Latest News

ইনিই সেই সিন্টারক্লাস, বিশ্ব যাঁকে চেনে ‘সান্টা ক্লজ’ নামে

The Man Behind the Story of Father Christmas Santa Claus.

Santa Claus

রূপাঞ্জন গোস্বামী

প্রতি ক্রিসমাসে বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ান সাদা চুল দাড়ির সদাহাস্যময় মোটাসোটাএক বৃদ্ধ। পরনে ফারের সাদা কলার দেওয়া লাল কোট, সাদা লাইনিং দেওয়া লাল ট্রাউজার। কোমরে কালো চামড়ার বেল্ট, মাথায় লাল টুপি থেকে ঝোলে কদমফুলের মতো ফারের বল। কাঁধে থাকে খেলনা ও নানা উপহারে ঠাসা থলে। প্রতি খ্রিস্টমাস ইভে শিশুদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন তিনি। মজাদার এই বৃদ্ধের নাম ‘সান্টা ক্লজ’।

শিশুরা জানে উত্তর মেরুতে আছে সান্টা ক্লজের খেলনা তৈরির কারখানা। যেখানে বরফে তাঁর স্লেজ টানে উড়ন্ত রেনডিয়ার ‘কমেট’। প্রাণোচ্ছ্বল মানুষটি কথায় কথায় ‘হো হো’ শব্দ করে হাসেন। ২৪ ডিসেম্বর রাতে, শিশুদের শোওয়ার ঘরের দরজায় টাঙানো মোজার ভেতরে লুকিয়ে রেখে আসেন নানা উপহার।Santa Clause

তাঁকে চেনে না এমন মানুষ বিশ্বে খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু বাস্তবের যে মানুষটিকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল কাল্পনিক চরিত্র সান্টা ক্লজ, সেই মানুষটিকে আজও বিশ্বের অনেকেই চেনেন না। ক্রিসমাসের মরসুমে তাই আজ চিনে নেব সেই অসামান্য মানুষটিকে।

কে এই মহামানব!

খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে, আনাতোলিয়া বা এশিয়া মাইনরের (তুরস্ক) মেইরা শহরে বাস করতেন এক ধনী ব্যবসায়ী। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সমস্ত সম্পদ হারিয়ে, সুদখোর মহাজনদের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। বিপত্নীক ব্যবসায়ীটির ছিল তিন কন্যা। মহাজনেরা টাকার বদলে চেয়েছিল তিন পরমা সুন্দরী কন্যাকে। তাদের পতিতাবৃত্তিতে নামিয়ে  টাকা উসুল করা ছিল মহাজনদের লক্ষ্য। দিশেহারা ব্যবসায়ী দ্রুত কন্যাদের বিয়ে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু পণের টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাঁর ছিলো না। বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন চার জন।

যে রাতে তাঁরা আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই রাতেই ঘরের জানলা গলিয়ে কেউ ফেলে দিয়ে গিয়েছিলো সোনার মোহর ভর্তি একটি থলি। সেই মোহর দিয়ে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী, মিটিয়েছিলেন কিছুটা ঋণ। বাকি মহাজনেরা চেপে ধরেছিলো ব্যবসায়ীকে। কিছুদিন পরে, একইভাবে কেউ ফেলে দিয়ে গিয়েছিলো সোনার মোহর ভর্তি দ্বিতীয় থলিটি। ব্যবসায়ী এবার মেজ মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন, শোধ করেছিলেন আরও কিছুটা ঋণ।

শিল্পীর কল্পনায় সেই দৃশ্য

কে এই দেবদূত, তা জানার জন্য প্রতিরাতে ব্যবসায়ী জেগে থাকতেন। পাওনা আদায়ের জন্য আবার অত্যাচার শুরু করেছিল মহাজনেরা। শুরু হয়েছিল ছোট মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। একদিন ভোর রাতে, ব্যবসায়ী শুনতে পেয়েছিলেন,  ভারী জুতোর আওয়াজ। তিনি লুকিয়ে দেখেছিলেন, জানলার ভেতরে একটি থলি ছুঁড়ে দিয়েছিলো রাতের পোশাক পরা একটি লোক।

ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে লোকটিকে ধরে ফেলেছিলেন ব্যবসায়ী। তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে ব্যবসায়ী বলেছিলেন, “প্রভু যিশু, আপনি স্বয়ং আমাদের উদ্ধার করলেন!” মানুষটি বলেছিলেন, “আমি প্রভু নই, প্রভুর দাস, নাম নিকোলাস। দয়া করে কাউকে জানাবেন না আমার কথা।”

লুসি কুইন্টানিলার আঁকা নিকোলাস

কে এই নিকোলাস!

রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত আনাতোলিয়ার পাটারা শহরে, ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ, জন্ম নিয়েছিলেন নিকোলাস। বাবার নাম ছিলো থিওফেনিস (মতান্তরে এপিফেনিয়াস) ও মায়ের নোন্না (মতান্তরে জোহানা)। ধনী পরিবারের সন্তান নিকোলাস বাল্যকালে হারিয়েছিলেন বাবা মা’কে। কাকার কাছে থাকতেন। কাকা ছিলেন মেইরা শহরের গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের বিশপ। ছোটবেলা থেকেই নিকোলাসের ছিল প্রভু যিশুর প্রতি গভীর অনুরাগ।

যৌবনে পৌঁছনোর পর,নিকোলাস তাঁর অগাধ সম্পত্তি বিলিয়ে দিতে শুরু করেছিলেন গরিবদের মধ্যে। রাতের অন্ধকারে, সকলের অজান্তে গরিব মানুষদের বাড়িতে ফেলে আসতেন থলি ভর্তি অর্থ। কারণ তিনি মনে করতেন, সবাইকে জানিয়ে সাহায্য করলে গরিবদের অপমান করা হয়।

তুরস্কের আগের নাম ছিলো এশিয়া মাইনর বা আনাতোলিয়া

ক্রমশ মেইরা ও আশেপাশের শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল, বিপদবন্ধু অথচ অজ্ঞাতপরিচয় এক মহানুভব মানুষের কথা। আর্তকে সাহায্য করাই যাঁর একমাত্র ব্রত। ভাইপো নিকোলাসের এই অসামান্য দানশীলতার কথা একমাত্র জানতেন তাঁর কাকা। তাই তিনি নিকোলাসকে দিয়েছিলেন যাজক হওয়ার দীক্ষা।

পবিত্রভূমিতে নিকোলাস

কাকার মৃত্যুর পর নিকোলাস নৌকা করে রওনা হয়েছিলেন, খ্রিস্টানদের পবিত্রভূমি বা ‘হোলি ল্যান্ড’-এর উদ্দেশ্যে। ভূমধ্যসাগর ও জর্ডন নদীর পূর্ব তীরের মধ্যবর্তী অঞ্চল হলো এই হোলি ল্যান্ড। আজ যেখানে আছে ইজরায়েল,প্যালেস্টাইন,পশ্চিম জর্ডন, দক্ষিণ লেবানন ও দক্ষিণ সিরিয়া।

নিকোলাসের নৌকা চলেছিল ভূমধ্যসাগরের বুক চিরে। মাঝ সমুদ্রে উঠেছিল ভয়াবহ ঝড়। নৌকা ডোবার উপক্রম হয়েছিল। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন আতঙ্কিত যাত্রীরা।  কিন্তু নিকোলাস ছিলেন অবিচল। তীর্থযাত্রীদের মৃত্যুমুখে ফেলে দেওয়ার জন্য তীব্র ভাষায় তিরস্কার করেছিলেন সমুদ্রকে। যাত্রীদের বিস্মিত করে, কিছুক্ষণের মধ্যেই পুকুরের মতো শান্ত হয়ে গিয়েছিল সমুদ্র। থেমে গিয়েছিল প্রবল ঘুর্ণিঝড়।

