Latest News

জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে আশ্রয় দিয়েছিল, বিরজু মহারাজের কেরিয়ারে কলকাতা তাই মায়ের শহর

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কত্থকের জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন তিনি। দক্ষিণের কালকা-বিনন্দাদিন ঘরানার নৃত্যশৈলী বিশ্বের দরবারে উঠে এসেছে তাঁরই হাত ধরে। প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব এবং প্রতিভাবলে জীবিতকালেই তিনি জন্ম দিয়েছেন অজস্র মিথের। তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের কিন্নরপুরুষ বিরজু মহারাজ। এলাহাবাদের ৩৫ কিলোমিটার দূরে আছে এক আশ্চর্য গ্রাম, হান্দিয়ার কিচকিরা। এই কিচকিরা গ্রামের ৯৮৯ ঘর মানুষের সকলেই বংশপরম্পরায় জড়িয়ে আছেন ভারতীয় ধ্রুপদি নৃত্যকলার সঙ্গে। গ্রামের একমাত্র পুকুরটির নামও ‘কত্থকো কা তালাব’।

পাঠশালা, গুরুগৃহ থাকলেও কথায় বলে শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় তার বাড়িতে। আর নাচ গানের মধ্যে দিয়ে বাড়ির শিশুদের পুরাণ-মহাকাব্য শিক্ষা দেওয়া দেশের অতি প্রাচীন মাধ্যম। নাচের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে গল্প- কখনও রামায়ণের, কখনও রাধাকৃষ্ণ প্রেমের, গোপিনীদের সঙ্গে কানুর নটঘট ঝগড়ার, আবার কখনও বা অন্য কোনও লোককথার। কথা আর মুদ্রা যেখানে মিলেমিশে এক হয়ে যায়, সেই শৈলীই তো কত্থক।এই শৈলিই একদিন টেনেছিল লখনউয়ের নবাবদের। দরবারে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য তাঁরা ডাক পাঠিয়েছিলেন শিল্পীদের। নবাবের ডাকে সাড়া দিয়েই এইভাবেই একদিন হরিয়া গ্রাম ছেড়ে সুদূর লখনউয়ে পাড়ি জমায় বিরজু মহারাজের পরিবারও। শিল্পের গুণে ঠাঁই হয়ে যায় নবাব দরবারে৷ নবাবই জমিজমা ঘোড়ার গাড়ি কিনে বসবাসের পাকা ব্যবস্থা করে দেন। বিরজু মহারাজের ঠাকুরদা দুর্গম শাহ ঠাকুরশাহ ছিলেন তেমনই এক কলাকার, যিনি ওয়াজেদ আলী শাহের ডাকে গ্রামের বাস তুলে সপরিবারে পা রেখেছিলেন নবাব দরবারে। সংস্কৃতি আর আভিজাত্যের শহর লক্ষ্মণাবতী। সেই শহরের বুকে এক হাসপাতালে ১৯৩৮ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বিরজু মহারাজের জন্ম।

হাসপাতালের যে ঘরে সদ্যপ্রসূতি বিরজু মহারাজের মা-কে রাখা হয়েছিল, সে ঘরে জন্মানো প্রতিটি শিশুই কন্যাসন্তান। একমাত্র আম্মা জি মহারাজের কোল আলো করে এসেছে ফুটফুটে ছেলে। জন্ম থেকেই নারী পরিবেষ্টিত, প্রতিবেশীরা ঠাট্টা করে বলেছিলেন এ তো ব্রজের কেষ্টঠাকুর গো। ব্রিজ কা মোহন, তাই বাড়ির একমাত্র ছেলের নাম হল ব্রিজমোহন। আদরের ডাক বিরজু।

