Latest News

Dead Mountain:একের পর এক পৈশাচিক মৃত্যু, শব ঘিরে রহস্য, কী ঘটেছিল সেই রাতে?

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: সময়টা ১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে। বিকেল ছ’টা বেজেছে সবে। জায়গাটা রাশিয়ার বরফঘেরা ‘ডেড মাউন্টেন’ পর্বত (Dead Mountain)। সেদিন তুষারপাত হচ্ছিল প্রচণ্ড, সঙ্গে হাঁড় কাপানো ঠান্ডা হাওয়া। এমনিতেই ‘ডেড মাউন্টেন’ বা মৃতদের পাহাড়’ নামে পরিচিত এই এলাকা বছরের যেকোনও সময় বিপদসংকুল, তার উপর এমন প্রতিকূল আবহাওয়া। ভয়ের কারণ ছিল বৈ কি! কারণ পর্বতের ঢালে সেদিনই তাঁবু গেড়েছে ৯ অভিযাত্রী।

Image - Dead Mountain:একের পর এক পৈশাচিক মৃত্যু, শব ঘিরে রহস্য, কী ঘটেছিল সেই রাতে?
অভিযাত্রীর দল

সন্ধে হয় হয়। একটু পরেই নামবে ঘুটঘুটে ঘন অন্ধকার। হাড় কাঁপানো শীতে, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে তাঁবুর ভিতরে নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল হয়ে পড়েন অভিযাত্রীরা। পাহাড়ি আবহাওয়ার মুড তো তাঁদের অজানা নয়। সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু তখনই ঘটে যায় এক আশ্চর্য ঘটনা। অজানা কী এক আতঙ্কে হঠাৎ তাঁবু ছিঁড়ে সজোরে বেরিয়ে পড়েন অভিযাত্রীরা। মৃত্যু যেন তাড়া করেছে তাঁদের। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় গরম কাপড় ছাড়াই তাঁরা খালি পায়ে দৌঁড়াতে শুরু করেন রুদ্ধশ্বাসে। কিন্তু কিসের আতঙ্ক? আসন্ন মৃত্যু থেকে যেন কোনোভাবে বাঁচতে চাইছেন তাঁরা। এলোপাথারি দৌড়। কিন্তু প্রত্যেকের পিছনেই যেন এসে দাঁড়িয়েছে কালান্তক যম। অদৃশ্য সেই শয়তানের হাত থেকে মুক্তি নেই কারও…।

পরে যখন হতভাগ্য নয় অভিযাত্রীর দেহ শনাক্ত করা হয় তখন দেখা যায় তাঁদের কারোও বুকের পাঁজর ভাঙা, মাথার খুলি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে কারও, কারও বা চোখ খুবলে বেড়িয়ে এসেছে। একজনের হাঁ মুখ থেকে প্রচণ্ড টানে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল জিভ। শুধু নৃশংশতাই নয়, মৃত দুইজনের শরীরে মাত্রাতিরিক্ত রেডিয়েশনের অস্তিত্বও পাওয়া গিয়েছিল। ঠিক কি ঘটেছিল সেইদিন? ঘটনার অর্ধশতাব্দী পরেও সেই ইতিহাস আজও রহস্য আর ভয়ের চাদরে ঢাকা।

সেই দশজন

ঘটনার সূত্রপাত ১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখ। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উরাল পর্বত মালায় স্কি করার উদ্দেশ্যে ট্রেনে চেপে যাত্রা শুরু করে দশজন অভিযাত্রী। দু’জন নারী এবং আট জন পুরুষের সেই দলে নেতা ছিলেন ইগর দিয়াতলোভ। যাঁর নামেই পরে এই পাসের নামকরণ করা হয়। দলের সবাই উড়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউশন শিক্ষার্থী অথবা সদ্য পাস করা ইঞ্জিনিয়ার। পর্বতারোহণ এবং স্কি তে তারা সবাই যথেষ্ট পারদর্শী।

Image - Dead Mountain:একের পর এক পৈশাচিক মৃত্যু, শব ঘিরে রহস্য, কী ঘটেছিল সেই রাতে?