সমুদ্রকে তিরস্কার করছেন নিকোলাস

বেশ কয়েক বছর হোলি ল্যান্ডে কাটিয়ে নিকোলাস ফিরে এসেছিলেন মেইরাতে। সেইদিনই প্রয়াত হয়েছিলেন কাকার পরবর্তী বিশপ। নতুন বিশপ নির্বাচন নিয়ে মতভেদ হয়েছিল যাজকদের মধ্যে। ঠিক হয়েছিল, পরদিন সকালে যে যাজক চার্চে প্রথম প্রবেশ করবেন, তিনিই হবেন নতুন বিশপ। ঘটনাটা জানতেন না নিকোলাস। পুরোনো অভ্যসের বশবর্তী হয়ে, পরদিন ভোরে সবার আগে পৌঁছে গিয়েছিলেন চার্চে। নিকোলাস হয়েছিলেন মেইরার গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের পরবর্তী বিশপ।

বিশপ নিকোলাস

ঘটেছিল একের পর এক অলৌকিক ঘটনা

৩১১ খ্রিস্টাব্দে, মেইরাতে দেখা দিয়েছিল ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ। ঠিক সেই সময়েই নিকটবর্তী অ্যান্ড্রিয়াক বন্দরে দাঁড়িয়েছিল গম বোঝাই এক জাহাজ। কনস্টান্টিনোপলের সম্রাটের জন্য যাচ্ছিল সেই গম। জাহাজের নাবিকদের নিকোলাস বলেছিলেন, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষদের জন্য কিছু গম নামিয়ে দিতে। রাজি হননি নাবিকেরা। কারণ গমের ওজন সম্রাটের লোককে বুঝিয়ে দিতে হবে। ওজন সামান্য কম হলেই গর্দান যাবে।

নিকোলাস বলেছিলেন, জাহাজে থাকা গমের ওজন কমবে না। এরপর নিকোলাস নাবিকদের নিয়ে ঘুরেছিলেন মেইরার পথে পথে। দেখিয়েছিলেন রাস্তায় পড়ে থাকা শত শত মৃতদেহ। সেই দৃশ্য দেখার পর, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নাবিকেরা নামিয়ে দিয়েছিল প্রচুর গম। সেই গম নিকোলাস বিলি করেছিলেন মেইরার বাড়িতে বাড়িতে।

জাহাজ থেকে গমের বস্তা নামিয়ে দিচ্ছে নাবিকেরা

যথাসময়ে কনস্টান্টিনোপল পৌঁছেছিল গমভর্তি জাহাজ। গমের ওজন করেছিলো সম্রাটের লোকজন। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন নাবিকেরা। কিন্তু অবাক কাণ্ড। জাহাজে তোলার সময় গমের যে ওজন ছিলো, নামানোর পরও একই ওজন ছিলো।

 অলৌকিকভাবে বাঁচিয়েছিলেন তিনটি প্রাণ

আনাতোলিয়ার ফ্রিজিয়াতে শুরু হয়েছিল বিদ্রোহ। রোম সম্রাট কনস্টানস্টাইন, বিদ্রোহ দমন করতে পাঠিয়েছিলেন বিশ্বস্ত তিন সেনাপতিকে। তাঁরা হলেন, উরসস, নেপসিয়ানোস ও হার্পাইলিওঙ্কে। সেনাবাহিনী ফ্রিজিয়াতে পৌঁছনোর পর শুরু হয়েছিল ভয়াবহ ঝড়। ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল,বালির ঝড়ে দিশেহারা সেনাবাহিনী। সেনাপতিরা পথ ভুল করে পৌঁছে গিয়েছিলেন মেইরাতে।

