Latest News

Ghost Plane: রহস্য, না ভূতুড়ে কাণ্ড? ৩৪০০০ ফুট উপরে কী ঘটেছিল এই প্লেনের যাত্রীদের সঙ্গে

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো ১৪ আগস্ট, ২০০৫- আজ থেকে ১৭ বছর আগের এক সকাল। রোজকার রুটিন মেনেই কাজ চলছে সাইপ্রাসের লার্নাকা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। বিখ্যাত বিমান নির্মাণকারী সংস্থা বোয়িং-এর ৭৩৭ মডেলের হেলিওস এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ৫২২ সাইপ্রাস থেকে গ্রিসের এথেন্সের উদ্দেশ্যে রওনা হল যখন, তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় ৯টা ০৭। প্লেনে সে মুহূর্তে ১১৫ জন প্যাসেঞ্জার আর ৬ জন ক্রু মেম্বার নিয়ে ১২১ জন মানুষ। (Helios)

সেদিন হেলিওস ওড়ানোর দায়িত্ব ছিল ৫৮ বছরের জার্মান পাইলট হ্যান্স-জারগেইন মারটেইনের কাঁধে। যাঁর আন্তর্জাতিক প্লেন ওড়ানোর অভিজ্ঞতা প্রায় ১৬৯০০ ঘণ্টার। সঙ্গে কো-পাইলট হিসেবে ছিলেন প্যাম্পস ক্যারালাম্বাস। বিমান চালানো তথা অন্যান্য খুঁটিনাটি নিয়ে তাঁরও অভিজ্ঞতা কম না। সাদা রঙের অতিকায় এক অ্যালবাট্রস পাখির মতো যথাসময়ে আকাশে ডানা ছড়িয়ে টেক অফ করল হেলিওস।

Image - Ghost Plane: রহস্য, না ভূতুড়ে কাণ্ড? ৩৪০০০ ফুট উপরে কী ঘটেছিল এই প্লেনের যাত্রীদের সঙ্গে

শুরুটা ভালোই হয়েছিল। আকাশে ওড়ার ঠিক ৫ মিনিটের মধ্যেই অর্থাৎ নটা বেজে ১৫ মিনিট নাগাদ বিমান পৌঁছে যায় ১২০৪০ ফিট উচ্চতায়। হঠাৎ এই সময় যাত্রীদের সচকিত করে একটানা অদ্ভুত শব্দে অ্যালার্ম বাজতে শুরু করে ককপিটে। এই উচ্চতায় এসে এই ধরনের অ্যালার্ম সাধারণত বাজার কথা নয়, কারণ এটি টেক অফ কনফিগারেশন এলার্ম। সোজা কথায় প্লেনটা যখন রানওয়ের মাটিতে টেক অফ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন এই অ্যালার্ম বাজার কথা। তাই হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে ওঠায় চমকে যান পাইলটেরাও। মেঘের উপরে ১২০০০ ফুট উচ্চতায় উঠে গিয়েও প্লেন হঠাৎ এমন সিগন্যাল দিচ্ছে কেন? এমন তো হওয়ার কথা নয়। মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন অভিজ্ঞ দুজন পাইলট।

সমস্যাটা ঠিক কোথায় বুঝে উঠতে পারছিলেন না দুজনের কেউই। টেকনিক্যাল অসুবিধা হয়েছে কি না, বা হয়ে থাকলে অবস্থা ঠিক কতটা গুরুতর তা পরীক্ষা করার জন্য তাঁরা তক্ষুনি এটিসি মানে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তার আগেই রহস্যজনকভাবে প্লেনের ককপিটে একসঙ্গে আরও কিছু অদ্ভুত রকমের অ্যালার্ম বাজতে শুরু করে। অ্যালার্মগুলোর আওয়াজ এতই জোরালো ছিল যে পাইলট অনেক চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাঁদের কণ্ঠস্বর এটিসি পর্যন্ত পৌঁছচ্ছিল না। (Helios)

Image - Ghost Plane: রহস্য, না ভূতুড়ে কাণ্ড? ৩৪০০০ ফুট উপরে কী ঘটেছিল এই প্লেনের যাত্রীদের সঙ্গে

