Latest News

আমেরিকার পাহাড়ে ইয়েতির ছায়া! আজও নাকি দেখা মেলে এক রহস্যময় গুহামানবের

প্রায় দুশো বছর ধরে দৈত্যাকৃতি গুহামানবদের স্বচক্ষে দেখার দাবি করে আসছেন উত্তর আমেরিকা ও কানাডার বহু মানুষ।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আমেরিকার উত্তর ক্যারোলিনায় আছে জঙ্গল ও পাহাড় দিয়ে ঘেরা ক্লেভল্যান্ড কাউন্টি। ২০১০ সালের ৫ জুন। সে দিন ভোরে কাউন্টির বাসিন্দা টিম পিলার, তাঁর ফার্ম হাউসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেকড়ের ডাক নকল করছিলেন। তাঁর পাঁচটি কুকুর বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছিল। হঠাৎই চঞ্চল হয়ে উঠেছিল কুকুরগুলি। তারস্বরে ডাকতে ডাকতে ছুটে গিয়েছিল জঙ্গলের দিকে।

জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল ডালপালা ভাঙার শব্দ ও কুকুরদের চিৎকার। হঠাৎ একটি কুকুরের আর্তনাদ শুনে মোটা লাঠি নিয়ে দৌড়ে গিয়েছিলেন টিম। ঘটনাস্থলে পৌঁছে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কুকুরগুলি ঘিরে ধরেছে প্রায় দশ ফুট লম্বা একটি প্রাণীকে। মানুষের মত দেখতে প্রাণীটির গায়ে হলুদ রঙের লোম। মুখে হলুদ রঙের লম্বা দাড়ি, মাথায় হলুদ রঙের লম্বা চুল। প্রাণীটির হাতে ও পায়ে ছ’টি করে আঙুল। এরকম অদ্ভুত প্রাণী জীবনে দেখেননি টিম।

টিম পিলার

প্রাণীটির হা্তে ঝুলছিল টিমের প্রিয় কুকুর লুসির ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ। লাঠি উঁচিয়ে চিৎকার করতে করতে প্রাণীটির দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন টিম। ছুঁড়তে শুরু করেছিলেন পাথর। টিমের দিকে একবার এগিয়ে এসেও থমকে গিয়েছিল প্রাণীটি। তারপর রক্তজল করা গর্জন করে চকিতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল জঙ্গলের গভীরে। ডালপালা ভাঙতে ভাঙতে চলে গিয়েছিল জঙ্গলের পিছনে থাকা পাহাড়টির দিকে।

কাউন্টি পুলিশের ৯১১ নম্বরে ফোন করেছিলেন টিম। পুলিশ এসেছিল, কিন্তু টিমের কথা বিশ্বাস করেনি। পুলিশ বলেছিল, হয়ত কোনও ভাল্লুককে দেখেছিলেন টিম। দ্য শার্লোট অবজার্ভার ও দ্য ইন্ডিয়ান নিউজকে টিম বলেছিলেন, তিনি একশো শতাংশ নিশ্চিত, জন্তুটি ভাল্লুক, গরিলা বা শিম্পাঞ্জিও ছিল না। ওটি ছিল রহস্যময় গুহামানব বা বানরমানুষ বা ‘বিগফুট’।

টিম একা নয়, দেখেছেন অনেকেই

প্রায় দুশো বছর ধরে দৈত্যাকৃতি গুহামানবদের স্বচক্ষে দেখার দাবি করে আসছেন উত্তর আমেরিকা ও কানাডার বহু মানুষ। এরকম সাড়ে তিনহাজার ঘটনার কথা ছড়িয়ে আছে কানাডা ও উত্তর আমেরিকার পাহাড়ে পাহাড়ে। তবে স্থানভেদে পালটে গিয়েছে গুহামানবের নাম। সাসকুয়াচ, বিগফুট, সোয়াম্প এপ, গ্রাসম্যান, বগি ক্রিক মনস্টার, মোমো, উড বুগার, মোগোলন, প্রভৃতি নামে ডাকা হয়েছে রহস্যময় গুহামানবকে।

