Latest News

চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড় চূড়ায় বিরাজ করেন জাগ্রত শিব ‘চন্দ্রনাথ’, পাদদেশের সতীপীঠে ‘দেবী ভবানী’

পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় আছে 'ব্যাসকুণ্ড'। যার পাশে বসে মহামুনি ব্যাসদেব এবং অন্যান্য ঋষিগণ অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে শিব হলেন ‘পরমসত্ত্বা’। তিনিই ‘পরমেশ্বর’। ‘সৃষ্টি’ করেন ব্রহ্মারূপ ধারণ করে, ‘পালন’ করেন বিষ্ণুরূপ ধারণ করে এবং ‘সংহার’ করেন রুদ্ররূপ ধারণ করে। রাশিচক্রের ষষ্ঠ নক্ষত্র আর্দ্রার অধিপতি হলেন শিব। শিবপুরাণের “শতরুদ্র সংহিতা” (অধ্যায় ৪২/২-৪) অনুসারে, আর্দ্রা নক্ষত্রের রাতে দেবাদিদেব মহাদেব জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন মর্ত্যে। জ্যোতির্লিঙ্গ রূপ ধারণ করে তিনি আজও অবস্থান করছেন ভারতের বারোটি স্থানে। উত্তরাখণ্ডে কেদারনাথ। গুজরাটে সোমনাথ, নাগেশ্বর। মহারাষ্ট্রে ভীমশঙ্কর, ত্র্যম্বকেশ্বর, ঘৃষ্ণেশ্বর। উত্তরপ্রদেশে কাশী বিশ্বনাথ। মধ্যপ্রদেশে মহাকালেশ্বর, ওঙ্কারেশ্বর। ঝাড়খণ্ডে বৈদ্যনাথ। অন্ধ্রপ্রদেশে মল্লিকার্জুন ও তামিলনাড়ুতে রামেশ্বর রূপে।

হিমালয় তাঁর বাসভূমি

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ ধারণকারী স্থানগুলি ছাড়াও শিবশম্ভু বিরাজ করেন উত্তরাখণ্ডের আদি কৈলাস, ওম পর্বত, শিবলিং পর্বত, হিমাচলের কিন্নর কৈলাস, ট্রান্স-হিমালয়ের মাউন্ট কৈলাস বা গাং রিনপোচে পর্বত শৃঙ্গে। তিনি বিরাজ করেন কাশ্মীর হিমালয়ে ‘অমরনাথ’ রূপে। কুলুর পাহাড়ে ‘বিজলি মহাদেব’ রূপে। উত্তরাখণ্ডে রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর, তুঙ্গনাথ, মদমহেশ্বর রূপে। ভুটানের মহাকাল গুহায় ‘মহাকাল’ রূপে। তাই সনাতনধর্মীরা বিশ্বাস করেন মর্ত্যে দেবাদিদেবের মূল নিবাস হল তুষারমৌলি হিমালয়।

এই হিমালয়েরই পূর্বদিকের একটি অংশ হিমালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে। এরপর ভারতের অসম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়ে, ফেনী নদী পেরিয়ে চট্টগ্রামের প্রায় সত্তর কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছে। ক্রমশ পর্বতমালাটি এগিয়েছে বঙ্গোপসাগরের দিকে। এই পর্বতমালার বিখ্যাত শৃঙ্গগুলি হল রাজবাড়ি টিলা (৯০০ ফুট), সাজিঢালা( ৮০১ ফুট), নঙ্গরখানা (২৯৮ ফুট) ও বাটালি (২৮০ ফুট)। পর্বতমালাটির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হল সীতাকুণ্ড বা চন্দ্রনাথ (১১৫২ফুট)। এই চন্দ্রনাথ পর্বতের চূড়ায় হাজার হাজার বছর ধরে বিরাজ করছেন জাগ্রত শিব ‘চন্দ্রনাথ’। এবং পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত জাগ্রত শক্তিপীঠে বিরাজ করছেন ‘মা ভবানী’।