এতসাথে এতরকম শব্দে ক্রু আর যাত্রীদের মধ্যেও দেখা দিল আতঙ্ক। চিন্তার ভাঁজ পড়ল অভিজ্ঞ দুই পাইলটের মুখেও। কিন্তু বিপদের এখানেই শেষ নয়। এর কয়েক মুহূর্ত পরেই বেজে উঠল প্লেনের মাস্টার কশান (CAUTION) অ্যালার্ম। ওড়ার সময় চূড়ান্ত বিপদসংকেত ছাড়া এ অ্যালার্ম বাজে না। পাইলটেরা স্পষ্টতই বুঝলেন ফ্লাইটের অনেকগুলি সিস্টেম একসঙ্গে ওভারহিট হয়ে গেছে। ব্যাপারটা ভয়ংকর চিন্তায় বৈ কী! ঘাবড়ে যাওয়া পাইলটেরা প্রথমে বুঝতেই পারছিলেন না এই মুহূর্তে কী করা উচিত? বিপদ সংকেত পেয়ে ক্রু মেম্বারদের মধ্যেও ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। বড় কোনও বিপদ যে সামনে তা বিমানের যাত্রীরাও বুঝতে পারছিলেন। অস্বাভাবিকরকম ভয় পেয়ে যায় তাঁরাও। বিমানের ভিতরের বাতাস যেন আচমকা ভারী হয়ে এসেছে। নিশ্বাস নিতে রীতিমতো অসুবিধে হতে শুরু করে একসময়। যেন কার ইঙ্গিতে বিষাক্ত বাতাসে ভরে গেছে প্লেনের খোল। বাতাসে অক্সিজেনের অভাব টের পাওয়া মাত্র যাত্রীদের মুখের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে আসে অক্সিজেন মাস্ক।

বিশ্বের যেকোনও প্লেনেই এরকম অক্সিজেন সেন্সর লাগানো থাকে। যাঁদের জীবনে দুএকবার প্লেনে চড়ার অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরা সকলেই জানেন এ কথা। সেন্সর যদি কখনও বোঝে যে প্লেনের ভিতর অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে তাহলে সেটা নিজে নিজেই খুলে গিয়ে যাত্রীদের মুখের সামনে চলে আসে। সেই সময় হেলিওস ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০০ ফুট উচ্চতায়। প্লেনের পাইলটরা বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন এটিসির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার, নিজেদের আশু বিপদের কথা তাঁদের জানানোর… কিন্ত যান্ত্রিক গোলোযোগের কারণেই হোক বা অন্য কোনও কারণে, যোগাযোগের সব চেষ্টাই বিফল হচ্ছিল। এই ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই এটিসির সঙ্গে প্লেনের সমস্ত রকম সংযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমনকি এটিসি গ্রাউন্ডের প্রফেশনালরাও হেলিওসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেন বহুবার, কিন্তু সব চেষ্টাই বিফলে হয়। সব যোগসূত্র হারিয়ে মেঘের ওপারে ক্রমাগত আরও আরও উচ্চতায় উঠে যেতে থাকে হেলিওস।

Image - Ghost Plane: রহস্য, না ভূতুড়ে কাণ্ড? ৩৪০০০ ফুট উপরে কী ঘটেছিল এই প্লেনের যাত্রীদের সঙ্গে

সাধারণত সাইপ্রাস থেকে গ্রিসের এথেন্স যেতে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট মতো সময় লাগে। সেই হিসেবে এথেন্স শহরে ১০ টা ৫০ নাগাদ পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল হেলওসের। এদিকে বিমানটি ছাড়ার ২০ মিনিট পরেই অর্থাৎ ৯:২৩ নাগাদ বিমান পৌঁছে যায় প্রায় ৩৪০০০ ফুট উচ্চতায়। যেটা একেবারে অস্বাভাবিক। নটা বেজে সাইত্রিশ মিনিটে বিমান এথেন্সের ফ্লাইট ইনফর্মেশন রিজিয়নে পৌঁছে যায়। ১০:১২ থেকে ১০:১৫, এই সময়ের মধ্যে এথেন্সের এটিসি বিমানটির সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে থাকে। তারাও হেলিওস ৫২২ থেকে কোনওভাবে কোনও উত্তর পায় না। এদিকে ঘড়ি এগারোটার কাঁটা ছুঁইছুঁই তখন। বিমানটির এথেন্সে ল্যান্ড করে যাবার কথা ১০:৪৫। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও হেলিওসের দেখা নেই। এবার চিন্তার ভাঁজ পড়ে কর্তৃপক্ষের কপালেও। কোথায় গেল হেলিওস ৫২২? ১২১ জন জলজ্যান্ত মানুষকে নিয়ে সে কি মেঘের রাজ্যে উধাও হয়ে গেল?

