Latest News

মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া গাঁয়ে অসাধ্যসাধন, মেয়েদের স্বপ্নপূরণে কী করেছিলেন এই মহিলা?

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: মেয়েদের পড়াশোনার হাল এ দেশে কেমন তা আর নতুন করে বলে দিতে হয় না। ২০১১ সালের জনগণনা বলছে ভারতের মাত্র ৬৫% মেয়ে লিখতে পড়তে পারে। এই শিক্ষিত মেয়েদের অধিকাংশই আবার থাকেন শহরে, বিশেষত মেট্রোসিটিগুলোয়। কোভিড পরবর্তী সময়ে স্কুল কলেজের অনিশ্চয়তায়, অনলাইন পড়াশোনার চাপে সেই সংখ্যাটা যদি আরও কমে যায়, অবাক হওয়ার কিছু নেই। অবশ্য শুধু এ দেশেই নয়, গোটা পৃথিবীর পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষরের সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই মহিলা।

Image - মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া গাঁয়ে অসাধ্যসাধন, মেয়েদের স্বপ্নপূরণে কী করেছিলেন এই মহিলা?

ছোট থেকেই নিজেদের অক্ষম, পরনির্ভরশীল ভাবতে শুরু করে মেয়েরা। আর সেই অক্ষমতার পাঠ তারা পায় পরিবার থেকেই। নিজের মা ঠাকুমা দিদিমাদের অসহায়তাই দিনের পর দিন তাদের কচি মনে ছায়া ফেলে যায়। গ্রামীণ ভারতে এখনও এই বিশ শতকেও মেয়েদের ‘পরায়ে ধন’ বলে উপেক্ষা করা হয়। নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে কোথাও কুপিয়ে দেওয়া হয় কব্জি- আঙুল, কোথাও বা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় মেরুদণ্ডটাই।

প্রতিকূলতা বুকেই জেগে ওঠে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। পরিশ্রম তো ঘরে বাইরে করতেই হয় মেয়েদের। কিন্তু পরিশ্রমের বিনিময়ে যে উপার্জন করাও যায়, আর সেই নিজস্ব টাকা সঞ্চয় করে যে নিজের স্বপ্নগুলো ছোঁয়া যায়- এই সত্যিটা এখনও এ দেশের অনেক মেয়ে জানে না। এমনই কিছু মেয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বদলে দিয়েছিলেন তাদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা, আগামীকে। তাঁরই চেতনার রঙে উজ্জ্বল হয়েছে অনেক অনেক পিছিয়ে পড়া মেয়ের ললাট। তিনি চেতনা সিংহ (Chetna Sinha)। গ্রামের মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিয়ে আসতে আজীবন প্রাণপণ লড়ে গেছেন এই দৃঢ়চেতা নারী। কেমন ছিল সেই লড়াই! জানব আজ…

Image - মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া গাঁয়ে অসাধ্যসাধন, মেয়েদের স্বপ্নপূরণে কী করেছিলেন এই মহিলা?

৬৩ বছর বয়সী চেতনার জন্ম ১৯৫৯ সালে, আজকের মুম্বাইয়ে। ১৯৮২ সাল নাগাদ বম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমার্স এবং ইকোনমিকসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন চেতনা। পড়াশোনার পাশাপাশি সমকালীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিও খুব মনোযোগী ছিলেন চেতনা। সত্তর ও আশির দশকে বড় হয়ে ওঠার ফলে একরকম চোখের সামনেই দেখেছেন স্বাধীনতা-পরবর্তী সমস্যা আর স্বপ্নভঙ্গের খতিয়ান, দেখেছেন জরুরি অবস্থা। সমাজসেবার ঝোঁক বরাবরই, সেই সূত্রে কমবয়সেই আকৃষ্ট হয়ে পড়েন জয়প্রকাশ নারায়ণের সাম্যবাদী রাজনীতির প্রতি। স্নাতকোত্তরের পড়া শেষ করে চাকরিজীবনে ঢুকলেন বটে, কিন্তু তাতে মন বসল না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল সমাজসেবা। নতুন কিছু করে দেখানোর তাগিদ থেকেই শহুরে স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে বদলি নিলেন পশ্চিম মহারাষ্ট্রের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। (Chetna Sinha)

