Latest News

রাড়ুলী গ্রামের ফুলুকে আজও ভোলেনি বিষণ্ণ নদ ‘কপোতাক্ষ’

যদি কথা বলতে পারত কপোতাক্ষ, হয়ত এভাবেই বলে চলত ফুলুর গল্প। সেই ফুলু যাকে আমরা চিনি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও বিশ্ব চেনে স্যার পি,সি,রায় নামে।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বাংলাদেশের খুলনার সোনাডাঙ্গা বাসস্টান্ড থেকে বাসে  ৬০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যেতে হবে পাইকগাছা উপজেলার  রাড়ুলী ও গদাইপুর ইউনিয়নের সীমানায়। যেখান দিয়ে থির থির করে বয়ে চলেছে ঐতিহাসিক কপোতাক্ষ নদ। নদ পেরিয়েই রাড়ুলী-কাটিপাড়া গ্রাম। সেই গ্রামেই আছে কপোতাক্ষের বন্ধু ফুলুর বাড়ি। ফুলু মানে প্রফুল্ল। ভারতের সর্বকালের সেরা মনীষীদের তালিকায় থাকা অন্যতম নক্ষত্র আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। সবাই রায়বাড়ির প্রফুল্লকে ভারী ভারী নামে ডাকলেও তাকে ফুলু ছাড়া ভাবতে পারে না কপোতাক্ষ! কারণ, কপোতাক্ষের জল, নাকি বুকের রক্তে ভেজা জমিতে জন্ম নিয়েছিল ফুলু।

কপোতাক্ষ নদ

কপোতাক্ষের স্পষ্ট মনে পড়ে

ফুলুর বাবা ছিলেন জমিদার হরিশচন্দ্র রায়। প্রকাণ্ড বাড়ি ছিল ফুলুদের। এখনও আছে অবশ্য। প্রায় ১৭০টি থামের উপর বসানো দোতলা বাড়িটিতে  ৪৫টি দরজা ও  ১৩০টি জানলা রয়েছে। বাড়িটির বিভিন্ন থাম ও দেওয়ালে রয়েছে নানা নকশা। বাড়ির ছাদে বসানো আছে একটি অতিকায় সিংহমূর্তি। বাড়ির একপাশে রয়েছে একটি পুকুর ও মন্দির। এক সময় এই  তল্লাট দাপাতো ফুলু। সর্বত্র ছিল তার অবাধ গতিবিধি।

রাড়ুলী গ্রামে আজও আছে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের বাড়ি।

কপোতাক্ষের বুক বেয়ে রায় বাড়ির নৌকাগুলির আসা যাওয়া লেগেই থাকত। নৌকায় থাকা বাবু কিংবা মাঝিদের কাছ থেকে রায় বাড়ির সব খবর পেত কপোতাক্ষ। এছাড়া ফুলু নিজেই আসত কপোতাক্ষের তীরে। ছোটবেলায় পরিবারের কারও সঙ্গে, একটু বড় হওয়ার পর একা। কপোতাক্ষের বুকে দু’চোখ ভাসিয়ে বসে কীসব ভাবত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কপোতাক্ষও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত বন্ধুর দিকে।

জমিদার হয়েও ফুলুর বাবা ছিলেন ইংরাজি , আরবি ও ফারসী ভাষায় বিশারদ। বাড়িতে ছিল প্রকাণ্ড এক লাইব্রেরি। দেশী বিদেশী বই কতো যে ছিল সেই লাইব্রেরিতে তার ইয়ত্বা নেই। জমিদারী ভুলে সব সময় জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করতেন। হিন্দু জমিদার হয়েও ফুলুর বাবার সামান্যতম ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল না। উদারচেতা এবং অসাম্প্রদায়িক মানুষটি বাড়িতে একজন মৌলবী নিয়োগ করেছিলেন আরবি ও ফারসী ভাষা শেখা ও কোরান বোঝার জন্য।

নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝে হরিশচন্দ্র রায় ফুলুর জন্মের অনেক আগে গ্রামের বালিকাদের পড়াশুনার জন্যএকটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন । স্ত্রী ভূবন মোহিনীর নামে। এটা ছিল খুলনা জেলার প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। ফুলুর মা ভূবনমোহিনী দেবী সে যুগের আর পাঁচজন সাধারণ গৃহিণীর মতো ছিলেন অন্তঃপুরবাসিনী ছিলেন না। স্বামীর লাইব্রেরিতে দিনের কিছু সময় কাটত তাঁরও। ফুলুর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁরই হাতে।

রাড়ুলীর সেই ভূবন মোহিনী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বয়স এখন ১৭০ বছর।

