Latest News

স্বামীকে খেয়ে বিধবা হয়েছিলেন দেবী সতী, রহস্যময়ী সেই দেবীর পুজো করে কারা?

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো:. দক্ষকন্যা সতীকে বিয়ে করে হিমালয়ের বুকে বেশ সুখেই ঘরকন্না করছিলেন মহাদেব। কিন্তু দেবাদিদেব মহেশ্বরের সুখও যে এত ক্ষণস্থায়ী তা কে জানত! প্রজাপতি দক্ষ এবং প্রসূতি দেবীর সবচেয়ে ছোট মেয়ে সতী, সবচেয়ে আদরেরও। আর সেই মেয়েই কী না বাবা-মায়ের অমতে শ্মশানচারী শিবের গলায় মালা দিল! জামাই হিসাবে ভোলানাথকে মেনে নেওয়া তো দূর, রাগে ক্ষোভে মেয়ে সতীর সঙ্গেও সম্পর্কচ্ছেদ করেন দক্ষ।

Image - স্বামীকে খেয়ে বিধবা হয়েছিলেন দেবী সতী, রহস্যময়ী সেই দেবীর পুজো করে কারা?

এই ঘটনার কিছুদিন পর ‘বৃহস্পতি’ নামে এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন দক্ষ প্রজাপতি। সেই যজ্ঞে নিমন্ত্রণ পায় ত্রিলোকের সব্বাই। কেবল বাদ দেওয়া হয় সতী আর শিবকে। এদিকে লোকমুখে সেই মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠানের খবর জানতে পেরে চঞ্চল হয়ে ওঠে দেবী সতীর মনও। নাহয় বাপ-মা একটু অভিমান করেছে, ডাকেনি যজ্ঞে, কিন্তু তাতে কি! মেয়ে যাবে বাপের বাড়ি, তার জন্য আবার আমন্ত্রণ লাগে না কি! বিনা নিমন্ত্রণেই দক্ষালয়ে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন সতী মহাদেবের কাছে। প্রমাদ গণলেন শিব। তাঁকে অপমান করার জন্যই যে এই শিবহীন যজ্ঞের আয়োজন, তা বুঝতে দেরি হয়নি মহাদেবের। কিন্তু সতী তখন বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য ছেলেমানুষের মতো অধীর। শিবের কোনও যুক্তিই কানে তুলতে রাজি নন তিনি। উলটে অভিমানের বশে ভেবে নিলেন স্বামী বুঝি তাঁকে খুব সাধারণ মেয়ে ভেবে নিয়েছে, দুর্বল ভেবেছে। তিনিই যে স্বয়ং ভগবতী, দেবাদিদেব কি ভুলে গেলেন সে কথা! রাগে কাঁপতে কাঁপতে দেবী সতী দশ মহাবিদ্যার রূপ ধারণ করে দশ দিক দিয়ে ঘিরে ফেললেন শিবকে। সুকুমারী তন্বী সতীর বদলে ভীত সন্ত্রস্ত শিবের পথরোধ করে দাঁড়ালো দশ ভয়ঙ্করী দেবী।

মুণ্ডমালা তন্ত্র অনুসারে এই ‘দশমহাবিদ্যা’র দেবীরা হলেন কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা। এই দশ দেবীর সপ্তম দেবী ধূমাবতী। তিনিই একমাত্র দেবী যিনি অপারযৌবনা নন। তিনি বৃদ্ধা এবং কুৎসিত। এই দেবীর কোনও ভৈরবও নেই। দেবী নিরাভরণা, তাঁর রুক্ষ চুল, পরনে খুব মলিন সাদা পোশাক, স্বামীহীনা বিধবা বেশ। রোগা জীর্ণ শরীর, কোটরে বসে যাওয়া চোখদুটো যেন জ্বলছে, তীক্ষ্ণ দাঁতের কয়েকটি পড়ে গেছে, হাসলে তাঁকে ফোকলা মনে হয়। কখনও কখনও দেবীর হাতে দেখা যায় ত্রিশূল। গলায় থাকে নরমুণ্ডমালা। এই শীর্ণকায়া, দীর্ঘাকার, রোগগ্রস্থা ও পাণ্ডুরবর্ণা দেবীই ধূমাবতী। (Devi Dhumavati)

Image - স্বামীকে খেয়ে বিধবা হয়েছিলেন দেবী সতী, রহস্যময়ী সেই দেবীর পুজো করে কারা?

