Latest News

Nirupama Deshpande: আদিবাসী মহিলাদের উন্নয়নে দীপশিখার নাম নিরুপমা দেশপাণ্ডে

চৈতালী চক্রবর্তী

যুদ্ধজয়ের নেশা তাঁর শিরায়-উপশিরায়। সমাজসেবার ব্রত নিয়েছিলেন কিশোরীবেলায় (Nirupama Deshpande)। বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে, প্রতিবেশীদের বাঁকা চাউনি হজম করে আদিবাসীদের গ্রামে গ্রামে ঘুরে শিক্ষার আলো জ্বালছেন এক তেজস্বিনী। চার দেওয়ালের আড়ালে থাকতে অভ্যস্ত যাঁরা, তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে ছুটে চলেছেন নিরুপমা দেশপাণ্ডে (Nirupama Deshpande)। মেলঘাটের সম্পূর্ণা ব্যাম্বু কেন্দ্র এবং গ্রাম জ্ঞানপীঠের সঞ্চালিকা নিরুপমা। স্বামী সুনীল দেশপাণ্ডে হাত ধরে মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তীসগড়ের পাঁচ হাজারের বেশি আদিবাসী পরিবারের (Tribal Women) ভরণপোষণের (Tribal Welfare) দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁদের সংস্থার শাখা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আরও নানা প্রান্তে।

সরকারি চাকরি ভাল লাগত না মেয়ের (Nirupama Deshpande), গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়ানোই ছিল নেশা

রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা নিরুপমার। মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে সোশ্যাল ওয়ার্কে মাস্টার্সের পরে ভাল মাইনের সরকারি চাকরি। বিয়ের সম্বন্ধও এসে যায় চাকরি মেলার কয়েক মাস পরেই। নিরুপমা বলেছেন, ‘‘আমাকে দেখে নয়, আমার চাকরি দেখে সম্বন্ধ আসত। সরাসরি না করে দিয়েছিলাম। কারণ আমার স্বপ্ন ছিল অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো। চাকরি সারাজীবন করব না, আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম।’’

Nirupama Deshpande
নিরুপমা দেশপাণ্ডে (Nirupama Deshpande) ও স্বামী সুশীল দেশপাণ্ডে

শহুরে জীবন খুব একটা পছন্দ ছিল না নিরুপমার (Nirupama Deshpande)। মহারাষ্ট্রের নানা প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। পছন্দ ছিল প্রান্তিক মানুষজনের সান্নিধ্য। গ্রামেগঞ্জে সবুজের ছোঁয়ায় যে স্বাধীনতা ছিল, কংক্রিটের বন্দি জীবনে তার কিছুমাত্র ছিল না। গ্রামে গ্রামে মানুষজনের অভাবের কথা শুনতেন। খিদের জ্বালায় শিশুর কান্নায় চোখ ভিজত। নিজের হাতে চাষের কাজ শিখেছিলেন। বাঁশ, বেতের জিনিসপত্র তৈরিতেও হাতেখড়ি হয়। এইভাবেই একদিন আলাপ হয় সুনীল দেশপাণ্ডের সঙ্গে। তিনিও তখন সমাজসেবার ব্রত নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মহারাষ্ট্রের গ্রামে গ্রামে। মিলে যায় দু’জনের পছন্দ। মনের মিল হয় অচিরেই। চার হাত এক হতে দেরি হয় না। চাকরি ছেড়ে প্রান্তিক মানুষজনের মাঝে থাকারই সিদ্ধান্ত নেন দু’জনে। শুরু হয় এক অন্য পথ চলা।

Sampurna Bamboo Kendra - Posts | Facebook


মেলঘাটারে লাভাডা তখন সভ্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, আদিবাসীদের হাত ধরলেন নিরুপমা (Nirupama Deshpande)

১৯৯৫ সাল। লাভাডার প্রত্যন্ত এলাকায় তখন মহিলারা (Trial Women) চার দেওয়ালের আড়ালে থাকতেই অভ্যস্ত। আদিবাসীদের ঘৃণার চোখে দেখে তথাকথিত সভ্য সমাজ। আদিবাসী অধ্যুষিত প্রতিটি গ্রামে কুসংস্কারের কালো ছায়া। ঘরে ঘরে অপুষ্টি, আধপেটা হয়ে থেকে খিদের যন্ত্রণা। দুরারোগ্য ব্যধির প্রকোপে মাঝে মধ্যেই গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। প্রসূতি মৃত্যুর হার শঙ্কাজনক। খাবার নেই, শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আকাল— এমনই এলাকায় নিজের স্বপ্নের উড়ান শুরু করেন নিরুপমা। বলেছেন, “নিজের শহর, ভাল মাইনের চাকরি ছেড়ে আদিবাসী গ্রামে যখন থাকতে গিয়েছিলাম, নিজের আত্মীয়-বন্ধুদেরই নানা বাঁকা কথা হজম করতে হয়েছিল। অনেকেই বলেছিল আমি নির্বোধ। শুধু পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় স্নেহের হাত রেখেছিলেন মা। সেটাই ছিল আমার যুদ্ধ জয়ের প্রথম সিঁড়ি।”