চন্দ্রনাথ পর্বতের চূড়ায় শৈবতীর্থ চন্দ্রনাথ মন্দির

চন্দ্রনাথ পর্বতটিকে নিয়ে আছে নানান পৌরাণিক কাহিনি

বনবাসে থাকার সময় শ্রীরামচন্দ্র, ভাই লক্ষণ ও স্ত্রী সীতাদেবীকে নিয়ে একদিন শরভঙ্গ মুনির আশ্রমে গিয়েছিলেন। শরভঙ্গ মুনি তাঁদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক দিব্য ঋষির। সেই ঋষি রামকে বলেছিলেন, রাম স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু। রাক্ষসদের হাত থেকে মর্ত্যকে রক্ষা করার জন্যেই ‘রাম’ হয়ে জন্ম নিয়েছেন। সীতা হলেন দেবী লক্ষ্ণী। ঋষি এরপর শ্রীরামচন্দ্রকে বলেছিলেন, পূর্বদিকে চন্দ্রশেখর পর্বতে বিরাজ করছেন জাগ্রত ‘চন্দ্রনাথ’ শিব। তিনি রামচন্দ্রদের সেই স্থানে নিয়ে যেতে চান।

দিব্য ঋষির সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষণ ও সীতা এসেছিলেন ‘চন্দ্রশেখর’ (বর্তমানের সীতাকুণ্ড বা চন্দ্রনাথ) পর্বতে। সেই যুগে ‘চন্দ্রশেখর’ পর্বতের পাদদেশে ছিল মহামুনি ভার্গবের আশ্রম। চন্দ্রনাথ পর্বতে এসে মহামুনি ভার্গবের আশ্রমে গিয়েছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। তিনি যখন কথা বলছিলেন ভার্গব মুনির সঙ্গে, মা সীতা সেই সময় একাকী স্নান করতে গিয়েছিলেন। শ্রীরামচন্দ্রের আগমনবার্তা পেয়ে তাঁদের স্নানের জন্য মহামুনি ভার্গব নিজের হাতে তিনটি কুণ্ড খনন করে রেখেছিলেন। তারই একটিতে স্নান করতে গিয়েছিলেন সীতা মা।

কুণ্ডের জলে ডুব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা সীতার রূপ পালটে গিয়েছিল। নরকলেবর ত্যাগ করে মা সীতা ত্রিনেত্র ধারিনী, মেঘবর্ণা, অষ্টাদশভুজা রূপ ধারণ করেছিলেন। সীতা দেবীকে আশপাশে দেখতে না পেয়ে, শ্রীরামচন্দ্র তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছিলেন কুণ্ডটির কাছে। কুণ্ডে এসে মা সীতার কৃষ্ণকায়া ও ভীষণা রূপ দেখে শ্রীরামচন্দ্র কুণ্ডকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কলিযুগে চার হাজার বছর অবস্থান করার পর, অদৃশ্য হয়ে যাবে এই মায়াবী কুণ্ড। এরপর মা সীতা পুনরায় নরকলেবর ধারণ করেছিলেন। ভাই লক্ষণ ও সীতাদেবীকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় চন্দ্রনাথ শিব দর্শন করতে গিয়েছিলেন শ্রীরামচন্দ্র।

যে কুণ্ডে স্নান করেছিলেন মা সীতা, শ্রীরামচন্দ্রের অভিশাপে বর্তমানে তার কোনও অস্তিত্ব নেই। তবে পৌরানিক যুগেই কুণ্ডটির নাম হয়ে গিয়েছিল সীতাকুণ্ড। আজ সেই কুণ্ডটির নাম থেকেই পাহাড়, এমনকি উপজেলাটিরও নাম সীতাকুণ্ড। যদিও সীতাকুণ্ড পাহাড়টি আজ ‘চন্দ্রনাথ’ পাহাড় নামেই বেশি পরিচিত। পাহাড়ের পাদদেশে আছে সীতা মন্দির। মন্দিরে আছে দেবী সীতার মূর্তি। এছাড়াও চন্দ্রনাথ পাহাড়ে এসেছিলেন মহামুনি ব্যাসদেব। পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় আছে ‘ব্যাসকুণ্ড’। যার পাশে বসে মহামুনি ব্যাসদেব এবং অন্যান্য ঋষিগণ অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন।

ব্যাসকুণ্ড

পাহাড়চূড়ায় কে নির্মাণ করেছিলেন মন্দির!