অভিযাত্রীদলের মূল লক্ষ্য ছিল ‘ওতোর্তেন’ পর্বত। স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষায় ‘ওতোর্তেন’ শব্দের অর্থ, ‘ওখানে যেও না’। সত্যিই সে এক দুর্গম পাহাড়। আর জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারিতে অত্যধিক তুষারপাতের ফলে তা আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। জানুয়ারির ২৭ তারিখে অভিযাত্রীকেরা রওনা দিল ওতোর্তেনের উদ্দেশ্যে। সব ঠিকই চলছিল। তবে ওতোর্তেন থেকে আসল যাত্রা শুরু আগেই ইউরি ইউদিন নামে দলের এক সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফেরত পাঠানো হয়। দশ জনের দল হয়ে যায় নয়জন। তখনও ইউদিন জানতেন না মৃত্যুর কত কাছ থেকে ফিরে এলেন তিনি।

অভিযানের আগে হাসিখুশি টিম, জানে না কী অপেক্ষা করে আছে তাঁদের জন্য

যাত্রা শুরু করার তিনদিনের মধ্যে অর্থাৎ জানুয়ারির ৩১ তারিখে তাঁরা এসে পৌঁছান ‘খোলাত সিয়াকো’ পর্বতের পাদদেশে। স্থানীয় আদিবাসী মানসি জাতির ভাষায় যার অর্থ, ‘মৃতদের পর্বত’। সেদিন শুরু থেকেই গোলমাল করছিল আবহাওয়া। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হাওয়া জমিয়ে দিচ্ছিল ধমনির রক্ত, তুষারপাতও চলছিল অবিরাম। এদিকে পাহাড়ের কোলে ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে। ওতোর্তেন পর্বত তখনও প্রায় ১০ মাইল দূর। তাই আর কোনওরকম ঝুঁকি না নিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ তারা সিদ্ধান্ত নেয় ‘ডেথ মাউন্টেন’ বা মৃতদের পর্বতের গায়ে তাঁবু খাটিয়ে রাতটা কাটিয়ে দেবে। আর সেই রাতেই ঘটে যায় এক হাড় হিম করা রহস্যময় ঘটনা যাতে একে একে প্রাণ হারায় ন’জন অভিযাত্রীই।

Image - Dead Mountain:একের পর এক পৈশাচিক মৃত্যু, শব ঘিরে রহস্য, কী ঘটেছিল সেই রাতে?
ডেড মাউন্টেন

ওতোর্তেন পর্বতে গিয়ে আবার ভিজহাই ফেরার পর স্পোর্টস ক্লাবের কাছে টেলিগ্রামে ফেরার খবর পাঠাবে দিয়াতলোভ এমনটাই কথা ছিল। যেহেতু ফেরার কথা ছিল ১২ই ফেব্রুয়ারি আর্ রাস্তা খুব দুর্গম তাই কোনো টেলিগ্রাম না পেলেও স্পোর্টস ক্লাবের মেম্বার বা অভিযাত্রীদের আত্মীয়-স্বজনরা বিরাট কিছু চিন্তিত হয়নি।কিন্তু ১২ তারিখের পর বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও কোনও টেলিগ্রাম না আসায় আত্মীয়স্বজনদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দেয়। এত দেরি তো হওয়ার কথা নয়! ২০ তারিখ অব্দি অপেক্ষা করার পর উড়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি সাহায্যকারী দল গঠন করা হয় এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে তাঁদের পাঠানো হয় অভিযাত্রীদের খোঁজে। কিন্তু দুর্গম পরিস্থিতিতে তাঁদের কোনোরকম খোঁজ না মেলায় প্লেন ও হেলিকপ্টারও যুক্ত হয় এই অপারেশনে।

