Latest News

শহিদের তালিকায় শতাধিক যুবক, তবুও এই গ্রামের ঘরে ঘরে ফৌজি

রূপাঞ্জন গোস্বামী

পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহর থেকে ৩৯ কিলোমিটার দূরে আছে ‘সৈদপুর'(Army Village)। গ্রামটির নাম শুনলেই ছাতি চওড়া হয়ে যায় ভারতের সেনাবাহিনীর। কারণ যুগ যুগ ধরে এই সৈদপুর (Saidpur) জন্ম দিয়ে চলেছে, গৌরবোজ্জ্বল বীরগাথার নায়কদের। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ আজও দেশের জন্য রাত জাগেন।

গ্রামের ভূমিপুত্ররা রাইফেল হাতে রাত জাগেন সীমান্তে। গ্রামের বেশিরভাগ নারী রাত জাগেন, সেনাবাহিনীতে থাকা সন্তান, স্বামী, পরিবারের সদস্যদের কল্যাণ কামনায়। তাই সৈদপুরকে সম্ভ্রমের চোখে দেখে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

Image - শহিদের তালিকায় শতাধিক যুবক, তবুও এই গ্রামের ঘরে ঘরে ফৌজি

প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনাটির সূত্রপাত ১৯১৪ সালে

সে বছর শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ব্রিটিশদের ‘দ্য রয়্যাল ইম্পিরিয়াল আর্মি’ ২ লক্ষ ৪০ হাজার ভারতীয় সেনাকে পাঠিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধে। ইউরোপ, আফ্রিকা, ভূমধ্যসাগর ও মধ্য প্রাচ্যের রণভূমিতে অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়েছিলেন ভারতীয় সেনারা। কিন্তু দেশে ফিরতে পারেননি সবাই। বিদেশের মাটিতে প্রাণ দিয়েছিলেন প্রায় ৬২,০০০ ভারতীয় সেনা।

বিশ্বযুদ্ধে লড়ার জন্য দেশ ছাড়তে হয়েছিল সৈদপুর গ্রামের ১৫৫ জন যুবককেও। ব্রিটিশ জাহাজ সৈদপুরের ফৌজিদের পৌঁছে দিয়েছিল জার্মানিতে। মিত্রশক্তির ইউরোপীয় সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে ছিলেন সৈদপুরের ফৌজিরা। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের পর গ্রামে ফিরেছিলেন মাত্র ২১ জন। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছিলেন ২৯ জন এবং বাকি ১০০ ফৌজি ছড়িয়ে পড়েছিলেন জার্মানির বিভিন্ন শহরে। দেশে ফেরার অর্থ না থাকায় জার্মানিতেই থেকে গিয়েছিলেন স্থায়ীভাবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকেরা

যাঁরা গ্রামে ফিরে এসেছিলেন, তাঁদের রাজকীয় সম্মান দিয়েছিল সৈদপুর। বিশ্বযুদ্ধ ফেরত ফৌজিরা একসময় হয়ে উঠেছিলেন সৈদপুর গ্রামের শৌর্য ও বীর্যের প্রতীক। তাঁদের মুখে বিশ্বযুদ্ধের রোমহর্ষক কাহিনি শুনেছিলেন গ্রামবাসীরা।তাঁদের দেখে স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছিল গ্রামের কচিকাঁচার দল। স্বাধীনতার পর যে স্বপ্ন দাবানল হয়ে জ্বলতে শুরু করেছিল সৈদপুর গ্রামের নবীন প্রজন্মের বুকে।

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সৈদপুর গ্রামের ছেলেরা একে একে ভারতীয় সেনায় যোগ দিতে শুরু করেছিল। ছুটিতে যখন ফৌজিরা ঘরে ফিরত, সেনার উর্দি পরা সুঠাম যুবকদের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকত গ্রামের বালক বালিকারা। ক্লান্ত ফৌজির মালপত্র তারা দল বেঁধে বয়ে দিয়ে আসত বাড়ি অবধি। গ্রামের শিশুদের জন্য ফৌজিরা নিয়ে আসত লজেন্স ও বিস্কুট। এভাবেই সেনাবাহিনীর উর্দির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল সৈদপুর গ্রামের নবীন প্রজন্ম।

