Latest News

গুপীবাঘার ভূতের রাজার বর যেন, বৃষ্টির সঙ্গে প্রতিবছরে আকাশ থেকে ঝরে পড়ে রাশি রাশি মাছ

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: ধরুন একদিন আপনি বাজারের থলি নিয়ে বেরিয়েছেন মাছ কিনতে। ঈশান কোণে মেঘ জমেছে, আকাশ ঘন কালো। দেখতে দেখতেই হঠাৎ ধেয়ে এল প্রচণ্ড বৃষ্টি। জলঝড়ের হাত থেকে বাঁচতে আপনি ছাতাটা খুলতে যাবেন, হঠাৎ… এ কী! মাথার উপর এসে দুম করে আছড়ে পড়ল আস্ত একটা মাছ। প্রথমে একটা, তারপর শয়ে শয়ে, আকাশ থেকে শিলার মতো টুপটাপ ঝরে পড়ছে ছোট বড় নানা ধরণের মাছ। গোটা জায়গা জুড়েই শুরু হয়েছে এক আশ্চর্য মাছ বৃষ্টি। মাছের বন্যায় থই থই করছে রাস্তাঘাট… এমন একটা ঘটনা চোখের সামনে ঘটে যেতে দেখলে ঠিক কেমন লাগবে আপনার! সোনায় সোহাগা হয়ে মাছ কুড়োতে শুরু করবেন! না, মাথা বাঁচাতে দৌড় দেবেন নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের সন্ধানে! কী ভাবছেন, ভূতের রাজার বরে আকাশ থেকে পেল্লায় মিষ্টির হাঁড়ি পড়ার ঘটনা রুপোলি পর্দায় চাক্ষুষ করেছেন বটে, কিন্তু তা বলে মাছ! অবাক হবেন না। গল্পের মতো শোনালেও এই মাছবৃষ্টি নিখাদ সত্যি। আমেরিকার হন্ডুরাসের মানুষজন এমনই অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন প্রতিবছর।

ক্যারিবিয়ন সাগরের নীল জলের তীরে অবস্থিত সবুজ এক দেশ হন্ডুরাস। প্রাচীন মায়া সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান। মধ্য আমেরিকার ছবির মতো সুন্দর সেই দেশ হান্ডুরাসের ইয়োরো শহরে এভাবেই প্রতিবছর আকাশ থেকে ঝরে পড়ে হাজারে হাজারে মাছ। প্রশ্ন হল, আকাশে মেঘের ভিতর এত মাছ আসে কী করে! তাছাড়া ইয়োরো শহর, যেখানে প্রতিবছর মাছ-বৃষ্টি হয়, তা কিন্তু মোটেও সমুদ্রের কাছে নয়। বরং সমুদ্র থেকে যোজন মাইল দূরে অবস্থিত। তবুও প্রতি বছর মে থেকে জুন মাসের মধ্যে কোন এক ভোজবাজিতে ঐ শহরের বুকেই  ঝরে পড়ে হাজারে হাজারে জ্যান্ত, মরা, আধমরা মাছ।

ইতিহাস বলছে হন্ডুরাসের বুকে প্রথম মাছ-বৃষ্টি হয়েছিল ১৮০০ সাল নাগাদ। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি কোনও এক বছরের মে কিংবা জুন মাসের একদিন আচমকাই প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হয় শহরে। তুমুল ধারায় বৃষ্টি আর বজ্রের গর্জনে সেবার কেঁপে উঠেছিল শহর। ঝড়বৃষ্টি থেমে যাবার পর শহরের লোকজন রাস্তায় বের হয়ে তো অবাক। অমন অকল্পনীয় অদ্ভুত দৃশ্য তাঁরা আগে কখনও দেখেনি। শহরের সব রাস্তাজুড়ে তখন লাফালাফি দাপাদাপি করছে জলজ্যান্ত অজস্র মাছ। একটা দুটো নয়, শত শত মাছের শরীর ঢেকে ফেলেছে পথঘাট! সেই শুরু… তারপর থেকে প্রতিবছর নিয়ম করে এই আশ্চর্য মাছ বৃষ্টি হয়েই চলেছে শহরের বুকে।