প্রায় ছয় দিন পর অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখ খোলাত সিয়াকোর সেই ক্যাম্প অভিযাত্রীদের পরিত্যক্ত তাঁবুর সন্ধান পান মিখালি শারাভিন নামক এক শিক্ষার্থী। পরপর তুষারপাতে ততদিনে তাঁবুর বেশ কিছু অংশ বরফে ঢাকা পড়ে গেছিল। তাঁবুর ভেতর অভিযাত্রীক দলের সদস্যদের ছেঁড়াখোঁড়া জিনিসপত্র আর জুতো পড়েছিল। তদন্ত দলের অনুসন্ধানে উঠে আসে বিস্ময়কর প্রথম তথ্যটি। তাঁবুটি না কি ভেতর থেকেই ছেঁড়া হয়েছিল! তাঁবুর বাইরে থেকে শুরু করে প্রায় ৫০০ মিটার দূর পর্যন্ত জঙ্গলের কাছাকাছি ন’জনের পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। ছাপ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কেউ ছিল খালি পায়ে, কেউ ছিল মোজা পরে, আবার কারও কারও পায়ে ছিল শুধু একপাটি জুতো। অর্থাৎ একথা স্পষ্ট, একেবারে প্রস্তুতিহীন অবস্থায় তাঁরা কোনওরকমে প্রাণ বাঁচাতে সে রাত্রে বেরিয়ে পরেছিল। জামাকাপড় পাওয়া গেলেও মানুষের সন্ধান তখনও পাওয়া যায় না। নজন মানুষ উবে তো যেতে পারে না। অনুসন্ধান চলতে থাকে। জঙ্গলের ধারে এসে উদ্ধারকর্মীরা একটা সিডার গাছের নীচে আগুন জ্বালানোর চিহ্ন দেখতে পায়। সেখানেই প্রথম পাওয়া যায় দুজনের মৃতদেহ। ইউরি ক্রিভোনিশেঙ্কো আর ইউরি দোরোশেঙ্কোর লাশ পড়ে ছিল সেখানে। যে গাছের নীচে তাঁদের পাওয়া গেল সেটা থেকে পাঁচ মিটার উঁচু ডাল ভাঙার নমুনা পাওয়া গেল, অর্থাৎ তাঁরা কোনও কারণে সেই শীতের রাতে গাছে উঠেছিল। ফরেনসিক টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, গাছের বাকলে তাঁদের রক্ত লেগে ছিল, অর্থাৎ কোনও কারণে তারা ভয়ঙ্কর দ্রুত গাছে উঠতে চাইছিল। কিন্তু কেন? কিছু কি তাড়া করেছিল তাদের? এই প্রশ্নের উত্তর বাস্তবিক যারা বলতে পারত, সেই দুজনই মারা গিয়েছিল, প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে, হাইপোথার্মিয়ায়।

হতভাগ্য ক্রিভোনিশেঙ্কো আর দোরোশেঙ্কোর মৃতদেহ

২৭ ফেব্রুয়ারিতে সেই সিডার গাছ থেকে আরও ৩০০ মিটার দূরে পাওয়া গেল ইগর দ্যাতলোভের লাশ। তাঁর দু’পায়ে দু’রকম মোজা ছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছিল কিছু আঘাতের চিহ্ন। একই দিনে জিনাইদা কোলমোগরোভার লাশ পাওয়া যায় সিডার গাছ থেকে ৬৩০ মিটার দূরে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের দাগ ছিল। এদের দুজনেরও মৃত্যু হয় হাইপোথার্মিয়ায়।

Image - Dead Mountain:একের পর এক পৈশাচিক মৃত্যু, শব ঘিরে রহস্য, কী ঘটেছিল সেই রাতে?
মৃত ইগর দ্যাতলোভ

৬ দিন পর মার্চের ৫ তারিখে পাওয়া যায় রুস্তেম স্লবোদিনের মৃতদেহ। সেই সিডার গাছ থেকে ৪৮০ মিটার দূরে। এই অভিযাত্রীর লাশের ময়নাতদন্তের সময় প্রায় চমকে ওঠেন ডাক্তারেরা। মৃত অভিযাত্রীকের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন তো ছিলই, মাথার খুলিতেও ছিল আঘাত ও রক্তপাতের চিহ্ন। খুলির আঘাতের চিহ্নগুলো ভারি অদ্ভুত রকমের। স্লবোদিন যদি পাহাড়ের নীচের দিকে যাবার সময় খানিক পরপর পড়ে গিয়ে আঘাত পায়, তাহলেই কেবল এমন চিহ্ন তৈরি হওয়া সম্ভব। কিন্তু দলের মধ্যে সবচেয়ে সুঠাম দেহের এই দক্ষ অভিযাত্রী বারবার পড়ে গেল, আঘাতও পেল কেন? সত্যিকার অর্থে এমন কিছু ঘটা একরকম অসম্ভব ছিল।