ঝড় থামার পর, বিদ্রোহ দমনের নামে ফ্রিজিয়ায় নারকীয় অত্যাচার শুরু করেছিল সেনাবাহিনী। জনসাধারণের বাড়িঘর  ধ্বংস, লুঠপাঠ থেকে নরহত্যা, কিছুই বাকি রাখেনি তারা। খবর পেয়ে উদবিগ্ন নিকোলাস দেখা করেছিলেন তিন রোমান সেনাপতির সঙ্গে। সেনাবাহিনীদের এই নির্মম অত্যাচারের কথা তাঁরা জানতেনই না। নিকোলাসের কাছ থেকে সব শুনে, সেনাদের রোমে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন তিন সেনাপতি।

আরও পড়ুন: ধ্বংস হয়েছে বার বার, তবুও যিশুর আঁতুড়ঘর আগলে রেখেছে ‘চার্চ অফ নেটিভিটি’

কয়েকদিন পর, নিকোলাস শুনেছিলেন, তিন সহৃদয় সেনাপতিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন মেইরার গভর্নর ইউস্থাসিয়াস। বিদ্রোহ দমন করার বদলে তাঁরা নাকি সেনাদের বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করতে বলেছিলেন। তিন সেনাপতিকেই শিরচ্ছেদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বধ্যভূমিতে। ভোজবাজির মতোই নিকোলাস পৌঁছে গিয়েছিলেন বধ্যভূমিতে।

বধ্যভূমিতে হাঁটু মুড়ে বসেছিলেন তিন সেনাপতি। তাঁদের পিছনে তরবারি হাতে দাঁড়িয়েছিল জল্লাদ। উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি আব্লাবিয়াস ও গভর্নর ইউস্থেসিয়াস। নিকোলাসের আচমকা হুঙ্কারে কেঁপে উঠেছিলো বধ্যভূমি। শুরু হয়েছিলো বালির ঝড়। ছিঁড়ে গিয়েছিল সেনাপতিদের শরীর জড়িয়ে থাকা লোহার শিকল। জল্লাদের হাত থেকে ছিটকে গিয়েছিলো তরবারি।

সেনাপতিদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন নিকোলাস

বিচারপতি আব্লাবিয়াসের দিকে তাকিয়ে নিকোলাস বলেছিলেন, “ঘুষ নিয়ে নির্দোষ সেনাপতিদের প্রাণ নিতে গিয়েছিলে। এবার প্রভুর দরবারে তোমার ও গভর্নর ইউস্থেসিয়াসের বিচার হবে।” রুদ্রমূর্তি নিকোলাসকে দেখে ঘোড়ায় চড়ে পালাতে গিয়েছিলেন ইউস্থেসিয়াস। তাঁকে নিয়ে ঘোড়াটি ফিরে এসেছিল নিকোলাসেরই কাছে। নিকোলাসের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছিলেন দু’জনে।

সেই রাতেই সম্রাট কন্সটানটাইনের স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন নিকোলাস। জানিয়েছিলেন তিন সেনাপতির কথা। আব্লাবিয়াস ও ইউস্থেসিয়াসকে শাস্তি দিয়েছিলেন ক্রুদ্ধ সম্রাট। তিন সেনাপতির হয়েছিল পদোন্নতি।

কারাকক্ষে দেখা দিয়েছিলেন প্রভু যিশু

৩২৫ খ্রিস্টাব্দে, রোম সাম্রাজ্যের বিশপেরা একটি বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকে প্রভু যিশুর সম্পর্কে অবমাননাসূচক মন্তব্য করায় ক্ষুব্ধ নিকোলাস, চড় মেরেছিলেন মিশরের বিশপ আরিয়াসকে। কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল নিকোলাসকে। তাঁর সর্বাঙ্গে জড়িয়ে রাখা হয়েছিল শিকল, যাতে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নিকোলাস পালাতে না পারেন।

