Latest News

ইন্দোনেশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধার করেছিলেন ভারতের এই মুখ্যমন্ত্রী, নিজেই বিমান চালিয়ে

pilot Biju Patnaik who flew Indonesian PM to India in 1947.

Biju Patnaik

রূপাঞ্জন গোস্বামী

খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে জাভা, মালয় উপদ্বীপ, বোর্নিও, সুমাত্রা ও বালিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল হিন্দু ‘মজাপহিত’ সাম্রাজ্য। ষোড়শ শতাব্দীতে ‘মজাপহিত’ সাম্রাজ্যের পতনের পর, ১৬০২ সালে এলাকাটি চলে গিয়েছিল হলান্ডবাসী জার্মানদের দখলে। যাদের ইংরেজরা বলত ডাচ ও বাকি বিশ্ব বলত ওলন্দাজ।

কালক্রমে এলাকাটিতে সীমাহীন আধিপত্য বিস্তার করেছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এলাকাটির নাম হয়েছিল ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ’। এরপর ১৮৮০ সালে, প্রায় ৫,০০০ ছোট ও বড় দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এলাকাটির নাম ডাচেরা দিয়েছিল ‘ইন্দোনেশিয়া’। প্রায় ৩০০ বছর ধরে ইন্দোনেশিয়ার ধনসম্পদ ও  কৃষিজ ফসল লুঠ করেছিল ডাচেরা। সহজ সরল ইন্দোনেশিয়াবাসীর ওপর চালিয়েছিল অকথ্য নির্যাতন।

Biju Patnaik
ডাচেরা দখল করে নিয়েছিলো ইন্দোনেশিয়া

শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ

জাভার যুবরাজ ডিপনেগোরোর নেতৃত্বে, ১৮২৫ সাল থেকে ডাচদের ওপর শুরু হয়েছিল গেরিলা আক্রমণ। ১৮৭৩ সালে ডাচ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল আচেহ দারুলসালামের সুলতানের সেনাবাহিনী। তখনই পায়ের তলা থেকে জমি হারাতে শুরু করেছিল ডাচেরা।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে শুরু হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার মুক্তিযুদ্ধ। ইন্দোনেশিয়াকে স্বাধীন করতে এগিয়ে এসেছিলেন ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও সমাজের সব পেশার মানুষেরা। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিলেন এক যুবক ইঞ্জিনিয়ার। নাম আচমাদ সুকর্ণ। সঙ্গে ছিলেন দুই যুবক মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী সুতান জাহরির ও অর্থনীতিবিদ মহম্মদ হাট্টা।

জাহরির, সুকর্ণ ও হাট্টা

 

ইন্দোনেশিয়ার মুক্তিযুদ্ধকে অঙ্কুরেই বিনাশ করবার জন্য সব ধরণের প্রচেষ্টা শুরু করেছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সম্পত্তি ধ্বংস, নরহত্যা, লুঠপাট থেকে ধর্ষণ, কিছুই বাদ রাখেনি ডাচেরা। তবুও নেভানো যায়নি মুক্তিযুদ্ধের লেলিহান শিখা। মুক্তিযুদ্ধ যখন প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করেছিল, তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৪২)।

ডাচ সেনাদের হাতে ধরা পড়ে যাওয়া কিছু মুক্তিযোদ্ধা

এশিয়াতে থাকা ব্রিটিশ, ডাচ ও পর্তুগিজ কলোনিগুলি একে একে দখল করে নিয়েছিল, অক্ষশক্তির অন্যতম শক্তি, দুর্ধর্ষ জাপান। বাদ যায়নি ইন্দোনেশিয়াও। তিন বছর ধরে ইন্দোনেশিয়া ছিল জাপানের দখলে। কিন্তু ১৯৪৫ সালের ১৫ অগস্ট,  মিত্রশক্তির কাছে পরাজয় স্বীকার করেছিল জাপান। ইন্দোনেশিয়ার মাথার ওপর থেকে সরে গিয়েছিল বিদেশি শাসনের ঘন কালো মেঘ।

১৭ অগস্ট, সুকর্ণ ঘোষণা করেছিলেন ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা। দেশে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সুকর্ণ হয়েছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি। উপ-রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হয়েছিলেন সুকর্ণের বিশ্বস্ত দুই সহযোদ্ধা মহম্মদ হাট্টা ও সুলতান জাহরির।