পশ্চিম মহারাষ্ট্র খরাপ্রবণ এলাকা, চাষবাস একেবারে হয় না বললেই চলে। দারিদ্র্য, অপুষ্টি আর অশিক্ষা গ্রাস করেছে মানুষগুলোকে। আর্থিক সমস্যার পাশাপাশি রয়েছে বঞ্চনা আর নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস। অলাভজনক চাষবাস ছেড়ে সেখানকার মহিলারা ব্যবসা করতে চাইলেও অর্থাভাবে তা হয়ে উঠত না। ঋণ তো দূরস্থান, গ্রাম সমাজে কেউ ন্যূনতম সম্মানটুকুও দিতে চাইত না মেয়েদের। স্বামী, পরিবারের বাইরে আলাদা কোনও পরিচিতি যে থাকতে পারে মেয়েদের, সেটাই যেন অবিশ্বাস্য ছিল। জীবিকা নেই, আত্মবিশ্বাস নেই, ভবিষ্যৎও নেই। এই মেরুদণ্ড-ভাঙা মেয়েগুলোর পাশে সেদিন এসে দাঁড়িয়েছিলেন চেতনা। তাদের না-পাওয়া স্বপ্নগুলোর কথা মাথায় রেখেই তিনি তৈরি করতে চেয়েছিলেন এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে শেখাবে মেয়েদের।

Image - মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া গাঁয়ে অসাধ্যসাধন, মেয়েদের স্বপ্নপূরণে কী করেছিলেন এই মহিলা?

চেতনা দেখেছিলেন, সংসার চালানোর জন্য উদয়াস্ত কঠোর পরিশ্রম করে যায় গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা। তারই ফাঁকে ফাঁকে চেষ্টা করে তিল তিল করে দুচার পয়সা জমিয়ে নিজেদের আর্থিক স্বাধীনতা গড়ে তোলার। কিন্তু সারাদিন হাড়ভাঙা খেটে যে সামান্য পুঁজিটুকু জমে, সেটুকুও বাঁচিয়ে রাখতে পারে না অনেকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওই সামান্য টাকাটুকুই তাদের মদ্যপ স্বামীরা মারধোর করে কেড়ে নেয়। বাড়ির লোকের হাত থেকে নিজের উপার্জনের টাকা ক’টা বাঁচাতে ব্যাঙ্কে জমা রাখার কথাও ভাবতে পারে না তারা। শিক্ষার অভাবে ব্যাঙ্কের বাবুদের কাছে যেতে ভয় পায় গ্রামের মেয়েরা।

আর তাছাড়া প্রতিদিনের যা সামান্য রোজগার সেই ব্যাঙের আধুলি অনেকসময় জমা রাখতেও চায় না ব্যাঙ্ক। কোনও মহিলা যদি কিছু টাকা জমিয়েও ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ব্যাংকের কাছে লোনের আবেদন করে তাতেও ব্যাংক লোন দিতে রাজি হয় না। ফলে গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেও স্বাবলম্বী হতে পারে না, বা বলা ভালো, সমাজ তাকে স্বাবলম্বী হতে দেয় না।

Image - মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া গাঁয়ে অসাধ্যসাধন, মেয়েদের স্বপ্নপূরণে কী করেছিলেন এই মহিলা?

ভারতের গ্রামীণ জীবনে নারীর ক্ষমতায়নই চেতনার মূল লক্ষ্য ছিল। বেশ কয়েকবছরের অক্লান্ত চেষ্টার পর সাফল্যের মুখ দেখলেন তিনি। ১৯৯৭ সালে মহারাষ্ট্রের মাসোয়াদে গড়ে তুললেন ‘মান দেশি’ ব্যাঙ্ক, যে ব্যাঙ্কের মূল উদ্দেশ্য শুধু মহিলাদের সঞ্চয়ের উপর সুদ দেওয়াই নয়, বরং ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলার কাজে গ্রামীণ নারীদের ঋণ দেওয়া আর তাদের সুবিধা অনুযায়ী সেই ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা। মাঝারি থেকে ছোট সব ধরনের শিল্পদ্যোগের পাশে আজ এসে দাঁড়িয়েছে চেতনা দেবীর ব্রেন-চাইল্ড ‘মান দেশি’ ব্যাঙ্ক। মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটক রাজ্যে আটটি শাখা এবং ১৪০ জন ফ্যাসিলিটেটরের মাধ্যমে আজ তিন লক্ষেরও বেশি মহিলার কাছে লোনের সুযোগ পৌঁছে গিয়েছে ‘মান দেশি’ ব্যাঙ্ক।

শুনতে সহজ লাগলেও কাজটা কিন্তু একেবারেই সহজ ছিল না। মেয়েদের জন্য একটা সম্পূর্ণ নতুন ব্যাঙ্কের কী প্রয়োজন, তা প্রশাসনকে বোঝাতে পারাটাই একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছ থেকেও প্রাথমিকভাবে কোনও অনুমোদন পাননি চেতনা। ভবিষ্যতে ঋণ পাবার উদ্দেশ্যে যে সমস্ত মহিলাদের একাউন্ট খোলার কথা হয়েছিল কমবেশি তারা সকলেই ছিলেন অশিক্ষিত। এতেও আপত্তি জানায় ব্যাঙ্ক। তাছাড়া নিয়ম মতো ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিতে গেলে সিকিউরিটি হিসাবে যে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি জমা দিতে হয় তা দেবার মতো অবস্থাও ছিল না তাদের।

Image - মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া গাঁয়ে অসাধ্যসাধন, মেয়েদের স্বপ্নপূরণে কী করেছিলেন এই মহিলা?