ছোটবেলায় ভীষণ দুরন্ত ছিল ফুলু। তাকে বাগে আনতে হিমশিম খেয়ে যেত সবাই। কিন্তু বই হাতে পড়লেই পালটে যেত ফুলু। মায়ের কাছটিতে বসে চুপ করে লক্ষী ছেলের মত পড়া করে নিত। বাবার স্থাপন করা এম ই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল ফুলু। পড়াশুনায় বরাবর চৌখশ ছিল সে। কপোতাক্ষের বুক পেরিয়ে ফুলুর শিক্ষকেরা যখন বিকেল বেলা বাড়ি ফিরতেন। তাঁদের মুখ থেকে ফুলুর প্রশংসা শুনতে পেত কপোতাক্ষ।

ফুলু প্রথম গ্রাম ছেড়েছিল ১৮৭২ সালে, চলে গিয়েছিল কলকাতায় পড়াশুনা করতে। কপোতাক্ষের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুবছর পরেই ফুলু আবার ফিরে এসেছিল। কপোতাক্ষ শুনেছিল কলকাতায় গিয়ে ফুলু রক্ত আমাশায় ভুগত । ফিরে এসে এসে রাড়ুলিতে দুই বছর ছিল ফুলু। খুব খুশি হয়েছিল কপোতাক্ষ। তখন অবশ্য ফুলুর দাপাদাপি অনেক কমে গিয়েছিল। নদীর তীরে বড় একটা আসত না। অসুস্থ ফুলুকে যদিও দেখতে ইচ্ছা করত কপোতাক্ষের। কিন্তু সে জানত ঈশ্বর তাকে সে ক্ষমতা  দেয়নি।

বাড়িটির যে অংশে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় থাকতেন।

কপোতাক্ষ শুনেছিল

শরীর একটু ভালো হতে ফুলু রাড়ুলি ছেড়ে আবার ফিরে গিয়েছিল কলকাতায়। ১৮৭৬ সালে কলকাতা  গিয়ে কেশব চন্দ্র সেনের অ্যালবার্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করলেও বৃত্তি পায়নি ফুলু। আত্মীয়স্বজন ও  শিক্ষক  হতাশ হলেও ফুলু কিন্তু হতাশ হয়নি। কারণ ফুলু  বিশ্বাস করত, পরীক্ষার নম্বরই মানুষের জীবনের শেষ কথা নয়। কপোতাক্ষ এটা মনে প্রাণে মানে। সত্যিই তো, সেই পরীক্ষায় ফুলুর চেয়েও ভালো নম্বর পেয়েও কতো ছেলে মেয়ে হারিয়ে গিয়েছিল সাধারণের ভিড়ে। কিন্তু রাড়ুলীর ফুলু নিজের নামের সঙ্গে সঙ্গে দেশের নাম এমনকি তার গ্রামের নামও সারাবিশ্বে  পৌঁছে দিয়েছিল।

ফুলু একাধারে বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী,  অধ্যাপক, উদ্যোগপতি, গ্রামসেবক, জননেতা আরও কত কি। কেউ ফুলুকে সম্বোধন করতেন  ‘আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়’ বলে, কেউ বলতেন ‘স্যার পি,সি,রায়’।  ইংরেজি সাহিত্যে ফুলুর ছিল প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য। শেক্সপিয়র ছিলেন ফুলুর প্রিয় নাট্যকার। গোটা হ্যামলেট নাটকটি  ফুলু নাকি মুখস্থ বলতে পারত।

অন্যদিকে তার প্রিয় কবি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ফুলুকে একবার বিশ্বকবি লিখেওছিলেন, “…যেসব জন্মসাহিত্যিক গোলমালের মধ্যে ল্যাবরেটরির মধ্যে ঢুকে পড়ে, জাত খুইয়ে বৈজ্ঞানিকের হাটে হারিয়ে গিয়েছেন তাদের ফের জাতে তুলব। আমার এক একবার সন্দেহ হয় আপনিও বা সেই দলের একজন হবেন।” আসলে বিশ্বকবি অনুভব করেছিলেন, বিলেতে পড়াশুনা করলেও এবং ইংরেজিতে চোস্ত হলেও বাংলা ভাষা ছিল ফুলুর প্রাণ এবং ফুলুর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক সাহিত্যিক।  

ফুলুর ৭০ তম জন্মজয়ন্তীর দিনে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন, আবেগমথিত কণ্ঠে বিশ্বকবি বলেছিলেন, ‘আমরা দুজনে সহযাত্রী, কালের তরীতে আমরা প্রায় একঘাটে এসে পৌছেছি।” সেদিন রবীন্দ্রনাথ ফুলুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি তাম্রফলক, তাতে খোদাই করা ছিল কবির লেখা দুটি লাইন -‘প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয়, করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়।’