রেডিওর মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন সুকর্ণ

আবার ডাচেরা হেনেছিল আক্রমণ

ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি হয়ে, একটি সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন সুকর্ণ। তাই ১৯৪৫ সালের ৫ অক্টোবর, প্রায় তিন লাখ যুবক নিয়ে সুকর্ণ তৈরি করেছিলেন ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী ‘টেনতারা কিয়েমানান রাকিয়াট’। ডাচ ও জাপানিদের ফেলে যাওয়া কিছু অস্ত্রশস্ত্র ও কয়েকটি বিমানই ছিল বাহিনীর সম্বল।

টলমল পায়ে হাঁটা শুরু করেছিল সদ্য-স্বাধীন ইন্দোনেশিয়া। তাই ডাচেরা আবার দেখেছিল ইন্দোনেশিয়া দখলের স্বপ্ন। স্বাধীনতা ঘোষণার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৬ সালের মার্চে, ইন্দোনেশিয়ার ওপর আক্রমণ হেনেছিল ডাচেরা।

নেহেরু নজর রেখেছিলেন ইন্দোনেশিয়ায়

ভারত তখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। ভারতের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ছিলেন জওহরলাল  নেহেরু। ইন্দোনেশিয়ার মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন সহানুভূতি। কারণ ভারত ও ইন্দোনেশিয়াকে কয়েক হাজার বছর ধরে আত্মীক বন্ধনে বেঁধে রেখেছিল ধর্ম ও সংস্কৃতি। বিশেষ করে রামায়ণ।

তাই ডাচেরা নতুন করে ইন্দোনেশিয়ায় হানা দেওয়ার পর থেকেই, ইন্দোনেশিয়ার বিপ্লবীদের কাছে মানবিক ত্রাণ পাঠিয়ে যাচ্ছিলেন নেহেরু। ত্রাণের আড়ালে পৌঁছে যাচ্ছিল অস্ত্রশস্ত্রও। গোপন ও দুর্ধর্ষ এই অপারেশনগুলির দায়িত্বে ছিলেন ওড়িশার এক ডাকাবুকো পাইলট বিজেন্দ্রনাথ পট্টনায়ক। নেহেরুর অত্যন্ত প্রিয় ‘বিজু’।

নেহেরু ও বিজু পট্টনায়েক

দুঃসাহসী পাইলট বিজু পট্টনায়েক

ব্রিটিশদের রয়াল ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের পাইলট বিজু তখন মিত্রশক্তির নয়নের মণি।  দিল্লি ফ্লাইং ক্লাব থেকে ১৯৩০ সালে নিয়েছিলেন বিমান ওড়ানোর প্রশিক্ষণ। এরপর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল এয়ার ওয়েজ সংস্থার বিমান ওড়াতে শুরু করেছিলেন, ওড়িশার বেলাঘুন্ঠার ধনী পরিবারের সন্তান বিজু পট্টনায়েক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, বিজু যোগ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ রয়াল ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে। শুরু করেছিলেন একের পর এক দুঃসাহসী অভিযান। বিমান উড়িয়ে সাহায্য করে এসেছিলেন হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত রাশিয়ান সেনাবাহিনীকে। বিজুকে পুরষ্কৃত করেছিল রাশিয়া। এছাড়াও যুদ্ধবিমান বিমান চালিয়ে বার্মা থেকে উদ্ধার করে এনেছিলেন জাপানিদের কবলে থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনানী বিজু পট্টনায়ক

কিন্তু মিত্রশক্তির নয়নের মণি বিজুরই ছিল সম্পূর্ণ আলাদা এক সত্বা। সে সত্বার কথা জানতেন, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়তে থাকা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময়, ব্রিটিশ সেনাদের কাছে যুদ্ধের রসদ পৌঁছে দেওয়ার অছিলায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিজে থেকেই চলে যেতেন বিজু। তখন তিনি ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের ট্রান্সপোর্ট কমান্ডের প্রধান।

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধরত ভারতীয় সেনাদের ছাউনির ওপর বিজু গোপনে ফেলে আসতেন ভারতের শীর্ষ নেতাদের পাঠানো লিফলেট। বিজুর এই অভিযানগুলি রক্তশূন্য করে দিয়েছিল পূর্ব এশিয়ায় অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে।