‘চন্দ্রনাথ’ পাহাড়ে ‘চন্দ্রনাথ’ শিবমন্দিরটি কে নির্মাণ করেছিলেন, তা নিয়ে মতানৈক্য আছে। নেপালের প্রাচীন পুঁথি ‘গোপালরাজ আলোক ভামশাভালি’ থেকে জানা যায়, নেপালের ‘লিচ্ছবি’ রাজবংশের রাজা প্রচণ্ডদেবের স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন মহাদেব। তিনি রাজাকে পাঁচকোণে পাঁচটি শিবমন্দির নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন। মহাদেবের স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাজা প্রচণ্ডদেব তাঁর সভার শাস্ত্রজ্ঞদের থেকে মতামত নিয়ে, পাঁচটি পবিত্রস্থানে পাঁচটি শিবমন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

সেগুলি হলো নেপালের পশুপতিনাথ, কাশীর বিশ্বনাথ, পাকিস্তানের ভুতনাথ, মহেশখালীর আদিনাথ এবং সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ মন্দির। কিন্তু অন্য আর একটি মত অনুসারে, চন্দ্রনাথ মন্দির এবং পার্শ্ববর্তী বিরুপাক্ষ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন চট্টগ্রামেরই পরৈকোড়ার জমিদার নারায়ণ লালা। কিন্তু এই মতটি নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে। পুরাণের কথা ধরলে ও সময়কাল বিচার করলে, জমিদার নারায়ণ লালার সময়কালের বহু সহস্রাব্দ আগেই নির্মিত হয়েছিল ‘চন্দ্রনাথ’ মন্দির।

সীতাকুণ্ড বাজার থেকে চার কিলোমিটার দূরে আছে চন্দ্রনাথ পাহাড়

অটোরিক্সা স্ট্যান্ডের কাছেই আছে ‘চন্দ্রনাথ’ পর্বত এলাকায় প্রবেশের প্রথম তোরণ। এরপর ইটের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে, আসবে পাহাড়ের পাদদেশ। সেখানে রাস্তাটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। বাম দিক দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে পাহাড়চূড়ায় পৌঁছনোর ট্রেকিং রুট। পর্যটক ও ট্রেকাররা যান সেই পথে। তীর্থযাত্রীরা ও পথ ধরেন না। কারণ সে পথে কোনও মন্দির নেই। তাই তীর্থযাত্রীরা ধরেন ডানদিকের পথ।

ডানদিকের পথটির শুরুতে আছে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার মূল তোরণ। যেটির ওপর লেখা আছে,“মহাপীঠ অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভবানী ও পীঠ অধিষ্ঠাতা চন্দ্রশেখর ভৈরব শ্রী শ্রী ক্রমদীশ্বর স্বয়ম্ভুনাথ। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমিই একমাত্র ক্রমদীশ্বর। চন্দ্রনাথ পর্বতে আমি অষ্টশক্তি, অষ্টমূর্তি সহিত স্বয়ং আবির্ভূত, তাই শ্রী শ্রী ক্রমদীশ্বর স্বয়ম্ভুনাথ (স্বয়ম্ভুলিঙ্গ)।”

তোরণটির পিছনে, ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে সিঁড়িপথ। পৌঁছে গিয়েছে পাহাড়চূড়ার চন্দ্রনাথ মন্দির পর্যন্ত। এই পথ ট্রেকিং রুটটির চেয়ে অনেক কঠিন। প্রায় ২২০০ সিঁড়ি ভাঙতে হয় চন্দ্রনাথ মন্দিরে পৌঁছনোর জন্য। তোরণের সামনের দোকান থেকে তীর্থযাত্রীরা কুড়ি টাকার বিনিময়ে কিনে নেন বাঁশের লাঠি। তার পর “জয় বাবা চন্দ্রনাথ”, “জয় মা ভবানী”, “জয় বাবা চন্দ্রশেখর” ধ্বনি তুলে সিঁড়ি ভেঙে এগিয়ে চলেন পাহাড়ি পথে।