স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে মনে করা হয়েছিল কোনও সন্ত্রাসবাদী বোধহয় বিমানটিকে হাইজ্যাক করেছে। ঠিক কী হয়েছে তা বোঝার জন্য তক্ষুনি একটি আপদকালীন কমিটি গঠন করা হয় এথেন্সে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিজ্ঞ পাইলট সহ দুটি অত্যন্ত উন্নত এফ-সিক্সটিন ফাইটার জেটকে বোয়িং বিমানটির খোঁজ করতে পাঠানো হয়। যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে আকাশে ওড়ে নজরদারি বিমান। বেশ কিছুক্ষণ আকাশে চক্কর কাটার পর হঠাৎ করেই বোয়িং বিমানটিকে দেখতে পায় তারা। সঙ্গে সঙ্গেই ফাইটার বিমানদুটো ফলো করতে থাকে বোয়িং বিমানটিকে।

বোয়িং বিমানটির ওড়ার মধ্যে একটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যাচ্ছিল। ফাইটার বিমান পাইলটদের নজর এড়ায় না সেটা। দ্রুত গতি বাড়িয়ে একটি ফাইটার বিমান হেলিওসের খুব কাছে চলে যায় শুধুমাত্র এটা দেখার জন্য যে প্লেনের ভিতর কী চলছে? বোয়িং বিমানের ককপিটের যতটুকু অংশ দেখা যাচ্ছিল তাতে ফাইটার প্লেনের পাইলট দেখেন কো-পাইলটের জায়গায় প্রায় পুতুলের মতো বসে রয়েছে একজন। তাঁর মাথা ঝুঁকে পড়েছে কাঁধের একপাশে। কিছুই বুঝতে পারে না সে। কো-পাইলট কি তবে জ্ঞান হারিয়েছে? পাইলটই বা কোথায়?

Image - Ghost Plane: রহস্য, না ভূতুড়ে কাণ্ড? ৩৪০০০ ফুট উপরে কী ঘটেছিল এই প্লেনের যাত্রীদের সঙ্গে

মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন ভিড় করে এসেছে তখন। দেরি না করে ফাইটার প্লেনের পাইলট তক্ষুনি প্লেনটির পেছনের দিকে যায় আর জানলা দিয়ে যাত্রীদের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে। সাধারণত বিমানের পাশে যদি কোনও ফাইটার প্লেন চলে আসে তাহলে আগ্রহী যাত্রীদের মধ্যে কেউ না কেউ সেই ফাইটার প্লেনটির দিকে অবশ্যই একবার তাকাবে। কিন্তু পাইলট দেখলেন পাশাপাশি ওড়া ফাইটার প্লেনের দিকে একজন যাত্রীও তাকাচ্ছে না। সবাই অক্সিজেন মাস্ক মুখে লাগিয়ে চুপচাপ বসে আছে। বিমানের সমস্ত যাত্রীকে ওইভাবে অক্সিজেন মাস্ক মুখে লাগিয়ে কাঠের পুতুলের মতো বসে থাকতে দেখে এক আশ্চর্য ভয়ের শিহরণ বয়ে যায় ফাইটার পাইলটের শরীরে।

ঠিক এই সময় ঘটে যায় আর একটা ঘটনা। ফাইটারের পাইলট লক্ষ করেন বিমানের ভেতর এক ব্যক্তি তাড়াহুড়ো করে কেবিন থেকে ককপিটের দিকে যাচ্ছেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায় লোকটি পাইলটের সিটে গিয়ে বসলেন। ফাইটার বিমানের পাইলট তাঁকে দেখতে পেয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। বোয়িং বিমানের লোকটিও তখন ফাইটার বিমানের পাইলটকে দেখতে পেয়ে ইশারা করে কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু লোকটি কিছুই স্পষ্ট করে ইশারা করতেও পারছিলেন না। কী এক ভূতুরে কাণ্ডকারখানা যেন চলছে অভিশপ্ত হেলিওসের ভিতর। কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও বোয়িং বিমানের ওই ব্যক্তির চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ দেখতে পাচ্ছিলেন ফাইটার বিমানের পাইলট।

