Latest News

কিংবদন্তি শ্মশানবন্ধু ‘মারিয়াম্মাল’, তিয়াত্তর বছরে করেছেন বারো হাজার সৎকার

G. Mariammal, the legendary Octogenarian undertaker of India.

G. Mariammal

রূপাঞ্জন গোস্বামী

প্রায় সাত দশক আগে ঠাকুর্দা, মা ও মামার সঙ্গে মাদুরাই শহরের পাসুমালাই শ্মশানঘাটে এসেছিল বাইকারা এলাকার তেরোর বছরের বালিকা ‘মারিয়াম্মাল’। ঠাকুর্দা ও মামা সেই শ্মশানে শবদাহের কাজ করতেন। সেই কাজে টুকিটাকি সাহায্য করতেন মারিয়াম্মালের মা। এই কাজ করে যেক’টি টাকা আসত, সেই টাকায় চলত অভাবের সংসার।

স্কুলে যাওয়ার জন্য সেদিনও ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছিল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মারিয়াম্মাল। স্কুলের কাছে পৌঁছেও গিয়েছিল প্রায়। পিছন থেকে সাইকেল চালিয়ে এসেছিলেন ঠাকুর্দা। স্কুলে না গিয়ে তাঁর সঙ্গে শ্মশানে যেতে বলেছিলেন। কারণ সেদিন একজন দাহকর্মী কম পড়েছিল।

পিতৃহীন মারিয়াম্মাল জানত ঠাকুর্দার কোনওদিন কাজ জোটে, কোনওদিন জোটে না। শ্মশানে আসা  শবদেহ নিয়ে কাড়াকাড়ি করে বাকি ডোমেরা। তাদের সঙ্গে শব দখলের যুদ্ধে পেরে ওঠেন না বৃদ্ধ ঠাকুর্দা। তাই বেশিরভাগ দিনই বাড়ি ফেরেন মাথা নিচু করে। সেদিন ঠাকুর্দা কাজ পাওয়াতে, অন্য কিছু আর ভাবেনি মারিয়াম্মাল। স্কুলে না গিয়ে, উঠে পড়েছিল ঠাকুর্দার সাইকেলে।

পাসুমালাই শ্মশানে প্রথম দিন

শ্মশানে পৌঁছে মারিয়াম্মাল এককোনে নামিয়ে রেখেছিল স্কুল ব্যাগ। স্রেফ পেটের জ্বালায় এক মেধাবী ছাত্রীকে শিক্ষার পথ থেকে সরে যেতে দেখে, হয়ত কষ্ট পেয়েছিল সবুজ কাপড়ের স্কুলব্যাগটিও। শ্মশান চত্বরে বাঁশের বিছানায় রাখা ছিল বেশ কয়েকটি শবদেহ। মারিয়াম্মালের মা ও মামা দাঁড়িয়েছিলেন একটি শবদেহের  কাছে। চিতা সাজানো হয়ে গিয়েছিল। পাশে পড়েছিল ঘুঁটে, খড়, জ্বালানি কাঠ ও কেরোসিনের বোতল। সেদিনই প্রথম শ্মশানে আসা, তাই ভীষণ ভয় করছিল মারিয়াম্মালের। এর আগে এত কাছ থেকে মৃতদেহও দেখেনি সে।

মৃতদেহটিকে প্রায় নগ্ন করে স্নান করাচ্ছিলেন মা ও মামা। দৃশ্যটি দেখে চোখ বুজে ফেলেছিল মারিয়াম্মাল। হঠাৎ কপালে সে পেয়েছিল গরম হাতের স্পর্শ। চোখ খুলতেই দেখেছিল ঠাকুর্দাকে। নিভে যাওয়া এক চিতা থেকে ছাই তুলে এনে, নাতনি মারিয়াম্মালের কপালে লাগিয়ে ঠাকুর্দা বলেছিলেন, “আশীর্বাদ করি, এই ছাই আর আগুনই যেন তোকে আজীবন দু’মুঠো জুটিয়ে দেয়।”