এখন প্রশ্ন হল, দেবী ধূমাবতী কেন বিধবা, বা দশমহাবিদ্যার অন্যান্য দেবীদের মতো তাঁর কোনও ভৈরব নেই কেন? এ ব্যাপারে বেশ মজার একটা গল্প পাওয়া যায় ‘প্রাণতোষিণী’ তন্ত্রে। একবার খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠেছিলেন দাক্ষায়ণী সতী। ঘরে এক দানা খাবার নেই, তাই সোজা স্বামী মহাদেবের কাছে গিয়ে খাবার চেয়ে বসেন দেবী। কিন্তু শিব তাঁকে জানান এই মুহূর্তে দেওয়ার মতো খাবার তাঁর কাছেও নেই। খিদে সইতে না পেরে, রাগে দুঃখে তখন স্বামী শিবকেই গিলে ফেলেন দেবী। দেবীর জঠরে আটকে পড়েন মহাদেব। বেগতিক দেখে কোনওভাবে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য সকাতর অনুরোধ কর‍তে থাকেন দেবীকে। অন্যদিকে শিবের প্রবল তেজে দেবীর সারা শরীরে প্রদাহ তৈরি হয়, শরীর থেকে ধোঁয়া বা ধূম বেরোতে শুরু করে। বিরক্ত সতী ফের উগড়ে দেন স্বামীকে। এরপর মুক্তি পেয়ে ক্রুদ্ধ শিব অভিশাপ দেন দেবীকে। স্বামীকে গিলে ফেলার দরুণ তাঁর এই বৈধব্যরূপ, আর সারা শরীর থেকে ধূম নির্গত হওয়ায় দেবীর নাম ধূমাবতী (Devi Dhumavati)

আবার কোনও কোনও শাস্ত্র অনুসারে দেবী সতী যখন দক্ষযজ্ঞে প্রাণ বিসর্জন করেন, তখন যজ্ঞের আগুন থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠেছিল বিকট কালো ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া বা ধূমই দেবী ধূমাবতীর রূপ ধারণ করে যজ্ঞনাশ করে। এই দেবী কুটিলা, কোপনস্বভাবা, দেবীর গায়ের রং ধোঁয়ার মতোই কালো।

শুধু দশমহাবিদ্যা নয়, সনাতন দেব-দেবীদের মধ্যে ধূমাবতী সত্যিই অনন্যা, অপার রহস্যময়ীও বটে। মহাপ্রলয়ের সময় বিশ্বের সমস্ত পুরুষকে ধ্বংস করে শূন্যে বিলীন হন তিনি। তাঁর এক হাতে থাকে কুলো ও অন্য হাতে বরদা-মুদ্রা। সাক্ষাৎ ভয়ের প্রতিমূর্তি তিনি। শ্মশানে মশানে ঘুরে বেড়ানো এই দেবীর বাহন অশ্বহীন রথ অথবা কাক। বৈদিক দেবী জ্যেষ্ঠা, নির্ঋতি বা অলক্ষ্মীর সঙ্গে দেবী ধূমাবতীর কিছু কিছু মিল চোখে পড়ে।  এঁরা প্রত্যেকেই মৃত্যু, দারিদ্র, ক্ষুধা এবং অভাবের দেবী। তবে প্রাথমিকভাবে ধূমাবতী তান্ত্রিক দেবী। পরবর্তীকালে বৈদিক ধর্মে তাঁর আত্তীকরণ ঘটে। (Devi Dhumavati)

Image - স্বামীকে খেয়ে বিধবা হয়েছিলেন দেবী সতী, রহস্যময়ী সেই দেবীর পুজো করে কারা?

হিন্দু ধর্মে বিধবাদের অশুভ ধরা হয়। দেবী ধূমাবতীও সেই ভাবনার ফসল। তাঁকে অমঙ্গলের দেবী মনে করে সাধারণ ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা হয়। বিবাহিত নারী-পুরুষকে ধূমাবতীর পূজা করতে বারণ করা হয়। কথিত আছে, ধূমাবতীর পূজা করলে জাগতিক বিষয়ে বিতৃষ্ণা জাগে, মন একা আর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। আধ্যাত্মিক সাধনার উপযোগী এই মন রোজকার সংসারে টিকতে চায় না। শাস্ত্রমতে দেবীকে কেবল আইবুড়ো, বিধবা এবং সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীরাই পুজো করে থাকেন। একা মানুষ, বিশেষত বিধবাদের প্রতি দেবী ধূমাবতীর পক্ষপাত আর বরাভয় থাকে সবসময়। বিধবারাই একমাত্র তাঁর দৈবী শক্তি সহ্য করতে পারে বলে মনে করা হয়। সাধারণ গেরস্থ সংসারে তাই দেবী ধূমাবতীর পুজো শুধু অপ্রচলিতই নয়, কঠোরভাবে নিষিদ্ধও বটে। (Devi Dhumavati)

ধূমাবতীর মন্দির প্রায় দেখাই যায় না। বারাণসীতে অন্নপূর্ণা মন্দিরের কাছে দেবী ধূমাবতীর মন্দির রয়েছে। বীরাচারী তন্ত্রসাধকদের পাশাপাশি সে মন্দিরে গৃহস্থেরাও পুজো দিতে পারে। এছাড়া ঝাড়খণ্ডের রাজরাপ্পা এবং অসমের কামাখ্যা মন্দিরের কাছে দেবী ধূমাবতীর একটি করে মন্দির আছে। মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া অঞ্চলেও দেবী ধূমাবতীর মন্দির আছে। তবে অনেকেই জানেন না আমাদের বাংলাতেও এক মন্দিরে পূজিতা হন দেবী ধূমাবতী। তবে সেখানে তিনি পরিচিতা পেটকাটি দেবী নামে।

You might also like