Latest News

হাড়ের বাঁশি (ষটত্রিংশ পর্ব)

বাসরাস্তা ওপরে, সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলে মোড়ের মাথায় রিক্সারা দাঁড়িয়ে থাকে। নিভু নিভু আলো, কদম গাছের নিচে একটা ঘুপচি চা-দোকান,পেট নরম মাছ আঁধারে নিয়ে বসে থাকে এক মেছুনি বুড়ি, যেমন হয় আর কী! একখান মাত্র রিক্সা আজ। হেঁটে হেঁটে ফিরতে ইচ্ছে করছিল না সাত্যকির, ভাড়া কত জিগ্যেস করল, রিক্সাচালকের ভাবলেশহীন কণ্ঠ ভেসে এল, ‘পঁচিশ টাকা!’ 

দু-এক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে সামান্য অন্যমনস্ক স্বরে সাত্যকি বলল, ‘কুড়ি টাকা তো ভাড়া!’ বয়স্ক লোকটি রিক্সা ঘুরিয়ে বলল, ‘আসুন।’

 

কে একজন অচেনা লোক সামনের চা-গুমটি থেকে আপনমনেই উঁচু গলায় বলছে, ‘বিষ্টি তো হবে আজ, ঢালবে ঢালবে, পেলাস আর মাইনাস যত, জানো তো, এভরি অ্যাকশান হ্যাড অপোজিট অ্যাকশান!’

মাধবীলতা ফুটেছে এদিকে কোথাও, সাত্যকি দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু গুমোট বাতাসে ভেসে আসছে সুবাস। 

 

রিক্সার প্যাডেলে চাপ দিয়ে চালক মৃদু হাসি গলায় টেনে বলল, ‘কুড়ি আর পচিশ, পাচ টাকা বেশি দিলিই বা কী! বলেন তো!’

তা, আপনিই কম নেন না পাঁচ টাকা, পনেরো নেন!

তা দ্যান, তাই দ্যান, দশ টাকাই দ্যান, কী হয়েচে! 

সে কেন দেব! যা ভাড়া তাই দেব, আপনিই বা বেশি বলবেন কেন!

কম আর বেশি, আসল কতা বুজলেন, যাওয়ার আনন্দ! যাওয়ার আনন্দ! টাকা তো আচেই!

 

চমকে উঠল সাত্যকি! দোহারা চেহারা, ফর্সা রঙ। কাঁচাপাকা চুল মাথায়। নাকটি বেশ উঁচু। আঁকাবাঁকা গলি পার হয়ে চলেছে দুজনে, পুকুরওয়ালা বড় বাড়ির চারপাশে কতগুলো সুপুরি গাছ তার ওপরে আকাশ, খণ্ড খণ্ড পাতলা মেঘ ভাসছে।

 

একটা মেয়ে সেদিন, তা ধরেন একানেই বাজে তকন দশটা পাচ, বুজলেন

হ্যাঁ, কী হল?

বাসে টাকার ব্যাগ খুয়েচে, যাবে সেই নন্দননগর

সে তো অনেকটা দূর! 

হাঁ, তা বললে, জ্যাটা, একটা উপ্‌কার করবে, বাড়ি পৌচে দেবে

কী বললেন আপনি?

বল্লাম, কেন করব না, চলো যাই, উপ্‌কার না করলি কী চলে, বলেন!

নিশ্চয়, ঠিকই তো!

তবে এ হল গে, ছোট উপ্‌কার! 

ছোট উপকার?

হাঁ, বড় উপ্‌কার করার মুরোদ কই! আমাদের ঘরে ঠাকুর আচে জানলেন, সে করবে বড় উপ্‌কার!

 

একফালি দোকানে চাল আলু ডিম কিনছে এক কিশোরী।লণ্ঠনের আলোয় চকচক করছে মুখ, রঙচটা নাইটি পরনে। আলো চলে গেছে মনে হয়। কটা কুকুর শুয়ে আছে এখানে ওখানে।

 

আপনাদের ঘরে কী ঠাকুর?

শিব। বড় শিব আচে। মেয়ে বউরা সব জল ঢালতে আসে।

শিবরাত্রি করেন নাকি?

একটু হেসে বলল, ‘পাড়ায় করে। দুদ ঢালে ভোগ দেয়।আমাদের নীল পুজোর আস্য।’

 

একটু অবাকই হল সাত্যকি, চড়কের আগে, নীলের অধিবাস। শিব লীলাবতীর বিয়ে, রাতের বেলায় যত ভূত পেত্নি শাকচুন্নীদের নেমতন্ন, খিচুড়ি আর শোল মাছ! বেলকাঠ কেটে নীলের মূর্তি গড়ে কাঁখালে নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করবে চড়কের সন্নিসিরা কিন্তু এসব দোঁআশলা শহরে সেসব করার তো লোক নাই!

জিজ্ঞাসা করল, ‘ঘর কোথায় আপনার ? এদেশের ?’

