Latest News

পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: শুধু কবিতা লিখে বা সাহিত্যচর্চা করে তো পেট ভরে না। বেঁচে থাকার জন্য কবি ও লেখককে কোনো না কোনো কাজ করতে হয়। কবিতার বইয়ের জন্য রয়্যালটি পাওয়া এক অলীক স্বপ্ন। প্রাথমিকভাবে তার পরিমাণও শোচনীয় রকমের কম। ওতে সারামাসের নুন-ভাতটুকুও জোটানো দায়। খুব খ্যাতিমান না হলে গল্প উপন্যাসও বিপুল পরিমাণে বিক্রি হয় না। ফলে ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য চাকরি, ব্যবসা বা নিদেনপক্ষে ছাত্র পড়ানো কিছু একটা করতেই হয়। ভালো চাকরিও তো সহজে জোটে না। ফলে সংসার চালাতে কবি বা লেখককে বেছে নিতে হয় বিচিত্র সব জীবিকা। প্রাইভেট ট্যুইশন, বীমার দালালি, ছোটখাটো দোকানদারি, বিজ্ঞাপন লেখা, সাংবাদিকতা, প্রুফ রিডিং। এক তরুণ কবি তাঁর সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তিনি বেশ কিছুদিন ডক এলাকায় নৈশ প্রহরীর কাজও করেছেন। (Writer’s struggle)

বাংলা কবিতার বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামী একসময় রানাঘাটে জার্সি গোরু কিনে তার দুধ বিক্রি করে অন্ন সংস্থান করতেন। ‘এই কাব্য এই হাতছানি’ বইতে শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন: কবি অরুণেশ ঘোষ দিনের বেলা সাপ ধরে বিক্রি করে, রাতে কবিতা লেখে। এর সত্য মিথ্যা জানা যায় না যদিও। পেশাগতভাবে অরুণেশ ঘোষ শিক্ষক ছিলেন। কবি বিনোদ বেরা দিনে চাষ করতেন, রাতে কবিতা লিখতেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম জীবনে প্রাইভেট টিউশন করেই জীবন কাটিয়েছেন। কবি হেলাল হাফিজ দীর্ঘদিন জুয়া খেলে আর কিছুকাল জিগোলো সার্ভিস দিয়ে বেঁচে থাকার রসদ অর্জন করেছেন। জুয়া খেলায় তাঁর এতটাই ব্যুৎপত্তি ছিল যে, প্রায় কখনোই হারতেন না। আর আর্থিক স্বনির্ভর কিন্তু নিঃসঙ্গ নারীদের সুন্দর সান্নিধ্য দিয়েও জীবন কেটেছে তাঁর।

Image - পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি
কবি জয় গোস্বামী

বেলাল চৌধুরী সম্পর্কে গুজব ছিল, তিনি নাকি কুমিরের ব্যবসা করতেন আর শ্মশানের পাশে কুঁড়ে ঘর বানিয়ে বাস করতেন। শোবার খাট ছিল না। এক রাশ বইয়ের উপরে একটা চাদর বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। (Writer’s struggle)

কবি সুবোধ সরকার একসময় গানের টিউশন করতেন। দু বেলা পেট ভরে খেতে পেতেন না। বাবার মৃত্যুর পর ভেসে যাওয়া সংসারকে বাঁচাতে তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন একটা ছেঁড়া গীতবিতান।

এরকম আরও কতো অজানা কৃচ্ছ্রসাধনার কথা আমাদের অগোচরে রয়ে গেছে। অনেক পাশ্চাত্য কবি-লেখক মনে করেন, কবি সাহিত্যিকদের কোনওরকম চাকরি করাই উচিত নয়। তাঁরা চব্বিশ ঘণ্টাই লিখবে, লেখা নিয়ে ভাববে। কারও দাসত্ব করবে না। কিন্তু সবাই তো আর এ্যালেন গিনসবার্গ নয় যে, একটা হাউল বা কাদিস লিখলেই হাজার হাজার ডলার উঠে আসবে। এদেশের কবিদের বেঁচে থাকার জন্য এবং কবিতা লেখার জন্য ছোটো বড়ো কতরকম কাজ যে করতে হয়!