Image - শহিদের তালিকায় শতাধিক যুবক, তবুও এই গ্রামের ঘরে ঘরে ফৌজি
সৈদপুর গ্রাম

ফৌজি গাঁও’ সৈদপুর

এরপর কেটে গিয়েছে বহু যুগ। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে সৈদপুর আজ ‘ফৌজি গাঁও’। কারণ এ গ্রামের ঘরে ঘরে ‘ফৌজি’। সৈদপুর গ্রামের কুড়ি হাজার মানুষের প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। এই রেকর্ড ভারতের অন্য কোনও গ্রামের নেই।

মাত্র ৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা সৈদপুর গ্রামে বাস করেন ৩৫৯৬ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও সেনাকর্তা। কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর তাঁরা ফিরে এসেছেন নিজের গ্রামে। ভিন রাজ্যের আধুনিক শহরকে তাঁরা স্থায়ী ঠিকানা করেননি। ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, পুলওয়ামা আক্রমণের পর, সৈদপুরের নিকটবর্তী ব্যাঙ্ক উপচে পড়েছিল অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের ভিড়ে।

ন্যাশন্যাল রিলিফ ফাণ্ডে একমাসের পেনশন দান করেছিলেন সৈদপুরের অবস্রপ্রাপ্ত সেনারা। প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে তাঁরা জানিয়েছিলেন, “দেশকে অস্ত্র কেনার জন্য আরও টাকা দিতে চাই। শর্ত একটাই। পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে হবে।”

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনারা

এছাড়াও সেই চিঠিতে তাঁরা লিখেছিলেন,”ভারতে সন্ত্রাসবাদী হানার কথা শুনলেই আমাদের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। মনে হয় আবার হাতে তুলে নিই নামিয়ে রাখা রাইফেল। ছুটে যাই বর্ডারের দিকে। সরকার যদি আমাদের অনুমতি দেয়, আমরা দেশের হয়ে আবার যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত।”

শুনলে অবাক লাগবে, সৈদপুর গ্রামের ৭৯০০ জন বাসিন্দা বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত। তাঁরা ছড়িয়ে আছেন স্থলসেনা, নৌসেনা ও বায়ুসেনার বিভিন্ন বিভাগে। এছাড়াও উত্তরপ্রদেশ পুলিশ, দিল্লি পুলিশ ও প্যারা-মিলিটারিতে আছেন প্রায় ৫৫০ জন গ্রামবাসী। সৈদপুর দেশকে উপহার দিয়েছে সেপাই, নায়েক, সুবেদার, লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন, কর্নেল থেকে মেজর জেনারেল। সৈদপুর গ্রামেরই ভূমিপুত্র ছিলেন মেজর জেনারেল শোইরাজ সিং আহলাওয়াত।

Image - শহিদের তালিকায় শতাধিক যুবক, তবুও এই গ্রামের ঘরে ঘরে ফৌজি
মেজর জেনারেল শোইরাজ সিং আহলাওয়াত

গ্রামের বেশিরভাগ বাড়ির দেওয়ালের রঙ সবুজ, গেরুয়া ও সাদা। সেই সব দেওয়ালে শোভা পায় ‘মহাবীর চক্র’, ‘বীর চক্র’, ‘কীর্তি চক্র’, ‘শৌর্য চক্র’, ‘সর্বোত্তম যুধ সেবা মেডেল’ সহ ভারতীয় সেনাবাহিনীর দেওয়া প্রায় সব ধরনের পদক। প্রতিটি বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে লুকিয়ে আছে সৈদপুরের ফৌজিদের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের অজস্র কাহিনী। রক্ত গরম করে দেওয়া কাহিনিগুলির সাথেই লুকিয়ে আছে এমন অজস্র কাহিনি, যা চোখে এনে দেয় জল।

সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সুখবীর সিং সিরোহী

দিনটি ছিল ১৯৬৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। পাঞ্জাবের খেমকরণ সেক্টরে পাকসেনার বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই চালাচ্ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। রণক্ষেত্রে ছিলেন সৈদপুর গ্রামের তরতাজা যুবক, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সুখবীর সিং সিরোহী। সুখবীর ছিলেন’ডেকান হর্স’ রেজিমেন্টের পাঁচটি ট্যাঙ্কের কম্যান্ডার।

পাকিস্তানি সেনাদের ওপর গোলাবর্ষণ করতে করতে বীরবিক্রমে এগিয়ে চলেছিল সুখবীরের সেঞ্চুরিয়ান ট্যাঙ্ক। সুখবীরের গতি স্তব্ধ করার জন্য খড়ের গাদায় আগুন দিয়ে পাকসেনারা আকাশ করে দিয়েছিল অন্ধকার। রণক্ষেত্র ঢেকে ফেলা ধোঁয়ার সুযোগ নিয়ে সুখবীরের ট্যাঙ্ককে ঘিরে ফেলেছিল বেশ কিছু পাকিস্তানি ‘প্যাটন’ ট্যাঙ্ক।

পাক গোলার আঘাতে দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করেছিল সুখবীরের সেঞ্চুরিয়ান। সেই অবস্থাতেই চরকির মত ঘুরতে শুরু করেছিল সুখবীরের সেঞ্চুরিয়ান। এক অবিশ্বাস্য আক্রমণ চালিয়ে সুখবীর ধ্বংস করে দিয়েছিলেন একাধিক পাক প্যাটন।

পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে দিয়েছিলেন সুখবীর সিং আহলাওয়াত

এরপর জ্বলন্ত ট্যাঙ্ক থেকে জ্বলন্ত শরীর নিয়ে লাফিয়ে নেমে পড়েছিলেন সুখবীর। তাঁর হাতের অটোমেটিক রাইফেল তখনও আগুন ঝরিয়ে চলেছিল। পাক মেশিনগানের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বার আগে, শেষবারের মত প্রিয় রাইফেলটি চালিয়ে সুখবীর ঝাঁঝরা করে দিয়েছিলেন বেশ কিছু পাক সেনার বুক।

ভারতীয় সেনাদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল সুখবীর সিং সিরোহীর অমর বলিদানের কাহিনী। সুখবীর সিং সিরোহীর চিতাভস্ম নিয়ে সৈদপুর গ্রামে এসেছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সৈদপুর গ্রামের মাটিকে প্রণাম করে বলেছিলেন,”সৈদপুরকে মাটি বীরোঁকা ঘাঁটি।”

নায়েক সুরেন্দ্র সিং আহলাওয়াত

গুলাবঠি-বিবিনগর রাস্তা দিয়ে সৈদপুর গ্রামে ঢোকার সময় চোখে পড়বে রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচুতে থাকা একটি মন্দির। মন্দিরের পিছনে বোল্ডার দিয়ে তৈরি করা পাহাড়। মন্দিরে কোনও দেবতার বিগ্রহ নেই। মন্দিরের ভেতরে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গ্রামের বীরপুত্র নায়েক সুরেন্দ্র সিং আহলাওয়াত। রাজপুতানা রাইফেলের দুই নম্বর ইউনিটের নায়েক। পরনে সেনাবাহিনীর উর্দি। মাথায় টুপি। কপালে লাল তিলক। হাতে একে-৪৭ রাইফেল। গলায় গাঁদা ফুলের টাটকা মালা। পায়ের বুট দুটিও ঢাকা পড়েছে গাঁদা ফুলে।

Image - শহিদের তালিকায় শতাধিক যুবক, তবুও এই গ্রামের ঘরে ঘরে ফৌজি
নায়েক সুরেন্দ্র সিং আহলাওয়াতের মূর্তি

