Latest News

তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কলেজ থেকে, শোভাবাজার রাজবাড়িতে জুটেছিল চরম অসম্মান

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: চাকরি গেছে, টাকাপয়সাও শেষ প্রায়। প্রবল অন্নকষ্টে, প্রায় না খেতে পেয়ে এক একটা দিন কাটছে। ঠিক এমনই সময় এল সেই অভাবিত নিমন্ত্রণ। যে সে লোক নয়, ডাক পাঠিয়েছেন শোভাবাজারের রাজা স্বয়ং। তিনি শুনেছিলেন, হিন্দুদের কাছে অতিথি না কি নারায়ণ, ঈশ্বরতুল্য। আর শোভাবাজার রাজবাড়ির আতিথেয়তার কথা কে না জানে! হোক না ভিন্নমতের মানুষ, সসম্মানে ডেকে পাঠিয়েছেন যখন, অন্তত একটা বেলা ভরপেট খাবার তো জুটবে। কতকটা সেই আশায় ভর করেই একমাত্র ছোট বোনের হাত ধরে পৌঁছে গিয়েছিলেন রাজবাড়ি। কিন্তু আপ্যায়নের বদলে কী জুটল? অসম্মান। লাঞ্ছনা। উৎসব প্রাঙ্গণে সমাজের মান্যগণ্য মানুষদের ভিড়ে অপমানে অপমানে জর্জরিত করা হল তাঁকে। সতী হতে না চাওয়া এক অসহায় তরুণীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি। সেই অপরাধে, মাথা নীচু করে প্রায় চোরের মতো বোনের হাত ধরে সেদিন পথে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। অভুক্ত, অসুস্থ, অপমানিত। সেই তিনি তৎকালীন বাংলার তরুণ পণ্ডিত, নবজাগরণের পথিকৃৎ, হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও। (Derozio)

Image - তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কলেজ থেকে, শোভাবাজার রাজবাড়িতে জুটেছিল চরম অসম্মান

পুরো নাম হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। জন্ম ১৮০৯-এর ১৮ এপ্রিল কলকাতার মৌলালি অঞ্চলে এক ইউরেশীয় পরিবারে। তাঁর বাবার নাম ফ্রান্সিস, মা সোফিয়া। মাত্র ছ’বছর বয়সে মাকে হারান হেনরি। ছোট ছেলেমেয়ের কথা ভেবেই আনা মারিয়া নামে এক ইংরেজ মহিলাকে এরপর বিয়ে করেন তাঁর বাবা। আনার নিজের বাচ্চাকাচ্চা না থাকায় সতীনের সন্তানদের নিজের ছেলে মেয়ের মতোই দেখতেন। বেশ সচ্ছল পরিবারেই জন্মেছিলেন হেনরি। পোশাকে, সাজসজ্জায় সব সময়ে পরিপাটি থাকতে ভালোবাসতেন। মাথার মাঝখানে সিঁথি কেটে চুল আঁচড়াতেন, ইংরেজদের মতো টুপি পরতেন না সচরাচর। শীতকালে ময়দানে ক্রিকেট খেলতেন বন্ধুদের সঙ্গে, আর ছিল ঘোড়ায় চড়ার শখ। (Derozio)

পড়াশোনার জন্য বেশ অল্পবয়সেই তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল কলকাতার ধর্মতলা আকাডেমি স্কুলে। সে ইস্কুলেরই শিক্ষক ছিলেন স্কটিশ কবি ও নাস্তিক যুক্তিবাদী এক মানুষ, নাম ডেভিড ড্রুমন্ড। ড্রুমন্ডের প্রগতিশীল চিন্তাধারা বালক বয়স থেকেই আকৃষ্ট করেছিল ডিরোজিওকে। ওই অল্প বয়স থেকেই এক কুসংস্কারমুক্ত স্বাধীন মনের অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন তিনি৷

সেকালের শোভাবাজার রাজবাড়ি

১৮১৭ সালে ঘড়ি ব্যবসায়ী ডেভিড হেয়ারের চেষ্টায় কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘হিন্দু কলেজ’… সেটা ১৮২৬ সাল, ১৭ বছর বয়সী তরুণ ডিরোজিও জানতে পারলেন হিন্দু কলেজে কিছু পদ খালি আছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। আবেদন করলেন তিনি। যথাসময়ে হাতে এল কর্তৃপক্ষের চিঠি। হিন্দু কলেজের নতুন ইংরেজি শিক্ষক হিসাবে যোগ দিলেন মেধাবী উজ্জ্বল তরুণ ডিরোজিও। তার পড়ানোর বিষয় ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাস হলেও আলোচনার গণ্ডি এগুলোতেই আটকে থাকত না। আলোচনা অতিক্রম করত বিজ্ঞান ও দর্শনের বিস্ময়কর পথও। ক্লাসভরা ছাত্র মুগ্ধ হয়ে দেখত এক তরুণ বাগ্মীকে। ধ্রুবতারার মতো তাঁকে অনুসরণ করত। হু হু করে জনপ্রিয়তা বাড়ছিল ডিরোজিওর। বাড়ছিল গুণমুগ্ধের দল, বন্ধু, শত্রুও।

Image - তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কলেজ থেকে, শোভাবাজার রাজবাড়িতে জুটেছিল চরম অসম্মান
হিন্দু কলেজ