ঠিক আর কয়েক মিনিট পরেই অর্থাৎ ১১:৫০ নাগাদ হেলিওস প্লেনের বামদিকের ইঞ্জিনটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। বামদিকে সাংঘাতিক রকমের ঝুঁকে পড়ে বিমান, আর ঐ অবস্থাতেই অসম্ভব গতি নিয়ে নীচে নেমে আসতে শুরু করে। ককপিটের পাশের কাচ দিয়ে যেটুকু চোখ যায় তাতে ফাইটার পাইলট দেখতে পাচ্ছিলেন হেলিওসের ভিতরের ওই ব্যক্তি ককপিটে বসে প্লেনটিকে প্রাণপণে সোজা করার চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু কোনওভাবেই হেলিওসকে আর তিনি কন্ট্রোল করতে পারছেন না।

Image - Ghost Plane: রহস্য, না ভূতুড়ে কাণ্ড? ৩৪০০০ ফুট উপরে কী ঘটেছিল এই প্লেনের যাত্রীদের সঙ্গে
ফাইটার প্লেন থেকে হেলিওসের উপর নজরদারি

আরও মিনিট দশেক পর বেলা বারোটা নাগাদ প্লেনের ডানদিকের ইঞ্জিনটিও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। প্লেনের দুটো ইঞ্জিনই তখন বন্ধ। ডানাভাঙা পাখির মতো গোঁত্তা খেতে খেতে এর ঠিক ৪ মিনিট পরে এথেন্সের ৪০ কিলোমিটার দূরের এক পাহাড়ে আছড়ে পড়ে অভিশপ্ত হেলিওস। ফাইটার বিমানের পাইলট অসহায়ের মতো উপর থেকে দেখেন সবকিছু। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দ্রুতগতিতে নেমে যাওয়া হেলিওস মুহূর্তেই টুকরো টুকরো হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। আর দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে কালান্তক আগুন।

অত বড় দুর্ঘটনার পরে ওই বিমানে আর কি কেউ বেঁচে থাকতে পারে? অসম্ভব। চোখের সামনে ১২১ জন যাত্রীর এই ভয়াবহ পরিণাম দেখে ভয়ে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যান নজরদারি বিমানের পাইলটও। বিমানটি চোখের সামনে ধ্বংস হতে যেতেও নির্বাক দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না সেই ফাইটার বিমান পাইলটের।

ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিমানটির খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে যায় সব জায়গায়। সঙ্গে সঙ্গেই দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসে রেসকিউ টিম। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। ১২১ জন হতভাগ্য মানুষের পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া লাশগুলো একটা একটা করে বাইরে বের করা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় পোস্টমর্টেমের জন্য। কিন্তু চমকের এখানেই শেষ নয়। মৃতদের অটোপসি রিপোর্ট দেখে ঘাবড়ে যান সরকারি বড়কর্তারাও। কারণ পোস্টমর্টেম রিপোর্ট স্পষ্ট বলছে, সেদিন প্লেনে যত জন যাত্রী ছিল তারা কেউ প্লেন ক্রাশ হওয়ার কারণে মারা যাননি। তাঁরা মারা গেছেন দুর্ঘটনার বহু আগেই। প্লেন মাঝ আকাশে থাকাকালীনই কী এক রহস্যজনক কারণে একে একে দমবন্ধ হয়ে মারা গেছেন প্লেনের প্রত্যেক যাত্রী, মায় পাইলট, কো-পাইলটও।

হেলিওসের ধ্বংসাবশেষ

তাহলে শেষ্মুহূর্ত অবধি ফাইটারের পাইলট কাকে দেখেছিল সেই অভিশপ্ত প্লেনের ককপিটে? যদি প্লেন ক্র্যাশ করার অনেক আগেই হেলিওসের পাইলট মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে প্লেনের ভেতরে কে ছিল যে প্লেনটিকে কন্ট্রোল করছিল? এ নিয়েই নতুন করে শুরু হয় তদন্ত।