খাতায় কলমে এতটা এগিয়ে যাওয়ার পর রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তাঁর প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়ায় খুব হতাশ হয়ে পড়েন চেতনা। সেসময় তাঁকে নতুন করে ভরসা জোগাতে পাশে এসে দাঁড়ায় গ্রামের মহিলারাই। তারা নিজেরাই এগিয়ে এসে চেতনাদেবীকে অনুরোধ করে তাদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য। একদম একার চেষ্টায় গ্রামীণ মহিলাদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য যে লড়াইটা শুরু করেছিলেন চেতনা, তা ততদিনে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে গ্রামের প্রতিটি মহিলাকে। শুরু হয় মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার কাজ। অবশেষে দু’পক্ষের চেষ্টা আর সদিচ্ছার জয় হয়। সকলের মিলিত প্রয়াসে তৈরি হয় চেতনা সিনহার স্বপ্নসন্ততি, তাঁর ‘মান দেশি’ ব্যাঙ্ক। মাত্র ছ’লক্ষ টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু করে ‘মান দেশি’ ব্যাঙ্ক উন্নতির এক অনন্য শিখরে পৌঁছে গিয়েছে আজ। পিছিয়ে পড়া নারীদের উন্নতি সাধনে প্রতিদিন নিরন্তর প্রয়াস করে চলেছেন সমাজকর্মী চেতনা সিনহা।

স্বল্পমেয়াদি অথবা দীর্ঘমেয়াদি অনুদানের পাশাপাশি কেউ চাইলে এই ব্যাঙ্ক থেকে মাত্র ৫,০০০ টাকার ঋণও নিতে পারে! ঋণের আবেদন হোক বা পরিশোধ, সবক্ষেত্রেই শুধুমাত্র ক্রেতাদের সুবিধাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে এই ব্যাঙ্ক। এমনকি গয়না গচ্ছিত রেখেও নারী ক্রেতারা খুব কম সুদে ঋণ পেতে পারেন মান দেশি ব্যাঙ্কে। বহু গ্রামীণ মহিলাই আজ ‘মান দেশি’ ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে উপকৃত। খুব কম সুদে ঋণ নিয়ে নিজেদের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন তাঁরা। স্বাবলম্বিতার পাশাপাশি ফিরে পেয়েছেন আত্মবিশ্বাসও। ঋণ নিতে গিয়ে বা টাকা জমা দিতে গিয়ে যাতে সময় নষ্ট, বা অযথা হয়রানির শিকার না হতে হয়, তাই বাড়ি গিয়েই এখন সমস্ত পরিষেবা প্রদান করছে ব্যাঙ্ক।

Image - মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া গাঁয়ে অসাধ্যসাধন, মেয়েদের স্বপ্নপূরণে কী করেছিলেন এই মহিলা?

‘মান দেশি’র উদ্যোগে আজ বহু গ্রামীণ নারী, যারা আগে পরিশ্রম করলেও আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভুগতেন, তাঁরা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন, স্বনির্ভর হয়েছেন। তাদের জীবনে এই আমূল পরিবর্তনের কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয়, তবে তিনি নিঃসন্দেহে চেতনা সিনহা এবং তাঁর বৈপ্লবিক ‘মান দেশি’ ব্যাঙ্ক। অক্লান্ত সমাজসেবার জন্যে চেতনাদেবী আজ দেশ-বিদেশে এক বহু প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব। পেয়েছেন নারী শক্তি পুরস্কারসহ নানা দেশিয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

এই সমাজের বুকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া কতটা জরুরি, তা বুঝেছিলেন চেতনা। এক আশ্চর্য জেদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কর্মযজ্ঞে। দেরিতে হলেও সেই কাজের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে এদেশের প্রশাসন। এই মান দেশি ব্যাঙ্কই ভারতের গ্রামীণ মহিলাদের প্রথম নিজস্ব ব্যাঙ্ক, যার সদস্য সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। নিজের সাফল্যকে অবশ্য খুব বেশি গুরুত্ব দেন না চেতনাদেবী। তিনি মনে করেন- “জীবনে জেতার জন্যে পাঁচটি উপাদান খুব প্রয়োজনীয়: কাজের প্রতি আবেগ, ধৈর্য, অধ্যবসায়, শোনার ইচ্ছে আর নম্রতা।”

You might also like