পাঁচজনের দেহ পাওয়া গেলেও বাকি চারজন অভিযাত্রিকের দেহ তখনও পাওয়া যায়নি। খোঁজ চলতে লাগলো লাগাতার। দু মাস টানা খোঁজ চালিয়েও হতদ্যম হতে হল উদ্ধারকারীদের। এরপর মে মাস নাগাদ যখন বরফ গলতে শুরু করল সেই সময় এক স্থানীয় আদিবাসী এসে খবর দেউ উদ্ধারকারীদের। খবরটা নিঃসন্দেহে চাঞ্চল্যকর। ঐ ব্যক্তির পোষা কুকুর গন্ধ শুঁকে শুঁকে এমন একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছে যেখানে বেশ কিছু কাপড়ের টুকরো ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় পড়ে ছিল। কী হতে পারে আন্দাজ করে সদলবলে ছুটে গেলেন উদ্ধারকারী টিম। শেষমেশ মে মাসের ৫ তারিখে পাওয়া গেল নিখোঁজ চার অভিযাত্রিকের দেহ। সেই সিডার গাছ থেকে ৭৫ মিটার দূরে জঙ্গলের মধ্যে একটি পরিখার ভেতরে প্রায় ৪ মিটার গভীর তুষারের তলায় চাপা পড়ে ছিল তাঁদের মৃতদেহ। শবগুলোর চেহারা দেখে সেদিন অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিলেন দুঁদে গোয়েন্দারাও। মরার আগে কী তীব্র শীত আর যন্ত্রণা যে ভোগ করেছে তাঁরা, তা বোঝা যাচ্ছিল বিকৃত মৃতদেহগুলো দেখে, বোঝা যাচ্ছিল তাঁদের গায়ের পোশাক দেখে। এদের মধ্যে কারও গা একদম খালি, আবার কারো গায়ে দুটো জামা। হয়তো একজনের মৃত্যুর পর মৃত বন্ধুর গায়ের কাপড় খুলে নিয়ে অন্যজন শীত নিবারণের চেষ্টা করছিল। এই চারজনের মধ্যে কেবল আলেকজান্ডার মারা গেছিলেন হাইপোথার্মিয়ায়। বাকি তিন জনের মৃত্যু হয়েছিল অদ্ভুত সব আঘাত পেয়ে। লুদমিলা ডুবিনিনার পাঁজরের দশটি হাড় ভাঙা ছিল, দুই চোখের কোটর ছিল ফাঁকা, কেউ যেন খুবলে নিয়েছে চোখগুলো। গোটা মুখমণ্ডলের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল, কে যেন তার জিভটাও কেটে ফেলেছিল।

লুদমিলা ডুবিনিনার দেহ

পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ডুবিনিনার জিভ যখন কেটে ফেলা হয়, সে তখনও জীবিত ছিল! সেমিওন জোলোতারিওভের শরীরেও ছিল আঘাতের চিহ্ন, পাঁজরের হাড় ভাঙা, চোখের কোটর ফাঁকা। অদ্ভুতভাবে তার গলায় ঝোলানো ছিল ক্যামেরা, এক হাত এমনভাবে ছিল, যেন কোনও কিছুর ছবি তুলতে চাইছে। অন্য হাতে ছিল কলম-নোটখাতা, যেন কিছু লিখবে এখনই, অথচ সেখানে লেখা ছিল না কিছুই।

Image - Dead Mountain:একের পর এক পৈশাচিক মৃত্যু, শব ঘিরে রহস্য, কী ঘটেছিল সেই রাতে?
উদ্ধার হওয়া ফিল্ম