তদন্তে উঠে আসে এক আশ্চর্য সত্যি। জানা যায় ফ্লাইটটিকে সেই মুহূর্তে যিনি কন্ট্রোল করছিলেন তিনি ছিলেন ফ্লাইটের তিন নাম্বার কো-পাইলট। তাঁর নাম ছিল অ্যান্ড্রিয়াস। শেষ মুহূর্ত অবধি তিনি প্লেনটিকে নানাভাবে সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। এটিসি থেকে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে এই ব্যক্তির আর্ত গলার আওয়াজই খুব ক্ষীণভাবে শুনতে পেয়েছিলেন অফিসারেরা। অ্যান্ড্রিয়াসের কাছে কমার্শিয়াল পাইলটের লাইসেন্স ছিল বটে, কিন্তু যাত্রীবাহী প্লেন চালাবার তেমন কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই প্রাণপণ চেষ্টা করেও এত বড় প্লেনকে তিনি কন্ট্রোল করতে পারেননি। বিমানটিকে নিয়ে রানওয়ের ওপরে চক্কর মারলেও বিমানবন্দরে কোনো অবস্থাতেই নামাতে পারেননি তিনি। সম্ভবও ছিল না। কারণ গ্রাউন্ডের সঙ্গে সমস্ত সংযোগই বিচ্ছিন্ন হয়েছে ততক্ষণে। মৃত্যু আসন্ন বুঝতে পেরে তিনি প্লেনটিকে ধ্বংসের আগে এথেন্সের ঘনবসতি থেকে অনেক দূরে নিয়ে যান।

Image - Ghost Plane: রহস্য, না ভূতুড়ে কাণ্ড? ৩৪০০০ ফুট উপরে কী ঘটেছিল এই প্লেনের যাত্রীদের সঙ্গে

পরে ব্ল্যাকবক্স রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে বাঁদিকের ইঞ্জিনের তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রথমে হেলিওসের বাঁদিকের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে তা ভারসাম্য হারিয়ে ভেঙে পড়ে মাটিতে। কিন্তু আসল প্রশ্ন তো অন্যখানে। তদন্তকারী অফিসারদের মাথায় ঢুকছিল না একটাই কথা, বিমানটি ক্রাশ হওয়ার অনেক আগে মাঝ আকাশেই কীভাবে মারা গেল সমস্ত যাত্রী? এই ভূতুড়ে ঘটনার কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যাই মিলছিল না।

রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে। কাগজে লেখালিখিও শুরু হয়। উপরমহলের চাপে নতুন করে শুরু করা হয় ইনভেস্টিগেশন। তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালানো হল ভাঙা বিমানটির ভেতর, যদি কিছু ক্লু মেলে, যা থেকে জানা যায় ঠিক কী ঘটেছিল সেই অভিশপ্ত দিনে! তদন্ত করতে করতে একসময় এক ইনভেস্টিগেটিভ অফিসারের দৃষ্টি যায় প্লেনের ককপিটের ওপর রাখা কন্ট্রোলের দিকে। ওখানে একটি বাটন ছিল যাতে প্লেনের প্রেসার কন্ট্রোল করা হয়। আর এই বাটনটির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল রহস্যের উত্তর। এরপরেই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় সেদিনের সমস্ত ঘটনা।

ওই প্রেসারাইজ বাটনটি এমন একটি বাটন যেটি প্লেনের ভেতরের বাতাসের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। সাধারণত এই প্রেসার আইস বাটনটিকে অটোমেটিক মোডেই রাখা হয়। তবে কখনো যদি ওই অটোমেটিক প্রেসারাইজ বাটনটিকে ম্যানুয়াল মোডে রাখা হয় তাহলে প্লেনের পাইলট এবং কো-পাইলট সজাগ দৃষ্টি রাখেন ওই বিশেষ বাটনটির উপর। হেলিওসের সঙ্গে সেদিন ঠিক কী হয়েছিল জানতে আপনাদের নিয়ে যাব ঘটনার ঠিক একদিন আগে।

নির্দিষ্ট যাত্রার আগের দিন এই বোয়িং বিমানটি নিজের রুটিন সার্ভিসে গেছিল। সেখানে প্লান্টের সার্ভিসিং হয়, আর সেখানেই প্রেশার বাটনটিকে ম্যানুয়াল মোডে সেট করে দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট দিনে যখন পাইলট বা কো-পাইলট বিমানটিকে নিয়ে আকাশে ওড়েন তখন তাদের দৃষ্টি একবারের জন্যও এই প্রেশার বাটনের দিকে যায়নি। তারা জানতেই পারেননি বিমানের ম্যানুয়াল প্রেশার মোডটি অন আছে, অটোমেটিক নেই। যে কারণে একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় ওঠার পরেই বিমানের মধ্যে অক্সিজেনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। তার ফলে বিমানের মধ্যে বসে থাকা যাত্রীদের ধীরে ধীরে অস্বস্তি হতে শুরু হয়। বিমানের অক্সিজেনের মাত্রা কম হতে শুরু করায় বিমান অ্যালার্ম দিতে শুরু করে। অনুমান করা হয় যে দুর্ভাগ্যবশত সেই অ্যালার্মটিকে পাইলটরা টেক অফ অ্যালার্ম ভেবে ভুল করেন এবং এটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু যান্ত্রিক গোলোযোগ হওয়ায় এটিসির সাথে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়।