সেই রাতেই অন্ধকার কারাকক্ষ ভেসে গিয়েছিল নীলাভ আলোয়। নিকোলাসকে দেখা দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রভু যিশু ও ভার্জিন মেরি। অশ্রুসিক্ত কন্ঠে নিকোলাস বলেছিলেন, “তোমাদের ভালোবাসাটাই কী আমার অপরাধ!” এরপর নিজে থেকেই খুলে গিয়েছিল শিকল। কারাকক্ষের ঘন অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিলেন প্রভু যিশু ও ভার্জিন মেরি। বিনা বাধায় নিকোলাস চলে এসেছিলেন কারাগারের বাইরে। কারণ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন ছিল জেলের প্রহরীরা।

নিকোলাসকে দেখা দিয়েছিলেন প্রভু যিশু ও ভার্জিন মেরি

শিশুদের রক্ষাকর্তা নিকোলাস

এই অলৌকিক ঘটনাটির সময় জানা যায় না। তবে সেবারও মেইরাতে হয়েছিল ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ। এক অসাধু কসাই সেই সুযোগে এঁটেছিল নৃশংস এক ফন্দি। তিনটি শিশুকে খাবারের লোভ দেখিয়ে সে নিয়ে গিয়েছিল একটি পোড়ো বাড়িতে। শিশুগুলিকে হত্যা করে,মাংসের টুকরো দিয়ে আচার বানিয়েছিলো। কাঠের পিপেতে লুকিয়ে রেখেছিলো সেই আচার। শুয়োরের মাংসের আচার বলে বিক্রি করাই ছিলো তার উদ্দেশ্য।

ঘটনাচক্রে সেখানেই ত্রাণ বিলি করতে গিয়েছিলেন নিকোলাস। মানসচক্ষে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন এই নৃশংস ঘটনাটি। জনতাকে একত্রিত করে, ঘিরে ফেরেছিলেন বাড়িটি। ভেতর থেকে বের করে  আনা হয়েছিল সেই পিপে। এরপর নিকোলাস উপস্থিত জনতাকে দিয়েছিলেন নৃশংস ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।

ভেঙে পড়েছিল কসাই। স্বীকার করেছিল অপরাধ। দ্রুত বিচারের পর, কার্যকর করা হয়েছিল কসাইয়ের মৃত্যুদণ্ড। শিশুকে তিনটিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নিকোলাসের পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন তাদের বাবা মা। নিকোলাসের নির্দেশে মাংসের টুকরোগুলি  ক্রসের আকারে সাজানো হয়েছিল। আকাশের দিকে হাত তুলে প্রভুকে ডেকেছিলেন নিকোলাস। নিজে থেকেই জোড়া লাগতে শুরু করেছিলো মাংসের টুকরোগুলি। এক সময় পিপে থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল জীবন্ত তিন শিশু। ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো মায়েদের কোলে। সেই দিন থেকে পৃথিবীর শিশুদের বন্ধু ও রক্ষাকর্তা হয়ে গিয়েছিলেন নিকোলাস।

জীবন ফিরে পেয়েছিলো তিন শিশু

নানা দেশের শিশুরা দল বেঁধে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতো। শিশুদের সঙ্গে নিকোলাস খেলতেন, মজা করতেন। বড়দিনের আগে শিশুদের বাড়িতে গোপনে রেখে আসতেন উপহার। শিশুদের নিয়ে মহানন্দে কেটেছিল নিকোলাসের শেষজীবন। ৩৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর, বিশ্বের শিশুদের কাঁদিয়ে, বিদায় নিয়েছিলেন ৭৩ বছরের ক্রিসমাস বুড়ো নিকোলাস। তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো মেইরাই সেই গির্জার প্রাঙ্গনে, যেখানে তিনি দীর্ঘকাল বিশপের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

চুরি হয়ে গিয়েছিল নিকোলাসের অস্থি

ক্যাথলিক চার্চ ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল গ্রিক অর্থডস্ক চার্চকে। নিকোলাসের কফিন ভেঙে অস্থি নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল ইতালির বারি থেকে আসা একদল নাবিক। অস্থিগুলি তারা দান করেছিল, বারির ব্যাসিলিকা ডি সান নিকোলাকে। নিকোলাসের ভাঙা কফিনে পড়েছিল ছোট ছোট কিছু অস্থি। সেগুলিও চুরি করে নিয়েছিলো ভেনিসের নাবিকেরা। ভেনিসের সান নিকোলাস আল লিডোতে রাখা হয়েছিল এই অস্থিগুলি।