প্রাচীনকালে চন্দ্রনাথ মন্দিরে পৌঁছনোর জন্য কোনও সিঁড়ি ছিল না

বিপজ্জনক পথে, প্রায় প্রাণ হাতে করে আরোহণ করতে হত। ঘটত অনেক দুর্ঘটনা। পরবর্তীকালে তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে সিঁড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন অসংখ্য সহৃদয় মানুষ। প্রথম উদ্দ্যোগটি নিয়েছিলেন অবিভক্ত চব্বিশ পরগণার গঙ্গারাম বিশ্বাস। তিনি তাঁর মাকে নিয়ে চন্দ্রনাথ ধামে এসেছিলেন। কিন্তু দুর্গমপথ দিয়ে তাঁর মা চন্দ্রনাথ মন্দিরে পৌঁছতে পারেননি। ক্ষুব্ধ মা পুত্র গঙ্গারামকে বলেছিলেন, পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছবার জন্য সিঁড়ি তৈরি করে দিতে। মায়ের নির্দেশ মেনে ১৮৫৩ সাল নাগাদ ৭৮২টি সিঁড়ি বানিয়ে দিয়েছিলেন মাতৃভক্ত গঙ্গারাম।

কালের ছোবলে সিঁড়িগুলি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ১৯২২ সালে সিঁড়িগুলির সংস্কার করেছিলেন, চব্বিশ পরগনার জমিদার সূর্যকান্ত রায়চৌধুরী। পরবর্তীকালে অসংখ্য মানুষ সিঁড়ি নির্মাণে অর্থ দান করেছিলেন। তাই অধিকাংশ সিঁড়ির গায়ে আজও খোদাই করা আছে অর্থদাতাদের নাম। সিঁড়িগুলির নির্মাণের ফলে তীর্থযাত্রীরা পৌঁছতে পারেন চন্দ্রনাথ মন্দিরে। তবুও সিঁড়িপথে চন্দ্রনাথ মন্দিরে পৌঁছনো প্রচণ্ড কষ্টকর। কারণ সিড়ির ধাপগুলি প্রায় দেড়ফুট ফুট উঁচু।

জাগ্রত শক্তিপীঠে ‘মা ভবানী’

ঘন অরণ্যের বুক চিরে পাহাড়ের উপরের দিকে উঠে গিয়েছে আঁকাবাকা পথ। সমতল থেকে কিছুটা ওপরে আছে জাগ্রত শক্তিপীঠ ‘ভবানী মন্দির’। সবুজে ঘেরা মনোরম নৈসর্গিক পরিবেশে মধ্যে অবস্থিত গোলাপি রঙের অতি সাধারণ একটি মন্দির। মন্দিরের ভেতরে শ্বেতপাথরের সিংহাসনে বিরাজ করছেন জাগ্রত দেবী ‘মা ভবানী’ ও তাঁর ভৈরব ‘চন্দ্র‌শেখর’। পীঠনির্ণয় তন্ত্রমতে দেবীর চৌদ্দতম পীঠ হল ‘ভবানী শক্তিপীঠ’। এই পীঠে সতীর দক্ষিণ হস্ত পতিত হয়েছিল।

পীঠনির্ণয়তন্ত্রে তাই বলা হয়েছে, “চট্টলে দক্ষবাহুর্মে ভৈরব চন্দ্রশেখরঃ ব্যক্ত রূপা ভগবতী ভবানী যত্র দেবতা।।” এই শক্তিপীঠের উল্লেখ পাওয়া যায় মঙ্গলকাব্যের সর্বশেষ শক্তিমান কবি, অন্নদামঙ্গলের স্রষ্টা ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের লেখাতেও। তিনি লিখেছিলেন,” চট্টগ্রামে ডানহস্ত অর্ধঅনুভব, ভবানী দেবতা চন্দ্রশেখর ভৈরব ।।”

জাগ্রত শক্তিপীঠ ‘ভবানী মন্দির’

