Latest News

জীবনের পিচে পৃথিবীর দীর্ঘতম ইনিংস খেলেছিল এই প্রাণীটি, বেঁচেছিল ৫০৭ বছর

Ming, the oldest individual animal ever discovered.

Ming, the oldest individual animal.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

এই পৃথিবীতে বাস করা লক্ষ লক্ষ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে হয়ে চলেছে দীর্ঘজীবী হওয়ার প্রতিযোগিতা। উদ্ভিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন বাঁচার বিশ্বরেকর্ড আজও আমেরিকার প্রমেথিউসের দখলে। ১৯৬৪ সালে ডোনাল্ড রাস্ক কুরি এই ‘ব্রিস্টল কোন পাইন’ গাছটিকে কেটে ফেলার আগে অবধি প্রমিথিউস বেঁচে ছিল ৪৯০০ বছর।

এখনও বেঁচে মেথুসেলা

এখনও জীবিত এবং দীর্ঘায়ু গাছেদের তালিকায়  প্রথমেই আছে আমেরিকার মেথুসেলা। এই  গ্রেট বেসিন ব্রিস্টল কোন পাইন (Pinus longaeva) গাছটির বয়স ৪৮৫৩ বছর। দ্বিতীয় স্থানে আছে চিলির এক প্যাটাগোনিয়ান সাইপ্রাস (Fitzroya cupressoides)  গ্রান আবুয়েলো। গাছটির বয়স ৩৬৫০ বছর। তৃতীয় স্থান দখল করেছে  শ্রীলঙ্কার জয়া শ্রী মহাবোধি নামের এক অশ্বত্থ গাছ, যেটির বয়স ২৩০৭ বছর।

আমেরিকায় আছে কুয়েকিং আসপেন (Populus tremuloides) নামের গাছেদের কলোনি ‘পান্ডো’। একটি পুরুষ কুয়েকিং আসপেন গাছ থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্টি হয়েছে হাজার হাজার পুরুষ কুয়েকিং আসপেন। ১০৮ একর এলাকা জুড়ে থাকা গাছগুলির সম্মিলিত ওজন প্রায় ৬০ লক্ষ কিলোগ্রাম। গাছেদের কলোনিটির বয়স প্রায় ১৪০০০ বছর। কলোনিটি বিশ্বের প্রাচীনতম জীবন্ত কলোনি।

৪৯০০ বছর বয়সি গাছ প্রমেথিউসের কাটা গুঁড়ি

রবার্ট ক্লাইভের কচ্ছপ ‘অদ্বৈত’

উদ্ভিদের মতো না হলেও, প্রাণীদের বেঁচে থাকার রেকর্ড কিন্তু মন্দ নয়। একসময় কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানায় ছিল অদ্বৈত নামের এক কচ্ছপ। সিসিলি থেকে আনা আরও চার কচ্ছপের সঙ্গে ‘অ্যালডাবরা জায়ান্ট টরটোয়েজ’ (Aldabrachelys gigantea) প্রজাতির কচ্ছপটি মহানন্দে ছিল ব্যারাকপুরে। রবার্ট ক্লাইভের বাগানবাড়িতে। পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) জেতার পর  ক্লাইভকে উপহার দেওয়া হয়েছিল কচ্ছপগুলি। অদ্বৈতকে আলিপুর চিড়িয়াখানায় আনা হয়েছিল ১৮৭৫-৭৬ সালে। আলিপুর চিড়িয়াখানায় ২৩১ বছর কাটিয়ে, ২০০৬ সালের ২২ মার্চ মারা গিয়েছিল অদ্বৈত। বয়স হয়েছিল ২৫৫ বছর।

আলিপুর চিড়িয়াখানায় অদ্বৈত

আছে আরও উদাহরণ

গ্রিনল্যান্ড হাঙরেরা ( Somniosus microcephalus) গড়পড়তা বাঁচে প্রায় ২৭২ বছর। প্রায় ৩০০ বছর বেঁচে থাকতে পারে ‘টিউব ওরাম’। ব্ল্যাক কোরাল বা কালো- প্রবাল কলোনিও পৃথিবীতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রায় ৪০০০ বছর এবং গ্লাস-স্পঞ্জ কলোনি ১০০০০ বছর।

