Latest News

আজও কেন দেবতার সম্মান পায়, গুরুভায়ুর মন্দিরের কৃষ্ণভক্ত হাতি ‘কেশবন’

রূপাঞ্জন গোস্বামী

কেরলের (Kerala) অংশে থাকা নীলগিরি পর্বতমালার নীচে, নীলাম্বুর তালুকে আছে চিরসবুজ নেদুমকায়াম অরণ্য। বিপদসংকুল অরণ্যটিতে বাস করে বাঘ, হাতি, হরিণ, গাউর, বাইসন, বুনো বিড়াল, শুয়োর, চিতাবাঘ, শকুন, মালাবার টিয়া, ধুসর ধনেশ সহ শত শত প্রজাতির পশুপাখি। অরণ্যের বুক চিরে শ্লথগতিতে বয়ে চলে শান্ত নদী ‘চালিয়ার’।

মাত্র এক শতাব্দী আগেও, নীলগিরি পর্বতের এই অংশের উপত্যকায় ছিল ‘নীলাম্বুর’ নামে এক সামন্ত রাজ্য । যে রাজ্যটি শাসন করতেন ভালিয়া রাজারা। চালিয়ার (Kerala) নদীর তীরে ছিল ভালিয়া রাজাদের কোভাইলাকম প্রাসাদ।

নীলাম্বুরের পাহাড় ও অরণ্যে বাস করত চোলানাইক্কার, আরানাদান, কাদার, আলার ও পানিয়ার উপজাতি (Kerala)। পশুশিকার ছিল যাদের জীবনধারণের একমাত্র উপায়। ভালিয়া রাজারা শিকার করতে যাওয়ার সময় তাই সঙ্গে নিতেন উপজাতীয় শিকারিদের।

Image - আজও কেন দেবতার সম্মান পায়, গুরুভায়ুর মন্দিরের কৃষ্ণভক্ত হাতি 'কেশবন'
চালিয়ার নদীর তীরে নেদুমকায়াম অরণ্য

বর্ষাকাল, ১৯১২ সাল (Kerala)

তৎকালীন ভালিয়া রাজার আদেশে, শিশু হাতি ধরার জন্য, নেদুমকায়াম অরণ্যে প্রবেশ করেছিল একদল চোলানাইক্কার শিকারি। হাতির মল অনুসরণ করে, দলটি একসময় পৌঁছে গিয়েছিল হাতির পালের কাছে। মানুষ দেখে হাতির পাল পালিয়েছিল নদীর দিকে। সাঁতরে পেরিয়ে গিয়েছিল বর্ষায় অশান্ত হয়ে ওঠা চালিয়ার নদী। হারিয়ে গিয়েছিল নদীর ওপারে থাকা ঘন অরণ্যে (Kerala)।

কিন্তু শিকারিদের ফাঁদে ধরা পড়ে গিয়েছিল ছ’সাত মাসের এক পুরুষ হস্তিশাবক। তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল ভালিয়া রাজার হাতিশালে। সেখানে থাকা ১১ টি দাঁতাল ও কুনকি হাতি আপন করে নিয়েছিল হস্তিশাবকটিকে।

প্রথম প্রথম ভীষণ কাঁদত হস্তিশাবকটি। মুখে তুলত না কোনও খাবার। হয়ত তার মন খারাপ করত মায়ের জন্য। কিন্তু কিছুদিন পরেই থেমে গিয়েছিল কান্না। মনের কোণে জমে উঠেছিল একরাশ ক্রোধ।

অত্যন্ত অবাধ্য হয়ে উঠেছিল হস্তিশাবকটি। তাকে পোষ মানাতে কালঘাম ছুটে গিয়েছিল অভিজ্ঞ মাহুতদের। তবে মাহুতদের শাণিত অঙ্কুশের আঘাত, হস্তিশাবককে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেছিল। তাই একসময় পায়ের শিকলকে গলার মালার মতই আপন করে নিয়েছিল হস্তিশাবকটি।

নীলাম্বুরের সামন্ত রাজাদের কোভাইলাকম প্রাসাদ

শুরু হয়েছিল মালাবার বিদ্রোহ (Kerala)

মালাবার জুড়ে, ১৯২১ সালে, ইংরেজ ও হিন্দু সামন্ত রাজাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিল মাপিল্লা মুসলিমেরা। প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রচুর মানুষ। বিদ্রোহের আঁচ এসে পড়েছিল নীলাম্বুর রাজ্যেও। রাজত্ব হারাবার ভয় গ্রাস করেছিল ভালিয়া রাজাকে। জগৎবিখ্যাত গুরুভায়ুর মন্দিরে ছুটে গিয়েছিলেন ভালিয়া রাজা।