সারাবছর ধরেই দেশ বিদেশ থেকে ভক্তেরা আসেন সতী মায়ের কাছে। তাঁরা বিশ্বাস করেন সতী মায়ের কাছে কোনও কিছুর জন্য প্রার্থনা করলে, মা তা পূরণ করেন। মন্দিরটির উচ্চতা বেশি না থাকায় বয়স্ক মানুষ, যাঁরা পাহাড়ের শীর্ষে চন্দ্রনাথ মন্দিরে যেতে পারেন না, তাঁরা সতী মাকে দর্শন করে পাহাড় থেকে নেমে আসেন।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের আরও কিছুটা ওপরে আছে স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির। ষোড়শ শতাব্দীতে চট্টগ্রামের পরৈকোড়ার জমিদার ধনমানিক্য বাহাদুর, মুক্তাগাছার জমিদার বিদ্যাময়ী দেবী ও আরও কয়েকজনের অর্থানুকুল্যে নির্মিত হয়েছিল এই স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির। দু”হাজারের বেশি সিঁড়ি পেরিয়ে চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাওয়া যাদের পক্ষে সম্ভব হয় না, তাঁরা স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিরে মহাদেবকে পুজো দিয়ে ফিরে আসেন।

জাগ্রত দেবী ‘মা ভবানী’ ও তাঁর ভৈরব ‘চন্দ্র‌শেখর’

দুর্গম পথ এগিয়ে চলে আরও ওপরে

প্রথমদিকে তেমন কষ্ট না হলেও, ক্রমশ মইয়ের মতো খাড়া পথ ধরে উঠতে থাকবে সিঁড়ি। কোনও কোনও জায়গায় পথ এতটাই সংকীর্ণ, দু’জন মানুষ একসঙ্গে পাশাপাশি ওঠানামা করতে পারেন না। এর ওপর একপাশে পাহাড় অন্যপাশে গভীর খাদ। একটু বেসামাল হলেই পড়তে হবে তিনশো চারশো ফুট নীচে। তাই স্থানীয় মানুষরা তীর্থযাত্রীদের বারে বারে বলেন, ঘণ্টা তিনেক সময় হাতে নিয়ে ধীরে সুস্থে উঠতে।

পথে কোনও কোনও জায়গায় আছে বসবার বেঞ্চ। সিমেটের ও বাঁশ দিয়ে তৈরি। আছে টুকিটাকি খাবার, ফল, জল ও পুজোর উপকরণের দোকান। সবকিছুর দাম সমতলের প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি এত উচ্চতায় হাতের কাছেই পাচ্ছেন, সঙ্গে করে বইতে হচ্ছে না, এটাই বা কম কি। তাই বেশি দাম দিতে কার্পণ্য করেন না তীর্থযাত্রীরা।

ক্রমশ দুর্গম হয়েছে পথ

পথে যেতে যেতে তীর্থযাত্রীদের কানে ভেসে আসবে পাখির ডাক। চোখে পড়বে একগাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে যাওয়া বানরের পাল। এইভাবে প্রায় দেড় দু’ঘণ্টা যাওয়ার পর দেখা দেবে চন্দ্রনাথ পর্বতের দুটি চূড়া। দুটি চূড়াতেই আছে দু’টি মন্দির। কাছাকাছি মনে হলেও, দু’টি মন্দিরের মধ্যে দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার। বামদিকের চূড়ায় আছে ‘বিরুপাক্ষ’ মন্দির। যে মন্দিরে পুজো দিতে আসেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও। ডানদিকে, আরও ওপরে থাকা চূড়াটিই চন্দ্রনাথ পর্বতের শীর্ষস্থান। সেখানেই আছে বিখ্যাত চন্দ্রনাথ মন্দির। যার টানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চন্দ্রনাথধামে ছুটে আসছেন দেশবিদেশের মানুষ।

বিরুপাক্ষ শিব মন্দির

প্রথমে দর্শন দেন ‘বিরুপাক্ষ’ শিব

তীর্থযাত্রীরা প্রথমে এগিয়ে যান বিরুপাক্ষ মন্দিরের দিকে। শৃঙ্গটির ওপরে সামান্য সমতল স্থানে অবস্থিত এই সুপ্রাচীন বিরুপাক্ষ মন্দির। মন্দিরের ভেতরে বিরাজ করছেন জাগ্রত শিব ‘বিরুপাক্ষ’। তীর্থযাত্রীরা যে যার সাধ্যমতো পুজো দেন। কয়েকঘণ্টা ধরে চড়াই ভাঙার ধকলে ক্লান্ত তীর্থযাত্রীরা বিশ্রামও নেন বিরুপাক্ষ মন্দির প্রাঙ্গণে। তবে চারপাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য নিমেষেই ভুলিয়ে দেয় সমস্ত ক্লান্তি। মন্দিরের তিনদিকে নেমে গিয়েছে গভীর পাহাড়ি খাদ। পশ্চিমদিকে তাকালে, দৃষ্টি চলে যাবে সীতাকুণ্ড বাজার পেরিয়ে আরও অনেক দূরে। যেখানে চট্টগ্রামের সবুজ বনানীকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছে ঘন নীল বঙ্গোপসাগর।