কিন্তু এত কষ্টেও তাঁরা কবিতাকে বা কথাসাহিত্যকে ছেড়ে যান না। জীবন-মন্থনের এই সমুদ্র-সুধা বা স্বর্গীয় গরল পান করার জন্য তাঁরা অনায়াসে জীবন বাজি রাখতে পারেন।

সব চাইতে বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবিকা ছিল ১৫৭ টি গল্প ও ৩০ টি উপন্যাসের স্রষ্টা সুবোধ ঘোষের। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করে হাজারিবাগের সেন্ট কলম্বাস কলেজে ভর্তি হয়েও অভাব অনটনের জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে জীবন জীবিকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় তাঁকে। বিচিত্র জীবিকার সঙ্গে জড়িত ছিল তাঁর জীবন। হেন কাজ নেই যা তাঁকে করতে হয়নি সংসারের ঘানি টানার প্রয়োজনে। পড়াশোনা ছেড়ে কলেরা মহামারী আকার নিলে বস্তিতে টিকা দেবার কাজ নেন। কর্মজীবন শুরু করেন বিহারের আদিবাসী অঞ্চলে বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে। তারপর সার্কাসের ক্লাউন, মুম্বাই পৌরসভার চতুর্থ শ্রেণির কাজ, চায়ের ব্যবসা, বেকারির ব্যবসা, মালগুদামের স্টোর কিপার ইত্যাদি কাজে তিনি তাঁর প্রথম জীবনের অনেকখানি অংশ ব্যয় করেন। বহু পথ ঘুরে ত্রিশের দশকের শেষে আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে সহকারী হিসেবে যোগ দেন। (Writer’s struggle)

কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ

লেখাকেই জীবিকা করে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিজ্ঞতাও অত্যন্ত করুণ। তরুণ শঙ্খ ঘোষ তাঁর নিরাভরণ লেখার ঘর ও সাদামাটা টেবিল দেখে বিস্মিত হওয়াতে মানিক বলেছিলেন: “পাঠক যদি বই না কেনে, লাইব্রেরি থেকে বা অন্য কারো কাছ থেকে চেয়েচিন্তে বই পড়ে তাহলে লেখকের ঘর তো এরকমই হবে। আপনারা তো বই কেনেন না, তাই লেখককে থলে হাতে পায়ে হেঁটে লুঙ্গি পরে বাজার করতে হয়।”
শেষ জীবনে তাঁর উপলব্ধি ছিল বড় করুণ— ‘চারটে ডালভাতের ব্যবস্থা না রেখে কোনো বাঙালি লেখক যেন লিখতে না আসে।’

মধ্যযুগের অভয়ামঙ্গলের কবি মুকুন্দ চক্রবর্তীর উপজীবিকা ছিল কৃষিকর্ম। বর্ধমানের দামিন্যা গ্রামে তিনি গোপীনাথ নন্দীর জমিতে চাষাবাদ করতেন। মুসলিম অত্যাচারের ফলে উদ্বাস্তু কবি পায়ে হেঁটে মেদিনীপুরে গিয়ে জমিদার বাঁকুড়া রায়ের পুত্র রঘুনাথ রায়ের গৃহশিক্ষকের কাজ নেন।

ভারতচন্দ্র কিংবা জয়দেবের মতো সভাকবি হবার সৌভাগ্য সবার হয় না। কাউকে কাউকে বেঁচে থাকার জন্য নানা উঞ্ছবৃত্তিও করতে হয়েছে।
ঢাকা জেলার ভাওয়ালের কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস শেষ বয়সে শোচনীয় অর্থকষ্টে পড়ে লিখেছিলেন :
“ও ভাই, বঙ্গবাসী, আমি মরলে—
তোমরা আমার চিতায় দিবে মঠ ?
আজ যে আমি উপোস করি,
না খেয়ে শুকায়ে মরি,
হাহাকারে দিবানিশি করি ছটফট
ও ভাই, বঙ্গবাসী, আমি মরলে,
তোমরা আমার চিতায় দিবে মঠ ?”