আত্মগোপনকারী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিজের বিমানে তুলে, গোপন বৈঠকের স্থানে পৌঁছে দিতেন বিজু। এভাবেই তিনি গ্রেফতারের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ ও  অরুণা আসফ আলির মতো নেতাদের। রাতের অন্ধকারে বিমান উড়িয়ে দিল্লি থেকে কোলকাতা পৌঁছে দিয়েছিলেন রাম মনোহর লোহিয়াকে।

বিজুর এই দ্বিতীয় সত্বার কথা জেনে ফেলেছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। ১৯৪৩ সালে বিজুকে ব্রিটিশরা পাঠিয়েছিল কারাগারে। সেখানে বিজুর কেটেছিল তিন বছর। ভারতের হাতে ব্রিটিশেরা স্বাধীনতা তুলে দেওয়ার কিছুদিন আগে, ১৯৪৬ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন বিজু। ১৮ টি ডগলাস সিরিজের ডাকোটা বিমান নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘কলিঙ্গ এয়ারলাইন্স’।

কলিঙ্গ এয়ারলাইন্সের একটি ডাকোটা বিমান

ইন্দোনেশিয়া আবার দখল করে নিয়েছিলো ডাচেরা

ইন্দোনেশিয়ার ওপর ডাচ বাহিনীর আক্রমণ বীভৎস আকার ধারণ করেছিল ১৯৪৭ সালের ২১ জুলাই। সর্বশক্তি নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ডাচদের বিশাল সেনাবাহিনী। একে একে দখল করে নিয়েছিল জাভা, সুমাত্রা, এমনকি রাজধানী জাকার্তাও। গৃহবন্দি করা  হয়েছিল রাষ্ট্রপতি সুকর্ণ, উপ- রাষ্ট্রপতি মহম্মদ হাট্টা ও প্রধানমন্ত্রী সুলতান জাহরিরকে।

গৃহবন্দী রাষ্ট্রপতি সুকর্ণ গোপনে চিঠি পাঠিয়েছিলেন হাট্টা ও জাহরিরের কাছে। দুই সহযোদ্ধাকে  বলেছিলেন, যেভাবেই হোক ইন্দোনেশিয়া থেকে পালিয়ে পৌঁছাতে হবে বন্ধুদেশ ভারতে। বিশ্বের সামনে ডাচেদের মুখোশ খুলে দিতে হবে ভারত থেকেই। কারণ তখন এশিয়ার মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছিল ভারত। ১৯৪৭ সালের মার্চ-এপ্রিলে, দিল্লিতে হয়েছিল প্রথম আন্তঃ এশিয়া সম্মেলন। সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল এশিয়ার ৩০ দেশের ২৩১ জন প্রতিনিধি। তাই ডাচেদের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য আদর্শ স্থান হল ভারত।

প্রথম আন্তঃ এশিয়া সম্মেলনের সময় গান্ধী ও নেহেরুর সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানেরা

ডাক পড়েছিলো বহু আকাশযুদ্ধের সেনানী বিজুর

রাষ্ট্রপতি ও অবিসংবাদী নেতা সুকর্ণের নির্দেশ শিরোধার্য, কিন্তু গৃহবন্দি প্রধানমন্ত্রী জাহরির ও উপরাষ্ট্রপতি হাট্টা দেশ ছেড়ে পালাবেন কী করে!  জল স্থল আকাশের দখল তো  ডাচ সেনাবাহিনীর হাতে! বাধ্য হয়ে দূত মারফত জওহরলালকে খবর পাঠিয়েছিলেন জাহরির।

খবরটি পেয়েই নেহেরুর মনে পড়েছিল একটিই নাম। সেটি হল ‘বিজেন্দ্রনাথ পট্টনায়ক’। নিজের কলিঙ্গ এয়ারলাইন্সের ডাকোটা বিমান নিয়ে বিজু, তাঁর পাইলট স্ত্রী জ্ঞানবতী ও  সংস্থার পাইলটেরা বহুবার গোপনে প্রবেশ করেছেন ডাচেদের চক্রব্যুহে থাকা ইন্দোনেশিয়ায়। বিপ্লবীদের হাতে তুলে দিয়ে এসেছেন ওষুধ, খাদ্য এবং অস্ত্রশস্ত্র। সেই সূত্রে বিজুরও বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল সুকর্ণ ও জাহরিরের সঙ্গে।