১৯৭০ সালে তোলা এই ছবিটি রহস্যময় গুহামানবের বলে দাবী করা হয়েছিল

রেভারেন্ড এলকানা ওয়াকার, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে ওয়াশিংটনের ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে প্রথম শুনেছিলেন এই গুহামানবের কাহিনি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট, ১৮৯৩ সালে তাঁর লেখা ‘দ্য ওয়াইল্ডারনেস হান্টার’ বইটিতে বাউম্যান নামে এক বৃদ্ধ পাহাড়ি মানুষের কথা উল্লেখ করেছিলেন। রহস্যময় গুহামানবকে বাউম্যান নিজের চোখে দেখেছিলেন ইডাহো-মন্টানা সীমান্তের জঙ্গলে। বৃদ্ধের সঙ্গীকে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছিল গুহামানব। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট লিখেছিলেন, কাহিনিটি বলার সময় বৃদ্ধ রীতিমতো কাঁপছিল।

এই ছবিটির ফোটোগ্রাফারও একই দাবী করেছিলেন

মাউন্ট সেন্ট হেলেনের এক গিরিখাতে একদল খনি শ্রমিকদের সঙ্গে একদল বিশালাকৃতি বানরমানুষের লড়াই হয়েছিল ১৯২৪ সালে। ১৬ জুলাই ‘দ্য ওরেগনিয়ান’ পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর গিরিখাতটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘এপ ক্যানিয়ন’। ১৯২৪ সালেই কানাডার ব্যবসায়ী আলবার্ট অসম্যান পুলিশকে জানিয়েছিলেন, একদল বানরমানুষ তাঁকে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার টোবা খাঁড়িতে ছ’দিন বন্দি করে রেখেছিল। ১৯৭৮ সালে কিংস মাউন্টেনে এক গুহামানবকে দেখা গিয়েছে বলে দাবি করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা দৈত্যাকৃতি বানরমানুষের নাম দিয়েছিলেন ‘নব্বি।’

কেমন দেখতে আমেরিকার গুহামানবকে!

বিভিন্ন এলাকায় নাম ভিন্ন হলেও, প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রাণীটির যে দৈহিক বিবরণ দিয়েছিলেন, তা প্রায় সবক্ষেত্রে এক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, এই গুহামানবদের উচ্চতা দশ থেকে বারো ফুট। লম্বা লম্বা হাত ও পা। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটে প্রাণীটি। পায়ের পাতা প্রায় চব্বিশ ইঞ্চি লম্বা, চওড়ায় আট ইঞ্চি। হাঁটার সময় মাটিতে তাদের পায়ের গভীর ছাপ পড়ে যায়।

দাবী করা হয়েছে, এটাই গুহামানবের পায়ের ছাপ

এদের পেশিবহুল শরীর ঢাকা থাকে  কালো, হলুদ, বাদামি বা গাড় লালচে লোম দিয়ে। পাথরের মত শক্ত চামড়া ভেদ করতে পারে না তিরের ফলা। প্রাণীটির শরীর থেকে পচা ডিমের মত তীব্র গন্ধ বের হয়। মুখটা আদিম মানুষের মত। সেরকমই চ্যাপটা নাক, পুরু ঠোঁট। চোখের মণি দিনের বেলায় কালো রঙের দেখতে হয়, কিন্তু রাতে হলুদ বা লাল টুনির মত জ্বলে। দিনের বেলা এদের দেখা যায় না। এরা সাধারণত রাতের বেলা বের হয়।

পূর্ব হিমালয় জুড়ে ছড়িয়ে আছে ইয়েতি বা তুষারমানবের কাহিনি। হিমালয়ে বাস করা মানুষ ও বিজ্ঞান ইয়েতির অস্তিত্বকে প্রমাণ ও খারিজ করার চেষ্টা করে চলেছে যুগের পর যুগ ধরে। তবে পূর্ব হিমালয়ের লোকগাথায় কিন্তু ইয়েতি বিরাজ করছে কয়েক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে।

