Latest News

দক্ষিণ ভারতে আছেন দেবী ‘জ্ঞান সরস্বতী’, বিগ্রহটি নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং ব্যাসদেব

Legends of the Gnana Saraswati Temple

রূপাঞ্জন গোস্বামী

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ তখন সদ্য সমাপ্ত। ধর্মের কাছে পরাজিত অধর্ম। অথচ আনন্দের লেশমাত্র ছিল না পঞ্চপাণ্ডবের মনে। কারণ কৌরব শিবির থেকে ভেসে আসছিল, স্বজন হারানো  নারীদের কান্নার আওয়াজ। যা বজ্র হয়ে আঘাত করছিল পঞ্চপাণ্ডবের বুকে।

কুরুক্ষেত্রের রক্তাক্ত প্রান্তরে পড়েছিল হাজার হাজার শব। আকাশে উড়ছিল শকুনের দল। মৃতের স্তুপের মধ্যে তাঁদের প্রিয়জনকে পাগলের মত খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন কৌরব নারীরা। ভ্রাতৃহত্যা ব্রহ্মহত্যার সমান। অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ পঞ্চপাণ্ডব তাই শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণ একটি কালো পতাকা ও একটি কালো গরু পঞ্চপাণ্ডবকে দিয়ে বলেছিলেন, গরুটিকে অনুসরণ করার জন্য। যেখানে গরু ও পতাকার রঙ কালো থেকে সাদা হয়ে যাব, সেই স্থানে পঞ্চপাণ্ডবকে বসতে হবে দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনায় এবং প্রতিষ্ঠা করতে হবে পাঁচটি শিবলিঙ্গ। তবেই পাপমুক্ত হতে পারবেন পঞ্চপাণ্ডব।

সারা ভারত ঘুরে গরুটি পৌঁছেছিল ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে। আরব সাগরের তীরে থাকা ছোট্ট  গ্রাম কোলিয়াকে। পঞ্চপাণ্ডবকে বিস্মিত করে গরু ও পতাকাটি হয়ে গিয়েছিল ধবধবে সাদা। কোলিয়াক সৈকতেই মহাদেবের আরাধনা শুরু করেছিলেন পঞ্চপাণ্ডব। তুষ্ট হয়েছিলেন মহাদেব। সমুদ্রবক্ষে পাণ্ডবেরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাঁচটি শিবলিঙ্গ। যেগুলি আজও নিষ্কলঙ্ক মহাদেব নামে বিরাজ করছে গুজরাটের ভাবনগরের সমুদ্রবক্ষে। দিনের বেশিরভাগ সময়েই শিবলিঙ্গগুলি ডুবে থাকে আরব সাগরের জলের তলায়।

নিষ্কলঙ্ক মহাদেব

ভারতের দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন ঋষি দ্বৈপায়ণ

পাণ্ডবেরা যখন কলঙ্কমোচনের জন্য গরু ও পতাকা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ঠিক একই সময় ভারতের দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন ঋষি পরাশরের পুত্র কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ। যাঁকে বিশ্ব চেনে মহাভারত ও ব্রহ্মসূত্রের রচনাকার মহর্ষি বেদব্যাস বা ব্যাসদেব নামে।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিয়োগান্তক ঘটনাক্রম, বদরিকাশ্রমে থাকা ব্যাসদেবের মনকে করে তুলেছিল বিষণ্ণ। তপস্যায় মনোনিবেশ করতে পারছিলেন না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের রক্তেরাঙা দৃশ্যগুলি সর্বক্ষণ তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। মহর্ষি ব্যাস তখন আশ্রম ছেড়ে কিছুদিনের জন্য দূরে কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমন জায়গায় যেতে চেয়েছিলেন, যেখানে তিনি পাবেন নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি। যেখানে পৌঁছাতে পারবে না, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতিগুলি।

