংলা দৈনিকের স্টলে। সেখানে একটি রান্নার বই কিনলেই ২৫০ মিলি সরষের তেল ফ্রি। চারটে বই কিনলে পুরো ১ লিটার! পাঠক, না অন্য কারও উদ্দেশ্যে এই তৈলমর্দন– কে জানে! এর আগে বইমেলায় বইয়ের সঙ্গে ফ্রিতে দিতে দেখেছিলাম হলুদের প্যাকেট (২০০১), শ্যাম্পু (২০০৪), হজমি বড়ি (২০১১), গায়েমাখা সাবান (২০১২), কোল্ড ক্রিমের টিউব (২০১৫)।

প্রাচীন ও দুষ্প্রাপ্য মূর্তির রেপ্লিকা পাওয়া যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ মণ্ডপে স্টেট আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামের বিপণিতে। বেশিরভাগই ফাইবারের। একমাত্র নবগ্রহেরটি ব্রোঞ্জের। দারুণ চাহিদা রয়েছে এই প্রতিলিপিগুলোর। আসামাত্র বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে জানালেন সোমদত্তা। বারাকপুরের গান্ধী স্মারক সংগ্রহালয়ের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে গান্ধীজি ব্যবহৃত চরকার কাঠের প্রতিলিপি। দাম মাত্র ২০০ টাকা।

বইমেলায় পালিত হয়েছে শিশু দিবস, প্রবীণ নাগরিক দিবস ইত্যাদি। এ বার থেকে একদিন বরাদ্দ করতেই পারেন বইমেলা কর্তৃপক্ষ হরেক মাল দিবসের জন্যে। সেদিন মেলায় সাহিত্যিকদের নামাঙ্কিত সরণিতে (এই নামকরণ মেলা কর্তৃপক্ষ জানলেই সম্ভবত যথেষ্ট! কারণ, গোটা মেলা ঘুরে কোথাও চোখে পড়ল না নামফলক। যতটুকু উল্লেখ, তা ওই মেলা মানচিত্রে) ঘুরেফিরে ফিরি করবেন ফিরিওয়ালারা। কিছু কিনলেই সঙ্গে বিনামূল্যে বই উপহার। মেলা কমিটির বড়বাবু মেজবাবুরা গোঁফের আলসেতে আলতো হাসি ঝুলিয়ে গলা হাঁকাবেন, বইয়ের জন্যে তাঁদের কী প্রাণপাত পরিকল্পনা…।

এ দিকে বইমেলাতে পকেটসাফাই নিয়ে নাকি পকেটমারদের সিন্ডিকেট ঠিক করেছে, পরের বার আগে থাকতে এই মেলায় যারা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবে, স্পেশাল ক্র‌্যাশ কোর্স করানো হবে। কারণ, এ বারে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত তিন ডজনের একটু বেশি পকেটমার ধরা পড়েছে।

দিনহাটা থেকে এসেছেন সমীররঞ্জন রাভা। ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তিকে দেখা গেল মালা জপতে জপতে ঘুরছেন বইমেলায়। উদ্দেশ্য কী– বারকয়েক জিজ্ঞেস করেও তার পাত্তা পাওয়া গেল না। জানা গেল, শুধু নাম আর সংক্ষিপ্ত ঠিকানাটুকু। হ্যাঁ, জপের মালা, তুলসীর মালা, রুদ্রাক্ষের মালা, আরও কত মালারা সব অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছে উপযুক্ত গলাস্থ হবে বলে।

বইমেলার মঞ্চে গেরুয়া-বাহিনীকে নিঙড়ে-কচলে ব্যাপক হাততালি কুড়োলেন বলিউডের অন্য মুখ স্বরা ভাস্কর। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে দেখা গেল এনআরসি-বিরোধিতার নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদ। প্ল্যাকার্ড হাতে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল বিচ্ছিন্নভাবে দু’চারজনকে। এ রকমই এক প্ল্যাকার্ড, যা ঝোলানো ছিল পিঠের ওপর, তাতে লেখা– ‘নুকোচুরি খেলছ খেলো– তা বলে আমারে দাবায়ে রাখতি পারবে না।’