আরও পড়ুন: Seema Rao: দেশের সীমা রক্ষায় অন্য ভূমিকা সীমার, ভারতের একমাত্র মহিলা কমব্যাট ট্রেনার

Combining traditional skills with modern needs to 'promote' bamboo  craftsmanship


১৯৯৬ সাল। গড়ে ওঠে সম্পূর্ণ ব্যাম্বু কেন্দ্র (Sampoorna Bamboo Kendra)

লাভাডাতেই নিজেদের সংসার পাতলেন সুনীল-নিরুপমা। চাষের কাজ জানতেন আগেই। নিরুপমার কথায়, “নতুন কী করা যায় ভাবতে গিয়ে আমাদের প্রথমেই মনে হয় লাভাডাতে বাঁশের উৎপাদন খুব ভাল। আদিবাসী মহিলাদের (Tribal Welfare) ঘরের বাইরে টেনে আনতে গেলে চাষের কাজের চেয়ে ভাল উপায় আর নেই।’’ বাঁশের চারা লাগানো শুরু করলেন দু’জনে। বাঁশ চাষের সুবিধা হল, এখান থেকে নানা রকম হাতের কাজ, ঘরোয়া উপকরণের জিনিসপত্র বানানো যায়। আর সূক্ষ্ম শৈল্পিক জিনিসপত্র তৈরি করতে মহিলারাই সবচেয়ে ভাল পারেন।

নিরুপমা বলেছেন, সংস্কারের আগল সরিয়ে আদিবাসী সমাজে মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটানোটা ছিল একরকমের চ্যালেঞ্জ। মহিলাদের ঘরের বাইরে পা রাখার অনুমতি ছিল না। প্রথম প্রথম খুব অসুবিধা হত। নিরুপমার কথায়, “আদিবাসী মহিলাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানোটা সহজ ছিল না। শহরের মানুষজনকে দেখলেই ভয় পেতেন তাঁরা। আমি ওদের সঙ্গে জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়োতে যেতাম, কুয়ো থেকে জল ভরতে যেতাম। এইভাবে সখ্য তৈরি হয় ধীরে ধীরে।”

A Visit to Sampoorna Bamboo Kendra

১৯৯৬ সালের ১১ জুন সম্পূর্ণ ব্যাম্বু কেন্দ্রের পথ চলা শুরু হয়। চিত্রকূটের এক শিল্পীর সাহায্যে বাঁশের নানারকম জিনিস বানানোর কাজ শিখেছিলেন সুনীল-নিরুপমা। আদিবাসীদের ঘরে ঘরে গিয়ে শেখানোর কাজ শুরু করেন দু’জনেই। আগ্রহ তৈরি হয় আদিবাসী মহিলাদের মধ্যে। প্রথমে ১০-১৫ জন করে কেন্দ্রে আসতে শুরু করলেন। পরে সেই সংখ্যাটা বেড়ে হয় ৫০। এখন পাঁচ হাজারের বেশি আদিবাসী মহিলা, স্কুল পড়ুয়া থেকে তরুণ-তরুণী এই কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেন। দিনে দিনে সংখ্যাটা বাড়ছে।

মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্র, ছত্তীসগড়, অরুণাচলে ছড়িয়ে রয়েছে নিরুপমার (Nirupama Deshpande) একাধিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

২০১৩-১৪ সালের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ, বিশাখাপত্তনমের অন্ধ্র ইউনিভার্সিটি, লাভাডা, অরুণাচল প্রদেশে একাধিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আয়োজন করে এই সংস্থা। নিরুপমা (Nirupama Deshpande) বলেছেন, প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে আদিবাসীদের উন্নতমানের শিক্ষা দেওয়ার জন্য এই কেন্দ্রের হাত ধরেছে আইআইটি বম্বে, নাগপুরের ভিএনআইটি, জয়পুরের ন্যাশনাল ক্রাফ্ট অ্যান্ড ডিজাইন ইনস্টিটিউট, নাসিকের এমভিপি ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট।