ইয়েতির ছবি (কাল্পনিক)

বিখ্যাত অ্যানথ্রোপলজিস্ট ডেভিড ডায়েগলিং বলেছিলেন, হিমালয়ের ইয়েতির মতই আমেরিকার লোকগাথাতেও হাজার বছর ধরে বিরাজ করছে এক রহস্যময় গুহামানব। যার কাহিনি শোনায় চোকটাউ ও চেরোকি ইন্ডিয়ানেরা। যার ছবি দেখতে পাওয়া যায় নেটিভ ইন্ডিয়ানদের পূর্বপুরুষের আঁকা গুহাচিত্রগুলিতে। তবে আমেরিকার গুহামানবেরা হিমালয়ের ইয়েতিদের মত লাজুক নয়। সদম্ভে এরা জাহির করে নিজের উপস্থিতি। তাই স্থানীয় মানুষের সঙ্গে গুহামানবদের দেখা হওয়ার প্রচুর ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। 

চোকটাউ ইন্ডিয়ানদের বিপদের বন্ধু গুহামানব ‘শামপে’

চেরোকি ইন্ডিয়ানদের মত চোকটাউরা বিশ্বাস করে পাতালপুরী থেকে পৃথিবীর জমিতে উঠে এসেছিল তাদের পূর্বপুরুষেরা। মিসিসিপির পবিত্র নানিহ ওয়েইয়া স্তুপের নীচে আছে সেই পাতালপুরী। পৃথিবীর বুকে উঠে আসার পর পাতালপুরী দখল করেছিল ‘শামপে’। এক অতিকায় গুহামানব। সূর্যের আলোয় ‘শামপে’ দেখতে পেত না। তাই সে রাতে গুহার বাইরে শিকার ধরতে বের হত।

শামপের ছবি ( কাল্পনিক)

পাতালপুরী থেকে বেরিয়ে আসার পর, জঙ্গল নদী পাহাড় পেরিয়ে চোকটাউয়েরা চলেছিল উপযুক্ত বাসভূমির সন্ধানে। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ‘ওঝা’। তার হাতে ছিল লাল লাঠি। প্রত্যেক সন্ধ্যায় ওঝা যেখানে লাঠিটি পুঁতে দিত, সেটাই হত রাতের আস্তানা। পরদিন সকালে দেখা যেত লাঠিটি পূর্বের দিকে ঝুঁকে গেছে। ওঝা বলত, আরও পূর্বে যেতে হবে। তবেই মিলবে বাসভূমি। যতক্ষণ না লাঠিটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, ততক্ষণ আমাদের চলতেই হবে। চোকটাউয়েরা চলার সময় শুনতে পেত জঙ্গল ভাঙার আওয়াজ। ওঝা বলত পূর্বপুরুষদের আত্মা ‘ওসিমি’ চলেছেন তাদের সঙ্গে।

চোকটাউ চিফ

একরাতে বিশ্রামরত চোকটাউদের আক্রমণ করেছিল নীল চোখ, সাদা চামড়ার দৈত্যেরা। তাদের গায়ে ছিল চামড়ার পোশাক। হাতে কুঠার ও কাঁটা লাগানো মুগুর। প্রায় বিনাযুদ্ধে মারা যাচ্ছিল ঘুমন্ত চোকটাউরা। কিন্তু বাতাসে হঠাৎ ভেসে এসেছিল তীব্র পচা গন্ধ। বুনো ঝোপের ওপরে দেখা দিয়েছিল দুটো লাল চোখ। সে চোখ শামপের। একটা বিশাল গাছ উপড়ে নিয়ে সাদা দৈত্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শামপে।