অন্যদিকে, প্রায় অমর বলা চলে Turritopsis dohrnii নামের এক জেলিফিস প্রজাতিকে। জন্মের পর প্রথমে লার্ভা দশা, তারপর পলিপ দশা, সবশেষে পুর্ণাঙ্গ জেলিফিশে রূপান্তরিত হয় এরা।  কিন্তু যদি প্রাণীগুলি চোট পায় বা অনাহারে থাকে, তারা আবার ফিরে যায় পলিপ দশায়। সুদিন এলে, পলিপ দশা থেকে আবার তারা রূপান্তরিত হয়ে যায় পুর্ণাঙ্গ জেলিফিশে।

বার্ধক্য থেকে শৈশবে ফিরতে পারে জেলিফিস Turritopsis dohrnii

গবেষকরা তবুও Turritopsis dohrnii নামের জেলিফিসকে পৃথিবীর সবথেকে দীর্ঘায়ু প্রাণীর শিরোপা দিতে রাজি নন। কারণ বিপদবুঝে নিজেদের শরীরে  কারিকুরি ঘটিয়ে শৈশব দশায় ফিরে যায় প্রাণিগুলি। প্রবাল ও গ্লাস-স্পঞ্জ যেহেতু কলোনি তৈরি করে বাঁচে, তাই এগুলিকেও একক দীর্ঘায়ু প্রাণী হিসেবে ধরেন না বিজ্ঞানীরা। অনেক গবেষক বলেন, কলোনি তৈরি করে বাঁচাটা, অনেকটা নিজের সন্তানের মধ্যে বেঁচে থাকার মতোই ব্যাপার। ও বাঁচাকে নিজে বাঁচা বলে নাকি! তাহলে প্রশ্ন, এই পৃথিবীতে জীবনের ক্রিজে দীর্ঘতম ইনিংস খেলার রেকর্ড কোন প্রাণীর দখলে?

যে বছর আলিপুর চিড়িয়াখানায় মারা গিয়েছিল অদ্বৈত, সেই ২০০৬ সালেই বিশ্ব খুঁজে পেয়েছিল জীবনের ক্রিজে দীর্ঘতম ইনিংস খেলা প্রাণীটিকে।

ming
উত্তর আইসল্যান্ডের সমুদ্র সৈকত

আইসল্যান্ডের গ্রিমসে সৈকত

ব্রিটেনের বাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির আবহাওয়া বিজ্ঞানের গবেষকেরা ২০০৬ সালে গিয়েছিলেন আইসল্যান্ডে। সামুদ্রিক জীবদের ওপর সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তনের  প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে। উত্তর আইসল্যান্ডের গ্রিমসে সৈকতের নিকটবর্তী সমুদ্রে ডুবরীর পোশাক পরে নেমে পড়েছিলেন কয়েকজন গবেষক। সেই দলে থাকা আইসল্যান্ডের একজন গবেষক, সমুদ্রের ২৬২ ফুট নিচে খুঁজে পেয়েছিলেন একটি কুয়াহগ (Mercenaria mercenaria) প্রজাতির ঝিনুক। তখনও জীবিত ছিল ঝিনুকটি।

গবেষক জানতেন এই প্রজাতির ঝিনুকেরা পৃথিবীতে হেসে খেলে কাটিয়ে দেয় দুশো বছর। তাই এই ঝিনুকটিই তাঁদের জানাতে পারবে, মেরু সাগরের গত দুশো বছরের আবহাওয়া পরিবর্তনের হাল হকিকত। এর আগে, ১৯৮২ সালে আমেরিকাতে পাওয়া গিয়েছিল ২২০ বছর বেঁচে থাকা এক কুয়াহগ ঝিনুককে। তবে তখনও পর্যন্ত একক প্রাণী হিসেবে সবথেকে বেশিদিন বেঁচে থাকার বিশ্বরেকর্ড ছিল জার্মান মিউজিয়ামে থাকা এক ঝিনুকের দখলে। ঝিনুকটি বেঁচেছিল ৩৭৪ বছর।