‘হন্ডুরাস’ আসলে একটা স্পেনিস শব্দ, যার অর্থ হল ‘গহীন’। এর স্প্যানিশ উচ্চারণ ‘ওন্দোরাজ’। ওই সময়ে ব্রিটিশ সম্রাজ্যে ‘হন্ডুরাস’ নামে আরও একটি দেশ থাকায় ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটাকে বলা হত স্পেনিশ হুন্ডুরাস। দীর্ঘদিন স্পেনের উপনিবেশ থাকার পরে ১৮২১ সাল নাগাদ স্বাধীনতা লাভ করে এই ছোট্ট দেশটি।

আদতে বেশ গরীব দেশ হন্ডুরাস। জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই দারিদ্র‍্য সীমার নিচে বাস করে। ভুট্টা আর মটর ছাড়া খাবার মতো কিছুই জোটে না তাদের। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো এই আকস্মিক মাছবৃষ্টি কিন্তু হন্ডুরাসের অনাহারে অর্ধাহারে থাকা মানুষগুলোর কাছে বেশ মজার ঘটনা। কিন্তু এই মাছ বৃষ্টির কারণ কী? লোকের মুখে মুখে নানান গল্প ঘুরে বেড়ালেও এই ঘটনার নিশ্চিত কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি… উলটে এর রহস্য খুঁজতে গিয়ে সম্ভাব্য অসম্ভাব্য নানা গল্পের জটিল গোলকধাঁধাঁয় ঘুরে মরেছে বিজ্ঞানীরা।

এই মাছবৃষ্টি হন্ডুরাসের গরীব মানুষগুলোর কাছে বেশ মজার ঘটনা

মাছবৃষ্টি নিয়ে ঐ এলাকার মানুষের মুখে মুখে ঘোরে নানান কাহিনি, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটা এক খ্রিষ্টান সন্ন্যাসীর। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি (১৮৫৬ সাল–১৮৬৪ সাল) সময়ে হন্ডুরাসে এসেছিলেন খ্রিস্ট ধর্মযাজক হোসে সুবিরানা। সেই সময়ে ওই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষেরই একেবারে দিন-আনি-দিন-খাই অবস্থা। খিদের জ্বালা আর দারিদ্র্য নিয়েই ছিল তাদের রোজকার জীবন। মানুষের এই দুর্দশা দেখে মন কেঁদে উঠল ঐ ধর্মযাজকের। মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন তিনি। হোসে সুবিরানার সেই প্রার্থনায় সাড়া দিয়েছিলেন পরম করুণাময় ঈশ্বর। তার পর থেকেই মানুষের খাবারদাবারের কষ্ট দূর করতে এভাবেই বছর বছর আকাশ থেকে ‘মাছের বৃষ্টি’ করেন ঈশ্বর। বহুল প্রচলিত হলেও এই ধরনের ধারণার যে কোনও বাস্তব যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি, সে তো বলাই বাহুল্য।

সন্ন্যাসীর ডাকে সাড়া দিলেন পরম করুণাময় ঈশ্বর

ফ্রান্সের প্রকৃতিবিজ্ঞানী এন্দ্রে মেরি এমপেরের মনে করেন, সামুদ্রিক ঝড়ের প্রভাবেই ঘটে এই মাছবৃষ্টি। আটলান্টিক মহাসাগরে প্রায়শই যেসব শক্তিশালী টর্নেডোর জন্ম হয়, সেই অসীম ক্ষমতাশালী ঘূর্ণি হাওয়া সমুদ্রের বুক থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসে এই মাছগুলো। মেঘের ভিতর জমে থাকা সেই মাছ বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ঝরে পড়ে ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হন্ডুরাসের ইয়োরো শহরের বুকে। এই তথ্যেও ফাঁকফোকর যথেষ্ট। প্রতিবছর একই সময় আটলান্টিক মহাসাগরে টর্নেডো আছড়ে পড়ে না। তাই ঝড়েই যদি সমুদ্র থেকে মাছ উঠিয়ে আনে, তাহলে প্রতিবছর কাছাকাছি একই সময়ে মাছবৃষ্টি হয় কী করে? তাছাড়া এলাকার মানুষজন একটা ব্যাপারে সহমত, ঝরে পড়া মাছগুলো মোটেও তাদের এলাকার মাছ নয়। তারা এ ধরনের মাছের খোঁজ কখনোই কাছে-পিঠে কোনও জলাশয়ে পায়নি। এতগুলো কাকতালীয় ঘটনা অনেকের মতেই একসঙ্গে ঘটা অসম্ভব। ফলে, মানুষের মনের মধ্যে আবারও অলৌকিকতার ব্যাখ্যা স্থান পেতে থাকে।