জান্তব জিঘাংসা নিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে শামপে নিকেশ করেছিল সাদা দৈত্যদের। তারপর আবার হারিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলে। ক্রমশ দূরে সরে গিয়েছিল গাছ ভাঙার আওয়াজটা। চোকটাউয়েরা বুঝেছিল তাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়ে ফিরে গেল শামপে। তবে নতুন বাসভূমিতেও চোকটাউয়েরা শামপের গন্ধ পেত।  মাঝে মাঝে এসে শামপে তাদের দেখে যেত। চোকটাউ ইন্ডিয়ানেরা আজও নাকি শামপের গন্ধ পায়। তারা বিশ্বাস করে, আজও তাদের খেয়াল রাখে শামপে।

চেরোকি ইন্ডিয়ানদের শিকারের দেবতা গুহামানব ‘সুলকালু’

উত্তর ক্যারোলিনার ‘পিজিয়ন’ নদীর তীরে ছিল জনপদ ‘কানুগা’। বহুদিন আগে কানুগাতে মেয়েকে নিয়ে বাস করত এক বিধবা। রুপসী মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছিল। তবুও বিধবা মা মেয়েকে অপেক্ষা করতে বলত। একজন ভাল শিকারি পেলে তবেই বিয়ে করতে বলত। যে শিকারি রোজ মা ও মেয়েকে পর্যাপ্ত মাংস দিতে পারবে। শিকারি স্বামীর অপেক্ষায় দিন কাটত মেয়েটির।

মেয়েটির মা রাতে শুতেন বাড়িতে। সমাজের রীতি মেনে মেয়েটি শুত বাড়ির সামনে থাকা একটি কুঁড়েতে। একদিন রাতে এক অচেনা পথিক এসেছিল মেয়েটির কুঁড়েতে। মেয়েটি পথিকের মুখ দেখতে পায়নি অন্ধকারে। পথিক মেয়েটিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। মেয়েটি বলেছিল, সে বীর শিকারি ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না। তাছাড়া তার স্বামীকে রোজ বাড়িতে মাংস আনতেই হবে। পথিক মেয়েটিকে বলেছিল সে সেরা শিকারী। প্রমাণ দিতে বলেছিল মেয়েটি।

পথিক মিশে গিয়েছিল অন্ধকারে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরেছিল বিশাল একটা হরিণ শিকার করে। শিকারিকে স্বামী বলে মেনে নিয়েছিল মেয়েটি। ঢুকতে দিয়েছিল তার ঘরে। মেয়েটির সঙ্গে রাত কাটিয়ে ভোর হওয়ার আগেই চলে গিয়েছিল শিকারি। মেয়েটি তার স্বামীর মুখ দেখতে পায়নি। তবে সে বুঝেছিল তার স্বামীর চেহারা সাধারণ পুরুষের মত নয়। সকালে সব শুনে ও হরিণ পেয়ে খুশি হয়েছিল মা।

পরের রাতে আবার এসেছিল শিকারি। সেই রাতে দিয়ে গিয়েছিল দুটি হরিণ। মেয়েকে বিধবা বলেছিলেন, শিকারি যেন কিছু জ্বালানি কাঠ দিয়ে যায়। মায়ের কথা যেন শুনতে পেয়েছিল শিকারি। রাতে এসে বলেছিল, সে কাঠ নিয়ে এসেছে। পরের দিন ভোরবেলায় মা মেয়ে দেখেছিল, তাদের বাড়ির সামনে পড়ে আছে গোড়া থেকে উপড়ে আনা বিশাল বিশাল গাছ। রেগে গিয়েছিল মা। মেয়েকে বলেছিল, তাদের কাঠ দরকার গাছ নয়। পরের রাতেই উধাও হয়ে গিয়েছিল গাছগুলি। সেই জায়গায় রাখা ছিল কাঠের বিশাল এক স্তুপ। প্রায় প্রত্যেক রাতেই আসত শিকারি। অন্ধকার থাকতে থাকতে ফিরে যেত শিকার দিয়ে।