কপোতাক্ষ অবাক হত জেনে

প্রেসিডেন্সি কলেজে ২৭ বছর পড়িয়েছে ফুলু। ক্লাসে ফুলু পড়াতো বাংলা ভাষায়। নীচের দিকেই ক্লাস নিতে ভালোবাসত ফুলু, সে বলত “কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমত আকার দিতে পারে হাইস্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়।” সে সব সময় চাইত তার ছাত্রছাত্রীরা তাকে ছাপিয়ে যাক। তাই সে লিখেছিল , “ সর্বত্র জয় অনুসন্ধান করিবে, কিন্ত পুত্র ও শিষ্যের নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়া সুখী হইবে।”

ফুলুর এক মুসলিম ছাত্র ছিলেন ডঃ কুদরত-ই খুদা। ১৯১৫ সালে কেমিস্ট্রিতে এম.এস.সি পরীক্ষায়  কুদরত-ই খুদা প্রথম শ্রেণী পাওয়ায় কয়েকজন কট্টর হিন্দু শিক্ষক ফুলুকে অনুরোধ করেছিলেন কুদরত-ই খুদাকে প্রথম শ্রেণী না দেওয়ার জন্য। কিন্ত ফুলু যে অসাম্প্রদায়িক পিতার ভাবাদর্শে দীক্ষিত। ফুলুর কাছে যে যোগ্য সে যোগ্যই। তাই ফুলু রাজি হয়নি। শুনে গর্বে বুক ফুলে উঠেছিল কপোতাক্ষের।

ফুলুকে বলা হয় ‘বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী’। ফুলুর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন, ড: মেঘনাথ সাহা, হেমেন্দ্র কুমার সেন, বিমান বিহারী দে,জ্ঞানেন্দ্র নাথ রায়, জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্র নাথ মুখোপদ্যায়, ড: কুদরত-ই-খুদা, প্রিয়দা ভন্জন রায়, রাজেন্দ্র লাল দে, ফজলুল হক, প্রফুল্ল কুমার বসু, বীরেশ চন্দ্র গুহ, অসীমা চ্যাটার্জী ও আরও  অসংখ্য বিখ্যাত মানুষজন।

কপোতাক্ষ জানে ফুলু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সভায় বলত জাতীয়তাবাদের কথা দেশপ্রেমের কথা, মুক্তি সংগ্রামের কথা।ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বলত ফুলু নাকি বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশে বিপ্লবী। ফুলু নাকি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলোনের সময় বিপ্লবীদের অস্ত্র কেনার টাকা দিতো। ফুলুর দেশপ্রেম এতই উগ্র ছিল, যে ঢাকার একজন উচ্চপদস্থ অফিসার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, “স্যার পি.সি. রায়ের মতো লোক যদি  আধ-ডজন থাকতেন, এতদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে যেত।”

১৯১৯ সালে ফুলুকে ব্রিটিশরা দিয়েছিল Companion of the Indian Empire(C.I.E.)  উপাধি, সেই বছরই  কলকাতার টাউন হলে রাউলাট বিলের বিরোধিতায় গর্জে উঠেছিল ফুলু, বলেছিল, ‘দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীকে টেস্ট টিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হবে। বিজ্ঞানের গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজের জন্য সংগ্রাম অপেক্ষা করতে পারে না।”

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ল্যাবরেটরি

কপোতাক্ষ বলে, ফুলু জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত  রাড়ুলী গ্রামের ফুলুই ছিল

ফুলু কী জন্য বিখ্যাত ,কত বিখ্যাত, সেটা বিশ্বের লোকে জানেন। যেটা অনেকেই জানেন না সেটা হল, জমিদারপুত্র হয়েও অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করত ফুলু। অথচ এই ফুলু সেই যুগে লক্ষ লক্ষ টাকা দান করেছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।বিজ্ঞান কলেজের যে ঘরে ফুলু থাকত, সে ঘরে খাট, একটা টেবিল,একটা সাধারণ চেয়ার ও জামাকাপড় রাখার জন্য একটা কমদামী কাঠের আলনা ছাড়া অন্য কোনও আসবাবপত্র ছিল না।

নিজের ধুতি পাঞ্জাবী কোট নিজের হাতে কাচতো ফুলু। খুব একটা যে পরিষ্কার করতে পারতো তাও নয়। কিন্তু সে কাউকে কাচতেও দেবেনা। এর ফলে আধময়লা ভাঁজপড়া কোট, ধুতি চাদর ও পাঞ্জাবিতে ফুলুকে দেখে অভ্যস্ত ছিল দেশ। চুলে চিরুনি পড়ত খুব কম, দাড়ি অবিন্যস্তভাবে থাকত। আসলে ফুলুর নিজেকে দেওয়ার মতো সময় ছিল না। সে ভাবত দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য।

 ফুলুর সঙ্গে থাকত ফুলুর কিছু ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই কলা খেতে ভালোবাসত ফুলু, সকালে টিফিন করত দুটো কলা দিয়ে। চাঁপাকলা ফুলুর খুব প্রিয় ছিল। সেই সময় এক পয়সায় দুটো চাঁপাকলা পাওয়া যেত। একদিন এক ছাত্র স্যারের জন্য তিন পয়সা দিয়ে দুটো কলা নিয়ে আসায় কি রাগ ফুলুর, ছাত্রকে বলেছিল, “নবাবি করতে শিখেছ, আমায় পথে বসাবে?”