আজও মেইরাতে আছে নিকোলাসের সেই ভাঙা কফিন

ইউরোপের নাবিকেরা মনে করতো নিকোলাস তাদেরও রক্ষাকর্তা। মাঝ সমুদ্রে বিপদের হাত থেকে তিনিই তাদের বাঁচান। তাই তারা চুরি করেছিল অস্থিগুলি। বিশপ নিকোলাসের জীবদ্দশায় ঘটা অলৌকিক ঘটনাগুলির সত্যতা যাচাইয়ের পর, ১৪৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ জুন, পোপ চতুর্থ ইউজিন বিশপ নিকোলাসকে ‘সেন্ট’ ঘোষণা করেছিলেন।

বিশপ নিকোলাস হয়েছিলেন ‘সেন্ট নিকোলাস’

নিকোলাস হয়ে গিয়েছিলেন ‘সান্টা ক্লজ’

শিশুদের প্রিয় বন্ধু বিশপ নিকোলাসের নাম আগেই ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ইউরোপে। হলান্ডবাসীরা ছিলেন সেন্ট নিকোলাসের সবথেকে বড় অনুগামী। তাঁরা সেন্ট নিকোলাসকে বলতেন ‘সিন্টারক্লাস'(Sinterklaas)। তাঁদের মাধ্যমেই আমেরিকায় পৌঁছে গিয়েছিলেন সেন্ট নিকোলাস। ১৭৭৩ সালের ৬ ডিসেম্বর, আমেরিকাতে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করেছিলেন হলান্ডের কিছু মানুষ।

সেই শুরু, এরপর ধীরে ধীরে আমেরিকাবাসীর নয়নমণি হয়ে উঠেছিলেন সেন্ট নিকোলাস। নিউইয়র্ক হিস্টোরিকাল সোসাইটির সদস্য জন পিন্ট্রাড, ১৮০৪ সালে, সোসাইটির বার্ষিক বৈঠকে বিতরণ করেছিলেন বেশ কিছু কাঠের ফলক। যেগুলিতে খোদাই করা ছিলো সেন্ট নিকোলাসের মূর্তি ও ফায়ার প্লেসের পাশে টাঙানো খেলনা  ভর্তি মোজা।

বিখ্যাত কবি ক্লেমেট মুর, ১৮২৩ সালে লিখেছিলেন “A Visit from St. Nicholas” নামে একটি কবিতা। আমেরিকার বিখ্যাত কার্টুনিস্ট থমাস নাস্ট, ১৮৬২ সালে এই কবিতাটি অবলম্বন করে এঁকেছিলেন, শিশুদের বন্ধু সেন্ট নিকোলাসের এক মজাদার ছবি। সেই ছবিতে থাকা, সদাহাস্যময় সেন্ট নিকোলাসের পরনে ছিলো লাল রঙের রাতের পোশাক। কোলে এক ফুটফুটে শিশু ও অজস্র উপহার। পিঠেও উপহারের থলি।

থমাস মাস্টের আঁকা এই ছবি সেন্ট নিকোলাসকে করেছিল ‘সান্টা ক্লজ’

সেন্ট নিকোলাসের এই মজাদার ছবিটি বিশ্ববিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলো উল্কাগতিতে। ছবিতে থাকা সেন্ট নিকোলাসের নতুন নাম হয়েছিলো ‘সান্টা ক্লজ’। সেই নামটির মধ্যে আজও মিশে আছেন আনাতোলিয়ার দয়ালু বিশপ সেন্ট নিকোলাস। মিশে আছেন শিশুদের সেরা বন্ধু, ক্রিসমাসের মিষ্টি বুড়ো ‘সিন্টারক্লাস’।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like