ভাবছেন তো, এতদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পাইলট এবং কো পাইলটের এত বড়ো ভুল কী করে করলেন! একেই বোধহয় বলে নিয়তির পরিহাস। প্লেনে অক্সিজেনের মাত্রা কম হতেই সমস্ত যাত্রীদের মুখের সামনে অটোমেটিক অক্সিজেন মাস্ক নেমে আসলেও ককপিটে অক্সিজেন মাস্ক অটোমেটিক্যালি নামে না। সেটিকে বের করে তারপর মুখে লাগাতে হয়। কিন্তু অক্সিজেনের মাত্রা হঠাৎ অনেকটা কম হয়ে যাওয়াতে প্লেনের দুজন পাইলটই অজ্ঞান হয়ে যান। এরপর বিমানটি অটোপাইলট মোডে চলতে থাকে এবং বিমানে বসে থাকা যাত্রীরাও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে শুরু করে। কারণ অক্সিজেন মাস্ক যেটা মুখের সামনে নেমে আসে তার সময়কাল থাকে মোটামুটি ১০-১২ মিনিট। সে সময় পেরিয়ে যেতেই প্লেনের মধ্যে উপস্থিত প্রায় সব যাত্রীই একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। একজন মাত্র ব্যক্তি বেঁচে ছিলেন তখনও। তিনি বিমানের সেই তৃতীয় পাইলট অ্যান্ড্রিয়াস।

Image - Ghost Plane: রহস্য, না ভূতুড়ে কাণ্ড? ৩৪০০০ ফুট উপরে কী ঘটেছিল এই প্লেনের যাত্রীদের সঙ্গে
যে শোকের সান্ত্বনা নেই

এবার মনে হতেই পারে যে এত লোক যখন অক্সিজেনের অভাবে মারা গেল তখন একজন লোক কী করে বেঁচে রইল? আসলে অ্যান্ড্রিয়াস ছিলেন একজন স্কুবা ড্রাইভার। স্কুবা ড্রাইভার জলের নীচে নিজের শ্বাস অনেকক্ষণ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন। ফলে প্রচন্ড কষ্ট হলেও বেঁচে থাকার একটা শেষ চেষ্টা করেছিলেন অ্যান্ড্রিয়াস। কোনওভাবে তিনি ককপিটের সামনে যান এবং প্লেনটিকে কন্ট্রোল করার চেষ্টাও করেন। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে তখন। ততক্ষণে পুরো বিমানটি হয়ে ওঠে মৃতদেহের স্তুপ। তবে অ্যান্ড্রিয়াস জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত প্লেনটিকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে গেছিলেন। শেষে তিনি যখন বোঝেন তাঁর আয়ু ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে এবং বিমানটির একটা ইঞ্জিনও একদিকে বন্ধ হয়ে গেছে, তখন তিনি সেই বিমানটিকে জনবসতি থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেন। পরে আরেকটি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিমানটি সবশুদ্ধ ভেঙে পড়ে পাহাড়ের কোলে। এই ঘটনার প্রায় ১৫ মাস পরে এথেন্সের আধিকারিকরা একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেন। সেদিন ঠিক কী হয়েছিল হেলিওসের ভিতরে, তারই ব্যাখ্যা ছিল সে রিপোর্টে। এই রিপোর্ট থেকে পরিষ্কার হয় যে প্লেনে যা ঘটেছিল তার জন্য দায়ি শুধুমাত্র একটি বাটন। আর দায়ি পাইলট আর কো-পাইলটের অভিজ্ঞতার খামতি, যারা সেই বাটনটির দিকে মনোযোগই দেননি। তবে সার্ভিস সেন্টারের যে ব্যক্তি ঘটনার আগের দিন হেলিওসের সার্ভিসিং করেছিলেন তাঁরও কি দোষ কম ছিল? না কি সবটাই নিয়তি? আপনাদের কী মনে হয়?

You might also like