এক নিমেষে ভয় কেটে গিয়েছিল মারিয়াম্মালের। চুলের বিনুনীটাকে খোঁপা করে ঠাকুর্দার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মারিয়াম্মাল। ঠাকুর্দা তখন মৃতদেহটিকে চন্দন ও মালায় সাজিয়ে দিচ্ছিলেন। ঠাকুরদার কাছ থেকে চন্দনের বাটিটা নিয়ে মৃতদেহের কপালে পরিয়ে দিতে শুরু করেছিল মারিয়াম্মাল। মৃত মানুষটির হিমশীতল কপাল স্পর্শ করার পর, তার সারা শরীর কাঁপছিল। কিন্তু ভয়ে নয়, এক অদ্ভুত আবেগে।

এক সময় দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল চিতা। মারিয়াম্মালের চোখের সামনে  মৃতদেহটিকে গ্রাস করতে শুরু করেছিল লেলিহান শিখা। কাঁচা বাঁশ হাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন ঠাকুর্দা ও মামা। আসতে আসতে কালো হয়ে যাচ্ছিল মানুষটির দেহ। পিঠে হাত রেখেছিলেন মারিয়াম্মালের ঠাকুর্দা, বলেছিলেন,”মানুষটা কিন্তু ব্যথা পাচ্ছে না।”

এরপর আর কোনওদিন স্কুলে যাওয়া হয়নি মারিয়াম্মালের। স্কুলের ব্যাগটা পড়েছিল একচিলতে কুঁড়েঘরেই। পথটা বেঁকে গিয়েছিল পাসুমালাই শ্মশানঘাটের দিকে। ঠাকুর্দার কাছ থেকে বালিকা মারিয়াম্মাল শিখে নিয়েছিল শবদাহের খুঁটিনাটি। কয়েক বছরের মধ্যেই সে হয়ে গিয়েছিল ঠাকুর্দার শ্রেষ্ঠ সহযোগী।

যৌবন মারিয়াম্মালকে দিয়েছিল শক্ত মন ও শক্তিশালী শরীর

ঠাকুর্দার মৃত্যুর পর যুবতী মারিয়াম্মালকে শ্মশান থেকে সরিয়ে দেওয়ার কম চেষ্টা হয়নি। পুরুষের পেশায় এক নারীর আগমন ও অভূতপূর্ব উন্নতি মেনে নিতে পারেনি অনেক পুরুষ দাহকর্মী। ফলে টিটকিরি, উপহাস, বিশ্বাসঘাতকতা থেকে শারীরিক আক্রমণ, কিছুই বাদ যায়নি।

একদিনের একটি ঘটনা। শ্মশানে একটি শবকে দাহ করার ব্যবস্থা করছিলেন মারিয়াম্মাল। সঙ্গে ছিলেন তিনজন পুরুষ দাহকর্মী। কিন্তু চিতায় আগুন ধরে যাওয়ার পর, মারিয়াম্মালের পাশ থেকে সরে গিয়েছিলেন সেই তিন দাহকর্মী। সহকর্মীদের বিশ্বাসঘাতকতা সেদিনও দমাতে পারেনি মারিয়াম্মালকে। একা হাতে মৃতদেহটিকে দাহ করেছিলেন যুবতী মারিয়াম্মাল।

এরকম হাজারো বাধার মুখে পড়েও অবিচল থেকেছেন মারিয়াম্মাল। কখনও সখনও মেজাজ হারিয়ে,  চিতার জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে রণচণ্ডী হয়ে উঠেছেন। প্রথাভাঙা এক নারীর সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে, মারিয়াম্মালকে তাড়ানোর চিন্তা ত্যাগ করেছিল পুরুষ দাহকর্মীরা।