ওপারে ঘর, বিক্কমপুর!

ঢাকা বিক্রমপুর? কোন গ্রাম ?

আপনারও ওদিকে নাকি?

একটু হেসে সাত্যকি জবাব দিল, ‘না না, আমরা এপারে!’

ও, তা আমাদের ঘর ছিল বজ্জযোনি।

বজ্রযোগিনী গ্রাম?

হাঁ, বজ্জযোনি।

ওখানে একটা ঢিপি আছে,

কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল, ‘হাঁ হাঁ, তকন তো পাচ ছ বচর বয়স, তবে মনে আচে, কে একজন লোকের ঢিপি নাকি।’

 

অল্প অল্প হাওয়া ছেড়েছে। সর পড়া পুকুরের পাশে ঘন বাঁশবন, কয়েকটা জোনাক জ্বলছে,পাশেই মুসলমানদের পুরোনো কবরখানা, এখন কেউ আসে টাসে না আর গোর দিতে, সাত্যকি জিজ্ঞাসা করল, ‘এদেশে এসেছেন কি ভাগের সময় ?’

না গো, সেই চোষট্টি সালে।

ঈশ্বরদী হয়ে?

তিপুরা হয়ে এসচিলাম। তকন এসব দিক ফাকা, লোকজন নাই, বড় বড় মাট আর জংগল।কত গাচ! তা বাবা তোমার ঘর কোতায় ?

 

অনেকদিন পর এই ধুলামলিন শহরে সাত্যকির ভারী মিঠে লাগল ডাকখানি, স্পষ্ট যেন দেখল, এক সরলমতি বালক খেলা করে বেড়াচ্ছে পথে, গাছপালার দিকে চেয়ে আছে অবাক বিস্ময়ে, পদ্মানদীর উথালিপাতালি বাতাসে টলমল করছে দুটি ভ্রমরকালো চোখ। বালকটির দেশ হারিয়ে গেছে, ক্ষুধার থালায় অন্ন বাড়ন্ত এখন,সেই দূর ভিটায় গেরস্ত দালান মন্দিরে কেউ আর ধূপ দেয় না জ্বলে না সন্ধ্যারতির দীপ, একলাই পড়ে থাকেন বাস্তুদেবতা। আপনমনে বয়ে যায় বাতাস।

 

আমার ঘর এদেশেই!

কোতায়?

আলগোছে সাত্যকি সাকিন বলায় মাঝবয়সী লোকটি রিক্সার ঘণ্টি দু’বার বাজিয়ে ফের জিজ্ঞাসা করল, ‘কে কে আচে? মা-বাপ ? নাম কী তোমার?’

প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু নিজের নামটি বলল সাত্যকি, ‘অভিজিৎ ব্যানার্জি!’, তারপর মানুষটির নাম শুধোল, লোকটি জবাব দিল, ‘মন্টু মুখার্জি।’

তোমরা কি বামুন বাবা? ঘরে দেবতা আচে ?

নাহ!

‘মনে করবা, সবসময় মনে করবা বাবা দ্যাশের কথা!’, তারপর একটু থেমে কেমন যেন আনমনা হয়ে বলল, ‘পেরাইভেটে চাকরি তো। খুব খাটনি। সমসারের ভার।’ 

 

সাত্যকির আস্তানা চলে এসেছে প্রায়, এদিকটায় আলো আছে, ঝলমলে দোকানপাট, কিচিরমিচির লোক, পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে শুধোল, ‘আপনার ছেলে মেয়ে কটি ?’

ছেলে বড় হয়েচে। তোমার তেকে খানিক কম হবে বয়স।

তা বেশ তো! কাজকর্ম করে তো ? এই বয়সে আর গাড়ি টানবেন না।

দু এক মুহূর্ত মাত্র, ঘামে ভেজা মুখে এসে পড়েছে রাস্তার আলো, মলিন গলায় বলে উঠল, ‘ও বাঁশি বাজায়, কাজ কামে মন নাই গো। ওই একানে ওকানে ফানশান করে, কটা টাকা পায়। দু একজনকে শেকায়!’ ,খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বেজে উঠল ভালোবাসায়, ‘আমি বলি না কিচু, ওসব লোকে কাজ করতে পারে না। করুক, ভালবাসে তো। যদ্দিন পারি টানি আমি, বুজলা বাবা!’

 

দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আলো-আঁধারি সন্ধ্যায় সাত্যকির দিকে তাকিয়ে মন্টু জিজ্ঞাসা করল, ‘তা তুমি কোন আপিসে চাকরি করো?’

কোমরের কাছে জামার তলায় অস্ত্রটির উপর আনমনা হাত রেখে সাত্যকি মৃদু হাসল, ‘রাত হয়েছে, বাড়ি যান!’