এই সেই ঝিনুক

 ব্রিটেনের পথে

জীবন্ত ঝিনুকটিকে আইসল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল ব্রিটেনের বাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির গবেষণাগারে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি ঝিনুকটিকে। গবেষকেরা বলেছিলেন পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরেই মারা গিয়েছিল ঝিনুকটি। মানবজাতির স্বার্থে প্রতিনিয়ত কত উদ্ভিদ ও প্রাণীকে প্রাণ দিতে হয় এভাবে, তাই ঝিনুকটির মৃত্যু সামান্যতম রেখাপাত করেনি গবেষকদের মনে।

মৃত ঝিনুকটিকে নিয়ে শুরু হয়েছিল গবেষণা। ঝিনুকের বয়স নির্ধারণের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সেটির সঙ্গে গাছেদের বয়স বের করার পদ্ধতির মিল আছে। গাছ কাটার পর, গুঁড়ির মধ্যে অনেক চক্রকার রেখা দেখা যায়। এগুলিকে বলা হয় বর্ষবলয়। এই চক্রগুলির সংখ্যাই হলো গাছটির বয়স। ঠিক তেমনই, ঝিনুকের খোলের ওপর আঁকাবাঁকা চক্র দেখতে পাওয়া যায়। যে চক্রগুলির সংখ্যা গুণে ঝিনুকের বয়স বের করা হয়। শুনতে সহজ হলেও পদ্ধতি বেশ কঠিন, বিশেষ করে ঝিনুকের ক্ষেত্রে। কারণ ঝিনুকের বর্ষবলয়গুলি একেবারে গায়ে গায়ে লেগে থাকে।

ঝিনুকটির গায়ের এই দাগগুলিই জানিয়েছে তার বয়স

নতুন বিশ্বরেকর্ড

গবেষকদের প্রায় একবছর লেগেছিল ঝিনুকটির খোলায় থাকা চক্রগুলি গুণতে। ফলাফল আসার পর চমকে গিয়েছিলেন গবেষকেরা। তাঁরা যে ঝিনুকটিকে আইসল্যান্ডের সমুদ্র থেকে নিয়ে এসেছিলেন, সেটি ভেঙে দিয়েছে প্রাণীদের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সব রেকর্ড। ২০০৬ সালে মারা যাওয়ার আগে, ঝিনুকটি বেঁচেছিল ৪০৫ বছর।

সাড়া পড়ে গিয়েছিল বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে। ছুটে এসেছিল বিশ্বের সবকটি প্রথমসারির সংবাদ-মাধ্যম। বাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ক্রিস রিচার্ডসন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই ঝিনুকগুলি হচ্ছে ছোট টেপরেকর্ডার। সমুদ্রের তলায় শুয়ে থাকে। সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সমুদ্রে পাওয়া খাদ্যের কথা রেকর্ড করে নিজেদের খোলকে। এদের খোলার ওপর থাকা প্রতিটি চক্র আগেরটির মতো হয় না, প্রতিটি চক্র সমুদ্রের পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুসারে পরিবর্তিত হয়। ফলে আমরা এই ঝিনুকটির চক্রগুলি বিশ্লেষণ করে গত চারশো বছরের আবহাওয়া পরিবর্তন সম্পর্কে বিশদ জানতে পারব।

ব্রিটেনের বাঙ্গোর ইউনিভার্সিটি

সহ-গবেষকেরা বলেছিলেন, আমরা জানতে পারব উত্তর মেরুর সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা বিভিন্ন যুগে কেমন ছিল। জানতে পারবো লবণের পরিমাণ, সামুদ্রিক জীবের খাদ্যের প্রাচুর্য্য বা অভাব। কুয়াহগ ঝিনুকগুলির দীর্ঘজীবী হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলেছিলেন,”আমরা অনুমান করছি এই প্রজাতির ঝিনুকগুলির বৃদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক মন্থর। তাই এরা বহু শতাব্দী অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। তবে আসল রহস্যের কাছে পৌঁছাতে গেলে, আরও কিছুটা সময় আমাদের দিতে হবে।”