এর কিছুক্ষণ পরেই কংগ্রেস নেতা ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এসেছিলেন ফুলুর কাছে, তাঁর তিনহাজার টাকা দরকার ছিল। যে যুগে এক পয়সায় দুটো কলা পাওয়া যেত, সে যুগে  তিন হাজার টাকার মুল্য সহজেই অনুমেয়। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনহাজার টাকার চেক লিখে দিয়েছিল ফুলু। খবরটা শুনে কপোতাক্ষ তার বুকে ঢেউ তোলা বাতাসকে বলেছিল,”ঠিক বাবার মতো হয়েছে ফুলুটা।” 

‘বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী’ রাড়ুলীর ফুলুর নাম তখন সারা বিশ্ব জানে। সাইমন কমিশনের সদস্যরা বিজ্ঞান কলেজের কথা ও ফুলুর কথা লন্ডনে অনেক শুনেছিল। তারা কলকাতায় এসে বিজ্ঞান কলেজ পরিদর্শনে এসেছিল, আসল উদ্দেশ্য ছিল  ফুলুকে দেখা। এক দুপুরে তারা ফুলুর ঘরে এসে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। ‘বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী’ মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিস্কারক স্যার পি,সি,রায় গামছা পরে চেয়ারে বসে আছেন। কারণ ফুলু তার ধুতি খানা কেচে রোদে শুকাতে দিয়েছিল। ঘরের এক কোণে স্টোভ জ্বলছে, নিজের খাবার নিজেই রান্না করছিল ফুলু। একটু লজ্জা না পেয়ে ফুলু নাকি সেই অবস্থাতেই সাইমন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। 

কপোতাক্ষ সেদিন ভেঙে পড়েছিল

যেদিন ফুলু চলে গেছিল পৃথিবী ছেড়ে। দিনটা ছিল ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন। শেষ ক’বছর ফুলু খুব অসুস্থ ছিল। ফুলুর তার অসামান্য স্মৃতিশক্তি  হারিয়ে ফেলেছিল। কথা জড়িয়ে গিয়েছিল। বিছানাতে উঠে বসতে পারত না। যেদিন ফুলু চলে গেল, অগণিত মানুষের বাঁধভাঙা কান্নার মাঝেই রাড়ুলীর বুকে নেমেছিল আকাশভাঙা বৃষ্টি। চোখের জল বুঝি আর ধরে রাখতে পারেনি প্রকৃতি মা।

জমিদারী প্রথা বিলোপ হওয়ার পর ফুলুদের রাড়ুলী গ্রামের বাড়ি বেশ কয়েকবার বেদখল হয়ে গিয়েছিল। তবে কপোতাক্ষ শুনেছে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বাড়িটি অধিগ্রহণ করেছে। ফুলুর জন্মদিন ও মৃত্যুদিবসে সেখানে সরকারি অনুষ্ঠানে ফুলুকে স্মরণ করা হয়। তবে ফুলুর ক্রমশ স্মৃতি ফিকে হয়ে আসছে রাড়ুলীর নবীন প্রজন্মের কাছে। রাড়ুলী দ্রুত ভুলে যাচ্ছে  ভুমিপুত্র ফুলুকে।

কিন্তু তার প্রিয় বন্ধু ফুলুকে আজও ভুলতে পারেনা বিষণ্ণ কপোতাক্ষ। দুটো প্রশ্নের উত্তর সে ৭৬ বছর ধরে খুঁজে চলেছে। খুঁজে চলবে আগামী হাজার হাজার বছর। যতদিন না মানুষ তাকে শুকিয়ে মেরে ফেলছে। গ্রামে এলেই কপোতাক্ষের তীরে চলে আসত ফুলু। ঘাসের বিছানায় শুয়ে থাকত কান পেতে কী যেন শুনতো। ফুলু কি কপোতাক্ষের ভাষা বোঝার চেষ্টা করত! কপোতাক্ষ যে তাকে ভালোবাসে এটা কি ফুলু বুঝতে পেরেছিল! মেলেনি উত্তর, তাই আজও কপোতাক্ষের দীর্ঘশ্বাস ভোরের কুয়াশা হয়ে আঁকড়ে আছে  ফুলুর ফেলে যাওয়া জন্মভিটে।

You might also like