মেয়েটির মা শিকারিকে দেখতে চেয়েছিল। রাজি হয়নি শিকারি। মেয়েটি কাঁদতে থাকায় শিকারি বলেছিল, একটি শর্তে সে শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করবে। শাশুড়ি যেন ভয় না পায়। সেই ভোরে শিকারি ফিরে যায়নি। মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে মাকে নিয়ে এসেছিল। মা এসে দেখেছিল, ঘরের মধ্যে শুয়ে আছে দৈত্যাকৃতি এক মানুষ। সারা গায়ে ভাল্লুকের মত বড় বড় লোম। হাতের নখগুলি বড় ছুরির মতো লম্বা ও ধারালো। ‘সুলকালু’ ‘সুলকালু’ ( ঢালু বড় চোখ) বলে চিৎকার করতে করতে পালিয়ে গিয়েছিল আতঙ্কিত মা।

প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল সুলকালু। গর্জন করতে করতে ছুটেছিল পাহাড়ের দিকে। সেদিন বিকেলে মেয়েটির শরীর থেকে বেরিয়ে এসেছিল রক্তের ডেলা। সেই রক্তের ডেলা মেয়েটির মা ফেলে এসেছিল নদীতে। কয়েকদিন পর ফিরে এসেছিল সুলকালু। স্ত্রীকে বলেছিল, তার সন্তান কোথায়। মেয়েটি বলেছিল, রক্তের ডেলা ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। সেই রক্ত মা ফেলে দিয়ে এসেছে নদীতে। 

নদী তোলপাড় করে সুলকালু খুঁজে পেয়েছিল রক্তের ডেলার সামান্য কিছু অংশ। মেয়েটির কাছে নিয়ে আসার সময় রক্তের ডেলাটি বৃদ্ধি পেতে পেতে পরিণত হয়েছিল এক অপরূপ শিশু কন্যায়। কন্যাটি তার স্ত্রীকে দিয়ে সুলকালু বলেছিল, আর সে এই গ্রামে আসবে না। তাই স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সে তার নিজের বাড়ি ফিরতে চায়। মাকে বিদায় জানিয়ে শিশুকন্যাটিকে নিয়ে মেয়েটি তার গুহামানব স্বামীর সঙ্গে এগিয়ে চলেছিল পাইলট মাউন্টেনের দিকে।

পাইলট মাউন্টেন

মেয়েটির বিয়ের খবর পেয়ে গ্রামে এসেছিল মেয়েটির দাদা। মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল শিশু কন্যাকে নিয়ে তার বোন স্বামীর সঙ্গে চলে গেছে পাহাড়ের দিকে। দাদা বলেছিল সে বোনকে ফিরিয়ে আনবে। সুলকালুর প্রকাণ্ড পায়ের ছাপ অনুসরণ করতে করতে জঙ্গলের পথে এগিয়ে চলেছিল দাদা। একসময় পাইলট মাউন্টেনের পাদদেশে এসে গিয়েছিল সে। তারপর উঠে গিয়েছিল পাহাড়ে।

রাতের অন্ধকারে পাহাড় কেঁপে উঠেছিল ড্রামের আওয়াজে। শব্দের উৎস খুঁজে খুঁজে দাদা চলে এসেছিল একটি গুহামুখের কাছে। গুহার ভেতরে প্রচুর নারী পুরুষ গাইছিল নাচছিল। তাদের মধ্যে ছিল তার বোনও। বোনকে ডেকেছিল দাদা। থেমে গিয়েছিল ড্রামের আওয়াজ। গুহার বাইরে এসে স্বামীর কথা বলেছিল বোন। বলেছিল তার স্বামী দেখতে ভয়ঙ্কর হলেও সে অসাধারণ বীর। শিকারিদের দেবতা ‘সুলকালু’। তার অনুমতি ছাড়া জঙ্গলে কেউ শিকার করতে পারে না।