মহর্ষি ব্যাস

এক ভোরে ব্যাসদেব বেরিয়ে পড়েছিলেন বদরিকাশ্রম থেকে। হাঁটা শুরু করেছিলেন দক্ষিণ দিকে। কেটে গিয়েছিল কয়েক মাস। তবুও হেঁটে চলেছিলেন মহর্ষি ব্যাস। হাঁটতে হাঁটতে একদিন তিনি এসে পৌঁছেছিলেন দক্ষিণ ভারতের এক ঘন অরণ্যে। গোদাবরী নদী ও পাহাড় দিয়ে ঘেরা অরণ্যটির আশেপাশে ছিল না কোনও জনপদ।

বালির ঢিপি রূপান্তরিত হয়েছিল বিগ্রহে

এলাকাটির শান্ত ও নির্জন পরিবেশ, প্রজাপতিদের ওড়াউড়ি, পাখিদের কলকাকলি, হরিণদের নির্ভয় বিচরণ, ময়ূরদের পেখম নৃত্য দেখে মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন ব্যাসদেব। সেই অরণ্যেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরপর ব্যাসদেব আশ্রয় নিয়েছিলেন, গোদাবরীর কিনারায় থাকা এক পাহাড়ি গুহায়। বনের ফল, মধু ও ঝরণার জলই ছিল তাঁর জীবনধারণের একমাত্র সম্বল।

আরও পড়ুন: জাপানেও আছেন মা সরস্বতী! সেখানে তিনি ‘বেঞ্জাইতেন’

গুহাটির ভেতরে ব্যাসদেব শুরু করেছিলেন তাঁর তপস্যা। কেটে গিয়েছিল বহু যুগ। তপস্যা সমাপ্ত হওয়ার পর, ব্যাসদেব স্নান করতে গিয়েছিলেন গোদাবরী নদীতে। দিনটি ছিল বসন্ত পঞ্চমী। দিন স্নান সেরে ব্যাসদেব হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিন মুঠো বালি। সেই বালি দিয়ে নদীর তীরে, তৈরি করেছিলেন তিনটি ঢিপি। তারপর বসেছিলেন ত্রিদেবের আরাধনায়।

দৈববলে তিনটি বালির ঢিপি পরিণত হয়েছিল দেবী শারদা (সরস্বতী), মা মহালক্ষী ও মা মহাকালীর চন্দন কাঠের বিগ্রহে। ত্রিদেবীকে তিন জায়গায় প্রতিষ্ঠা করে ব্যাসদেব শুরু করেছিলেন  আরাধনা। দেবী শারদার বিগ্রহের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। চিন্ময়ী দেবীর অনির্বচনীয় রূপ ব্যাসদেবের অশান্ত মনকে শান্ত করেছিল। সদানন্দময়ী দেবী জ্ঞানদার আশীর্বাদে কেটে গিয়েছিল ব্যাসদেবের মনে জমে থাকা হতাশার কুয়াশা। এরপর কেটে গিয়েছিল কয়েক হাজার বছর। দক্ষিণ ভারতের অরণ্যটিতে মহর্ষি বেসব্যাসের অবস্থানের কথা ছড়িয়ে পড়েছিল লোকমুখে। বেদব্যাসের নাম অনুসারে স্থানটির নাম হয়েছিল ব্যাসারা (বাসারা)।

গোদাবরীর তীরে জ্ঞান সরস্বতীর মন্দির

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে এই বাসারা ছিল নন্দাগিরি রাজত্বের অধীনে। সিংহাসনে তখন আসীন ছিলেন মহারাজ বিজিয়ালুডু।  তিনি একবার শিকার করতে এসেছিলেন ব্যাসদেবের পাদস্পর্শে ধন্য বাসারের অরণ্যে। দেবী সরস্বতী ও মহর্ষি ব্যাসদেবের কিছু অলৌকিক কাহিনি লোকমুখে শুনে মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন মহারাজ। গোদাবরীর তীরে গড়ে তুলেছিলেন অপূর্ব কারুকার্যময় এক মন্দির।

সেই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ব্যাসদেব নির্মিত সরস্বতী বিগ্রহটিকে। মা সরস্বতীর নাম হয়েছিল ‘জ্ঞান সরস্বতী’। মন্দিরে শুরু হয়েছিল দেবীর নিত্যপূজা। বাগদেবীর আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য দূরদূরান্ত থেকে আসতে শুরু করেছিলেন ভক্তেরা। এরপর মন্দির প্রাঙ্গণে চালুক্য রাজারা গড়ে তুলেছিলেন মা মহালক্ষী ও মা মহাকালীর মন্দির।