আরও পড়ুন: কার্শিয়াংয়ের ‘ডাওহিল’, ঘন অরণ্য লুকিয়ে রেখেছে অজস্র গা ছমছমে কাহিনি

কালবিলম্ব না করে দ্রুত বিজুকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন নেহেরু। বলেছিলেন, তোমাকে যেতে হবে এক ভয়ঙ্কর অভিযানে। ডাচদের চক্রব্যূহ ভেদ করে, ইন্দোনেশিয়া থেকে উদ্ধার করে আনতে হবে প্রধানমন্ত্রী জাহরির ও উপরাষ্ট্রপতি হাট্টাকে। হাসি ফুটে উঠেছিল ছ’ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা, একত্রিশ বছরের দুঃসাহসী পাইলট বিজুর মুখে। এরকম অভিযানের জন্যেই তো তাঁর বেঁচে থাকা।

বিজুর সেই রোমহর্ষক অভিযান

কলকাতা বিমান বন্দর থেকে ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই, টেক-অফ করেছিল বিজুর কলিঙ্গ এয়ারলাইন্সের ডগলাস C-47 ডাকোটা মিলিটারি বিমান। পাইলটের আসনে ছিলেন বিজু, কো-পাইলট ছিলেন স্ত্রী জ্ঞানবতী। যিনি এই জীবনবাজি রাখা অভিযানে এসেছিলেন, চোদ্দদিনের শিশুপুত্রকে বাড়িতে রেখে। সেই শিশুপুত্রই আজ ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক।

স্ত্রী জ্ঞানবতীর সঙ্গে বিজু পট্টনায়েক

কলকাতা ছেড়ে অসমের মোহনবাড়ি (ডিব্রুগড়) বিমানবন্দরের দিকে উড়ে চলেছিল বিজুর বিমান। মোহনবাড়িতে জ্বালানি ভরে, আন্দামান সাগরের ওপর দিয়ে সিঙ্গাপুরের দিকে উড়তে শুরু করেছিল ডগলাস C-47। সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর পর কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম, বিমানে আবার ভরা হয়েছিল জ্বালানি।

কলিঙ্গ এয়ারলাইন্সের বিমান সিঙ্গাপুরে নেমেছে, সে খবর পৌঁছে গিয়েছিল জাহরির ও হাট্টার কাছে। বাড়ি ঘিরে রাখা ডাচ সেনাদের চোখে ধুলো দিয়ে, দুই বিপ্লবী পালিয়েছিলেন ছদ্মবেশ ধরে। পৌঁছে গিয়েছিলেন, জাভার দুর্গম অরণ্য ঘেরা এক পরিত্যক্ত জাপানি এয়ারস্ট্রিপে। যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত ভাঙাচোরা কিছু জাপানি বিমান। রানওয়ে বলতে কিছু ছিল না, এক চিলতে সমতল জমিতেই নামাতে হবে বিমান। যে কাজটি আনকোরা পাইলটের পক্ষে এক কথায় অসম্ভব।

পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপে পড়ে থাকা জাপানি বিমান

জনা দশেক বিশ্বস্ত সঙ্গী নিয়ে, অরণ্যের গভীরে বিজুর বিমানের অপেক্ষায় ছিলেন জাহরির ও হাট্টা। মশার কামড় খেতে খেতে তাঁরা ভাবছিলেন, ডাচেরা কামান দেগে উড়িয়ে দেবে না তো বিজুর বিমান! পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপে পড়ে থাকা জাপানি বিমানগুলির মধ্যে দিয়ে বিজু নামাতে পারবেন তো তাঁর ডগলাস!