সুখের হয়নি সংসার

মারিয়াম্মালের তখন কুড়ি বছর বয়স। তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন পাসুমালাই শ্মশানেরই এক দাহকর্মী। হবুস্বামীকে মারিয়াম্মাল দিয়েছিলেন এক শর্ত। বিয়ের পরেও চালিয়ে যাবেন শবদাহের কাজ। এই শর্ত মানলে বিয়ে হবে, না হলে হবে না। কারণ তিনি চান, তাঁকে দেখে আরও বহু নারী যোগ দিক এই পেশায়। চূর্ণ হোক পুরুষদের একাধিপত্ত্ব। মারিয়াম্মালের শর্ত মেনে নিয়েছিলেন হবুস্বামী।

আরও পড়ুন: প্রায় বারোশো বছর ধরে চলছে এই বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক মুসলিম নারী

কয়েক বছর খুব সুখে সংসার করেছিলেন মারিয়াম্মাল। কিন্তু সে সুখ ছিল ক্ষণস্থায়ী।  জন্মের মাত্র একমাস পর মারা গিয়েছিল মারিয়াম্মালের একমাত্র সন্তান। মৃত্যু যে কতবড় আঘাত দিতে পারে, তা অনুভব করেছিলেন মারিয়াম্মাল। সন্তানকে মাত্র একমাসের জন্য কাছে পেয়েছিলেন তিনি। সারাদিন শ্মশানে থাকার জন্য, দুধের সন্তানকে তেমন ভাল করে আদরও করতে পারেননি মারিয়াম্মাল। সেই অভিমানেই কি সে চলে গেল! এই প্রশ্ন কুরে কুরে খেয়েছে মারিয়াম্মালকে। কিন্তু চোখের জল শুকিয়ে যাওয়ার আগেই হাতে তুলে নিতে হয়েছিল কাঁচা বাঁশ। চিতার ধোঁয়ায় চোখ থেকে জল গড়াত। সেই জলে মধ্যে মিশে থাকত সন্তানের জন্য ফেলা অশ্রুও। যা কেউ টেরও পেত না।

মারিয়াম্মাল

কর্তব্যে অবিচল মারিয়াম্মাল

১৯৮৯ সালে স্বামীকে হারিয়েছিলেন মারিয়াম্মাল। চলে এসেছিলেন তাঁর বড়দার কাছে। তবে জীবনের ওপর দিয়ে নানা ঝড় ঝাপটা গেলেও, নিজের কর্তব্যের প্রতি কিন্তু অবিচল ছিলেন মারিয়াম্মাল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক সময় নিভে যাওয়া চিতা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন দাহকর্মীরা। পালিয়ে গিয়েছেন মৃতের পরিবারের লোকজনও। পালাতে পারেননি কেবল মারিয়াম্মাল। তাঁর মনে হয়েছে নিভে যাওয়া চিতা থেকে মৃতদেহের অংশ খুবলে নিতে পারে শিয়াল কুকুর। শেষ সময়ে মৃত মানুষটার এই লাঞ্ছনা মারিয়াম্মাল সহ্য করবেন কেমন করে! তাই মোটা লাঠি আর ছয় সেলের টর্চ নিয়ে মৃতদেহ পাহারায় থেকে গিয়েছেন মারিয়াম্মাল। সম্পূর্ণ একা।

G Mariammal
একাই দাহ করছেন মারিয়াম্মাল

বৃষ্টি থামার পর লিটারের পর লিটার কেরোসিন ঢেলে জ্বালিয়েছেন চিতা। পঞ্চভূতে বিলীন করে দিয়েছেন শবদেহটিকে। পরদিন ভোরে মৃতের পরিবারের লোকজনেরা ফিরে এলে, তাঁদের গালাগাল দিতে দিতে বাড়ির পথ ধরেছেন মারিয়াম্মাল। পারিশ্রমিকের পয়সা না নিয়েই। কারণ এই দয়ামায়াহীন মানুষদের টাকায় লেগে থাকে পাপ। তাই ওই টাকা তিনি নিতে পারবেন না।