 

বাড়ি ফেরার পথে রাজুর কথা ভাবছে সাত্যকি, এখন ভাড়ার গাড়ি চালায়, আগে একনলা বাংলা-বন্দুক চালাতো, বোমা বাঁধতে গিয়ে ডান হাতের অনামিকা হারিয়ে ফেলেছে। তাও হল আজ পঁচিশ বছর। তখন রাজুকে সবাই মামা বলে চেনে।

 

ছকু খানসামা লেনে মামার দিন শুরু হয় রাত্রি আটটার পর। লোকজন আসে, কারোর বালি-পাথর ফেলতে হবে,  ভাড়াটে ঝামেলা করছে, আইবুড়ো মেয়ে পালিয়েছে লেদ কারখানার ইসমাইলের সঙ্গে, কাউকে হাসপাতালে অপারেশনের জন্য ভর্তি করে দিতে হবে, এইসব নানারকম সমস্যা। ডানহাতের অনামিকায় এই বড় একটা রক্তমুখী নীলা, সেদিকে তাকিয়ে মামা শান্ত হয়ে শোনে, তারপর নিচু গলায় একে তাকে নির্দেশ দেয়। ওতেই কাজ হয়ে যায়!

 

মামার পোষা মেয়েছেলে নাই। কাটা চন্দনের নিষেধ ছিল, মেয়েছেলে থেকে যেন সাত হাত দূরে থাকে। গুরুর কথা এখনও মনে রেখেছে। কাটা চন্দন মামাকে হাতে ধরে শিখিয়েছিল বন্দুকের নিশানা, কবজি কাঁপলেই আর গুলি ফুটোয় ঢুকবে না। এমনিই বাংলা বন্দুক কলের পাইপের মতো হড়হড়ে, অবশ্য পরে মামা বুঝেছে ওসব নিশানা ফিশানা দিয়ে এ লাইনে কিছু হয় না। কপালে ঠেকিয়ে ঘোড়া টানা, সোজা কাজ। শুধু হেগে মুতে না ফেললেই হল! প্রথম প্রথম রক্ত দেখে কত লোকের পেচ্ছাপ হয়ে যায়! গুরুর নাম উঠলে এখনও কপালে হাত ঠেকায় মামা। 

 

সাত কেলাস অবধি পড়ে, ও পাট চুকিয়ে দিয়েছে রাজু। বাবা, কালীরাম চট্টোপাধ্যায় ছিল পুরোহিত। দুই দিদি রাজু আর বৃদ্ধ পুরোহিত, এই হল সংসার। মা মারা গেছে বছর খানেক বয়সে, সেই থেকে বড়দির কাছেই মানুষ রাজু। বাড়ি থেকে যখন পালায় তখন দুই দিদির আর কেউ ই বেঁচে নাই। রেপ করে বড়দির দেহটা কারা যেন ফেলে রেখে গেছিল কানা ডোবার ধারে। আর ছোড়দি মরল টাইফয়েডে। পুরনো মফস্বল শহরে বড়দির লাশ নিয়ে কদিন খুব হইচই হল, তারপর বর্ষার জলের মতো থিতিয়ে গেল সবকিছু। অতসী চট্টাপাধ্যায়কে সবাই ভুলে গেল বেমালুম।

 

মা কে মনে ছিল না রাজুর, মর্গ থেকে যখন বডি এলো দিদির, ফুলে ঢোল। টলটলে পদ্মদীঘির মতো মুখখানি কালো হয়ে গেছে, চিতায় ওঠানোর আগে নুড়ো জ্বালতে গিয়ে হড়হড় করে বমি করে ফেলেছিল রাজু। কতই বা বয়স, তেরো চোদ্দ হবে। দুমাস আগেই মরেছে ছোড়দি। কালীরাম কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতো। সারা দিনমান বারান্দায়, বাড়ি বাড়ি পুজো করতেও যেত না আর। 

 

ছকু খানসামা লেনের মামার আজ রাতে বড় অপারেশন আছে। চা-গুমটির সেই লোকটির কথা শুনেই যেন বৃষ্টি নেমেছে জোর, গোঁয়ার ক্ষ্যাপাটে বাতাসে ভেসে যাচ্ছে মধ্য কলকাতা। ভবখেলা থেকে মুছে দিতে হবে দুজন মানুষকে। তেমনই নির্দেশ এসেছে ওপরের তলা থেকে, যেমন তেমন কেউ নয়, তালতলার কামাল, একসময় মামার ডানহাত ছিল। মেশিন চালানোর সময় মামা জানে, মন শক্ত করে রাখতে হবে। এ জগত এরকমই, পুরোনো পীরিতে চোখ বেঁধে রাখলে চলে না। কে কখন মরবে, জানা যায় না। যেমন ওরা কেউ জানে না কাল সকালে মামা আর কামাল, দুজনের লাশই তুলে নিয়ে যাবে তালতলা থানার পুলিশ! সাত্যকি তেমনই ব্যবস্থা করে এসেছে, গভীর রাতে অবশ্য বেরোতে হবে একবার। 

 

             চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (পঞ্চত্রিংশ পর্ব )

You might also like