কানুগা গ্রামে ফিরে এসেছিল দাদা। কিন্তু সুলকালুকে দেখার জন্য তার মন ছটফট করছিল। চারবছর পর বোন দাদাকে গুহার ভেতরে যেতে বলেছিল। গুহার ভেতরে ছিল অন্ধকার, সেখান থেকে ভেসে এসেছিল বুকের রক্ত জল করে সেই কণ্ঠস্বর। সুলকালু বলেছিল, সে গ্রামের লোকদের দেখা দেবে। তবে এর জন্য সাতদিন উপবাস করে, নতুন পোশাক পরে গুহার সামনে আসতে হবে গ্রামবাসীদের। তবে একজনও উপবাস ভাঙলে বা এই সময়ের মধ্যে অস্ত্র হাতে নিলে সুলকালুর দেখা মিলবে না।

গ্রামের লোকেরা পাহাড়ের নীচে এসে উপবাস করা শুরু করেছিল। কিন্তু গ্রামের লোকেদের ভিড়ে ঢুকে গিয়েছিল অন্য উপজাতির একটি লোক। রাতে সবাই যখন ঘুমোত সে দূরে গিয়ে খেয়ে আসত। উপবাসের সপ্তম দিনে পাহাড় থেকে পাথর গড়ানোর ভয়াবহ আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল গ্রামবাসীরা। শুনতে পেয়েছিল হাড়হিম করে দেওয়া এক গর্জন। Tsul Kalu

ভয়ে কাঁপছিল গ্রামবাসীরা। কিন্তু অন্য উপজাতির লোকটি অজানা শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য হাতে তুলে নিয়েছিল বর্শা। মুহূর্তের মধ্যে ভয়ঙ্কর ঘুর্ণিঝড় গ্রাস করেছিল যোদ্ধাটিকে। যোদ্ধার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে রক্ত মাংস ছড়িয়ে পড়েছিল মাটিতে। অদৃশ্য সুলকালু বলেছিল, “তোমরা আমার শর্ত ভেঙেছ। আর কোনওদিনই  তোমরা আমাকে দেখতে পাবে না।” সত্যিই আর কোনওদিন দেখা যায়নি সুলকালুকে। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পাইলট মাউন্টেনের গুহামুখ।

সত্যিই গুহামানব আছে আমেরিকার পাহাড়ে!

না নেই। বিজ্ঞানীরা মনে করেন পুরোটাই উপজাতিদের অন্ধবিশ্বাস। বিখ্যাত ইকোলজিস্ট রবার্ট পাইল লিখেছিলেন, আমেরিকার ইন্ডিয়ানদের ওপর লোককাহিনির প্রভাব অসীম। তাই তারা গুহামানবের কাহিনিগুলি সত্যি বলে ভাবে। দু’পায়ে দাঁড়ানো অতিকায় গ্রিজলি ভাল্লুককে রাতের আঁধারে গুহামানব বলে ভাবে।

গ্রিজলি ভাল্লুক

প্রাইমেটোলজিস্ট জন নেয়ার ও অ্যানথ্রোপলজিস্ট গর্ডন স্ট্রাসেনবার্গ একবার ঠাট্টার ছলে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “আমেরিকার গুহামানবকে দেখতে অনেকটা পারানথ্রপাস রোবাস্টাসের (Paranthropus robustus) মত। এই শ্রেণীর আদিম মানবেরা বোধ হয় দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় চলে এসেছিল পৃথিবীর সেরা মানুষ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। আজও সেরা হতে পারেনি, তাই লজ্জা পেয়ে লুকিয়ে আছে পাহাড়ের গুহায়।” 

গুহামানব নিয়ে বিজ্ঞান যতই হাসাহাসি করুক, চিরোকি ও চোকটাউ ইন্ডিয়ানেরা কিন্তু আজও তাদের সন্তানদের বলে, “সবটাই ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিও না। রাতের বেলা পচা ডিমের মত কোনও গন্ধ পেলে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তাকে অভিবাদন করবে।” চিরোকি ও চোকটাউ শিশুরা জানলে অবাক হয়ে যেত, একইভাবে ইয়েতিকে অভিবাদন জানায়, হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বতের কালাং গ্রামের শিশুরা।

You might also like