এভাবেই কেটে গেছে সাত সাতটা দশক

আজও শ্মশানবন্ধু হয়েই আছেন ছিয়াশি বছরের মারিয়াম্মাল। চিতার আগুনের পাশে কাটিয়ে ফেলেছেন  তিয়াত্তরটা বছর। প্রায় বারো হাজার শব দাহও করে ফেলেছেন এই তিয়াত্তর বছরে। পাইকারা, পুডুকুলাম বা পাসুমালাইয়ে কারও মৃত্যু হলেই মৃতের পরিবার আগে খোঁজ করে ছিয়াশি বছরের মারিয়াম্মালের। কারণ মৃতের পরিবারের একজন হয়ে উঠতে পারেন, একমাত্র মারিয়াম্মালই।

মারিয়াম্মালকে নিয়মিত দাহ করতে হয় বেওয়ারিশ লাশও। পুলিশের ভ্যান নির্দয়ভাবে  শ্মশানে নামিয়ে দিয়ে যায় লাশগুলিকে। নিজে হাতে স্নান করিয়ে পরম যত্নে সেগুলিকে চিতায় তোলেন মারিয়াম্মাল। যা তাঁকে ভীষণ শান্তি দেয়। মারিয়াম্মাল বলেন, “এই শেষ মুহূর্তটা আমার কাছে অত্যন্ত দামি। কারণ এদের পরিবারের কেউই নেই পাশে। তাই আমিই এদের মা, দিদি বা বোন হয়ে এই জন্মের সীমানাটা পার করে দিই। হয়ত এজন্য তারা আমাকে আশীর্বাদও করে।”

জীবনের সেরা পুরস্কার

২০১৪ সাল মারিয়াম্মালকে দিয়েছিল জীবনের সবথেকে বড় পুরস্কার। ভবঘুরেদের জন্য সেল্লুরে একটি নৈশাবাস তৈরি করেছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। জাতীয় পতাকা তুলে সেই নৈশাবাসটির উদ্বোধন করেছিলেন মারিয়াম্মাল। কান্নাভেজা গলায় বলেছিলেন, “ছোট থেকে দূরে দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন দেখেছি। নিজে কোনওদিন ভাবিনি জাতীয় পতাকা ছুঁতে পারব। উড়িয়ে দিতে পারব নীল আকাশে। এর থেকে বড় সম্মান আমি পাইনি।”

গত তিন বছর ধরে চলা কোভিড অতিমারীও দমাতে পারেনি মারিয়াম্মালকে। একদিনের জন্যেও শ্মশানে যাওয়া বন্ধ করেননি। যদিও পরিবারের সবাই তাঁকে কাজে যেতে বারণ করেন। কিন্তু মারিয়াম্মাল কারও কথা শোনেন না। সাইকেলে উঠতে উঠতে গজগজ করেন,”সবাই হাত গুটিয়ে ঘরে বসে গেলে লাশগুলোর সৎকার করবে কে ? তাছাড়া আমার এমনিতেই যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ভাল কাজ করতে করতে চলে যাওয়াই ভাল।”

পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীদের মারিয়াম্মাল বলেন, “তোমরা যেভাবেই হোক শ্মশানে দেহ পৌঁছে দাও। তারপর বাকিটা আমি বুঝে নেব।” সত্যিই  বুঝে নিয়েছেন তিনি। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গত দুই বছর ধরে মারিয়াম্মাল দাহ করেছেন কয়েকশো কোভিড রোগীর মৃতদেহ।

কিছুদিন আগে মারিয়াম্মালকে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলেন,” নারী হয়ে এতগুলো বছর মৃতদেহ নিয়ে কাটাতে ভয় করেনি আপনার?” মারিয়াম্মাল হেসে বলেছিলেন,” নারীর কঠিনতম রূপটাকে মানতে পারছেন না তাই না? তবে মৃত্যুর মধ্যে আমি কোনও ভয়াবহতা খুঁজে পাইনি। আমার কাছে জ্বলন্ত মৃতদেহ কোনও যাত্রার পরিসমাপ্তি নয়। বরং নতুন এক যাত্রার শুভ সূচনা। যার উদ্বোধন হয় আমার হাত দিয়েই।”

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like