বিরুপাক্ষ মন্দির প্রাঙ্গণ নীচের উপত্যকার দৃশ্য। দূরে বঙ্গোপসাগর

“জয় বাবা ‘চন্দ্রনাথ”

আধঘণ্টার মতো বিশ্রাম নিয়ে তীর্থযাত্রীরা ধরেন পূর্বদিকে চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাওয়ার পথ। বিরুপাক্ষ মন্দির থেকে চন্দ্রনাথ মন্দির পর্যন্ত পথে সিঁড়ি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন গোপাল চন্দ্র সাহা ও মধুসূধন সাহা নামের দুই ভাই। কিন্তু সিঁড়িগুলি খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। অত্যন্ত সংকীর্ণ এই পথকে ঘিরে আছে লম্বা লম্বা ঘাস ও ঝোপঝাড়। খুব সাবধানে এই পথটুকু পার হন তীর্থযাত্রীরা।

এক সময় অবসান হয় সব কষ্টের, সব প্রতীক্ষার। ‘জয় বাবা চন্দ্রনাথ’ ধ্বনি তুলে তীর্থযাত্রীরা পৌঁছে যান চন্দ্রনাথ মন্দির প্রাঙ্গণে। তাঁদের শ্রান্ত শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুজ উপত্যকা দাপিয়ে বেড়ানো মাতাল হাওয়া। বাবার আশীর্বাদে মুহূর্তের মধ্যে দূর হয়ে যায় ক্লান্তি। অনির্বচনীয় আনন্দে পুলকিত হয় দেহমন। সামনেই সেই মন্দির।

এই সেই পুরাণ খ্যাত চন্দ্রনাথ শিবের বর্তমান মন্দির

যে মন্দিরের ভেতরে ছোট্ট একটি কুণ্ডে ‘লিঙ্গ’ রূপ ধারণ করে বিরাজ করেছেন ‘শ্রী শ্রী চন্দ্রনাথ’ শিব। আবেগ বিহ্বল ভক্তেরা মন্দিরের দালানে শুয়ে পড়ে ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন ‘চন্দ্রনাথ’ শিবকে। দুধ ও ডাবের জল দিয়ে শিবকে স্নান করান। যথোপচারে পুজো দেন।

প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী বা শিব চতুর্দশী তিথিতে ‘শ্রীশ্রী শিবরাত্রি ব্রত’ উপলক্ষ্যে চন্দ্রনাথধামে বসে বিরাট মেলা। চন্দ্রনাথ মন্দিরে হয় চন্দ্রনাথের বিশেষ পূজা। সে সময় প্রায় দশ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় চন্দ্রনাথধামে। তীর্থযাত্রীরা আসেন ভারত, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার এমনকি শ্রীলঙ্কা থেকেও। মূল মেলাটি তিনদিন ধরে চললেও, মেলার রেশ থাকে দোল পূর্ণিমা পর্যন্ত।

বাবা ‘চন্দ্রনাথ’

চন্দ্রনাথ মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে তীর্থযাত্রীরা ঘন সবুজ উপত্যকার অপরূপ দৃশ্যাবলী উপভোগ করেন। বেশ কিছুক্ষণের জন্য তাঁদের সম্মোহিত করে রাখে, নীচে রেখে আসা জনপদগুলি, রেললাইন, হাইওয়ে, সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক, জুমচাষের রঙবেরঙের ক্ষেত, ছোট বড় হ্রদ, অসংখ্য ছোট ছোট টিলা ও হাতছানি দেওয়া সাগর। উপত্যকার আকাশে ভেসে বেড়ায় পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই সুন্দর, মনে হয় কোনও চিত্রশিল্পী বুঝি তাঁর তুলির আঁচড়ে এইসব দৃশ্যাবলী ফুটিয়ে তুলেছেন প্রকৃতির ক্যানভাসে।