আশ্চর্য এক পরিবেশে বেড়ে ওঠা বিরজু মহারাজের। বাড়িতেই কত্থকের স্কুল। ভোর সাড়ে তিনটে- চারটেয় ঘুঙুর- তবলার বোলে ঘুম ভেঙে যেত ছোট্ট বিরজুর। বাইরে তখনও ভোররাতের অন্ধকার। ধূপের গন্ধ ভেসে বেড়াত ঘরে। ছটফট করত বিরজুর শিশুমন। কত বয়স তখন? সাড়ে তিন-চার! মায়ের কাছে বায়না করে একছুট্টে চলে যেতেন বাড়ির নাচঘরে। সেখানেই তখন তালিম চলছে। আসছে নানা বয়সের শিক্ষার্থীরা। সেই একরত্তি বয়স থেকেই ছোট্ট ছোট্ট হাতের মুদ্রায় কত্থকের হরকত তোলা শুরু। যখন যা শিখতেন ছুটে গিয়ে দেখাতেন মাকে। এত্ত ছোট্ট বাচ্চা নাচ শিখবে কী! তার জন্য তো সারাজীবন পড়ে আছে। প্রশ্রয়ের বকুনি দিতেন মা। ‘আগে বড় হও! এখন তোমার পায়ে কত্থক শেখার দম কই!’
কিন্তু এসব বলে দমানো যায়নি ছোট্ট বিরজুকে। রাত শেষ হওয়ার আগেই যখন শুরু হত কত্থকের তালিম, দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াত বালক বিরজু। আনমনে শরীরে তুলে নিত নাচের মুদ্রা। একদিন কীভাবে যেন বাবার চোখে পড়ে গেল ব্যাপারটা। অচ্ছন মহারাজ অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর শিশুপুত্রের তালজ্ঞান! যেন নাচের জন্যই জন্মেছে এ ছেলে। আর দেরি করলেন না বাবা। ছেলের তালিমের ব্যবস্থা করলেন।

বাবা অচ্ছন মহারাজ

কাকা লাচ্চু মহারাজ তখন ওতপ্রোত জড়িয়ে কলকাতা আর বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে। ‘মুঘল-এ আজম’, ‘পাকিজা’-র মতো অজস্র ফিল্মে নাচের তালিম দিতেন তিনি। ছোট্ট বিরজুকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন তাঁর দুই কাকাই। আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় সে তখন শিখে ফেলছে নাচের নানান জটিল কৌশল।

রামপুরের নবাবের দরবারে এক অনুষ্ঠানে সেবার নৃত্য প্রদর্শনে গেছেন অচ্ছন মহারাজ। ন বছরের বিরজুও গেছে বাবার সঙ্গে। উত্তর ভারতের তীব্র গরম, লু লেগে আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়লেন অচ্ছন মহারাজ। অগত্যা ছেলে বিরজুকেই তোলা হল মঞ্চে। সেই প্রথম স্টেজ শোতেই মাতিয়ে দিলেন কিশোর বিরজু। ওই কাঁচা বয়সেই নামের সঙ্গে জুড়ে গেল ‘গুরু’ তকমা। অবশ্য গুণী ছেলের সুনাম বেশিদিন দেখে যেতে পারেননি বাবা। এই ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই মারা যান তিনি।বাবার মৃত্যুর পরপরই বদলে যেতে থাকে চারপাশ। সেই ঠাটবাট, শিষ্য সমাহার সব যেন ভোজবাজির মতো উবে যায়। থেমে যায় ভোররাতে নাচমহলে ঘুঙুরের আওয়াজ। সরে যায় আত্মীয়বন্ধুরাও। একের পর এক গয়না বেচে সেসময় সংসার চালাতেন বিধবা আম্মা জি । খাওয়া-পরা নিয়ে বায়না করার সেই বয়সে শুকনো রুটি আর পিঁয়াজ খেয়েই দিনের পর দিন কাটিয়েছেন কিশোর বিরজু, সামান্য চাল ডাল জোগাড় করে যেদিন খিচুড়ি হত আনন্দের সীমা থাকত না সেদিন। দাঁতে দাঁত চেপে সেই কষ্টকর অভাবের দিনগুলো পেরিয়েছে এক জেদি ছেলে আর তার সহায়সম্বলহীন মা। কখনও দুজনে একবেলা উপোস করেছেন, কখনও আধপেটা খেয়ে থেকেছেন, কিন্তু নাচের তালিম ছাড়েননি কিশোর বিরজু। কত্থক ছাড়া বাঁচা যায় না যে!