অসীম ক্ষমতাশালী ঘূর্ণি হাওয়া সমুদ্রের বুক থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসে এই মাছগুলো

১৯৭০ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের পক্ষ থেকে এক বিশেষ দল পাঠানো হয়েছিল হন্ডুরাসে। ওই দলের সদস্যরা ‘মাছের বৃষ্টি’র ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের ওই সদস্যরা জানান, ওই অঞ্চলে আকাশ থেকে বৃষ্টির সঙ্গে যে মাছগুলো ঝরে পড়ে, তারা নোনতা জলের সামুদ্রিক মাছ নয়। বরং সেগুলো মিষ্টি জলের মাছ। বেশিরভাগ মাছই একই প্রজাতির। যদিও ১৯৭০ সালে হন্ডুরাসে ‘মাছের বৃষ্টি’র সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সদস্যদল পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল কর্তৃপক্ষ।

মাছ বৃষ্টির পেছনে যে বৈজ্ঞানিক যুক্তি সবথেকে গ্রহনযোগ্যতা পেয়ছে তা হল একদম প্রাকৃতিক।বিজ্ঞানীদের মতে মাছ সমৃদ্ধ কোনো কম গভীরতার জলাশয়ের ওপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণিবায়ুর কেন্দ্র বয়ে গেলে জলঘূর্ণি ঘটতে পারে। এ সময় জলে থাকা মাছ, ব্যাঙ সহ সবকিছুই ঘূর্ণিবায়ুর সঙ্গে আকাশে উঠে যায়। আকাশে উঠে যাওয়ার পর ঝড়ের সঙ্গে অনেকদূরে চলে যেতে পারে এসব জলজ প্রাণীও। এমনকি এই জলঘূর্ণি থেমে যাওয়ার পরও মেঘের স্তরের কারণে এরা সাময়িকভাবে আটকে থাকতে পারে ওপরেই। আর ঝড়, জলঘূর্ণি থেমে গেলে মেঘের ভেতর থেকে ঝরে পড়তে শুরু করে জলজ প্রাণীগুলো।এই ধরনের মাছ বৃষ্টি শুধু হান্ডুরাসেই নয় সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডেও ঘটেছিল।কিন্তু এখানেও সেই প্রশ্ন ঘটনাস্থল থেকে জলাশয় অনেকটা দূরে অবস্থিত।

মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এমন ‘মাছ বৃষ্টি’ প্রতি বছরই হয় হন্ডুরাসের বিভিন্ন জায়গায়। স্থানীয়রা এই ঘটনাকে বলেন ‘জুভিয়া দে পেতেস’ (Lluvia de Peces)। স্প্যানিশ এই শব্দটির অর্থ হল ‘মাছের বৃষ্টি’। এইসময় আকাশ থেকে অঝোরে ঝরে পড়তে থাকে মাছ, স্কুইড, ব্যাঙ ও আরও কত কী! স্থানীয় মানুষজন বৃষ্টির সাথে পড়া মাছগুলোকে কুড়িয়ে নিয়ে বাড়ি যায় আর পরিবারের লোকজনের সঙ্গে একসাথে রান্না করে খায়। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবে শুধু খাওয়াদাওয়া নয়, নাচে-গানে, আমোদ আহ্লাদে মেতে ওঠে হন্ডুরসের মানুষ। এই মাছ ঝরে পড়ে এক একবার যে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে রীতিমতো লোক নামিয়ে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করাতে হয় এসময়।

হন্ডুরাসের এই মাছবৃষ্টির রহস্যভেদ হয়নি ঠিকই, তবে এই ধরনের মাছ বা প্রাণীদের বৃষ্টির নজির রয়েছে আরো অনেক দেশেই। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরের ২৩ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় মাছবৃষ্টি হয়। ১৩০ কিলোমিটারের চেয়েও লম্বা এলাকা। ১৯৯৫ সালের গিনেস বুক অব অডিটিসে এর উল্লেখ আছে। ১৯৮৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার ইপসউচ ও ১৯৬৬ সালে নর্থ সিডনিতেও মাছবৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৮৯ সালের বৃষ্টিতে ঝরে পড়েছিল ৮০০রও বেশি সার্ডিন মাছ।

You might also like