ভক্তদের বিশ্বাস, ত্রিশূরের (ত্রিচূর) এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা। মর্তের বৈকুন্ঠ রূপে পরিচিত এই মন্দিরে বিরাজ করেন, চতুর্ভুজ শ্রীকৃষ্ণরূপী সর্বশক্তিমান দেবতা ‘গুরুভায়ুরাপ্পান’।

প্রভু গুরুভায়ুরাপ্পানের পদতলে লুটিয়ে ভালিয়া রাজা বলেছিলেন,”হে প্রভু, আমার রাজত্ব ও পরিবারকে রক্ষা করো। আমি তোমায় পায়ে উৎসর্গ করব আমার হাতিশালের সেরা হাতি। যে নিষ্ঠাভরে শুধু তোমারই সেবা করে যাবে চিরকাল।”

Image - আজও কেন দেবতার সম্মান পায়, গুরুভায়ুর মন্দিরের কৃষ্ণভক্ত হাতি 'কেশবন'
গুরুভায়ুর মন্দিরের পুরোনো ছবি

মন্দিরে ঠাঁই পেয়েছিল কেশবন (Kerala)

মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়েছিল ভালিয়া রাজার। কিছুদিন পর থেমে গিয়েছিল বিদ্রোহ। প্রায় অলৌকিকভাবে বিদ্রোহের আগুন থেকে বেঁচে গিয়েছিল নীলাম্বুর রাজ্য। প্রতিজ্ঞা রেখেছিলেন রাজা। ১৯২২ সালের জানুয়ারি, গুরুভায়ুরাপ্পানের সেবার জন্য মন্দির কতৃপক্ষের হাতে ভালিয়া রাজা তুলে দিয়েছিলেন ১০ বছরের একটি পুরুষ হাতি। যেটিকে শিশু অবস্থায় ধরা হয়েছিল নেদুমকায়াম অরণ্য থেকে।

গুরুভায়ুর মন্দিরের নাম্বুদিরি পুরোহিতেরা হাতিটির নাম রেখেছিলেন ‘কেশবন’। হাতিকে রাখা হয়েছিল মন্দিরের হাতিশালা ‘পুন্নাথুরকোট্টা’ প্রাসাদে। সেখানে বাস করত আরও ৫৮ টি হাতি।

কেশবন

কিন্তু ক’দিনের মধ্যেই কেশবনের দৌরাত্মে অস্থির হয়ে উঠেছিল হাতিশালার হাতি ও মাহুতেরা। বাধ্য হয়ে কেশবনকে দীক্ষা দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত।

এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দীক্ষা দেওয়া হয়েছিল কেশবনকে। দীক্ষা গ্রহণের পর থেকেই সব বিষয়ে অদ্ভুত নির্লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল উদ্ধত কেশবন।

‘আনায়োট্টম’ বিজয়ী ‘কেশবন’

প্রত্যেক বছর কুম্ভম (ফেব্রুয়ারি/মার্চ) মাসে গুরুভায়ুর মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় দশ দিনের ‘উৎসভম’। উৎসবটির প্রথম দিনে হয় হাতিদের দৌড় প্রতিযোগিতা ‘আনায়োট্টম’। প্রতিযোগিতায় জয়ী হাতিটি সেই বছর পায় এক বিশেষ সম্মান। মন্দিরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে, প্রভু গুরুভায়ুরাপ্পানের প্রতিকৃতি (থিডাম্বু) মাথায় করে মন্দির প্রদক্ষিণ করার সম্মান।

বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের গোড়া থেকেই ‘আনায়োট্টম’ জিতে নিত ‘আখোরি গোবিন্দন’ নামের এক দাঁতাল হাতি। গোবিন্দনের দৌড় দেখার জন্য মুখিয়ে থাকত কেরল (Kerala)। কেশবন ১৯৩০ সালে নেমেছিল এই প্রতিযোগিতায়। উপস্থিত জনতাকে অবাক করে, ১৮ বছরের কেশবন হারিয়ে দিয়েছিল আখোরি গোবিন্দনকে। ছিনিয়ে নিয়েছিল ‘থিডাম্বু’ বহনের অধিকার।