মাত্র ১৭ বছর বয়সে হিন্দু কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করা মুখের কথা নয়। ক্লাসে ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল খুব কম। কেউ কেউ তো ছিলেন একেবারে সমবয়সী। ডিরোজিওর প্রত্যক্ষ ছাত্রদের মধ্যে সেসময় ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদার, রামতনু লাহিড়ী, শিবচন্দ্র দেব, দিগম্বর মিত্র, গোবিন্দচন্দ্র বসাক। তেমনই হরচন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ও রশিককৃষ্ণ মল্লিক ছিলেন তাঁর ভাবশিষ্য। সাক্ষাৎ ছাত্র না হলেও, মাইকেল মধুসূদন দত্তের উপরও তাঁর জীবনাদর্শের প্রভাব ছিল অসীম। শিক্ষাদানকে কেবল মাত্র ক্লাসরুমের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখেননি ডিরোজিও। ক্লাসের বাইরে তাঁর বাড়িতে কিংবা অন্যত্র তাঁরা মিলিত হতেন। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ছাত্রদের ‘friend philosopher and guide’। ডিরোজিওর এই সব ছাত্ররা নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল নামে সমাজে পরিচিতি পায় সেসময়।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের উপর ডিরোজিওর জীবনাদর্শের প্রভাব ছিল অসীম

শুধু ব্যক্তি ডিরোজিওর ক্যারিশমাই নয়, রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তাঁর জীবনাদর্শও। নিজের ছাত্রদের তিনি প্রতিনিয়ত বলতেন : ‘বিনা বিচারে বিনা জিজ্ঞাসায় কোনও প্রচলিত বিশ্বাস, সত্য ও রীতিনীতিকে মেনে নিও না। সত্যকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত কর।’
বলতেন : ‘কোনও মানুষ এত বড় নয় যে, তাকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে হবে।’
তাঁর এইসব দুঃসাহসী কথা অন্ধ ভক্তিবাদের মূলে চরম কুঠারাঘাত করেছিল সেদিন। দর্শন, ইতিহাস, দেশ বিদেশের সামাজিক সংস্কার ও তার বিবর্তন নিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন তিনি। ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে, করিডারে, নিজের বাড়িতে সর্বত্রই তিনি ছিলেন এক চৌম্বক ব্যক্তিত্ব। তাঁর ছাত্রদের নামে নানা নিন্দা প্রচলিত থাকলেও তাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে জীবনের নানা ক্ষেত্রে অপরিসীম মেধা ও মনীষার স্বাক্ষর রেখেছেন।

ডিরোজিওর এই অলোকসামান্য জনপ্রিয়তাই তাঁর শত্রু হয়ে উঠল। তাঁর মুক্তমনের স্বাধীন চিন্তাই তাঁকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। শুরু হল তাঁর নামে নানা অপপ্রচার। তিনি নাকি ছাত্রদের মধ্যে অবিশ্বাস, অধর্ম আর নাস্তিকতার বিষ ছড়াচ্ছেন। তিনি নাকি গুরুজনদের অশ্রদ্ধা করতে শেখাচ্ছেন। তিনি নাকি ভাই বোনের বিবাহকে সমর্থন করেন।

ক্লাসে মিশরের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে তিনি একদিন বলেছিলেন : রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য প্রাচীন কোনও কোনও জাতি ভাই ও বোনের মধ্যে বিবাহ দিত। এই ক্লাস লেকচারও তার বিরুদ্ধে ধারালো অস্ত্র হয়ে উঠল। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বলে গোঁড়া হিন্দু মৌলবাদীরা তাঁর বিরুদ্ধে বহুদিন ধরেই বিষ উগরে দিচ্ছিল। তাঁর ‘দ্য ফকির অব জঙ্ঘিরা’ নামের কবিতার বইটিও ছিল সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে একটা জ্বলন্ত প্রতিবাদ। কলেজের পরিচালন সমিতিও অভিযোগ করতে শুরু করল, ডিরোজিওর জন্যই হিন্দু কলেজে ছেলেদের পাঠাতে চাইছেন না অভিভাবকেরা। কলেজ ক্রমশ ছাত্রশূন্য হয়ে যাচ্ছে। শো কজ করা হল তাঁকে। বিচারের নামে প্রহসন হল। ভোটের নামে মস্করা করে এক কথায় তাড়িয়ে দেওয়া হল ডিরোজিওকে, তাঁর সাধের হিন্দু কলেজ থেকে।

Image - তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কলেজ থেকে, শোভাবাজার রাজবাড়িতে জুটেছিল চরম অসম্মান

নাস্তিকতা প্রচারের অভিযোগে প্রায় সমকালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবি শেলিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। যুক্তিবাদী ও নির্ভীক সত্যের উপাসক ডিরোজিওকেও নির্মমভাবে বহিষ্কার করা হল। এর অল্প কিছুকাল পরেই দুরারোগ্য কলেরায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর পরেও প্রতিপক্ষ স্তব্ধ হয়নি। খ্রিস্টান সমাধিক্ষেত্রে তাঁর মতো নাস্তিকের মৃতদেহ সমাধিস্থ করতে গেলে প্রবল বাধা দেওয়া হয়। অবশেষে মূল সমাধিক্ষেত্রের বাইরে একপ্রান্তে মাটির নীচে শায়িত করা হয় তাঁকে। সমস্ত জীবন যিনি অন্ধকারে আলো জ্বালাতে চেয়েছেন মৃত্যুর পরে তাঁর ঠাঁই হল অবজ্ঞা আর অবহেলার অন্ধকারে। মৃত্যুর পরেও তিনি প্রান্তিক মানুষ হয়েই রয়ে গেলেন।

কলকাতার এংলো ইন্ডিয়ান সোসাইটি এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন তাঁর সমাধির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তদারকিতে চলে পুরো সমাধিক্ষেত্রটি। ১৮০৯ থেকে ১৮৩১ মাত্র ২২ বছরের জীবনেই জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর এই তরুণ অধ্যাপক। এই আলোর রথের সারথি। এই যুক্তিহীন হিংস্র ধর্মান্ধতার দেশের প্রথম আলোকবর্তিকা, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।

You might also like