কলকাতায় মন্মথনাথ ঘোষ সেসময় আয়োজন করতেন অল বেঙ্গল কনফারেন্সের। সেবছর ১৪ বছরের কিশোর বিরজু নাম দিলেন সেই অনুষ্ঠানে। কিশোরের সেই আশ্চর্য কত্থক প্রতিভা সাড়া ফেলে দিল কলকাতার জ্ঞানীগুণী মহলে। দেশবিদেশের সংবাদপত্রে উঠে এলে তাঁর নাম।কলকাতা আজীবন বিরজু মহারাজের কাছে ছিল মায়ের শহর। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এই শহরই দুহাত দিয়ে কোলে টেনে নিয়েছিল তাঁকে।
নামডাক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপও বাড়ে। মাঝেমধ্যেই কাজের দরকারে কলকাতা বম্বে করতে হত কিশোর বিরজুকে। ১৫ বছরে পা দিতে তাঁকে প্রথমবার দিল্লি নিয়ে এলেন তাঁর কপিলা দিদি। খ্যাতনামা লেখিকা ও কত্থকশিল্পী কপিলা বাৎস্যায়ন। তাঁর ইচ্ছেতেই প্রথমে ভারতীয় কলাকেন্দ্রে যোগ দেন বিরজু মহারাজ। পরে আলাদা করে কত্থক কলাকেন্দ্র তৈরি হওয়ায় সেখানে চলে আসেন। এইভাবে কর্মব্যস্ততায় কেটে যায় সাড়ে চার বছর। এইসময় আচমকা একদিন ডাক পাঠালেন মা- ‘বাড়ি ফেরো, জরুরি দরকার’।

মাথার উপর বাবা নেই। ছেলে পাছে অসৎ সঙ্গে নষ্ট হয় তাই সাততাড়াতাড়ি বেনারসে মেয়ে পছন্দ করে আম্মা জি মহারাজ বিয়ে দিয়ে দিলেন বিরজুর। তাঁর বয়স তখন ১৮। বউয়ের ১৩।

১৯৬২ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্সের ডাক এল রাশিয়া থেকে। তারপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। ততদিনে গুরু বিরজু থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন ভারতীয় নৃত্যকলার জীবন্ত গন্ধর্ব, বিরজু মহারাজ। ১৯৬৪ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার জেতেন বিরজু মহারাজ। ১৯৮৬ সালে ভারত সরকারে পক্ষ থেকে পদ্মবিভূষণ দেওয়া হয় তাঁকে। কালিদাস সম্মান পান ১৯৮৭ এ। ২০০২ এ  পান লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার। একের পর এক অগুন্তি সম্মাননা তাঁর মুকুটে নতুন নতুন পালক সংযোজন করেছে, কিন্তু এতটুকু বদলায়নি ভিতরের মানুষটা। একসময় বেশ কিছু ছবিতে কোরিওগ্রাফির দায়িত্বভারও সামলেছেন বিরজু মহারাজ। কাজ করেছেন সত্যজিৎ রায়ে্র সঙ্গে ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ ছবিতে। ‘বিশ্বরূপম’ ছবিতে কোরিওগ্রাফির জন্য পেয়েছেন চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার। যদিও তিনি আজীবন বিশ্বাস করতেন রুপোলি পর্দায় কত্থকের আসল চার্মটাই ধরা যায় না। সিনেমায় দেখানো কত্থককে ‘প্যাথেটিক’ বলেও উল্লেখ করেছেন কিছু সাক্ষাৎকারে।এ দেশে একটা দীর্ঘ সময় অবধি পুরুষের শিল্প হয়েই ছিল কত্থক৷ মেয়েদের কত্থক শেখার অধিকার ছিল না। নবাবি আমলে অবশ্য সম্রাটের দাসীরা কত্থক তালিম পেত। কিন্তু তাদের গতিবিধিও সীমিত ছিল নবাবি হারেমের মধ্যেই। গান-বাজনা শেখানো হলেও নাচ তখনও খারাপ মেয়েদের শিল্প। বড়জোর নাচের মুদ্রায় হবু স্বামীর গলায় বরণমালা দেবে বলে অভিজাত বাড়ির মেয়েদের সামান্য কিছু হরকত শেখানো হত। এইটুকুই। এমনকি উত্তর ভারতে পুরুষ নৃত্যশিল্পীদেরও বাঁকা নজরে দেখা হত। ‘নচনিয়া’ বলে ঠাট্টা করা হত। অবস্থা বদলাতে শুরু করে বিরজু মহারাজের সময় থেকেই। নৃত্যশৈলীর মধ্যে দিয়েই একটা গোটা জাতির সমীহ আদায় করে নিয়েছিলেন এই মানুষটা। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের জগতে একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

You might also like