Image - পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি
ভাওয়ালের কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস

উনিশ শতকে ঈশ্বর গুপ্ত সাংবাদিকতা করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। দীনবন্ধু মিত্র ডাকবিভাগের ইন্সপেক্টিং পোস্টমাস্টারের কাজ করতেন। মাইকেল মধুসূদন কিছুদিন মাদ্রাজে শিক্ষতার কাজ করতেন। পরে আইনব্যবসায়ীর কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মীর মশাররফ হোসেন অথবা রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় চাকরির সন্ধানে বঙ্গদেশ ছেড়ে সুদূর ব্রহ্মদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। পরে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভের পর লেখাকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নেন। (Writer’s struggle)

লঘুগুরু উপন্যাসের লেখক জগদীশ গুপ্ত আদালতে টাইপিস্টের কাজ করতেন। সাংবাদিকতা ও গানের শিক্ষকতা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম জীবনে লেটোর দলে গান গাইতেন, পাঁউরুটির দোকানে কাজ করতেন, মহাযুদ্ধে সৈনিকের কাজও করেছেন কিছুদিন। ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’র লেখক শিবরাম চক্রবর্তী মেসে থেকে, জীবিকার চিন্তাকে গ্রাহ্য না করে সারা জীবন দিব্যি কাটিয়ে দিয়েছেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদারি স্টেটে চাকরি ও স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন কিছুকাল। পরে সর্বক্ষণের লেখক। জমিদারের সন্তান তারাশঙ্কর জমিদারি বিলিয়ে দিয়ে স্বেচ্ছায় লেখালেখির অনিশ্চিত জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন।

শুনলে আশ্চর্য হবেন, ইছাপুর বন্দুকের কারখানায় কাজ করার আগে ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’র লেখক সমরেশ বসু মাথায় করে সবজি বিক্রি, ডিম বিক্রির মতো কাজও করেছেন।

সমরেশ বসু

বুদ্ধদেব বসুর মতো অধ্যাপনা করলেও বারংবার চাকরি ছাড়ার ফলে জীবনানন্দ দাশের জীবিকা হয়ে পড়েছিল অনিশ্চিত। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’র লেখক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় জাহাজের কোলবয়ের কাজ নিয়ে সমুদ্রে ভেসে বেড়িয়েছেন দীর্ঘকাল। সেই অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রয়েছে ‘অলৌকিক জলযান’ উপন্যাসে। শুধু পুরুষ লেখকেরাই নয়, ‘অরণ্যের অধিকার’ কিংবা ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসের লেখক মহাশ্বেতা দেবী একসময় বেঁচে থাকার জন্য সেলস গার্লের কাজও করেছেন।

Image - পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি

বিদেশি কবি ও লেখকদের জীবিকাও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। দুজনের কথা বলি। গ্রাম থেকে পালিয়ে লন্ডন শহরে গিয়ে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার নাটকের দলে যোগদান করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে একটি প্রচলিত গুজব বা গল্প হল, তিনি লন্ডনের থিয়েটার পৃষ্ঠপোষকদের ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নাট্যশালায় কাজ করতে শুরু করেন।

বিশিষ্ট ফরাসি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক অধিকার আন্দোলন কর্মী জাঁ জেনে প্রথম জীবনে ছিলেন এক যাযাবর, ছিঁচকে চোর ও অপরাধী। সেই চৌর্যবৃত্তির বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লেখেন ‘দ্য থিফস জার্নাল’।

সেই স্বপ্নের দিন কবে আসবে, যেদিন একজন কবি ও লেখক কোনও চাকরির দাসত্ব না করে সারাক্ষণ লেখার ভিতরে মগ্ন থাকবেন। বই প্রকাশিত হলে পাঠক তা নগদ মূল্যে কিনবেন। প্রকাশকেরা বঞ্চনা করবেন না লেখকদের। যতদিন না সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে ততদিন এভাবেই কবি ও লেখকদের নানা অনিশ্চিত ও অসম্মানজনক চাকরির দাসত্ব করতে হবে। সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থের ‘সৃষ্টির তীরে’ কবিতায় জীবনানন্দের মতো আহত কবিদের ততদিন আক্ষেপ করে লিখতে হবে—‘মানুষেরই হাতে তবু মানুষ হতেছে নাজেহাল; পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি।’

You might also like