Image - আজও কেন দেবতার সম্মান পায়, গুরুভায়ুর মন্দিরের কৃষ্ণভক্ত হাতি 'কেশবন'
হাতিদের দৌড় প্রতিযোগিতা ‘আনায়োট্টম’

উৎসবের দ্বিতীয় দিন সকালে, হাতিশালা থেকে মন্দিরে নিয়ে আসা হয়েছিল সাড়ে দশফুট উচ্চতার কেশবনকে। কেশবনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। তাঁর হাতে ছিল ভগবান গুরুভায়ুরাপ্পানের পবিত্র প্রতিকৃতি।

উপস্থিত ভক্তবৃন্দকে অবাক করে, নিজে থেকেই সামনের পা দুটো মুড়ে, মাথা নিচু করেছিল কেশবন। সেই প্রথম প্রধান পুরোহিতকে চড়তে হয়নি মই। মাটিতে দাঁড়িয়েই কেশবনের মাথায় পুরোহিত স্থাপন করেছিলেন পবিত্র থিডাম্বু।

গুরুভায়ুরাপ্পানের প্রতিকৃতি মাথায় স্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছিল কেশবন। অন্য পুরোহিতদের পবিত্র ছাতা ও পাখা ওঠাবার সুযোগই দেয়নি সে। যেন প্রভু শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কারও কাছে মাথা নত করবে না কেশবন। বাধ্য হয়ে পবিত্র ছাতা ও পাখা নিয়ে, মইয়ে চড়ে কেশবনের পিঠে উঠেছিলেন মাহুত।

থিডাম্বু মাথায় কৃষ্ণভক্ত কেশবন

শুরু হয়েছিল সেদিনের শোভাযাত্রা। মাথা উঁচু করে রাজকীয় ভঙ্গিতে চলতে শুরু করেছিল কেশবন। প্রদক্ষিণ করেছিল মন্দির প্রাঙ্গণ। মাথা নিচু করেনি এক মুহূর্তের জন্যেও। শুধু সেদিনই নয়, এরপর থেকে আর কোনওদিন, প্রভু ও তাঁর প্রতিকৃতি ছাড়া কারও কাছে মাথা নত করেনি কেশবন।

সেই শুরু। তারপর থেকে প্রত্যেক বছর ‘আনায়োট্টম’ জিতে নিত কেশবন। যুগের পর যুগ ধরে, নিজের যোগ্যতায় আদায় করে নিত, পবিত্র থিডাম্বু বহনের অধিকার।

কেশবন হয়ে উঠেছিল কিংবদন্তির নায়ক

কেশবনের বিস্ময়কর কাহিনিগুলি ছড়িয়ে পড়েছিল কেরলের কোণে কোণে। একবার কেশবনকে অন্যান্য হাতিদের সঙ্গে পাঠানো হয়েছিল অরণ্যে। গাছের গুঁড়ি মন্দিরে বয়ে আনার জন্য।

অরণ্যে পৌঁছে কেশবন বুঝতে পেরেছিল, তাকে দিয়েও বওয়ানো হবে গুঁড়ি। সুযোগ বুঝে নিঃশব্দে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল কেশবন। তিরিশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে চলে এসেছিল মন্দিরে। একেবারে একা। হ্যাঁ, মাহুত ছাড়াই।

পুরোহিতেরা বুঝেছিলেন, গুঁড়ি বওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি কেশবন। শ্রীকৃষ্ণের সেবাকেই তার একমাত্র ধর্ম ও কর্ম বলে মনে করে সে। এরপর থেকে কেশবনকে অন্য কোনও কাজে ব্যবহার করা হয়নি কোনওদিন।

Image - আজও কেন দেবতার সম্মান পায়, গুরুভায়ুর মন্দিরের কৃষ্ণভক্ত হাতি 'কেশবন'
পুজোর সময় মন্দিরে হাজির হতকেশবন

মন্দির থেকে ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসলেই চঞ্চল হয়ে উঠত কেশবন। মাহুত তাকে মন্দিরে নিয়ে গেলে, শান্ত হয়ে যেত সে। একবার ঘণ্টা বাজার পরেও মাহুত না আসায়, মন্দিরের দিকে একাই ছুটেছিল কেশবন।

কেশবনকে রাস্তা দিয়ে ছুটে আসতে দেখে পালিয়ে গিয়েছিল সবাই। পালাতে পারেননি কুষ্ঠরোগে পা হারিয়ে ফেলা এক ভিক্ষুক। এক ভয়ঙ্কর দৃশ্যের আশঙ্কায় চোখ বুজে ফেলেছিল জনতা।

