Latest News

চেম্বারের বাইরে লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে ছেঁড়া পাঞ্জাবি সেলাই করলেন মন্ত্রী

অমল সরকার

রাইটার্সে মন্ত্রীর ঘরের বাইরে লালবাতিটা অনেকক্ষণ ধরে জ্বলছে! মন্ত্রীরা গোপন শলাপরামর্শ, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ইত্যাদির সময়ে চাইলে ঘরের বাইরে লালবাতি জ্বেলে রাখতে পারেন। সেই বাতির স্যুইচ মন্ত্রীর হাতের কাছেই দেওয়া থাকে। কিন্তু এই মন্ত্রী তো সেই তালিকায় পড়েন না! তাঁর ঘরে আগে তো কেউ কখনওই লালবাতি জ্বলতে দেখেনি।

Image - চেম্বারের বাইরে লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে ছেঁড়া পাঞ্জাবি সেলাই করলেন মন্ত্রী

তুমুল কৌতূহল আর বড় খবরের আশায় এক সাংবাদিক এটা দেখে আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। মন্ত্রীর প্রাইভেট সেক্রেটারির অনুমতি নেওয়া, কিংবা দরজায় টোকা দেওয়া—এসব সৌজন্য, ভদ্রতা, নিয়মকানুনের মধ্যে না গিয়ে সোজা মন্ত্রীর ঘরে হাজির হলেন সেই সাংবাদিক। ঘরে ঢুকে তিনি তো একেবারে স্তম্ভিত! কোনও মন্ত্রীকে যে এই অবস্থায় দেখবেন, ভাবতেও পারেননি তিনি।

মন্ত্রীকে কী অবস্থায় দেখেছিলেন সাংবাদিক?

একটি শতছিদ্র মশারির মতো স্যান্ডোগেঞ্জি গায়ে চেয়ারে বসে মন্ত্রী এক মনে নিজের পরনের পাঞ্জাবিটি সেলাই করছেন। সাংবাদিকের বিস্ময় কাটাতে মন্ত্রী বললেন, ‘কী করি বলুন, সারাদিন সময় হয় না। ভোর রাত থাকতে লোকজন আসতে শুরু করে। তাদের কথা শুনতে হয়। তারপর রাইটার্স, পার্টি অফিস, দলের কাজে এখানে ওখানে ছুটতে হয়। পাঞ্জাবিটা অনেক দিন হল ছিঁড়েছে। আজ একটু সময় পেলাম, তাই…।’

সর্বশেষ খবর জানতে পড়ুন দ্য ওয়াল

সাংবাদিক জানতে চাইলেন, আপনার ঘরের বাইরে লালবাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন কেন? মন্ত্রী জবাব দেন, ওটা আমার প্রাইভেট সেক্রেটারির কথায় করতে হয়েছে। উনি কিছুতেই চাইছিলেন না আমি পাঞ্জাবি সেলাই করি। আমি বললাম, আমার পোশাকআশাক আমি ধুই, সেলাইও আমিই করি। উনি তখন বললেন, গেঞ্জি পরে বসে আছেন তো স্যার, কেউ চলে এলে অস্বস্তি হবে। লাল বাতিটা বরং জ্বালিয়ে নিন।

প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের (Left Front Government) সেচমন্ত্রী (Irrigation minister) প্রভাস রায় (Prabhas Roy) মানুষটা এমনই ছিলেন। যেমন বিচিত্র ছিল মন্ত্রী হিসাবে তাঁর শপথের দিন ও তার আগের দিনের ঘটনা। প্রথম বামফ্রন্ট সরকার শপথ নিয়েছিল ১৯৭৭ সালের ২১ জুন। প্রথম দিন পুরো মন্ত্রিসভা শপথ নেয়নি। দিন কয়েক পর বাকি মন্ত্রীরা শপথ নেন।

দ্বিতীয় দফার শপথ অনুষ্ঠানের আগের দিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার (South 24 Parganas) বিষ্ণুপুরের মানুষ প্রভাসবাবু বিকালে হাঁটতে হাঁটতে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএম (CPM) অফিসে গিয়ে হাজির। পার্টি জিতেছে। সরকার গড়েছে। এই আনন্দে জেলা দফতরের কাজকর্ম সেরে আলিমুদ্দিনে যান প্রভাসবাবু। দক্ষিণ ২৪ পরগনা সিপিএমের জেলা দফতর তখন ছিল কোলে মার্কেটের উল্টো দিকে। বৈঠকখানা বাজারের পশ্চিম প্রান্তে বঙ্গবাসী কলেজের ঠিক পাশে।