ইন্ডিয়া পোস্ট-এর স্টলে পাওয়া যাচ্ছে বোতল-বন্দি গঙ্গাজল। খোদ হৃষিকেশ থেকে আনা। আরও পাবেন: পেপারওয়েট, বুকমার্ক, ঘর সাজানোর সেরামিক টালি। এগুলোর বৈশিষ্ট্য হল, প্রত্যেকটা আইটেমে কোনও না কোনওভাবে রয়েছে ফিলাটেলির ছোঁয়া। এহেন সরকারি গঙ্গাজল দেখে হতাশ হবেন না সরকার-বিরোধীরা। তারা পরখ করে দেখতে পারেন ধর্মীয় স্টলে বিক্রি হওয়া গঙ্গাজল।

যথারীতি জমজমাট খাবার স্টলগুলো। ওদের প্রতিটা অনু-পল-মুহূর্তই পৌষমাস। তাতে খানিক হলেও সর্বনাশ– বলছেন প্রতিবেশী স্টলমালিকরা। কার্যত বইমেলার কোলে খাদ্যমেলা…। গান্ডে-পিণ্ডে খাওয়ার বহর দেখে মনে হয়, বেচারা কতকাল খায়নি!

সুদূর ব্যাঙ্গালোর থেকে প্লেনে দমদমে নেমেই সোজা বইমেলায় চলে এসেছেন মিতালি ও শরণ্যা। দুই সখী। কর্নাটক রাজ্য সরকারের কর্মচারী– এভাবেই নিজেদের পরিচয় দিলেন ওঁরা। দু’জনের হাতেই একটা করে ট্রলি ব্যাগ, পিঠে রুকস্যাক। সঙ্গে যৎসামান্য জামাকাপড়। দু’রকম ব্যাগে ভর্তি বাংলা-ইংরেজি বই। দু’রাত থাকবেন ওরা কলকাতায়– এক বন্ধুর বাড়িতে। দু’তরুণীর উজ্জ্বল মুখ জানান দিল, কেবল বই কেনার জন্যই ওঁদের কলকাতায় আসা। ই-বুক প্রবণতার মাঝে এমন হার্ডকোর সনাতন গ্রন্থপ্রেমিকরাই বাংলা বইয়ের পাঠককুলের ভবিষ্যৎ।

লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে প্রকাশিত হয়েছে ‘শুভশ্রী’র ‘খাবারের স্বাদকাহন’ এবং ‘সংবর্তক’-এর ‘বিদ্যাসাগর’ সংখ্যা। অত্যন্ত সমৃদ্ধ দুটো সংখ্যা। ‘যারা যাযাবর’-এর স্টলে পাবেন কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্নপূর্ণা, মাকালু, ধৌলাগিরি, এভারেস্ট প্রভৃতি অভিযানের সিডি। সব ক’টিই দেবাশিস বিশ্বাসের।

এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বেরিয়েছে রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাসাগর-চরিতের সাঁওতালি অনুবাদ। শিশু দিবসে ৫০০ জন কচিকাঁচাকে গিল্ডের তরফে দেওয়া হল একত্রে একটি বই আকারে ছাপা বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়-এর দু’খণ্ড এবং জীবন-চরিত বইগুলো। বিশিষ্ট চিন্তক ও শিক্ষাবিদ পাউলো ফ্রেইরির শিক্ষা নিয়ে ভাবনা বিষয়ক বই সবিতা বিশ্বাসের ‘মুক্তির জন্য সাংস্কৃতিক প্রয়াস’। প্রকাশক, মনফকিরা। বীরুৎ জাতীয় সাহিত্য সম্মিলনী থেকে কবি অংশুমান করের সম্পাদনায় বেরিয়েছে ‘ওয়ার্ড অ্যান্ড ট্রুথ: রিডিং শঙ্খ ঘোষ’। শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি বই।

মেলার মাঠ পরিচ্ছন্ন থাকলেও ধুলোর দাপট অনুভব করা যাচ্ছে টানা চার-পাঁচঘণ্টা মেলায় থাকলেই। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের তরফে মেলায় স্টল না দেওয়াটা অবশ্যই মেলার আবহ-পরিবেশকে অনেকটাই স্বস্তি দিয়েছে। এতে শব্দদূষণ যে কমেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। যথারীতি অব্যাহত ‘ব্যাহত ইন্টারনেট পরিষেবা’। এ যাত্রায় কবে আর গাত্রোত্থান করবে!

You might also like