অসহায় ভিক্ষুকটির সামনে এসে থেমে গিয়েছিল কেশবন। শুঁড়ে করে ভিক্ষুকটিকে তুলে রাস্তার এক পাশে নামিয়ে দিয়েছিল। তারপর হেলতে দুলতে এগিয়ে গিয়েছিল মন্দিরের দিকে।

Kerala
আরাধ্য দেব গুরুভায়ুরাপ্পানের সেবাদাস হয়ে গিয়েছিল কেশবন

কেশবনের অজস্র কাহিনি আজও গাঁথা আছে ভক্তদের হৃদয়ে। একবার থিডাম্বু নিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করছিল কেশবন। ঠেলাঠেলির কারণে এক মহিলার কোল থেকে ছিটকে গিয়েছিল বছর খানেকের শিশু। ছিটকে গিয়ে পড়েছিল কেশবনের পায়ের নিচে।

সেই মুহূর্তেই এগোবার জন্য পা তুলেছিল কেশবন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে তুলে নেওয়া পা আর নামায়নি। পিছিয়ে গিয়েছিল সেই অবস্থাতেই। অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে গিয়েছিল শিশুটি।

শুধু মন্দির নয়, রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসার সময় গুরুভায়ুরাপ্পানের ছবি বা মূর্তি দেখলেই দাঁড়িয়ে পড়ত কেশবন। সামনের পা দুটি মুড়ে, মাথা নিচু করে, শুঁড়টা বিছিয়ে দিত সামনে। যেন সে তার প্রভুকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানাতে চায়। নিখাদ ভক্তির জন্য ভক্তদের কাছে ধীরে ধীরে ভগবানে পরিণত হয়েছিল কৃষ্ণভক্ত কেশবন।

Image - আজও কেন দেবতার সম্মান পায়, গুরুভায়ুর মন্দিরের কৃষ্ণভক্ত হাতি 'কেশবন'
প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে কৃষ্ণভক্ত কেশবন

প্রভু তার একার

প্রভুর সেবাদাস হিসেবে মন্দিরে পঞ্চাশ বছর কাটানোর পর, ১৯৭৩ সালে কেশবনকে দেওয়া হয়েছিল ‘গজরাজন’ উপাধি। কেশবনের নাম হয়েছিল ‘গজরাজন গুরুভায়ুর কেশবন’।

তবে কালের নিয়মে বয়স থাবা বসিয়েছিল হাতিদের প্রধান কেশবনের শরীরে। মন্দির কতৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, দৌড় প্রতিযোগিতায় আর নামানো হবে না কেশবনকে। থিডাম্বুর বহনের অধিকার দেওয়া হবে দৌড় প্রতিযোগিতায় জয়ী নতুন কোনও হাতিকে।

সেই বছর দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করার জন্য, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় মাহুতদের সাথে পৌঁছে গিয়েছিল হাতির দল। গজরাজন কেশবন মহারাজকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন ভক্তবৃন্দ।

হঠাৎ হাতিশালা থেকে ভেসে এসেছিল শেকল ভাঙার শব্দ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ বাতাস মুখরিত হয়েছিল সমবেত জনতার উল্লাসধ্বনিতে। বাকরুদ্ধ হয়ে সবাই দেখেছিলেন, প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই, চুনের দাগে দাঁড়িয়ে পড়েছে মাহুতবিহীন কেশবন।

কেশবনের নাছোড়বান্দা মনোভাব দেখে, তাকে প্রতিযোগিতায় নামার অনুমতি দিয়েছিল মন্দির কতৃপক্ষ। মাহুত গিয়ে বসেছিলেন কেশবনের পিঠে। শুরু হয়েছিল প্রতিযোগিতা। সর্বশক্তি একত্রিত করে ছুটতে শুরু করেছিল বৃদ্ধ কেশবন। হাঁটুর বয়সি ৫৪ টি হাতিকে হারিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিল ৬১ বছরের কেশবন। প্রথম হতে না পারায়, হারিয়েছিল থিডাম্বু বহনের অধিকার।

পরদিন সকালে জয়ী হাতিটির মাথায় থিডাম্বু বসানোর তোড়জোড় চলছিল। হঠাৎই সেখানে উপস্থিত হয়েছিল কেশবন। ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছিল জয়ী হাতিটিকে। সামনের পা দুটো মুড়ে মাথা নিচু করেছিল। যেন সে বলতে চাইছিল, “প্রভুর তার একার। প্রভুর প্রতিকৃতি বহন করার অধিকার নেই অন্য কোনও হাতির।”

হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও সেদিন নড়ানো যায়নি কেশবনকে। জয়ী হাতিটির মাথায় থিডাম্বু বসাতে দেয়নি কেশবন।
পুরোহিতেরা বলেছিলেন, “কেশবনের ইচ্ছাই হয়ত প্রভুর ইচ্ছা। আমরা বাধা দেওয়ার কে!”