দুঃসাহসী বিজু তখন জাভার দিকে উড়ে চলেছিলেন সেলাট কারিমাতা উপসাগরের ওপর দিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ককপিট রেডিওতে ভেসে এসেছিল ডাচেদের সতর্কবাণী, “দ্রুত বিমানের মুখ ঘুরিয়ে নাও, নাহলে কামান দেগে বিমান নামিয়ে দেবো।” হাড়হিম করা শীতল গলায় ক্রুদ্ধ বিজু  জবাব দিয়েছিলেন,ইন্দোনেশিয়ার মানুষদের ওপর ডাচদের প্রভুত্ব স্বীকার করে না নতুনভাবে জেগে ওঠা ভারত। যদি আমার বিমান গুলি করে নামানো হয়। এশিয়ার আকাশে ওড়া সবকটা ডাচ বিমানকে গুলি করে নামিয়ে দেব আমরাও।

ডগলাস C-47

এরপর বিজুর বিমানের দিকে একে একে উড়ে এসেছিল ডাচেদের কিটিহক যুদ্ধবিমান। বিজুর বিমানকে লক্ষ্য করে মেশিনগান থেকে চালিয়েছিল গুলি। কিন্তু বিজুর বিমান আকাশের বুক চিরে উল্কাগতিতে উড়ে চলেছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে। ঘন মেঘের আড়ালে, লুকোচুরি খেলায় ডাচদের নাস্তানাবুদ করে, বিজু এক সময় পৌঁছে গিয়েছিলেন সেই অরণ্যের আকাশে। যেখানে লুকিয়ে ছিলেন জাহরির ও হাট্টা।

ডাচদের নজরে পড়ার ভয়ে, বিজুর জন্য ধোঁয়ার সিগন্যালের ব্যবস্থা করতে পারেননি জাহরির। কিন্তু সেসবের প্রয়োজন ছিল না বিজুর। বহুবার ইন্দোনেশিয়ার আকাশে ঢোকার ফলে, ইন্দোনেশিয়ার এয়ারস্ট্রিপগুলিকে নিজের হাতের তালুর মতোই চিনতেন তিনি। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং জাহরির ও হাট্টাকে স্তম্ভিত করে, একফালি রানওয়েতে নামিয়ে ফেলেছিলেন বিমান।

ককপিট থেকে বিজু লাফিয়ে মাটিতে নামার পর, তাঁকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করেছিলেন জাহরির ও হাট্টা। সময় নষ্ট না করে, তাঁদের দ্রুত বিমানে উঠতে বলেছিলেন বিজু। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছিল অন্য জায়গায়। ডাচেদের সঙ্গে আকাশে লুকোচুরি খেলার জন্য নষ্ট হয়েছিল বেশ কিছুটা জ্বালানি। সিঙ্গাপুরে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ছিল না বিমানে।

এই সেই আবেগঘন দৃশ্য, জাহরিরের সঙ্গে করমর্দন করছেন সাদা পোশাকের বিজু

ক্ষুরবুদ্ধি বিজুর নজর পড়েছিল, দু’বছর ধরে এয়ারস্ট্রিপে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত জাপানি বিমানগুলির ওপর। ভাঙা বিমানগুলির ট্যাঙ্কে পড়ে থাকা তেল ভরে নিয়েছিলেন নিজের বিমানে। শুরু হয়েছিল প্রবল বৃষ্টি। ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা রানওয়ে থেকে সেই বৃষ্টির মধ্যেই টেক-অফ করেছিল বিজুর ডাকোটা।

ইন্দোনেশিয়ার নেতাদের নিয়ে বিজু বিকেল নাগাদ নিরাপদে পৌঁছে গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরে। ইন্দোনেশিয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন সুকর্ণ এবং ভারতে জওহরলাল। সিঙ্গাপুর থেকে রওনা হয়ে, ২৪ তারিখে  দিল্লি নেমেছিল বিজুর বিমান।

এক কঠিন যুদ্ধে জিতে আসা বিজুকে আবেগে জড়িয়ে ধরেছিলেন জওহরলাল। এরপর জাহরির ও হাট্টার সঙ্গে হয়েছিল জওহরলালের বৈঠক। সারা বিশ্ব জেনেছিল ইন্দোনেশিয়ায় ডাচেদের নারকীয় অত্যাচারের কাহিনি। ইন্দোনেশিয়ার মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন জানিয়েছিলো বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ।

ইন্দোনেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও উপ-রাষ্ট্রপতিকে নিরাপদে দিল্লি পৌঁছে দিলেন বিজু

কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেনি ইন্দোনেশিয়া

এরপরেও থামেনি বিজুর ইন্দোনেশিয়া অভিযান। ১৯৪৯ সাল অবধি, বারে বারে উড়ে গিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ায়। বিপ্লবীদের হাতে তুলে দিয়ে এসেছেন সব ধরণের রসদ। শিখিয়ে এসেছেন বিমানচালনা। ক্রমশ কোণঠাসা হয়েছিল ডাচেরা। অবশেষে ১৯৪৯ সালের নভেম্বর মাসে ডাচেরা মেনে নিয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা।

ইন্দোনেশিয়ার মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করতে গিয়ে, কলিঙ্গ এয়ারলাইন্সের ১৮ টি বিমানের মধ্যে ১২ টিই হারিয়ে ফেলেছিলেন বিজু। ভারতের এই লৌহপুরুষের অসামান্য আত্মত্যাগকে ভোলেনি ইন্দোনেশিয়া। ১৯৫০ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বিজুকে স্বাগত জানিয়েছিল কয়েক লক্ষ জনতা। বিজুকে দেওয়া হয়েছিল ‘ভূমিপুত্র’ সম্মান ও সাম্মানিক নাগরিকত্ব।

রাষ্ট্রপতি সুকর্ণ বিজুকে উপহার দিতে চেয়েছিলেন, একটি প্রাসাদ ও পালিনবাং এলাকার ১০০ একর জমি। যে জমি এক সময় প্রাচীন কলিঙ্গ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সবিনয়ে সেই উপহার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বিজু। বন্ধু সুকর্ণকে হেসে বলেছিলেন, “কলিঙ্গের রাজা নিজেরই জমি কখনও উপহার হিসেবে গ্রহণ করে না।”

সুকর্ণের মৃত্যু অবধি অটুট ছিল, সুকর্ণের সঙ্গে বিজুর বন্ধুত্ব। সুকর্ণের কন্যার নামকরণ করেছিলেন বিজুই। আকাশ দাপানো বিজু সদ্যোজাত কন্যাটির নাম রেখেছিলেন ‘মেঘবতী’। পরবর্তীকালে সেই মেঘবতী সুকর্ণপুত্রীই হয়েছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট।

সস্ত্রীক সুকর্ণের সঙ্গে সস্ত্রীক বিজু পট্টনায়েক

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল ছিলেন বিজু

শুধু ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধই নয়, কাশ্মীর যুদ্ধ (১৯৪৭-৪৮) ও ভারত-চিন যুদ্ধের(১৯৬২) সময় ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের পাইলট হিসেবে বিজু পট্টনায়েক তাঁর অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে হয়েছিলেন দেশের প্রথমসারির শিল্পপতি, লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদ,  কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ওড়িশার বিধায়ক ও দু’বারের মুখ্যমন্ত্রী। সারা ভারত তাঁকে বলত ‘বিজু বাবু’। এশিয়া চিনতো ‘কলিঙ্গ বুল’ নামে।

বিপদবন্ধু বিজু পট্টনায়েককে, ১৯৯৫ সালে ইন্দোনেশিয়া দিয়েছিল সে দেশের সর্বোচ্চ পুরষ্কার ‘বিনটাং জাসা উতামা।’ এর মাত্র দু’বছর পর, ১৯৯৭ সালের ১৭ এপ্রিল, ৮১ বছর বয়সে, অমরলোকে পাড়ি দিয়েছিলেন ইন্দোনেশিয়ার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক বিজেন্দ্রনাথ পট্টনায়ক।

শেষযাত্রার সময়, আধুনিক ওড়িশার রূপকার বিজু পট্টনায়কের কফিন ঢেকে দেওয়া হয়েছিল ভারত, রাশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পতাকা দিয়ে। পৃথিবীর হাতে গোনা কিছু রাষ্ট্রনায়কই পেয়েছেন এই সম্মান। বিজুর পট্টনায়েকের মৃত্যু্র খবর শুনে, চোখের জলে ভেসে গিয়েছিল শোকস্তব্ধ ইন্দোনেশিয়া। অর্ধনমিত করা হয়েছিল সে দেশের জাতীয় পতাকা। কারণ বিজু শুধু ভারত মায়েরই সন্তান নন, তিনি যে ইন্দোনেশিয়ারও ‘ভূমিপুত্র’।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like