সম্পূর্ণ ব্যাম্বু কেন্দ্রে শুধু বাঁশের জিনিস তৈরির প্রশিক্ষণ নয়, গবেষণামূলক কাজও হয়। কৃষিকাজ, বৃক্ষরোপণ, সেচ ব্যবস্থা নানারকম কাজের গবেষণা চলে এখানে। আদিবাসীদের তৈরি হাতের কাজের নানা জিনিস চলে যায় ভিন্ রাজ্যে। শিল্পমেলা থেকে বিজ্ঞান সম্মেলন, সব জায়গাতেই এই কেন্দ্রের তৈরি জিনিসপত্রের প্রদর্শণী হয়। সংস্থার উন্নয়নে ইতিমধ্যেই ২৫ লক্ষ টাকার অনুদান দিয়েছে নাবার্ড।

7-day workshop on 'New designs, Tools and Techniques' at Sampoorna Bamboo  Kendra, Lawada, Melaghat7-day workshop on 'New designs, Tools and Techniques' at Sampoorna Bamboo  Kendra, Lawada, Melaghat

বাঁশের বাড়ি, আসবাব, খেলনা থেকে গয়না— এই কেন্দ্রের তৈরি জিনিসের চাহিদা এখন আন্তর্জাতিক স্তরেও। নিরুপমার কথায়, অন্তত ২০০ স্কুলপড়ুয়া বাঁশের নানারকম গয়না তৈরি করতে পটু। তাদের বানানো গয়না দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেয় বেণু শিল্পী উদ্যোগ কো-অপারেটিভ সোসাইটি। বছরে লাভ ২০ লক্ষ টাকারও বেশি। অনলাইন ডেলিভারিরও সুবিধা রয়েছে। নেট মার্কেটিং, ফেসবুক-হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমেও কেনাবেচা চলে।

‘‘বাঁশের শৌচাগার বানানোরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। স্বচ্ছ ভারত অভিযানের এটাও একটা কর্মসূচি আমাদের। বাঁশের শৌচাগার তৈরি অনেক সহজ, কম খরচেই বানানো সম্ভব। ঘরে ঘরে এমন শৌচাগার তৈরির পরামর্শ দিচ্ছি আমরা। বর্তমানে আইআইটি মুম্বইয়ের সাহায্যে বাঁশের উপকরণ দিয়ে নানা মেশিন তৈরির প্রকল্প চলছে এই কেন্দ্রে’’, বলেছেন নিরুপমা।

বাঁশের রাখি মন জয় করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর

বাঁশের তৈরি রাখি এই সংস্থার অন্যতম আকর্ষণ। পরিবেশবান্ধব এই রাখি এখন মেলঘাট থেকে ছড়িয়ে পড়েছে ছত্তীসগড়, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাতের নানা জায়গায়। কোরকাস, গোন্ড, ভিলা ছাড়াও ভোসারি, স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর মহিলা-পুরুষরাও এই রাখি তৈরির কাজ শুরু করেছেন। চলতি বছরে প্রায় ৭০ হাজার বাঁশের রাখি পৌঁছে গেছে দেশের নানা রাজ্যে। তৈরি করেছেন ১৭৯ জন আদিবাসী মহিলা।

নিরুপমা বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতে আমাদের মেয়েরা রাখি বেঁধেছিল। প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাজের প্রশংসা করেছিলেন। আরও বেশি সংখ্যক মহিলাদের এই কাজে নিয়োগ করার কথা বলেছিলেন। সেদিন রাতে ঘুমোতে পারিনি। আমাদের এই লড়াই সার্বিক স্তরে কী ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় সেটাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।”

ড. বাবাসাহেব অম্বেদকর সমাজভূষণ পুরস্কার, মধ্যপ্রদেশ সরকারের শ্রী অগ্রসেন মহারাজ রাষ্ট্রীয় সম্মান পুরস্কার ইতিমধ্যেই হাতে এসেছে সুনীল-নিরুপমার। তবে পুরস্কার নিয়ে অতটা ভাবিত নন তাঁরা। নিরুপমা বলেছেন, ‘‘গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়াতাম। প্রান্তিক মানুষজনের চাহিদা বুঝেছি। মাটির গন্ধ আমার খুব প্রিয়। তাই শহর-কোলাহল থেকে দূরে সেই মানুষগুলোর মাঝেই নিজের পেশার ক্ষেত্রে বেছে নিয়েছি। শুধু পেশা নয়, আমার স্বপ্নও জড়িয়ে গেছে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর সঙ্গে।’’ সুনীল-নিরুপমা দু’জনেরই কথায়, ‘‘আর যেন অনাহারে মরতে না হয় কোনও আদিবাসী শিশুকে, অপুষ্টিতে ভুগতে না হয় কোনও প্রসূতিকে। আমরা হাত বাড়াচ্ছি, আপনারাও হাত বাড়িয়ে দিন। তবেই সুস্থ সমাজ গড়ে উঠবে।”

You might also like