Latest News

দৃষ্টি হারাতে চলেছে তিন সন্তান, তার আগেই বিশ্ব দেখাতে বেরিয়েছেন কানাডার দম্পতি

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বিশ্বকে তখন গ্রাস করতে শুরু করেছিল করোনা অতিমারী। প্রাণ হারাচ্ছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। ঠিক সেই সময়, কানাডার মন্ট্রিলের এডিথ ও সেবাস্টিয়ানের মনে গ্রাস করেছিল করোনার থেকেও ভয়াবহ এক আতঙ্ক। তাঁরা লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁদের চার সন্তানের মধ্যে মিয়া (), কলিন () ও লরেন্ট (), অল্প আলোয় কিছুই দেখতে পায় না। দ্বিতীয় সন্তান লিও’র () অবশ্য সে সমস্যা ছিল না। তবুও আতঙ্কিত দম্পতি চার সন্তানকেই নিয়ে গিয়েছিলেন চিকিৎসকের কাছে।

সন্তানদের পরীক্ষা করে চিকিৎসক দিয়েছিলেন এক মর্মান্তিক তথ্য। লিও ছাড়া বাকি তিন সন্তান হারাতে চলেছে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি। মিয়া, কলিন ও ছোট্ট লরেন্টের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিরল জিনগত রোগ রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা (retinitis pigmentosa)। তাদের রেটিনায় থাকা কোষগুলি দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করেছে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, এই মুহুর্তে এই রোগের কোনও চিকিৎসা নেই এবং রোগ যেভাবে ডালপালা মেলছে, তিরিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই মিয়া, কলিন ও লরেন্টের চোখের সামনে নেমে আসবে ঘন অন্ধকার।

world tour
বাম দিক থেকে, মিয়া, লিও, এডিথ, কলিন, সেবাস্টিয়ান ও লরেন্ট

চিকিৎসকের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন এডিথ ও সেবাস্টিয়ান। তাঁরা ভাবতে পারছিলেন না প্রিয় সন্তানদের চোখের সামনে থেকে চিরতরে মুছে যাবে পৃথিবীর সব আলো। বাবা মায়ের মুখ আর দেখতে পাবে না তারা। চিকিৎসকেরা দম্পতিকে বলেছিলেন, এই পৃথিবীতে দৃষ্টি হারিয়েও সফল হয়েছেন বহু মানুষ। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার লিখে গিয়েছিলেন ইলিয়াড ও ওডিসি। দৃষ্টিহীন হয়েও বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিলেন লুই ব্রেল, হেলেন কেলার সহ আরও কত বিশ্ববরেণ্য মানুষ।

তবুও থামেনি দম্পতির কান্না। চিকিৎসকেরা বলে চলেছিলেন, “আপনাদের এখন একটা কাজই করতে হবে। এই তিন সন্তান দৃষ্টি হারানোর আগেই যতটা পারেন চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করুন তাদের। ছবির বই কিনে আনুন। ছবির মাধ্যমে সন্তানদের দেখিয়ে দিন বিভিন্ন দেশ, পাহাড়, পর্বত, নদী, অরণ্য, মরুভূমি ও বিখ্যাত স্থাপত্যগুলিকে। চিনিয়ে দিন পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ ও তাঁদের সংস্কৃতিকে। যাতে দৃষ্টিশক্তি হারালেও স্মৃতিতে থেকে যায় পৃথিবীর রূপ ও রঙ।”

সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন দম্পতি। বাগানে খেলতে থাকা মিয়া, কলিন ও লরেন্টের নিষ্পাপ মুখগুলির দিকে তাকিয়ে নিয়েছিলেন এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার আগেই তিন সন্তানকে দেখাবেন পৃথিবী। তবে বইয়ের পাতায় নয়। ভ্রমণের থেকে চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা দেওয়ার ভাল পদ্ধতি নেই। তাই সন্তানদের নিয়ে বেরোবেন বিশ্ব ভ্রমণে (world Tour)। পৃথিবীর রঙ, রূপ, শব্দ, গন্ধ স্মৃতির মণিকোঠায় সাজিয়ে রাখবে সন্তানেরা। দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলার আগেই।