মন্দিরের ইতিহাসের চরমতম বিপর্যয়

সুরম্য মন্দিরে বিরাজ করছিলেন দেবী ‘জ্ঞান সরস্বতী’। গোদাবরী নদীর বুক দিয়ে বয়ে চলেছিল বিপুল জলরাশি। কিন্তু আকাশে ঘনিয়েছিল বিপর্যয়ের মেঘ। চতুর্দশ শতকে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল দেবী জ্ঞান সরস্বতীর মন্দির। খিলজি বংশের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক আলাউদ্দিন খিলজি, আক্রমণ করেছিলেন দক্ষিণ ভারত। তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুর (তাজ আল-দীন ইজ্জ আল-দাওলা) তরবারির জোরে দখল করে নিয়েছিলেন দক্ষিণ ভারতের প্রায় সমগ্র উত্তরাংশ।  চালিয়েছিলেন নৃশংস গণহত্যা ও লুঠতরাজ। একই সঙ্গে ধ্বংস করেছিলেন বহু প্রাচীন মন্দির।

মালেক কাফুর

মালেক কাফুরের কালো থাবার আঘাত পড়েছিল দেবী জ্ঞান সরস্বতীর মন্দিরে। ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছিল প্রাচীন মন্দিরটিকে। তবে মন্দির ধ্বংসের আগেই দেবী জ্ঞান সরস্বতীর বিগ্রহটিকে সরিয়ে ফেলেছিলেন পুরোহিতেরা। ধ্বংসের প্রায় চারশো বছর পর, ১৭ শতাব্দীতে দেবী জ্ঞান সরস্বতীর মন্দিরটির পুনর্নির্মাণ করেছিলেন নন্দাগিরির এলাকার উপজাতীয় প্রধানেরা। নবনির্মিত মন্দিরে সাড়ম্বরে স্থাপন করা হয়েছিল ব্যাসদেব নির্মিত জ্ঞান সরস্বতী বিগ্রহটিকে।

জ্ঞান সরস্বতী মন্দির

তেলেঙ্গানায় আছে সেই মন্দির

আজও স্বমহিমায় তেলেঙ্গানার বাসরায় বিরাজ করছেন দেবী জ্ঞান সরস্বতী। নিজামাবাদ-মাল্লারাম অরণ্য, সারাঙ্গাপুর অরণ্য, চান্দুর অরণ্য, ধরপল্লী অরণ্য ঘিরে রেখেছে দেবী জ্ঞান সরস্বতীর মন্দিরটিকে। শ্বেতশুভ্র মন্দিরের গর্ভগৃহে বিরাজ করছেন দেবী জ্ঞান সরস্বতী। চতুর্ভূজা, পীতবস্ত্র-পরিহিতা,পদ্মলোচনা, বীণাপুস্তকধারিণী দেবী এখানে শ্বেতবর্ণা নন। তাঁর গাত্রবর্ণ হরিদ্রাভ।

দেবীর গাত্রবর্ণ হরিদ্রাভ, কারণ তাঁর অঙ্গে প্রতিদিন দেওয়া হয় হলুদের প্রলেপ। সেই হলুদ দেওয়া হয় দেবী প্রসাদ হিসেবে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন প্রসাদী হলুদ খেলে জ্ঞান ও মেধা বৃদ্ধি পায়। ভারতের সব জায়গায় দেবী সরস্বতীর বাহন রাজহংস। কিন্তু দেবীর জ্ঞান সরস্বতীর বাহন এক হরিদ্রাভ ময়ূর।

দেবী জ্ঞান সরস্বতী

প্রতিদিন ভোর চারটের সময় দেবী জ্ঞান সরস্বতীর পূজা শুরু হয় পবিত্র ‘অভিষেকম’ আচারটির মধ্যে দিয়। ভোর পাঁচটায় শুরু হয় অলঙ্করণ। নতুন স্বর্ণলঙ্কার, ফুলমালা ও বস্ত্রে সজ্জিত করা হয় দেবীকে। সকাল ছ’টায় সূর্যের আলো মন্দির প্রাঙ্গণে এসে পড়লে, শুরু হয় দেবীর মহা আরতি। তারপর হয় প্রসাদ বিতরণ।