কার্গিল যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ৩ মে। এই যুদ্ধের অন্যতম কঠিন লড়াইটি হয়েছিল টোলোলিং পাহাড়ে। ১৯৯৮ সালের শীতে, বরফ পড়ার সুযোগ নিয়ে টোলোলিং পাহাড় দখল করে নিয়েছিল পাকিস্তানের নর্দান লাইট ইনফ্র্যান্ট্রির জওয়ান ও কাশ্মীরী উগ্রপন্থীরা। কারণ টোলোলিং পাহাড়ের পাশ দিয়ে গিয়েছি শ্রীনগর-লে হাইওয়ে। টোলোলিং পাহাড় থেকে গুলি ও মর্টার ছুঁড়ে ভারত থেকে লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করাই ছিল পাকিস্তানের উদ্দেশ্য।

দিনটি ছিল ১৯৯৯ সালের ১২ জুন। রাজপুতানা রাইফেলের মেজর বিবেক গুপ্তা, কোম্পানি নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন টোলোলিং পিকের পয়েন্ট-৫৪৯০ দখল করার জন্য। সহযোদ্ধা ছিলেন নায়েক সুরেন্দ্র সিং আহলাওয়াত। ১৬ হাজার ফুট উচ্চতায় সেদিন ঐতিহাসিক লড়াই লড়েছিল রাজপুতানা রাইফেল। তেইশটি তাজা প্রাণের বিনিময়ে চিরশত্রুর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল টোলোলিং পাহাড়। শতাধিক পাক সেনার রক্তে ভেসে গিয়েছিল টোলোলিং। আট পাক সেনাকে একা খতম করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন সৈদপুরের বীরপুত্র নায়েক সুরেন্দ্র সিং আহলাওয়াত।

সুরেন্দ্র সিং আহলাওয়াত

সুরেন্দ্রর মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সৈদপুর। বিস্ময়করভাবে গ্রামের মানুষকে সেদিন উজ্জীবিত করেছিলেন পুত্রহারা পিতা অমিচাঁদ সিং আহলাওয়াত। গ্রামের মানুষদের তিনি বলেছিলেন, “দেশের জন্য আমার ছেলে শহিদ হয়েছে। আমি গর্বিত। আমি মনে করি রাজপুতের শ্রেষ্ঠ মৃত্যু রণক্ষেত্রে। বিছানায় নয়।”

অমর ১১৭

সৈদপুরে আছে আরও একটি শহিদ স্মৃতিসৌধ। যেখানে শ্বেতপাথরের বুকে খোদাই করা আছে ১১৭ টি নাম। যে নামগুলি চিরতরে গেঁথে গিয়েছে সৈদপুরের মানুষদের বুকে। রবি, কিষাণ, আরজু, রণবীরের মত শতাধিক যুবক অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করে, ভারতের তেরঙ্গা নীল আকাশে উড়িয়ে আত্মবিসর্জন দিয়েছে বিভিন্ন যুদ্ধ ও অপারেশনে। আজও সজল চোখে প্রতিনিয়ত তাদের স্মরণ করে সৈদপুর।

দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন একটি গ্রামের ১১৭ জন যুবক। এমন ঘটনা শুধু ভারত নয়, সারা বিশ্বেই বিরল। গ্রামের প্রতিটি মানুষ সুরেন্দ্র সিং আহলাওয়াতের স্ট্যাচু ও শহিদ স্মৃতি ফলকের পাশ দিয়ে আসা যাওয়ার সময় এক মিনিট দাঁড়িয়ে যান। প্রণাম করেন। ফুল দেন। বীরপুত্রদের স্যালুট করে নিজের পথে এগিয়ে যান, ছুটি নিয়ে গ্রামের ফিরতে থাকা বা কাজে যোগ দিতে যাওয়া ফৌজিরা।

Image - শহিদের তালিকায় শতাধিক যুবক, তবুও এই গ্রামের ঘরে ঘরে ফৌজি
শ্বেত পাথরের ফলকে লেখা ১১৭ টি অমর নাম

‘পাখির চোখ’ সেনাবাহিনীর উর্দি

এতগুলি শবযাত্রা দেখা সত্ত্বেও সৈদপুরের নবীন প্রজন্মের মধ্যে ফৌজে ভর্তি হওয়ার অদম্য ইচ্ছা আজও অটুট। অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের মুখে নবীন প্রজন্ম নিয়মিত শোনে গ্রামের ফৌজিদের বীরত্বের নানা কাহিনি। কখনও তাদের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। কখনও চোখে দেখা দেয় জল। একসময় গ্রামের নবীন প্রজন্ম শুরু করে দেয় সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি।