দম্পতি তাঁদের সন্তানদের নিয়ে পথে নামবেন ভেবেছিলেন ২০২০ সালেই। কিন্তু বিশ্বগ্রাসী করোনার কারণে বিশ্বজুড়েই বন্ধ ছিল বিমান পরিষেবা। তাই দম্পতিকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় দুই বছর। এই দুই বছর দম্পতি তিলে তিলে জমিয়েছিলেন টাকা। বিক্রি করে দিয়েছিলেন বাড়ির সমস্ত দামী আসবাবপত্র ও অলঙ্কার।

কানাডার যানবাহন পরিষেবা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল ২০২১ সালে। জুলাই মাসে চার সন্তানকে নিয়ে পথে নেমেছিলেন দম্পতি। ঘুরতে শুরু করেছিলেন পূর্ব কানাডার বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে। সন্তানদের দেখিয়েছিলেন নায়াগ্রা ফলস, থাউজ্যান্ড আইল্যান্ড, অক্স মিডো ও গ্রস মোর্নে ন্যাশনাল পার্ক। প্রকৃতি মায়ের কোলে অনাবিল আনন্দে মেতে উঠেছিল সন্তানেরা। সব কিছু লিখে রাখছিল ডায়েরির পাতায়। যে ডায়েরি ভবিষ্যতে পড়তেও পারবে না তারা। তবে চোখে দেখা দৃশ্যগুলি চিরকালের জন্য অমলিন হয়ে থাকবে তাদের স্মৃতিতে।

Image - দৃষ্টি হারাতে চলেছে তিন সন্তান, তার আগেই বিশ্ব দেখাতে বেরিয়েছেন কানাডার দম্পতি

পরের বছরই সন্তানদের নিয়ে দম্পতি বেরিয়েছিলেন বিশ্ব ভ্রমণে। শুরু করবেন ভেবেছিলেন রাশিয়া ও চিন দিয়ে। সন্তানদের দেখাবেন উত্তর সাইবেরিয়ার ডলগ্যান উপজাতি। ডলগ্যানদের বল্গা হরিণে টানা চলমান বাড়িগুলিতে থাকবে মিয়া, লিও, কলিন ও লরেন্ট। ভেবেছিলেন সন্তানদের দেখাবেন চিনের প্রাচীর ও তাকলা মাকান মরুভূমি। কিন্তু করোনার কারণে তখনও বন্ধ ছিল রাশিয়া ও চিনের বিমান পরিষেবা। তাই পাল্টাতে হয়েছিল সিদ্ধান্ত।

বাড়ির টিভিতে সারাদিন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল চালিয়ে রাখত বাচ্চারা। অবাক চোখে দেখত আফ্রিকার অরণ্য ও উপজাতিদের। তাই দম্পতি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আফ্রিকাই হবে তাঁদের প্রথম গন্তব্যস্থল। কোথায় কোথায় যাবেন, তা আফ্রিকায় পৌঁছে ঠিক করবেন। তবে কোনও ট্যুর কোম্পানির প্যাকেজ নেবেন না। নিজেরাই ঘুরবেন। ২০২২ সালের মার্চ মাসে সন্তানদের নিয়ে দম্পতি চলে গিয়েছিলেন নামিবিয়া।

প্রায় তিন মাস ধরে পরিবারটি ঘুরে বেড়িয়েছিল নামিবিয়া, কেনিয়া, জাম্বিয়া ও তানজানিয়ার পাহাড়, সমুদ্র, হ্রদ ও অরণ্যে। হুড খোলা জিপ থেকে সন্তানেরা দেখেছিল সিংহ, চিতা, হাতি, জিরাফ ও আরও কত পশুপাখি। দেখেছিল কিলিমাঞ্জারো পর্বতের দুধসাদা চূড়া। মাসাইদের গ্রামে গিয়ে কাটিয়েছিল এক বেলা। নৌকা ভাসিয়েছিল লেক টাঙ্গানিকার নীল জলে।

নামিবিয়ায় চার ভাইবোন

তবে দম্পতি সন্তানদের নিয়ে আফ্রিকা ঘুরেছেন, বিমান বা বিলাসবহুল সেডানে চড়ে নয়। তাঁরা ঘুরে বেড়িয়েছেন বাস, ট্রেন ও ট্যাক্সিতে চড়ে। খেয়েছেন অতিসাধারণ খাবার। থেকেছেন মফঃস্বলের সাধারণ হোটেলে। যে এলাকাগুলিতে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দশ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না। জল আসে দিনে একবার। স্কুলে যায় না স্থানীয় ছেলেমেয়েরা। রাস্তার পাশে বসে বেচে অরণ্য থেকে কুড়িয়ে আনা ফলমূল।