চন্দ্রনাথ ধামে শিব চতুর্দশী মেলায় জনজোয়ার

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে রহস্যময় ‘উল্টাকালী’

সীতাকুণ্ড পাহাড়ের পরতে পরতে আছে রহস্য। চন্দ্রনাথ মন্দিরের পিছন দিক থেকে অত্যন্ত সংকীর্ণ একটি পাকদণ্ডি পথ নেমে গিয়েছে পাহাড়ের সবচেয়ে দূর্গম স্থানে। পথের পাশেই বিশাল খাদ। পা পিছলে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। এই পথে পার হতে হয় পাহাড়ি ঝর্না। ভয়ঙ্কর ও রোমাঞ্চকর পথের শেষে, গা ছমছম করা পরিবেশে বিরাজ করেন মা ‘পাতালকালী’।একটি প্রকাণ্ড কালো পাথরের গায়ে উল্টোভাবে খোদাই করা আছে দেবী কালিকার মূর্তি। তাই দেবীর নাম ‘উল্টাকালী’।

এই সেই কালো পাথর

কীভাবে এই পাথরটি এখানে এসেছিল, কেনই বা কালীমুর্তিটিকে উল্টোভাবে পাথরের গায়ে খোদাই করা হয়েছিল, তার উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র এই স্থানটি। তবুও উল্টাকালীর কাছে আসেন না বেশিরভাগ তীর্থযাত্রীই। কারণ দুর্গম ও ভয়াবহ এই পাহাড়ি পথ সবার জন্য নয়। এ ছাড়াও এই এলাকায় ডাকাতেরও উপদ্রব আছে।

তাই চন্দ্রনাথ ধামে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী এলেও পাতালকালীর দর্শন করার সৌভাগ্য বেশিরভাগ তীর্থযাত্রীরই হয় না। তাই সীতাকুণ্ড পাহাড়ের এই অংশটি আজও প্রায় অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে। তবে কালীপুজোর দিন ‘উল্টাকালী’ থানে জাঁক জমক করে মায়ের পুজো হয়। সেদিন প্রচুর তীর্থযাত্রী যান ‘উল্টাকালী’কে দর্শন করতে।

পাথরের গায়ে ‘মা উল্টাকালী’

চন্দ্রনাথ ধামে এসেছিলেন বিবেকানন্দ

চন্দ্রনাথ মন্দির থেকে নামার সময় ডান দিকের সিঁড়িপথ ধরে নীচে নেমে আসেন তীর্থযাত্রীরা। নেমে আসেন এক অবর্ননীয় অনুভূতি নিয়ে। যে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাই তো চন্দ্রনাথকে নিজের চোখে দেখার বাসনা নিয়ে ১৯০১ সালের এপ্রিল মাসে চন্দ্রনাথ ধামে এসেছিলেন বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ।

কামাখ্যা যাওয়ার পথে চন্দ্রনাথে এসেও, মা খুড়িমা ও বোনকে চন্দ্রনাথ মন্দির দর্শন করাতে পারেননি স্বামীজী। ঘন জঙ্গল ও দুর্গম পথের জন্য। তাই পাহাড়ের পাদদেশে পঞ্চবট স্থাপন করে, সেখানেই করেছিলেন মহাদেবের পুজো। আজও আছে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত ‘পঞ্চবটি’। সীতাকুণ্ডের শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম স্থানটিকে সংরক্ষণ করে রেখেছে।

রহস্যময় শৈবতীর্থ চন্দ্রনাথের আকর্ষণ তাই দুর্নিবার। উত্তরোত্তর ভিড় বাড়ছে চন্দ্রনাথে। আকুল হয়ে বাবাকে দর্শন করতে ছুটে আসছেন লক্ষ লক্ষ ভক্ত। অনেকের ইচ্ছা থাকলেও আসতে পারেন না চন্দ্রনাথ ধামে। স্থানীয় মানুষরা বলেন, কেউ যদি ‘চন্দ্রনাথ’ ধামে আসতে নাও পারেন, ‘চন্দ্রনাথ’ ধামের কথা শ্রবণ বা পাঠ করলেও ‘চন্দ্রনাথ’ দর্শনের সমান পুণ্য হয়।

You might also like