এরপর থেকেই কেশবনকেই পাকাপাকিভাবে দেওয়া হয়েছিল থিডাম্বু বহনের অধিকার। তবে বন্ধ করা হয়নি চিরাচরিত ‘আনায়োট্টম’। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাতিটি শোভাযাত্রার সময় হাঁটত কেশবনের পিছনেই।

Kerala
ভেঙ্গে যাচ্ছিল শরীর, এগিয়ে আসছিল সময়

শ্রীকৃষ্ণে বিলীন হয়ে গিয়েছিল শুদ্ধ আত্মা কেশবন

গুরুভায়ুর মন্দিরের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় মালয়ালম বর্ষপঞ্জিকার ‘বৃশ্চিকম’ (ডিসেম্বর) মাসের গুরুভায়ুর একাদশীতে। সেদিন মন্দিরে উদয় থেকে অস্ত পর্যন্ত চলে ‘উদয়াস্থামা’ পূজা।

১৯৭৬ সালে গুরভায়ুর একাদশী তিথি পড়েছিল ২ ডিসেম্বর। সকাল সাতটার সময় কেশবনের মাথায় বসানো হয়েছিল থিডাম্বু। শুরু হয়েছিল পাঁচটি হাতির শোভাযাত্রা। সবার আগে ছিল গজরাজন কেশবন।

কিছুটা পথ এগিয়েই কাঁপতে শুরু করেছিল কেশবন। থেমে গিয়েছিল শোভাযাত্রা। কেশবনের মাথা থেকে দেবতার প্রতিকৃতি নামিয়ে বসানো হয়েছিল পরবর্তী হাতিটির মাথায়। কেশবনের চোখ থেকে তখন বৃষ্টি ধারার মত ঝরে পড়ছিল অশ্রু।

Image - আজও কেন দেবতার সম্মান পায়, গুরুভায়ুর মন্দিরের কৃষ্ণভক্ত হাতি 'কেশবন'

এরপর সবাইকে হতবাক করে, কাঁপতে থাকা শরীর নিয়েই সবার আগে মন্দির প্রদক্ষিণ করেছিল কেশবন। থিডাম্বু ছাড়াই। তারপর চলে গিয়েছিল মন্দিরের সেই স্থানে, যেখানে তাকে বেঁধে রাখা হত।

সে বছরের ‘আনায়োট্টম’ জিতে নেওয়া হাতিটি থিডাম্বু নিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করার পর, আকাশ কাঁপিয়ে বেজে উঠেছিল শঙ্খ, কাঁসর, ঘন্টা। শুরু হয়েছিল প্রভু শ্রীকৃষ্ণের বিশেষ পূজা।

ঠিক সেই মুহূর্তেই, মন্দিরের গর্ভগৃহের দিকে মুখ করে, হাতিশালার মেঝেতে বসে পড়েছিল কেশবন। পায়ের ওপর কাঁপতে থাকা মাথাটি রেখে, এগিয়ে দিয়েছিল শুঁড়। প্রভু গুরুভায়ুরাপ্পানকে জানিয়েছিল তার শেষ প্রনাম। তারপর চিরকালের জন্য বৈকুণ্ঠলোকের নীলাভ কুয়াশায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল গজরাজন গুরুভায়ুর কেশবন।

মূর্তি হয়ে আজও থিডাম্বুকে অভিবাদন জানায় গজরাজন গুরুভায়ুর কেশবন (ডানদিকে)

আরও পড়ুন: তিন বছর অন্তর বাড়ি ফেরে পূর্বপুরুষদের মমি, ঘুরে বেড়ায় গোটা গ্রাম

আরও পড়ুন: হঠাৎ করে খুব পেটে ব্যথা, মোচড় দিচ্ছে? ঘরোয়া উপায়ে কমিয়ে ফেলুন

You might also like