দম্পতি তাঁদের সন্তানদের বলেছিলেন, “এটাই পৃথিবীর আসল চেহারা। যে চেহারা তোমরা দেখোনি। ভেবে দেখো, এই সব শিশুদের তুলনায় তোমরা কত ভালো আছো। তোমাদের থেকেও কত কষ্ট নিয়ে বাঁচছে এই পৃথিবীর কোটি কোটি শিশু। বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছে দিনের প্রত্যেকটি মুহূর্ত।” এইভাবেই সন্তানদের শিখিয়েছিলেন, নিজেদের দুঃখকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুঃখ না ভাবতে।

Image - দৃষ্টি হারাতে চলেছে তিন সন্তান, তার আগেই বিশ্ব দেখাতে বেরিয়েছেন কানাডার দম্পতি
মঙ্গোলিয়ায় , যাযাবরদের তাঁবুতে

আফ্রিকায় চার মাস কাটানোর পর সন্তানদের নিয়ে এডিথ ও সেবাস্টিয়ান চলে গিয়েছিলেন তুরস্কের আনাতোলিয়া বা এশিয়া মাইনরে। সন্তানেরা দেখেছিল আঙ্কারা দুর্গ, লেক তুজ, মেভলানা মিউজিয়াম, রোমান বাথ-সহ আরও অনেক কিছু। তুরস্ক থেকে পরিবারটি চলে গিয়েছিল মঙ্গোলিয়া। গোবি মরুভূমিতে রাত কাটিয়েছিল মিয়া, লিও, কলিন ও লরেন্ট। যাযাবরদের তাঁবুতে। পান করেছিল উটের দুধ। ডুবতে থাকা সূর্যের দিকে ছুটিয়েছিল ঘোড়া।

মাসের পর মাসে ধরে চলা ক্লান্তিকর ভ্রমণ মিয়া, কলিন ও লরেন্টকে নিঃশব্দে শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে লড়তে হবে নির্মম ভবিষ্যতের সঙ্গে। তাই এখন ওরা খিদে চেপে রাখতে পারে। গাড়ি বা বাস না পেলে হাঁটতে পারে মাইলের পর মাইল। রাত কাটাতে পারে খোলা আকাশের নিচে। ওরা বুঝে নিয়েছে যে কোনও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও বেঁচে নেওয়া যায়। সমস্যার সমাধানটা কেবল খুঁজে নিতে হবে।

আমরা করব জয়, নিশ্চয়

এই মুহূর্তে পরিবারটি আছে ইন্দোনেশিয়ায়। টাকা শেষ হওয়ার আগে দেশে ফিরবেন না, পণ করেছেন এডিথ ও সেবাস্টিয়ান। মিয়া, লিও, কলিন ও লরেন্ট এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে বালির দ্বীপে দ্বীপে। এরপর তারা যাবে পাপুয়া ও নিউগিনি। দেশে ফেরার আগে দেখতে চায় ভারতকেও। সন্তানদের তাজমহল দেখার সাধ মেটাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এডিথ ও সেবাস্টিয়ান।

কারণ ফুরিয়া আসা দৃষ্টি দিয়ে যা দেখছে তিন সন্তান, সেসব রয়ে যাবে সন্তানদের মনের মণিকোঠায়। চোখের সামনে ঘন অন্ধকার নেমে এলে, মন খুলে দেবে স্মৃতির রত্নভাণ্ডার। অন্ধকারে একে একে ভেসে উঠবে কিলিমাঞ্জারো, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, গোবি মরুভূমি, লেক টাঙ্গানিকা, তাজমহল। জীবনকে তখন আর অপূর্ণ বলে মনে হবেনা মিয়া, কলিন ও লরেন্টের। তবুও প্রতি রাতে, বালির কোনও সস্তা হোটেলে, সন্তানদের নিয়ে শুয়ে থাকা এডিথ ও সেবাস্টিয়ান ভাবেন, বিজ্ঞান কি ঘটাবে না কোনও মিরাকল, সন্তানদের চোখের আলো নিভে যাওয়ার আগে!

Image - দৃষ্টি হারাতে চলেছে তিন সন্তান, তার আগেই বিশ্ব দেখাতে বেরিয়েছেন কানাডার দম্পতি

আরও পড়ুন: দৃষ্টিহীন বলে পড়তে দেওয়া হয়নি ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষকপুত্র আজ পাঁচশো কোটির মালিক

You might also like