আলেকজান্ডার কোলেভাতভের মুখের আঘাতের চিহ্নগুলো দেখে মনে হয় যেন সে মৃত্যুর আগে কারো সাথে ভয়ানক মারপিট করেছে। নাক ভাঙা, কানের উপর ভারী আঘাত, ঘাড় ভাঙা, চোখের চারপাশ কে যেন খুবলে নিয়েছে। আরেক অভিযাত্রিক নিকোলাই থিবেউ ব্রিনোলের হাত আর মুখের আঘাত ছাড়াও মাথার খুলিতে ছিল প্রচণ্ড আঘাতের চিহ্ন। শুধু জোলোতারিওভ আর ব্রিনোলে এঁদের দুজনের পরনেই একমাত্র গরম পোশাক ছিল। বাকিরা যে কীসের ভয়ে অল্প কিছু কাপড় গায়েই বেরিয়ে এসেছিল তাঁবু থেকে সেটা হয়তো কোনওদিনও জানা যাবে না। ডুবিনিনা আর জোলোতারিওভের পাঁজর আর ব্রিনোলের খুলিতে যে প্রচণ্ড আঘাতের নিদর্শন রয়েছে, তা যেমনতেমন আঘাত নয়। একটা দ্রুতবেগে আসা গাড়ির সজোরে ধাক্কা দিলে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োগ ঘটে, সেই আঘাতের জন্য কতকটা তেমনই শক্তির দরকার হয়েছে বলে মতামত দিয়েছিলেন পোস্টমর্টেমের দায়িত্বে থাকা ডাক্তার বরিস। অবাক হওয়ার এখানেই শেষ নয়। এই রহস্যময় ঘটনার অদ্ভুত এক ব্যাখ্যার জন্ম দেয়, কারণ মৃত ডুবিনিনা আর কোলেভাতভের গায়ের পোশাকে তেজস্ক্রিয় বস্তুর উপস্থিতি চমকে দিয়েছিল বিজ্ঞানীদের।

পয়লা থেকে ২রা ফেব্রুয়ারি রাতের মর্মান্তিক ঘটনার কারণ কী? কেন এমন আকস্মিক প্রাণ গেল নটা তাজা নারী-পুরুষের। খুন, না দুর্ঘটনা? কোনও প্রশ্নেরই ঠিকঠাক উত্তর মেলেনি সরকারি তদন্তে। নাকি ইচ্ছে করেনি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ? তেমন কোনো কারণ না দেখিয়েই ২৮মে, ১৯৫৯ বন্ধ করে দেওয়া হয় এই রহস্যময় মৃত্যু সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলাটি। আইভডেল প্রকিউরেটর এল. ইভানভের একজন কর্মচারী দ্বারা সংকলিত একটি নথিতে বলা হয়েছিল: “……তাঁদের মৃত্যুর কারণ ছিল এমন একটি মৌলিক শক্তি, যা মানুষ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি।”

কেস ধামাচাপা পড়ে বটে, কিন্তু থেমে যায়নি মানুষের কৌতুহল। ‘ডেড মাউন্টেন’ রহস্য নিয়ে গবেষণা চলে বিস্তর। এই রহস্যের পিছনে মূলত যে খটকাগুলো তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল কেন তাঁবু ছেড়ে চলে গেলেন অভিযাত্রীরা? রাতের অন্ধকারে, সামান্য জামাকাপড়ে, খালি পায়ে, তাও ওই ঠান্ডায়? ধারণা করা হচ্ছিল সেই রাত্রে ওঁরা তুষারধসের মধ্যে পড়ে গেছিল। আর এটাও বিশ্বাস করা হয় যে তুষারধসের ফলে গ্রুপের অর্ধেক সদস্যের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু খটকা সেখানেও। পেশাদার পর্বতারোহীরা দাবি করেন, তাঁবুটি পাহাড়ের এমন একটা ঢালে দাঁড়িয়ে ছিল যেখানে তুষারধস নামতে পারে না। বরফের ধস শুধুমাত্র সেই জায়গাগুলিতে নেমে আসে যেখানে প্রচুর তুষার জমে থাকে। কিন্তু খোলাত সিয়াকোর পর্বতে সেটা হওয়া খুব মুশকিল। তাই তুষারধসের জন্য যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তুষার জমে থাকা দরকার তা ওখানে জমে থাকতেই পারেনা। অবশ্য এটি বলা হয়েছিল যে এটি একটি ভূগর্ভস্থ তুষারপাত, যা টাটকা তুষার নিয়ে গঠিত এবং দমকা বাতাসের কারণে ঘটে যায়।এই ধরনের তুষারধসে বরফের শুধু উপরের স্তরটি উড়িয়ে নিয়ে নিচে নেমে আসে।কিন্তু এটা যদি উপরের স্থর হয় তাহলে ওই হালকা বরফ কিভাবে এতো গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে? এটা ঠিক যে অনুসন্ধান দলের প্রধান, মাসলেনিকভ বলেছেন যে তিনি যখন তাঁবুটি আবিষ্কার করেছিলেন, তখন এটি বেশ কিছুটা তুষারে ঢাকা ছিল।সেটা হতেই পারে কারন মাঝে তুষারপাত ঘটে গেছিল অনেকবার।