আরও পড়ুন: বিশ্বের একমাত্র মানুষ, একুশ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন এভারেস্টের চূড়ায়, মর্মান্তিক মৃত্যু হিমালয়েই

সানডে টাইমসের সাংবাদিকেরা বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বিশ্বরেকর্ড গড়া ঝিনুকটির নাম দিয়েছিল ‘মিং'(Ming)। কারণ ঝিনুকটি যে সময়কাল জুড়ে বেঁচেছিল, সেই সময়ে (১৩৬৮-১৬৪৪) চিন দাপাচ্ছিল ‘মিং’ রাজবংশ।  ৮৭ × ৭৩ মিলিমিটার আয়তনের মিং-এর নাম উঠে গিয়েছিল গিনেস বুকেও। কিন্তু, ২০১৩ সালে আবার শোরগোল পড়ে গিয়েছিল বাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরিতে।

এই সেই বিশ্ববিখ্যাত ঝিনুক ‘মিং’

একদিন সকালে ল্যাবরেটরির সামনে একে একে এসে থামছিল গবেষকদের গাড়ি। গম্ভীর মুখে তাঁরা ঢুকে যাচ্ছিলেন ল্যাবরেটরিতে। বিশেষ খবরের আশায় ল্যাবরেটরির দরজায় হাজির হয়ে গিয়েছিল সংবাদ-মাধ্যমও। বিকেল নাগাদ প্রবল হর্ষধ্বনির আওয়াজ ভেসে এসেছিল ল্যাবরেটরির ভেতর থেকে।

সাংবাদিকদের সামনে এসেছিলেন প্রফেসর রিচার্ডসন, উল্লসিত কণ্ঠে তিনি জানিয়েছিলেন,” মিং-এর বয়স হিসাব করতে ভুল হয়েছিল আমাদের।  বিখ্যাত মেরিন বায়োলজিস্ট রব উইটবার্ড  ঝিনুকটির কার্বন-১৪ ডেটিং পরীক্ষা করেছিলেন। মিং-এর বয়স ৪০৫ নয়, মিং-এর আসল বয়স হল ৫০৭ বছর।

জীবনের ক্রিজে দীর্ঘতম ইনিংস খেলার ক্ষেত্রে, নিজের গড়া রেকর্ড নিজেই ভেঙে দিয়েছে এই পৃথিবীতে পাঁচ শতাব্দী কাটিয়ে যাওয়া মিং! মুহূর্তের মধ্যে খবরটি ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। আবার ছুটে এসেছিলেন গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের প্রতিনিধিরা। রেকর্ডবুক আপডেট করতে হলে প্রমাণ দরকার। অবশ্য, সে প্রমাণ হাতের কাছেই রেখেছিলেন গবেষকেরা।

মিং-এর জীবনকাল

এরপর পালটে গিয়েছিল ‘মিং’ নামে ঝিনুকটির নাম। আইসল্যান্ডের যে গবেষক ঝিনুকটিকে সমুদ্রের তলা থেকে উদ্ধার করেছিলেন, তিনি ঝিনুকটির নতুন নাম দিয়েছিলেন ‘হাফ্রান’। শব্দটির অর্থ ‘সমুদ্রের রহস্য’। কুয়াহগ ঝিনুকটি নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়লেও, যারপরনাই ক্ষুব্ধ ছিলেন পরিবেশবিদেরা। তাঁরা বলেছিলেন, গবেষকদের হাতে পড়েনি বলেই ঝিনুকটি বাঁচতে পেরেছিল  ৫০৭ বছর। গবেষণার জন্য তুলে না আনলে, হয়তো ‘হাফ্রান’ বাঁচতো আরও অনেক শতাব্দী।

ভাবুকেরা হাফ্রানের কথা শুনে নীল আকাশে চোখ ভাসিয়ে ভাবছিলেন, যখন ‘হাফ্রান’ বেঁচেছিল, সেই সময়ে এই পৃথিবীতেই একের পর এক কালজয়ী নাটক লিখে চলেছেন শেক্সপিয়র, দরজা বন্ধ করে নিবিষ্টমনে মোনালিসা এঁকে চলেছেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like