আরও পড়ুন: এই গ্রামের পঁচাত্তরটি বাড়ি দেশকে দিয়েছে সাতচল্লিশ জন ‘আইএএস’ অফিসার

গ্রামের নবীন প্রজন্মকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার প্রশিক্ষণ দেন অবসরপ্রাপ্ত ফৌজিরা। সাহায্য করেন ছুটি কাটাতে গ্রামে আসা ফৌজিরাও। সকাল বা বিকেলে সৈদপুর গ্রামে গেলেই দেখা যাবে, দলবেঁধে গ্রামের রাস্তায় বা মাঠে দৌড়াচ্ছে গ্রামের নবীন প্রজন্ম। অনেকে ব্যস্ত অন্যান্য শারীরিক কসরত নিয়ে। কারও দিকে ঘুরে দেখার সময় নেই তাদের। কারণ তাদের কাছে ‘পাখির চোখ’ হল ভারতীয় সেনার উর্দি।

ধুলো উড়িয়ে গ্রামে আসে সেনাদের গাড়ি

প্রত্যেক বছর নির্দিষ্ট সময়ে লক্ষ্ণৌ বা মেরঠ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রাক ও অফিসারদের গাড়ি রওনা হয় বুলন্দশহর জেলার বিবিনগর ব্লকের দিকে। ভোর হওয়ার আগেই গাড়িগুলি এসে থামে সৈদপুর গ্রামের মিলিটারি হিরোজ মেমোরিয়াল ইন্টার কলেজের বিশাল মাঠে। সেনাবাহিনীর গাড়িগুলি আসার আগেই মাঠ ভরিয়ে তোলেন সৈদপুর গ্রামের যুবকেরা। ভারতবর্ষের হাতে গোনা কয়েকটি গ্রামের মধ্যে একটি হল সৈদপুর, যে গ্রামের ছেলেদের সেনাতে ভর্তি করার জন্য গ্রামেই ক্যাম্প করে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

সেনাবাহিনীর গাড়িগুলি থেকে নামেন বেশ কিছু উচ্চপদস্থ অফিসার ও জওয়ান। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশাল মাঠের এক প্রান্তে মাথা তোলে অগুণতি জলপাই রঙের তাঁবু। সেই তাঁবুগুলির সামনে পাতা হয় ট্রাকে করে নিয়ে আসা টেবিল চেয়ার। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় সেনাবাহিনীতে ভর্তি নেওয়ার কঠোর পরীক্ষা। প্রায় তিন চারদিন ধরে সৈদপুর গ্রামে চলে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প।

Image - শহিদের তালিকায় শতাধিক যুবক, তবুও এই গ্রামের ঘরে ঘরে ফৌজি

তারপর তাঁবু গুটিয়ে, ধুলো উড়িয়ে ফিরে যায় সেনাবাহিনীর গাড়িগুলি। ঘর্মাক্ত শরীরে দল বেঁধে ঘরে ফিরতে থাকে সৈদপুর গ্রামের ভবিষ্যতের ফৌজিরা। তাদের কানে ভাসে, ১৯৭১ সালে করাচি বন্দর গুঁড়িয়ে দেওয়া দেবীন্দর সিং সিরোহীর কথা, “সৈদপুরের কাছে দেশের থেকে বড় কিছুই নয়। প্রতিটি যুদ্ধে বিজয়ের তেরঙ্গা উড়িয়ে, মাথা উঁচু করে গ্রামে ফিরেছে সৈদপুরের ফৌজিরা। তাই আগামী দিনে ভারতমায়ের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব তোমাদের। শুধু বিশ্বাস রেখো জাতীয় পতাকা, সৈদপুরের মাটি ও নিজের হাতের রাইফেলের ওপর।”

আরও পড়ুন: দ্য ওয়ালের অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like