রাশিয়ার কিছু বিজ্ঞানীর মতে, অভিযাত্রিকেরা যে জায়গায় তাঁবু গেঁড়েছিল সেটা পৃথিবীর এমন এক অংশ যেখানে অভিকর্ষের প্রভাবের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে পারে। হয়তো ব্যাপারটা ছিল এমন, অভিকর্ষের ওঠানামার কারণে হঠাৎ করেই তাঁবুর বাইরের অংশের বায়ুমণ্ডলের চাপ প্রচণ্ড রকমের কমে গিয়েছিল। আর তাঁবুর ভেতরে চাপ বেশি থাকায় এর ভেতরে অবস্থানরত অভিযাত্রীদের শূন্যে উঠিয়ে ফেলেছিল কিছুটা। তাঁবুটা শক্তপোক্তই ছিল। আতঙ্কিত না হয়ে কোনওভাবে এর ভেতরে থাকতে পারলে হয়তো প্রাণে বেঁচে যেত এই নয়জন। কিন্তু যেইমাত্র তাঁরা ভয় পেয়ে তাঁবু থেকে বের হতে গেল, অমনি বাইরের চাপ অস্বাভাবিক কম থাকার কারণে প্রচণ্ড গতিতে ছিটকে গেল তাঁদের শরীর এবং সেখান থেকে এক-দেড় কিলোমিটার দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ল। অন্যদিকে তাঁদের শরীরের মধ্যকার চাপের তুলনায়ও বাইরের চাপ অনেক কম হবার কারণে মুহূর্তের মধ্যে কারো কারও মাথার খুলি বা বুকের পাঁজরের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়ল। এত দূরে ছিটকে পড়ায় সকলেই নানারকম আঘাত পেল। সেই আঘাতে কেউ তাৎক্ষণিক আর কেউ খানিক পরে ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।

আরেকটি ধারণা নিয়েও শুরু হয়েছিল জোর গুঞ্জন। অনেকে এখনও বিশ্বাস করেন, কোনও প্রাকৃতিক কারণে নয়, সেই অভিশপ্ত রাতে নয় অভিযাত্রিকের মৃত্যু ঘটেছিল ইয়েতির আক্রমণে। আমরা জানি, ইয়েতি হল বরফের জগতে বসবাসকারী খানিকটা মানুষের মতো দেখতে এক দৈত্যকার কল্পিত প্রাণী। দিয়াতলোভ গিরিপথে তেমনই এক রাক্ষুসে ইয়েতির বসবাস ছিল বলে কল্পনা করে নিতে ভালোবাসেন অনেকেই। অবশ্য আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে এমন কোনও বরফমানবের সন্ধান পাওয়া যায়নি কোথাও। তবুও নানান অস্পষ্ট প্রমাণ দিয়ে এর উপস্থিতি প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে অনেক বার। যেমনটা ঘটেছে এখানেও। ব্রিনোলের ক্যামেরায় পাওয়া ১৭ নম্বর ফ্রেমের ছবিটিতে মানুষের একটি অস্পষ্ট অবয়ব দেখা যায়। আর এটাকেই ইয়েতি বলে দাবি করেন এই ধারণার অনুসারীরা।