দেবী জ্ঞান সরস্বতীর মন্দিরটির পাশেই আছে সুপ্রাচীন মা মহালক্ষীর মন্দির। কিছুটা দূরে আছে জাগ্রত মা মহাকালীর মন্দির। দেবী জ্ঞান সরস্বতীর মন্দির থেকে একশো মিটার দূরেই আছে একটি গুহা। এখানেই তপস্যা করেছিলেন মহর্ষি বেদব্যাস।

এই সেই গুহা, ভেতরে ব্যাসদেবের মূর্তি

মন্দির প্রাঙ্গণেই আছে বেদবতী নামের একটি পাথর। পাথরটির বিভিন্ন দিকে আঘাত করলে, কানে ভেসে আসে আলাদা আলাদা সুরেলা আওয়াজ। লোকগাথা বলে, এই পাথরটি ছিল সীতা মায়ের অলঙ্কার। এছাড়া দেবী জ্ঞান সরস্বতীর মন্দিরকে ঘিরে আছে, ইন্দ্র তীর্থম, সূর্য তীর্থম, ব্যাস তীর্থম, বাল্মিকী তীর্থম, বিষ্ণু তীর্থম, গনেশ তীর্থম, পুত্র তীর্থম ও শিব তীর্থম নামের আটটি পবিত্র পুষ্করিনী। মন্দির প্রাঙ্গণে থাকা একটি টিলার ওপর আছে দেবী সরস্বতীর বিশাল এক মূর্তি।

টিলার ওপর দেবী সরস্বতীর মূর্তি

সেরা উৎসবের নাম ‘অক্ষরভ্যাসম’

কয়েক হাজার বছর ধরে একটি বিশেষ উৎসব পালিত হয়ে আসছে দেবী জ্ঞান সরস্বতীর এই মন্দিরে। উৎসবটির নাম অক্ষরভ্যাসম। বসন্ত পঞ্চমীর দিন দুই বছর বয়স পূর্ণ হওয়া শিশুদের দেবী জ্ঞান সরস্বতী কাছে নিয়ে আসেন হাজার হাজার বাবা মা। দেবীর সামনে হয় শিশুগুলির হাতেখড়ি। কথিত আছে যে শিশু দেবীর পদতলে বসে জীবনের প্রথম অক্ষর লেখে, সে জীবনে ব্যর্থ হয় না।

তবে শুধু বসন্ত পঞ্চমীতেই নয়। বছরে আরও তিন দিন হয় এই অক্ষরভ্যাসম উৎসব। এই তিনদিনের মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিনটি হলো আষাঢ় মাসের গুরুপঞ্চমী বা ব্যাসপঞ্চমী। কারণ দিনটি মহর্ষি বেদব্যাসের জন্মদিন।এই দিনটি ছাড়া শ্রাবণ পঞ্চমী (রাখি পুর্ণিমা) ও বিজয়া দশমীতেও হয় এই অক্ষরভ্যাসম উৎসব। প্রতি বছর দশ থেকে বারো লক্ষ শিশুর হাতেখড়ির সাক্ষী থাকেন দেবী জ্ঞান সরস্বতী।

হাতেখড়ির অপেক্ষায় হাজার হাজার শিশু

ভারতীয় উপমহাদেশের সবথেকে বিখ্যাত ও প্রাচীনতম সরস্বতী মন্দিরটি আছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের নয়নাভিরাম নীলম উপত্যকায়। ঋষি শাণ্ডিল্য প্রতিষ্ঠিত দেবী নীল সরস্বতীর মন্দির শারদাপীঠ আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত। কিন্তু হাজার বিপর্যয়ের পরও অস্তিত্ব বজায় রেখেছে দেবী সরস্বতীর দ্বিতীয় বিখ্যাত মন্দিরটি। যেখানে বিরাজ করছেন দেবী জ্ঞান সরস্বতী। শিক্ষার আলোকে আলোকিত করে চলেছেন সমগ্র দক্ষিণ ভারতকে। প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like