ইতিহাসের অজানা কাহিনি জানতে পড়ুন দ্য ওয়াল ফিচার

সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান প্রয়াত প্রমোদ দাশগুপ্ত প্রভাসবাবুকে দেখেই বললেন, আরে! আপনার খোঁজই তো করছিলাম। কাল সকাল সকাল রাজ্য দফতরে চলে আসবেন। এখান থেকেই সকলে মিলে রাজভবন যাওয়া হবে। প্রভাসবাবু শুনে বললেন, ‘রাজভবনে আমাদের ঢুকতে দেবে?’ প্রমোদবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, দেবে, যাঁরা মন্ত্রী হবেন তাঁদের অবশ্যই ঢুকতে দেবে’। প্রমোদবাবু আরও স্পষ্ট করে বললেন, ‘প্রভাসবাবু ভুলে যাবেন না যেন। ঠিক ১০’টার মধ্যে চলে আসবেন। আপনাকেও কাল শপথ নিতে হবে। আপনি মন্ত্রী হচ্ছেন’।

সে কথা শুনে প্রভাসবাবু হাঁটতে হাঁটতে ফের শিয়ালদহে জেলা পার্টি অফিসে ফিরে গেলেন। রাতটা পার্টি অফিসেই কাটাতে হবে যে!

পরদিন সকালে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে তাঁকে দেখে প্রমোদবাবু যেন আঁতকে উঠলেন। বললেন, ‘আপনি তো এই ধুতি-পাঞ্জাবি পরেই গতকাল পার্টি অফিসে এসেছিলেন। এতো দেখছি অনেককাল ধোয়া-কাচা হয়নি! এই পোশাক পরে আপনি শপথ নিতে যাবেন?’ প্রভাসবাবু জবাব দেন, ‘ভিড়ের মধ্যে কে আমার ধুতি-পাঞ্জাবি দেখতে আসবে। আর এছাড়া আর পাব কোথায়!’

প্রমোদবাবু বললেন, ‘না, না তা হয় না। শপথ অনুষ্ঠানে একটু ভাল কিছু পরে যাওয়া উচিত’। উপস্থিত বাকিরাও প্রমোদবাবুর সঙ্গে গলা মেলান। কিন্তু তখন আর উপায় নেই, রাজভবনগামী গাড়িতে উঠতে সবাই ব্যস্ত। অগত্যা প্রমোদবাবু নিজের ধুতি-পাঞ্জাবি এগিয়ে দিলেন প্রভাসবাবুকে। মন্ত্রী শপথ নিলেন অন্যের পোশাক পরে।

সবরকম হেলথ টিপস ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খবরের জন্য পড়ুন দ্য ওয়াল গুড হেলথ

একেবারে সাধারণ জীবনযাত্রা ছিল প্রমোদবাবুরও। নিজের কাজ নিজে করে নিতেন। দিনের শেষে রোজ ধুতি-পাঞ্জাবি, আন্ডারওয়্যার জল কাচা করে মেলে দিতেন। নিজের হাতে সেগুলি ইস্ত্রি করতেন। অল্পদামের, সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। কিন্তু ধোপদুরস্ত থাকতেন। শখ বলতে ছিল চুরুট খাওয়া। প্রমোদবাবুর ধারা বহন করে চলেছেন বিমান বসুও।

কমিউনিস্ট পার্টিতে, বিশেষ করে সিপিএমে এই দুটি ধারাই ছিল। মাঠে ময়দানে রাজনীতি করলেও একদল ছিলেন প্রমোদবাবুর মতো পরিপাটি স্বভাবের। আর একদল ছিলেন প্রভাস রায়ের মতো মানুষ। সারাদিন পেটে দানাপানি না পড়লেও কেউ জানতে পারত না। মাথায় তেল-জলও রোজ পড়ত না। শুধু জীবনযাপনে সাদামাঠা ছিলেন না প্রভাস বাবু। সৎ বলে তাঁর মধ্যে কোনও দাম্ভিকতাও ছিল না। বরং ছিলেন মিশুকে। বিধানসভায় বিরোধীরা প্রশ্ন করলেই তার জবাব দিতেন। তাই বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গেও বন্ধু সম্পর্ক ছিল তাঁর।

জামা-কাপড় সেলাই করে পরার দুর্দশা অনেককাল হল ঘুচেছে। এবেলা-ওবেলা পোশাক বদলের সামর্থ আমাদের অনেকেরই আছে। পুরনো, ছেঁড়া জামা-কাপড় ইত্যাদি কেনার ফেরিওয়ালার হাঁক আর আগের মতো শোনা যায় না। আমরা অনেকেই বেশ ভাল আছি। প্রভাসবাবুরা বেঁচে থাকলে হয়তো আজ তাঁদের পাঞ্জাবি সেলাই করে পরতে হত না।

শুধু মনটা খারাপ হয়ে যায়, আজকালকার কিছু নেতার দামি পোশাক-আশাক দেখে। দাম শুনলে চোখ কপালে ওঠে, আর রুচি দেখে গা গুলিয়ে যায়। পদযাত্রা, জনসভার মঞ্চ থেকে টিভির পর্দা, মায় বিধানসভা, সর্বত্র নেতাদের রুচিহীন পোশাকের জয়জয়কার। এই নেতাদের সঙ্গে যাদেরই তুলনা টানা হবে, মিছিমিছি অপমান করা হবে তাঁদের। নেতাদের কিছু যাবে আসবে না। কারণ, তাঁরা তো আর কেউ এই নেতাদের মতো অর্থগৃধ্‌নু নন।

You might also like