সবথেকে গ্রহণযোগ্য যে ব্যাখ্যাটি পাওয়া যায় তা হল সেই সময় যারা তাঁবু করত তারা তাদের রান্নাবান্নার ব্যবস্থা তাঁবুর ভেতরেই করত, কারণ বাইরে অসহনীয় ঠান্ডা। তাঁবুতে রান্না করার সময় যে উনুনের ধোঁয়া বেরোতো তাকে বাইরে বের করার জন্য চিমনির মত এক ধরনের পাইপ ব্যবহার করা হতো। রান্না শেষ হবার পরে সে পাইপ খুলে ফেলা হত। ঘটনার দিনও রান্না হয়ে যেতে পাইপ খুলে ফেলা হয়, কিন্তু কোনওভাবে কয়লার ভেতরে আগুন থেকে যাওয়ার জন্য তাঁবুর ভেতরে আগুন ধরে যায়। তড়িঘড়ি আগুন নেভানোর প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। সেই ধোঁয়া বের করার জন্যই তাঁবুর ভেতর থেকে জায়গায় জায়গায় ছুরি দিয়ে তাঁবুর কাপড় কেটে ফেলার চেষ্টা করা হয়। আগুন কোনওভাবে কিছুটা বাগে এলেও ভেতরে এত ধোঁয়া যে তখন হাঁসফাঁস অবস্থা। এদিকে যেখান দিয়ে ধোঁয়া বের হয় সেই পাইপ আগেই খুলে ফেলা হয়েছে। ফলে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার আতঙ্কে পর্যাপ্ত পোশাক না পড়েই বাইরে বেরিয়ে আসে সবাই। কারো কারো দেহ আগুনে পুড়েও যায় কিছুটা। পরবর্তী সময়ে মৃতদেহগুলোতে সেই পোড়ার দাগ পাওয়া যায়। অভিযাত্রীদের মধ্যে যাদের গায়ে গরম কাপড় পরা ছিল তারা আশ্রয় পাওয়ার জন্য একটু দূরে যায় আর যাদের গায়ে তেমন শীতবস্ত্র ছিল না তারা কাছাকাছি একটি সিডার গাছের নীচে বসে পড়ে। কিন্তু সেই সময় প্রচণ্ড বরফ পড়তে শুরু করে এবং ওরা বোঝে এই বরফ ঝড়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। সেসময় ওরা সিডার গাছের উপর উঠে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। গাছে ওঠার সময় শরীর গাছে ঘষে যায় তাই হয়তো রক্তের দাগ পাওয়া গেছিল। গাছে উঠলেও খোলা প্রকৃতিতে প্রচন্ড ঠান্ডায় নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারেননি তাঁরা। ঐ গাছের উপরেই দুজনের মৃত্যু হয়। অন্য তিনজন ওখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে কোথাও কিছু দেখতে না পেয়ে আবার তাঁবুতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাঁবু ততক্ষণে পুড়ে গেছে আর ক্রমাগত তুষারপাতে বরফে ঢেকে গেছে তার চারপাশ। অগত্যা ঠান্ডার প্রকোপ থেকে বাঁচতে এদিক ওদিক আশ্রয় খুঁজতে থাকে হতভাগ্য তিনজন। কিন্তু কোথায় আশ্রয়? ওই অমানুষিক শীতে তুষারঝড়ের মধ্যেই এঁকে এঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তাঁরাও। বাকি চারজন আরও কিছু সময় বেঁচে ছিলেন বলে ধারণা করা যায়। ছোট্ট একটি টিলার কাছে গিরিখাতে আশ্রয় নেয় তাঁরা। কিন্তু সে রাত্রে ভাগ্য কারও সহায় হয়নি। ওই সময় হঠাৎ তুষারধস নামে এবং অবশিষ্ট চারজনের দেহও প্রায় ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সেখানেই কারোর খুলি ফেটে যায়, বুকের পাঁজরের হাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় কারোও, কারোও বা চোখের মণি ঠিকরে বেরিয়ে আসে।

এ ব্যাখ্যার পরও কিন্তু হিসেব মেলে না। অন্তত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। মৃত দুজনের শরীরে তেজস্ক্রিয়তা কোথা থেকে এল? তবে কি কোনও UFO ছিল আশেপাশে? তবে গবেষণায় বলা হয়েছে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া গেলেও সেটা খুব বেশি মাত্রায় নয়। জানা গেছে ঐ দুজনে নাকি কাজ করতো যেখানে, সেখানে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে গবেষণা চলত। আর তেজস্ক্রিয় পদার্থ দীর্ঘদিন শরীরে থেকে যায়, তাই হয়তো ওই দুজনের জামাকাপড়ে তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্তত সে সম্ভাবনা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্ত যাই হোক না কেন এগুলো সব অনুমান। সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল তা হয়তো সত্যিই কেউ জানেনা। কিন্তু সেদিনের ঘটনার রেশ আজও চলছে। অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেলেও এখনও গবেষক আর অনুসন্ধানকারীদের হাতছানি দেয় এই কালান্তক দিয়াতলভ পাসের মৃত্যুফাঁদ।

You might also like